ন্যাশনাল জিওগ্রাফী চ্যানেলে বাংলায় ডাবিংকৃত অনুষ্ঠানগুলো কখনো দেখেছেন? যদি না দেখে থাকেন, প্রথম সুযোগেই দেখে নেবেন! অনুষ্ঠানগুলোর ন্যারেশনগুলোকে যখন বাংলায় ডাব করে প্রচার করা হয়, ‘মাছি মারা কেরানি’ বিষয়টি কি তা হাতে-কলমে বেশ বোঝা যায়! দু একটি উদাহরণ এখানে বোধহয় দেয়াই উচিৎ। ধরুন, সমুদ্র জগতের জীবন বৈচিত্র্য নিয়ে কোন একটি অনুষ্ঠানের বাংলায় ডাব করা সংস্করণ দেখছেন। মূল ভাষায় ইংরেজীতে সঞ্চালক হয়ত বলেছিলেন “লুক অ্যাট দি সাইজ অফ দি ফিশ! ইট’স রি-ই-য়েলি বিগ”। ডাব করা বাংলায় আপনি শুনবেন অতি নাটকীয় কায়দায় গলা কাঁপিয়ে কেউ বলছেন, “আর তাকিয়ে দেখুন মাছটির আকারের দিকে। এটা কিন্তু সত্যিই ভীষণ বড়!” আজ সকালেই ‘ট্যাবু’ অনুষ্ঠানটি দেখছিলাম, বাংলায়। একজন ব্রিটিশ মহিলার সাক্ষাৎকার প্রচার করছিলো তখন, যিনি বাস্তবে একদম শতভাগ কর্মক্ষম কিন্তু নিজেকে পঙ্গু ভাবতে ভালোবাসেন, তাই হুইল চেয়ারে ঘুরে বেড়ান। তিনি তাঁর মেরুদণ্ডে অপারেশন চালিয়ে নিজেকে প্যারাপ্লেজিক করে ফেলতে চাইছেন (মানব মন!), এই বিষয়টি তিনি তাঁর ডাক্তারকে যখন প্রথমবার খুলে বলছেন, হতচকিত ডাক্তারের প্রতিক্রিয়া বাংলা ডাবে শুনেছি “এটা সত্যিই খুব মজার এবং আকর্ষণীয়” (ইন্টারেস্টিং)। ভালোবাসা দিবসের ওপর করা এক অনুষ্ঠানের বাংলা সংস্করণে দেখেছিলাম এক মহিলা তাঁর বয়ফ্রেন্ডের গলা জড়িয়ে বলছেন “তোমাকে খুঁজে পাওয়াটা ছিলো আমার জন্য বিশাল কিছু, উম্মা”! শেষের এই ‘উম্মা’ আসলে মহিলার চুমু খাবার আওয়াজ (আহেম আহেম), সংলাপের সাথে সাথে এটিও বাংলায় ডাব করা হয়ে গেছে! স্টুডিওতে বসে মাইক্রোফোনের পেছনে জনৈকা নারী বাংলায় অনুবাদকৃত সংলাপ আউড়াতে আউড়াতে আচমকা ‘উম্মা’ বলছেন, দৃশ্যটি কেমন হবে সেটি ভাবার চেষ্টা করি মাঝে সাঝে, কম বয়সের দোষেই বোধহয়!
মোস্তফা মীর রচিত ‘মিশরীয় পুরাণ’ বইটি ন্যাশনাল জিওগ্রাফী কিংবা ডিসকভারি চ্যানেলের এসব বাংলা সংস্করণ অনুষ্ঠানগুলোর কথা মনে পড়িয়ে দিলো, বেশ ভালোভাবেই। বইটির অদ্ভুত বাক্যগঠনরীতি ও শব্দের ব্যবহার পুরাণ পড়বার যে মজা তা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত করলো। ৩৩টি ইংরেজী বইয়ের তালিকা বইটির পেছনে দেয়া আছে, যেগুলোর একটু একটু করে নিয়েই ‘মিশরীয় পুরাণ’ বইটি হয়েছে। ইংরেজী বইগুলোর অনুবাদ করবার সময়ে লেখক খুব যত্নশীল ছিলেন, এমনটা বলতে পারছিনা। অনেক জায়গাতেই একেবারে আক্ষরিক অনুবাদ করে দিয়েছেন মনে হয়। বইয়ের দুটি অংশ এখানে উল্লেখ করছিঃ
“কিন্তু শেথের সেনাবাহিনীকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলার ক্ষেত্রে তার পৌনপুনিক সাফল্য সত্ত্বেও সে তার প্রতিপক্ষকে পরাভূত করতে সক্ষম ছিল না, সর্বদাই সে সক্ষম ছিলো নিজের ক্ষতের কথা ভুলে যেতে”
“রা-এর কর্তৃপক্ষ হিসেবে থোট নিজেই সেই মৃত্যুবিষ, যার কারণে শৈশবে শেথ মরতে বসেছিলো। যেমন থোট রা-এর চোখ পুনরুদ্ধার করেছিল, এমন কি ওষুধের ঈশ্বর হিসেবে সে সক্ষম ছিলো হোরাসের চোখ পুনস্থাপন করতে যখন কালো শূকরের ছদ্মবেশে শেথ তার চোখ উপড়ে নেয়”
গুগল ট্রান্সলেটর এখনও পর্যন্ত বাংলা ভাষায় দক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি এবং গুগল ট্রান্সলেটর এর করা বাংলা অনুবাদ এখনও অনেকের হাসির একটি বড় উৎস। “If you don't have an iphone, well you don't have an iphone” আইফোন এর এই বিজ্ঞাপনটির গুগল অনুবাদ হল “আপনি যদি একটি আইফোন আছে কি না, ভালো আপনি একটি আইফোন আছে না?” বইটি পড়তে গেলে দুষ্ট মনে এই চিন্তাও আসে সময় বাঁচাবার জন্য লেখক বোধহয় গুগল ট্রান্সলেটর দিয়ে অনুবাদ করে নিয়েছেন!
বইটিতে যত্রতত্র ‘যাহোক’ শব্দটির প্রয়োগ চোখে পড়বার মতন। ইংরেজী বইগুলোর যেখানে যেখানে ‘However’ পেয়েছেন সেখানেই হয়ত ‘যাহোক’ বসিয়েছেন। এমন একটি শব্দের এত ‘ঘরোয়া’ ব্যবহার দেখে মনে হতে পারে লেখক বই লিখে নয়, তাঁর বৈঠকখানার আসরে লুঙিতে মালকোঁচা বেঁধে গল্প বলতে বসেছেন।
সবচেয়ে জরুরী বিষয় যে দুটি আমার কাছে মনে হয়েছে, সেগুলো সবশেষে উল্লেখ করছি। পুরাণ লেখবার একটা কায়দা আছে। পুরাণে সাধারণত চরিত্রগুলোকে ‘তিনি’, ‘তাঁর’ ইত্যাদি সম্মানসূচক সর্বনাম প্রয়োগ করে সম্বোধন করা হয়। চরিত্রের প্রতি সম্মান থাকুক না থাকুক, এটি মোটামুটি একটি প্রথা হয়ে গেছে। সুকুমার রায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, বাল্মীকি, কালীপ্রসন্ন সিংহ এঁনারা এভাবেই পুরাণ কাহিনী লিখেছেন। পুরাণের ভাষা একটু ভাবগম্ভীর হবেই। সেখানে চরিত্রগুলোকে ‘সে’, ‘তার’, তাকে’ বলে সম্বোধন করলে তা অনেকটাই দৃষ্টিকটু লাগে। ইন্টারমিডিয়েটে পড়বার সময় আমাদের শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর ‘বিলাসী’ গল্পটি পাঠ্য ছিলো। কলেজের ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষায় ‘বিলাসী’ চরিত্রের বিশ্লেষণ এ একজন নাকি লিখেছিলো “বিলাসী অতি বিলাসী নারী ছিলো। বিলাস করাই ছিলো তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। তাই সে তার নাম বিলাসী করে”। মোস্তফা মীরের গতানুগতিক বর্ণনা অনেকটা এমনই দেখালো কোথাও কোথাও। দু-এক জায়গায় ‘সে’ ও ‘তিনি’র দূষণীয় রকম যুগপৎ ব্যবহারও লক্ষণীয়।
বইটিতে দেব-দেবীদের মূর্তি, ভাস্কর্য ইত্যাদির প্রচুর ছবি আছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি দারুণ ব্যাপার। কিন্তু ছবিগুলো দেয়া হয়েছে এলোমেলো ভাবে। ১১৭ জন দেব-দেবী'র প্রত্যেকের বিবরণীর পাশে যার যার ছবি সংযোজন করলেই বরং ভালো হত। তা না করায় বইটি অনেক সময়ই টেলিফোন ডিরেক্টরীর মত তথ্যবহুল কিন্তু আপাত অপ্রয়োজনীয় পুস্তকে পরিণত হয়েছে।
মিশরীয় পুরাণ দুর্বোধ্য একটি বিষয়। গ্রীক বা ভারতীয় পুরাণের মত এর কোন নির্দিষ্ট কাহিনী নেই। একই গল্প দশকে দশকে পরিবর্তিত হয়েছে। যে দেবতাকে মানুষ আগে ভালো জানতো, তাকেই পরের প্রজন্মের কাছে ভীষণ খারাপ বানানো হয়েছে (সবটাই স্বার্থের খেলা)। প্রাচীন মিশরের মোটামুটি সব অঞ্চলের মানুষেরাই দাবী করেছে তাঁরাই আদি ও অকৃত্রিম পূজারী, বাকিরা অন্ধ! এমন দুর্বোধ্য একটি পুরাণকে বাংলাদেশের মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বলে মোস্তফা মীরের একটা ধন্যবাদ প্রাপ্যই থাকে।
সবশেষে, বইটি পড়ে শেষ করবার অনুভূতি সেই ন্যাশনাল জিওগ্রাফী'র বাংলা ডাবের মত করেই বলি, "ওহ, এটা সত্যিই ছিলো এক কষ্টকর যাত্রা কিন্তু... শেষ পর্যন্ত আমি এসেছি আর...এই চিন্তাটি আমাকে আনন্দিত করে।"
যখন প্রথম এই বইটা দেখলাম, তখন উল্টেপাল্টে দেখে মনে হল, তেমন সুবিধার হবে না। তখন নিইনি। কিন্তু পরে কি মনে করে নিয়ে আসলাম, আর এনেই পস্তালাম। কারো যদি মিথ নিয়ে কোনভাবে আগ্রহ জন্মায় আর এই বইটাই তার প্রথম বই হয়, তবে আমি নিশ্চিত, তার আর মিথ নিয়ে পড়তে ইচ্ছে হবে না।
বইয়ে এমন কিছু কিছু আছে যা পড়ে মনে হল, লেখক বোধহয় ভুলে গেছেন, প্রাঞ্জলতা বলে একটা টার্ম আছে। পড়তেই কি কষ্ট লাগে।
এডিথ হ্যামিলটনের মিথলজি বইটা পড়ার কারণে একটা ধারণা মনে গেঁথে গেছে, মিথলজি নিয়ে উনার মতই লেখা উচিৎ। দেবতা/দেবীর বর্ণনা কেন্দ্রিক মিথের বই ভালো লাগার কথা না। ব্যাপারটা অবশ্য এমন না যে, এভাবে লিখলেই খারাপ লাগবে। না হলে তো, প্রতীচ্য পুরান বইটা ভালো লাগতো না। অবশ্য আমি আগে অন্য বই পড়েছি বলেই হয়তো এমনটা মনে হয়েছে। আর একটা কথা ওই বইয়ের সাথে এই বইয়ের তুলনা করাটাই ভুল। প্রতীচ্য পুরান বইটা খুব ভালো, এর প্রাঞ্জল বর্ণনার জন্য।
রেটিং যদি ২.৫ দিতে পারতাম, তাহলে খুব ভালো লাগতো। বইটাতে প্রচুর ছবি আছে। কিন্তু সবই সাদাকালো, অস্পষ্ট এবং অধিকাংশই অস্থানে। সব একসাথে দিলে ক্ষতি কি ছিল?
শেষের অধ্যায়ঃ এই বইয়ের ভালো কিছু বলে যদি থেকে থাকে সেটা হচ্ছে এটা।
আম-জাম-কাঠাল জনতাকে অনুরোধ করবো এই লেখাটা পড়ার জন্য। খুব অসাধারণ কিন্তু।
একজন মানুষ নীল নদীতে পড়ে গেলে এবং কুমির তাকে খেয়ে ফেললে তা ছিল তার জন্য সর্বোচ্চ সম্মান। ওয়াও।
গ্রীক মিথ কেন ঈজিপশিয়ান মিথের চেয়ে শ্রেষ্ঠ তা বুঝে গেলাম। দেবতা দেবীরা এখানে যেন দূরের কেউ। ঠিক ভালো লাগার মতো না।
এনসাইক্লোপেডিয়া হিসেবে কিন্তু এই বইটা বেশ ভালো। :D