"ছোট ভাইয়ের ওয়াইফ যেমন ভাসুরের নাম লয় না,হেইরকম ইয়াহিয়া-টিক্কা-নিয়াজী-ওমরের দল মুক্তিবাহিনীর নাম লইতে পারবো না। খালি চিল্লাইতে চিল্লাইতে কইবো দুষ্কৃতকারী, রাষ্ট্রের দুশমন আর বিদেশী চরেরা এগুলা করতাছে।"
মুক্তিযুদ্ধের নাম নিলেই যেসব শব্দ মাথায় ঘুরপাক খায়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তার মধ্যে একটি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বোধ করি সবচাইতে জনপ্রিয় অনুষ্ঠানটি চরমপত্র। ২৫ শে মে, ১৯৭১ থেকে ১৬ ই ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত নিয়মিতভাবে প্রচারিত এই কথিকাটি। অবশ্য তখন জনসাধারণের জানা ছিল না এই কথিকার কথক ও লেখক কে!! সেই উত্তর পাওয়া যায় চরমপত্রের শেষ পর্বের শেষ অংশে।
"আইজ ১৬ই ডিসেম্বর। চরমপত্রের শ্যাষের দিন আপনাগো বান্দার নামটা কইয়া যাই। বান্দার নাম এম আর আখতার মুকুল।"
যদিও এম আর আখতার মুকুল তাঁর চরমপত্রের জন্যই অবিস্মরণীয়, তবে তাঁর আরো একটি বই আছে, "আমি বিজয় দেখেছি"। ছাত্র অবস্থায় রাজনীতির শুরু। ১৯৪৮-৪৯ সালে জেল থেকেই স্নাতক পাস। অনেক লম্বা সময় ছিলেন সাংবাদিকতা পেশায়। ১৯৭১ সালে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের ছিলেন তথ্য ও প্রচার অধিকর্তা। সব কাজের ফাঁকে রোজ ভোর চারটায় উঠে লিখতেন এই দলিলের পান্ডুলিপি। লেখা না হওয়া পর্যন্ত তাঁর সহধর্মিণী ডাঃ মাহমুদা খাতুন নাস্তা দিতেন না।
চরম পত্র মূলত ব্যঙ্গাত্মক কথিকা। এই কথিকায় মূলত পাকিস্তানী জঙ্গি সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা ও বিচ্ছুদের (মুক্তিযুদ্ধের) গাবুর মাইরের চোটে মছুয়াগো (পাকবাহিনীর) ভাগোয়াট হওনের কথা রসিয়ে রসিয়ে বলা হতো। আমার মনে হয়েছে পাক সরকারের ব্যঙ্গের চাবুক চালানোতেই বেশি নজর দেয়া হয়েছে, ফলত ফিল্ডের কথা একটু কম স্পেইস পেয়েছে। বেশ কিছু ঐতিহাসিক (সেইসময়ের জন্য অবশ্য বর্তমান) আর হাতেগোনা কয়েকটা কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে কথিকার যাত্রা। হেতানগো কয়েকডার লগে আপনাগোরে একটু মোলাকাত করাইয়া দিতেছি।
১. ছদর ইয়াহিয়া: পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট
২. লারকানার লড়কা: জুলফিকার আলী ভুট্টো, পিপিপির নেতা।
৩. পিঁয়াজী: নিঁয়াজী, ইস্টার্ণ কমান্ডের প্রধান খুব সম্ভবত এপ্রিল থেকে।
৪. টিক্কা খান: পূর্ব বাংলার গভর্নর ও সামরিক প্রশাসক
৫. আগায় খান পাছায় খান, খান আব্দুল কাইয়ুম খান: কাইয়ুম মুসলিম লীগের প্রধান
৬. ঠ্যাটা মালেক্ক্যা: ডা: আবদুল মোত্তালিব মালেক, ৩/৯/৭১-১৪/১২/৭১ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর
৭. চুষ পাজামা মাহমুদ আলী: সহকারী দলনেতা পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের
৮. হরিবল হক : হামিদুল হক চৌধুরী, দলনেতা পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল
৯. এম আহম্মক: মনজুর আহমেদ, ফরেন মিনিস্টার
১০. এদেশীয় মানুষের মনোভাব ফুটিয়ে তোলার জন্য কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে ছিল ছক্কু মিয়া, মেরহামত মিয়া, কাউল্যা।
বইটির সবচাইতে অনন্য দিক ছিল এর ভাষা। ঢাকায়া বাঙাল ভাষার ব্যবহার করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে অনান্য অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা। ব্যবহার পেয়েছি ইংরেজী, আরবি, ফার্সি শব্দেরও। এই ভাষার ব্যবহারই বোধ করি চরম পত্রকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তুলে নেয়। আরো একটি ব্যাপার লক্ষণীয় বেশিরভাগ পর্বে শুরু ও শেষ একই কথা দিয়ে। যেমন পর্ব ৭৯, শুরুর শব্দ কাপে কাপ, শেষেও তাই। কখনো ব্যঙ্গের মাধ্যমে, কখনোবা মেছালের (গল্প) মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে সেসময়ের রণনীতি ও রাজনীতি। বোঝা গেছে যুদ্ধের টেম্পো। জুন পর্যন্ত খুব অল্পই ছিল যুদ্ধের কথা। জুলাই থেকে অক্টোবর ছিল গেরিলা যুদ্ধের সময়। মফস্বল তো বটেই খোদা ঢাকাতেই শুরু হয় বোমা ও মাইনের ম্যাজিক, কাটা পড়ে পাক বাহিনীর সাপ্লাই লাইন। কিছু কিছু ছোট ছোট অঞ্চল মুক্তিবাহিনীর দখলে (বর্তমানের অনেক জেলা তখন মহকুমা ছিল)। নভেম্বরে যুদ্ধ ময়দানে যোগ দেয় নিয়মিত বাহিনী। ডিসেম্বরের শুরুতে অনেক জেলা শহরও ছাড়তে শুরু করে পাক হানদাররা। ১৬ ই ডিসেম্বর প্রয়োজন শেষ হয় চরম পত্রের।
মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান দলিল অথচ এটি প্রকাশে সময় লাগে ২৮ বছর। ৭২ এ অর্থ সংকট, ৭৫ বঙ্গবন্ধু হত্যা, ৮০-৮১ তে তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক পান্ডুলিপি প্রত্যাখান, খালেদা জিয়া- এরশাদের আমলেও লেখককে লুকিয়ে রাখতে হয় এর পান্ডুলিপি। অবশেষে ২০০০ সালে বই আকারে প্রকাশের মাধ্যমে ফুরায় অপেক্ষার পালা।
৭১ বাবারা চলে যান আসামে। চরম পত্র পড়তে দেখে বাবা বলছিল আসামে রাতের বেলা বসে চরমপত্র শোনার অভিজ্ঞতার কথা। ভাবছিলাম তাই তো! রেডিওর অনুষ্ঠানের আসল মজা শোনাতে। চাইলেও শোনা যাবে না চরম পত্র। কেন?? আচ্ছা, লেখকের ভাষায় চেষ্টা করি। কুমিল্লার মীরজাফর আহম্মক নিজেগো তপনের বাসন্তীর কালার ঢাকোনের লাইগ্যা সব অক্করে ক্যাদোর মইদ্দে গায়েব কইরা দিছে।
চরমপত্র
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশক: অনন্যা