পথের পাঁচালী ট্রিলজির পুরোটা আমি দেখিনি, শুধু প্রথমটা আর শেষটা দেখেছি। অপুর সংসার আমার মামীর ভারী পছন্দের ছবি, বিয়ের পর মামা যখন আমেরিকা গেল, তখন মামী বাংলাদেশে বসে এই মুভিটা দেখত।
কিন্তু বই দুটো তো পড়েছি। এখন এই বই পড়ার পর মনে হল, সেই পুলক ঘোষালের কথা,"লালু, তুই তো গল্প লিখেই খালাস, যত ঝক্কি পোহাতে হয় আমাদের!"(বোম্বাইয়ের বোম্বেটে)।
সত্যিই, লাইটের কাজ, ক্যামেরার কাজ, প্রপার একশনের কাজ, জায়গা বাছাইয়ের কাজ, মানানসই অভিনেতা, অভিনেত্রী বাছাইয়ের কাজ, প্রডাকশনের কাজ, এডিটিং এর কাজ, ছবি বানানো একটা বিরাট কর্মযজ্ঞ বটে!
এসব কাজ যে মহান অদ্ভুত প্রতিভাশালী ব্যক্তির সুচারু অঙ্গুলিহেলনে করতে পেরেছিলেন, তিনি সত্যজিৎ রায়। একটা মানুষের মধ্যে এতরকম গুণ, আর রুচিবোধ থাকতে পারে, অবিশ্বাস্য! আর হ্যাঁ, গুণের পাশাপাশি ছিল প্যাশন। কি করে পথের পাচাঁলী হবে, কি চিত্রনাট্য, কি জায়গা বাছাই, কি বাজেট, কি আগের অভিজ্ঞতা, কিছুই কি সত্যজিৎ প্ল্যান করে রেখেছিলেন? না। অথচ সেটাই কিভাবে বাংলা সিনেমার একমাত্র অস্কার হয়ে রইল? সেটা শুধু সত্যজিৎ এর মত মনের জোর ছিল বলেই। শুধু তার অমিত প্রতিভার গুণে নয়।
আরেকটা জিনিস ভাবলাম, ন্যাচারাল প্লেসে শুটিং করা, শট নেওয়া, জায়গাটা ডেকোরেট করাটাও দারুণ একটা দক্ষতার ব্যাপার। আজকাল শুধু গৎবাধা স্ক্রিপ্ট আর গ্রাফিক্সের যুগে ওমন দক্ষতা কারো থেকে আশা করাও পাপ।
বাংলাদেশের বা কলকাতার আধুনিক চিত্রপরিচালকরা নমস্কার ঠুকেই খালাস। আসলেই কি করে ছবি করতে হয়, কি করে ডাইরেক্টর হতে হয়, আর সবার ওপরে কি করে নিজের প্যাশনকে সার্থক রূপ দেওয়া যায়, সেটা জানতে এই বই বাইবেলের মত পড়া যেতে পারে। সত্যজিৎ নিজে ছিলেন, তুলে দিয়ে গেছেন সৌমিত্রকে, শর্মিলা ঠাকুরকে। এরপর আর কি কেউ এসেছেন? অমন অভ্রভেদী প্রতিভা, অমন রুচি, অমন দেখার চোখ নিয়ে?
সিনেমা আসলে যে একটা জীবন, একটা শিল্প, এটাকে যে পুরোপুরি ধারণ করতে হয়, সেটা সত্যজিতের পর আর কাউকে বুঝতে দেখা গেল না! তাই "সিনেমা না করতে পারলে বেচেঁই বা লাভ কি!" এই কথা ওই মানুষটির মুখেই মানায়।
সত্যজিৎ সত্যজিৎই, এই কথাটা লিখে দিলেই হত। কিন্তু তিনি কেন যে সত্যজিৎ,সেটাও বলার দরকার ছিল। এবার বইটা পড়ে অন্য পাঠকেরা ধন্য হন, যেমন আমি হয়েছি।