দু'ধরনের পড়ুয়া দেখতে পাই বইঘরে, পড়ুয়াদের নানা আড্ডায়। একদল অমল শৈশব কাটিয়েছেন বইতে চোখ পেতে, ওই সঙ্গীসমেত-ই পা দিয়েছেন কৈশোরে। আরেকদলের বই পড়ার সূচনা বালকবয়স পেরিয়ে, বোধ এবং বুদ্ধি খানিকটা পাকার পর।
এখানে বই বলতে গল্পের, অপাঠ্য পুস্তক যাকে বলে, মফস্বলের গুরুজনদের ভাষায় আউট বই।
কাঁচাবয়সে বই পড়ার অভ্যাস না থাকাটা দূষণীয় কিছু নয়। নিন্দনীয় তো নয়ই। দুধদাঁত পড়ার আগেই কাব্যগপ্পো আউড়ানোর খাসলত বানিয়ে আমার অন্তত বাড়তি হাত-পা গজায়নি। অসময়ে আউটবইয়ের ওরকম নেশায় না পড়লে হয়তো আজ এমন হেরে যাওয়া মানুষ হতাম-ই না।
কিন্তু ঐ বয়সে পাওয়া আনন্দটার দাম? পাঁচ বছর, বড়জোর ছয় ছুঁই ছুঁই। সেজখালা দিয়েছিলেন 'নীলহাতি', তিনটে বড়গল্প তাতে। নীলুর একমাত্র মামা থাকেন আমেরিকায়, যাকে ও কখনো দেখেনি। তাও চিঠি লিখতেই পাঠিয়েছিলেন রুপোর ঘন্টা বাঁধা অদ্ভুত সুন্দর একটা হাতি, আপনা থেকেই যার শুঁড় নড়ে, শব্দ বাজে টুনটুনঝুনঝুন..
প্রবাসী মামা ছিলেন না কোথাও, কতো মন খারাপ করেছি তা নিয়ে ভেবে! কে পাঠাবে তাহলে অমন ঘন্টাঝোলা হাতি?
আরেকটা গল্প নীলু আর এক মামদো ভূতকে নিয়ে। জন্মদিনে বাবা-মা কিনে দিয়েছিলেন চমৎকার এক মেম পুতুল। নীলু তার নাম রেখেছিলো অ্যানি। আর বোকা মেয়ে হইয়ুু, মামদোভূতের ছানা, খিদে পেতেই কিনা চিবিয়ে খেয়ে নিয়েছিল ঐ পুতুলের মুন্ডুটা।
গোলাপি উলের ফ্রক পরা ডলের নাম রেখেছিলাম অ্যানি। নীলুর দেখাদেখি।
শেষ গল্পের নাম আকাশ পরী। নীলুর বাগানে লাগানোর জন্য সেনচুরিয়ান ফ্লাওয়ার নামেক এক বিদেশি গাছের চারা এনে দিয়েছিলেন বাবার বন্ধু আজিজ চাচা। একটা ছড়া শিখিয়ে বলেছিলেন পূর্ণিমার রাতে ফুলের মালা পরে জানালার ধারে বসে মনে মনে সেই ছড়া বললে আকাশ থেকে পরীরা নেমে এসে খেলা করে।
বাসায় মস্ত বাগান ছিলো। ফুল ছিঁড়তে বারণ ছিলো বলে পরীক্ষা করে দেখা হয়নি তখন আর। সত্যিই আসতো হয়তো, বললে, ঐ ছড়াটা..
শিশুতোষ বইসমেত শৈশব কাটানোর সুবিধে কিংবা অসুবিধেটা বুঝতে পেরেছেন এবার? আমরা বড় হয়েছিলাম যুক্তিতক্কোহীন বিশ্বাস নিয়ে, বইতে, ছাপার অক্ষরে যা লেখে, সব সত্যি, স-ব!
কী বোকা ছিলাম আসলে, তাই না? :)