'দূরবীন'-এর পর তাঁর সাথে আবার দেখা দিন দশেক পরে। কথা নেই বার্তা নেই, আমাকে নাকি তাঁর সাথে যেতে হবে পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর আর কোলকাতায়; অনেকগুলো মানুষ নাকি অপেক্ষায় আছে আমার! শুনে হেসে বাঁচি না। পাগলামি আর কাকে বলে! কিন্তু, উপেক্ষাও কি পেরেছি দিতে?
তাঁর গল্প শুনবার মোহে, একদল নতুন মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার লোভে 'না' করতে পারি নি আর। বর্ষার এক ছিমছাম দুপুরে ভাতঘুমের বদলে রওনা হলাম আমি, শীর্ষেন্দুর সাথে, 'পার্থিব'-এ!
বাংলাদেশ থেকে সোজা চলে গেলাম বিষ্ণুপুরে, কৃষ্ণজীবনের গ্রামের বাড়িতে। কৃষ্ণজীবন মস্ত বড় বিজ্ঞানী, পৃথিবী জুড়ে তার নামডাক। তবে মানুষ হিসেবে তিনি আরও বড়! বিজ্ঞান নিয়ে যার কারবার, সে নাকি পৃথিবী সুদ্ধ লোকের কাছে বলে বেড়াচ্ছে- "এতকাল পৃথিবীতে বাস করেও, পৃথিবীর ধনসম্পদ লুটপাট তছনছ করেও মানুষ– বোকা মানুষ ধরতেই পারেনি, পৃথিবীর সঙ্গে তার সম্পর্কটা কী!"
কৃষ্ণের সাথে বিষ্ণুপুরের যোগাযোগ কমে গেছে নানা বাস্তবতায়। তবে দেখা হল তাঁর বাবা বিষ্ণুপদ এবং মা নয়নতারার সাথে। অপূর্ব এক জুটি। এই র���ষারেষির জুগেও কী চমৎকার দাম্পত্যের চাদর বুনেছেন এই ভীষন 'গেঁয়ো' দুজনে মিলে। তবে বাকি ছেলে মেয়েগুলো মানুষ হয়নি ঠিকঠাক। কেউ নিজ দোষে, কেউ কপালের ফেরে। তাঁদের মুখেই শুনলাম ছেলে বামাচরণ আর রামজীবনের বৈপরীত্য, শুনলাম লোভের বশে হীন-দরিদ্র বীণাপানি-নিতাই এর অদ্ভূত জোড়ের গল্প। শুনলাম কৃষ্ণজীবনের অত বড় মানুষ হওয়ার পটভূমি। শুনলাম এক নিতান্ত অজপাঁড়াগাঁ থেকে নিদারুণ কষ্টে, অসীম অভাবেও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ানো কৃষ্ণজীবনের আত্মার কথা। যে একদিন ফিরে আসতে চায় নিজ গ্রামে, ছুড়ে ফেলতে চায় 'সভ্যতা' নামের মরীচিকার মুখোশকে।
কৌতুহল হল খুব। 'কৃষ্ণজীবন'– এ কেমন মানুষ? এত মস্ত হয়েও খুব অদ্ভূতভাবে আমার এলোমেলো চিন্তার সাথে এক হয়ে যাচ্ছে তাঁর অত পান্ডিত্যের রুচিবোধ, মিশে যাচ্ছে আমার হতাশার সাথে তাঁর দুঃখবোধ, একাকার হয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবনদর্শন! নাহ, এঁর সাথে দেখা না করে ফেরা যাবে না!
শীর্ষেন্দুকে সে কথা জানাতেই হাসলেন খুউব... সে ব্যবস্থা নাকি করাই আছে! এক বুক কৌতুহল নিয়ে রওনা হলাম কোলকাতায়। চারুশীলা, মানে চারুমাসির বাড়ি।
চারুশীলার স্বামী মস্ত আর্কিটেক্ট, বিশ্বজোড়া নাম, টাকার ছড়াছড়ি। বাড়িতে ঢুকেই টের পেলাম সত্যতা। কিন্তু এ কী? এ তো দক্ষযজ্ঞ একেবারে! বিরাট বাড়ি গমগম করছে লোকে। দারুণ ভাবে সাজানো পুরো বাড়ি, ডাইনিং টেবিলে শতেক পদ। তবে ভ্যাবাচ্যাকা খেলার চারুমাসির কথায় -"আসুন! আজকে আপনি আসার উপলক্ষ্যেই পার্টি দিয়ে দিলাম একটা! লজ্জা করবেন না, 'পার্থিব'-এর সকলের সাথে পরিচিত হতেই এই ছোট্ট আয়োজন।" বলে কি এই মেয়ে! পাগল নাকি? শীর্ষেন্দু হাসলেন। বুঝিয়ে দিলেন অত ঘাবড়ানোর কিছু নেই, চারুশীলা একটু অমনই– খুউউব ভালো, প্রচন্ড ফুর্তিবাজ, একটউ অফ-বিটের, তবে সকলকেই কী যে ভালোবাসেন! তার প্রমাণও পেয়ে গেলাম বাকি সময়টুকুতে। ঘুরে ঘুরে পরিচিত হলাম সকলের সঙ্গে।
চারুশীলার সঙ্গে ঘুরঘুর করছে যেই মেয়েটি, ও ঝুমকি। হঠাৎ দেখাতে সাদামাটা চেহারাই মনে হয়, তবে ভালো করে তাকালে হুট করেই তীক্ষ্ণ লাবণ্যতা টের পাওয়া যায়। এছাড়াও হাব ভাবে সহজ-সরল জড়তা থাকলেও, ব্যক্তিত্ব খুব স্পষ্ট।ও ই পরিচয় করিয়ে দিল ওর বাড়ির আর সবার সাথে। বাবা-মা অপর্ণা-মনীষ। খুব পরিচ্ছন্ন দম্পতি, যদিও দুজনের বাস্তবতাবোধ ভিন্ন,তবুও ভীষণ ভালো বোঝাপড়া ওদের। পাশের বাড়িতেই থাকে। বোন অনু আর ভাই বুবকা। অনু মেয়েটাকে কেন জানি ভালো লাগেনি, বাচ্চা মেয়ে, কিন্তু চাহুনীতে বড্ড পাকামি!
সোফার এক কোণে চুপচাপ বসে আছে রোগামতন একটা যুবক। চোখ তুলে চাইছে না কারুর দিকে, চাহুনীতে একটা দিশেহারা ভাব, বসবার মধ্যে কেমন যেন আত্মবিশ্বাসের অভাব! জানলাম ওর নাম চয়ন, চারুমাসির মেয়ের প্রাইভেট টিউটর। সে কৃষ্ণজীবনের মেয়েকেও পড়ায়। ভীষণ দুঃখী ছেলে, মৃগীরোগ আর অন্যান্য অসুখের ভয় বড্ড ভোগাচ্ছে ওকে। তার উপর পরগাছার মতো ভাইয়ের বাড়িতে থাকা আর অসুস্থ মা যেন ছিবড়ে নিয়েছে ওর সমস্ত যৌবন। মায়া লাগলো খুউব। করুণাও কি নয়?
সোফার আরেকপাশে এক সুদর্শন যুবক সিল্কের পাঞ্জাবি পড়া, মুখোমুখি বসা একটি মেয়ে। দুটিতে গল্প হচ্ছে খুব। বোঝাই যাচ্ছে নিজেদের সঙ্গ উপভোগ করছে ওরা, আমি আর গেলাম না সামনে। চারুমাসি বললেন, একজন হেমাঙ্গ-তাঁর পিসতুতো ভাই, আরেকজন রশ্মি। ওদের বিয়ে হচ্ছে শিগগিরি, যদিও হেমাঙ্গ কিছু বলে নি এখনো, তবে চারুমাসি এবার বিয়ে যেন দিয়েই ছাড়বে হেমাঙ্গের। ছেলেটাকে বেশ লাগছে। প্রাণোচ্ছল, একটু শিশুসুলভ ভাব চোখে মুখে, সে তুলনাম রশ্মি যেন একটু বেশিই স্মার্ট। খাপছাড়া লাগছে নাকি একটু? আরেকটু খেয়াল করতেই দেখলাম, না, ভুল দেখিনি, কিছুক্ষণ পরপর হেমাঙ্গ আর ঝুমকির দু'জোড়া চোখ যেন দুজনের দিকে স্থির হচ্ছে হঠাৎ হঠাৎ। কিছু একটা বলতে চাইছে দুজনেই, পরিস্থতি তাদের সেই সুযোগটা দিচ্ছে না! কিন্তু কেন? কী বলতে চায় ওরা?
এবারে খাবার পালা। ডাইনিং টেবিলে বসেছি সবাই। ডাইনিং রুমের দরজা দিয়ে তাড়াহুড়োয় ঢুকলেন মধ্যবয়সী এক জোড়। পুরুষটি বেশ লম্বা, চওড়া কাঁধ, ভাবেসাবে গাম্ভীর্য প্রকট, তবে চোখদুটিতে কেমন যেন সরলতা ভর করেছে। পাশের মহিলাটিও বেশ পরিপাটি, ক্লাসিক। শীর্ষেন্দু পরিচয় করিয়ে দিলেন। কৃষ্ণজীবন আর রিয়া।
ওহ! এ-ই তাহলে সে! কৃষ্ণজীবন! এক অভিমানী, ব্যথিত বিজ্ঞানী! পৃথিবীকে যে ভালোবাসে নিজের গাঁয়েরই মতোন! পরিচয় একটু এগুতেই শুরু হল কৃষ্ণজীবনের জীবনদর্শন।অনেক অনেক কথার শেষে ওঁ বললো, "জীবনের গভীর গভীরতর মর্মস্থল থেকে মাঝেমাঝে উঠে আসে হলাহল। মাঝেমাঝে উঠে আসে অমৃত। মন্থন কর, জীবনের গভীরে দাও ডুব। নইলে ওপরসা ওপরসা ভেসে বেড়ানো হবে, লাগবে হাজার উপকরণ, বোঝাই যাবে না কেন জন্ম, কেন এই জীবন যাপন।"
সহধর্মিণী রিয়া কি স্পর্ষ করতে পারে কৃষ্ণর এই ব্যকুলতা, এই উদ্বেগ? সে কি প্রগাঢ় মমতায়, সুবিশাল ভালোবাসায় দিতে পারে কৃষ্ণকে একটুখানি ভরসা, একটুখানে স্বস্তি?
কৃষ্ণ কি বোঝাতে পারে রিয়াকে সব? নাকি কাজের ব্যস্ততায় এড়াতে পারে না দুজনের অবশ্যম্ভাবী দূরত্ব?
কে জানে! চোখ দেখে কি আর অতটা বোঝা যায়? আমি কি অতটাই অতলস্পর্শী?
এরপরের কাহিনীগুলো এগুতে থাকে ধীরলয়ে, চলতে থাকে নিজের গতিতে। কাহিনীর গলিঘুপচি, চরিত্রের বিশাল সম্ভার— কোনোকিছুই জট পাকাতে পারে না এর বুননে, কাটতে পারে না কোনো সুর। সমস্তটা মিলে এক মস্ত জীবন দর্শন, এক বিরাট রঙিন ক্যানভাস।
গল্পের যখন শেষ, তখনো আমি ডুবে আছি সবটাতে। নিজের ব্যক্তিসত্তার তিনটি দিক স্পষ্ট খুঁজে পেলাম কৃষ্ণকান্তে, হেমাঙ্গে, ঝুমকিতে। তাই বুঝি এত অল্পেই এতটা আপন লাগছে ওদের?
সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কোলকাতার ব্যস্ত রাস্তায়। চাপা গলায় শীর্ষেন্দু বলে উঠলো, "জীবন ও মৃত্যুর অর্থহীনতার মাঝখানে কী মহান এই পার্থিব জীবন! ক্ষণস্থায়ী, অথচ কত বর্ণময়!"
[এটা কোনো বুক রিভিউ নয়। ভেবে দেখলাম, ওভাবে আমি পারি না লিখতে। তাই লিখে গেলাম ৭১৪ পৃষ্ঠার এই বই পড়ার সময়টুকুতে আমার ভ্রমণ। যা বলতে চেয়েছি, বোঝাতে পারি নি তার কিছুই, হয়তো ! 'পার্থিব' - যে কোনো কিছুর চেয়েও একটু বেশি কিছু...! ]