দেশভাগে ঘরছাড়া মানুষ বনে জঙ্গলে এসে বসত গেড়েছে। এ থেকেই শুরু মানুষের ঘরবাড়ি উপন্যাসটির, এরপর সেখান থেকে দেখা মেলে প্রকৃতির অপূর্ব বর্ণনা, বিলু-পিলুদের ছোট থেকে বড়ো হয়ে ওঠা, চঞ্চল বাবার ঘরবাড়িতে স্থিতু হওয়া।
শহরের-বয়সে ছোট ছোড়দির প্রতি বিলুর এক রকম অনুভূতি জন্মেছিল, বিলু জানতো না এই অনুভূতির নাম ভালোবাসা। দীর্ঘদিন শহুরে ছোড়দিকে সে ভুলতে পারেনি, এমনকি দ্বারের কাছে সাক্ষাৎ লক্ষ্মী ছোড়দির অনুভূতিকে কমায়নি, বড়োং বাড়িয়েছে।
উপন্যাসে আমার সবচেয়ে পছন্দের চরিত্র, লক্ষ্মী। তার পরিচয়টা শুরু হয় এভাবে-
“মন্দিরের দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেল। খুলে দিচ্ছে আমারই বয়সী একটি মেয়ে। ডুরে শাড়ি পরনে, মাথায় ঘোমটা। ………অমা! আমাদের নতুন মাস্টার দাঁড়িয়ে আছেন গো। আসেন আসেন, আমার সঙ্গে আসেন।“ লক্ষ্মীর ভাবটা এমন, যেন বিলু তার কতদিনের পরিচিত! এই যে এক দেখায় সমস্ত বিভেদ ভেঙে আপন করে নেয়া, ক’জন পারে?
দেবালয়ের আশ্রিতা লক্ষ্মী-বয়সে বিলুর সমান হলে কি হবে, পরপর দু’বার বৈধব্যকে বরণ করতে হয়েছে তার। নিজের মঙ্গল অমঙ্গল নিয়ে তার ভাবনা নেই, কিন্তু পাছে বিলুর অমঙ্গল হয়ে যায়, এ নিয়ে তার দুশ্চিন্তা বেশি।
“লক্ষ্মী লন্ঠন হাতে চলে এসেছে। হাতে শীতের চাদর। শুধু বলল, বাড়ি চল মাস্টার। ঠান্ডা লাগবে। এটা গায়ে দাও। ঠান্ডা লাগিয়ে জ্বর বাধালে কে দেখবে।
-কেন তুমি।
-আমি তোমার কে? কেউ না। আমার দায় পড়েছে দেখার।“
নটু পটুকে পড়ানোর মাঝখানে বিলুকে কলেজে যেতে হয়। ঘরদোর পরিষ্কার, কাপড় কেঁচে দেয়া, স্নানের জলটুকু তুলে দেয়া- সবটা লক্ষ্মীই করে। আসলে বাড়ির সব কাজ লক্ষ্মীই করে, এতসবের মাঝে মাস্টারের যাতে অযত্ন না হয় সে খেয়ালও লক্ষ্মীর রাখা চাই।
দেবালয় ছেড়ে বিলুর বাড়ি দেখার সাধ লক্ষ্মীর।
-আমাদের বুঝি পছন্দ না ঠাকুর।
-এ কথা কেন?
-এই যে ছুটি হলেই বাড়ি যেতে ইচ্ছে হয়। আমাকে নিয়ে যাবে?
বিলুর ভয়, একটা সোমত্ত মেয়েকে একা বনজঙ্গলের ভেতর দিয়ে নিয়ে যেতে চাওয়া কি ভালো দেখাবে?
-চল না একদিন, বৌদি, দিদি, নটু, প্টু, তুমি, সবাই। সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে আসি।
-সবার সাথে কেন যাবো ঠাকুর? যেতে হয় তোমার সঙ্গে যাবো। যা কপালে থাকে হবে।
লক্ষ্মীর চোপাকে সবাই ভয় করে। লক্ষ্মী যখন বলেছে, যাবে, সে যাবেই, বৌদি থেকে পারমিশনটা বাগিয়ে আনে।
এমন সাক্ষাৎ রমনি পাশে পেয়েও শহুরে ছোড়দির রেশ বিলুর কাটে না। একদিন আরেক গড়নের শহুরে ছোড়দির সাথে তার পরিচয় হয়। মৃন্ময়ী। বাড়ির লোকজন তারে ডাকে মিমি। লক্ষ্মীর সাথে তার খুব ভাব। রায়চৌধুরী পরিবারের দেবালয় দর্শন-উপন্যাসের একটা টার্নিং পয়েন্ট।
মিমি জানিয়ে রাখে, অষ্টমীর রাতে মাস্টারের সাথে তার রেললাইনে হাঁটা চাই। লক্ষ্মী বোঝে, তার ঠাকুরের মাঝে একটা কিছুর পরিবর্তন এসেছে। লক্ষ্মী আবদার করে বিলুর কাছে,
-অষ্টমীর দিন আমাকে ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যাবে? আমি নটু পটু তোমার সঙ্গে ঠাকুর দেখব।
-মাস্টার যাবে ত?
……
-বুঝতে পারছি তোমার ইচ্ছে নেই মাস্টার।
অষ্টমীর দিনে বিলু মন্দির প্রান্তরে ঢুকে দেখে, লক্ষ্মী বৌদির পাশে বসে গান শুনছে। যেন গান শুনছে না, মন্দিরে হত্যা দিয়েছে। চোখ দেখলেও বোঝা যায় ইহজগতে নেই কিংবা কত মগ্ন সে। লক্ষ্মীর আবদার তুচ্ছ করে বিলু মিমির স্বার্থোদ্ধারকেই সায় দিয়েছিল বটে, তবে তা যে কেবল রেললাইনে হাটা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না, এ বলাই বাহুল্য। লক্ষ্মী কি নিজ চোখে দেখেছিলো সব?
“সহসা মিমি উঠে দাঁড়ালো। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, দেখছ কে গেল!
-কে!
-দেখ না। ঐ যে জঙ্গলের মধ্যে নেমে গেল। “
লক্ষ্মী চায় নি বিলু কিংবা মৃনন্মীর পথের কাঁটা হয়ে থাকতে। আজ এজন্যই উপন্যাসের প্রথম খন্ডের সমাপ্তি হয় লক্ষ্মীর আত্মহননের মধ্য দিয়ে। কিন্তু যাদের জন্য লক্ষ্মী আত্মোৎসর্গ করলো, সেই বিলু আর মৃন্ময়ী কি কোনদিন এক হতে পেরেছিল?
“পটু ডাকছে, স্যার শিগগির আসুন। লক্ষ্মীদি বিষ খেয়েছে। ……… লক্ষ্মীর দরজা ভাঙা। ভিতরে লক্ষ্মী পুজোর শাড়ি পড়ে শুয়ে আছে। পায়ে আলতা। মাথায় সিঁদুর। চোখ দুটো আধবোজা। ঠোঁটের কোণে সেই বিষণ্ণ হাসিটুকু… “
উপন্যাসের দ্বিতীয় খন্ডে গিয়ে মনে হয়েছে, বিভিন্ন বিষয়ের পুনরাবৃত্তি। লেখক নিজেও স্বীকার করেছেন, উপন্যাসটি তিনি দীর্ঘ সময় ধরে লিখেছেন আলসেমির কারণে। আর এজন্য হয়তো একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। উপন্যাসের প্রথম খন্ড ছেড়ে যেমন ওঠা যায় না, দ্বিতীয় খন্ডে এসে যেন আর আগাতে ইচ্ছা করে না। প্রথম খন্ডে বিলুকে আমরা দেখি পড়াশোনায় আগ্রহী আর সম্ভাবনাময়, অথচ দ্বিতীয় খন্ডে বিলুকে কেমন যেন বয়সের তুলনায় অপরিণত লাগে। মিমির নাম দিয়েছে সে পরি, অথচ সে চায় না পরি কখনও তার বাড়িতে আসুক। পরির প্রশংসা শুনতে তার ভালো লাগে না, আবার কেউ পরির দূর্নাম করলেও তার সহ্য হয় না। পরি ছাত্র ইউনিয়ন করে, থিয়েটারে অভিনয় করে, এসব বিলুর ভালো লাগে না। শেষতক পরির গালে চড় মেরে কালশিটে করে দেয়, আবার নিজের কাজে লজ্জিত হয়ে বাড়িছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়!
বিলুর ছোট ভাই পিলুকে নিয়ে বলতে হলে বলতে হয়, দুরন্তপনায় জুরি মেলা ভার এই পিলুই শেষ পর্যন্ত বাড়িঘর এবং সংসারের সবচেয়ে দায়িত্ববান ব্যক্তিত্ব। পিলুকে নিয়ে আজকে বলতে ইচ্ছে করছে না, শুধু এটুকু বলতে যাই, বিলু অনেক ভাগ্য করে এসেছিলো বলেই পিলুর মতো ভাই পেয়েছে। পিলুর মুখের “…দাদারে” ডাকটুকু পুরো উপন্যাসের সবচেয়ে আবেগঘন আহবান।
(পুনশ্চঃ লিখবো না লিখবো না করেও শেষতক ভাবলাম, হৃদয়ের হাহাকারটুকু খাতার পাতায় লিখা থাক। ভুলত্রুটি মার্জনীয়)