হোয়াটসঅ্যাপের কোনো একটা গ্রুপে এই বইয়ের প্রচ্ছদটি প্রথম দেখামাত্র চমকে উঠেছিলাম। কাগজের কাটিং আর লেখায় ভরা প্রচ্ছদ থেকে যে দুটি চোখ আমার দিকে তাকিয়েছিল, তাদের যে ভীষণ ভালো করে চিনি! সত্যি বলতে কি, একটা সময় এইদুটি চোখ তথা তাদের মালকিনকে চিনতেন না এমন বাঙালি বিরল। সেই অভিনেত্রীর রহস্যমৃত্যু নিয়ে তুলকালাম হয়েছিল ক'দিনের জন্য; আবার তা স্তিমিতও হয়ে গেছিল অস্বাভাবিক দ্রুততায়। সেই সময় মা-ঠাকুমাদের দীর্ঘশ্বাস-ভরা "আহা রে!" দিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা শোনেনি এমন মানুষ, অন্তত আমার প্রজন্মে, খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাহলে কি এই বইটা মহুয়া রায়চৌধুরীকে নিয়েই? পড়তে গিয়ে বুঝলাম, উত্তর 'হ্যাঁ' এবং 'না' দুই-ই। কেন? কারণ আইনের দাবি মেনে, অজস্র পরস্পরবিরোধী বয়ানকে মাথায় রেখে তাঁকে নিয়ে লিখতে গেলে... লেখাই যায় না। তাই লেখক এখানে এক সাংঘাতিক কাজ করতে চেয়েছেন। তিনি একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও কাল্পনিক রহস্যের সমাধান করতে চেয়েছেন ফিকশন হিসেবেই। বাংলায় রীতা নামে খ্যাত এক অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, সুন্দরী, প্রতিভাবান বাঙালি অভিনেত্রী তৎকালীন বম্বেতে প্রীতি নাম নিয়ে নিজের প্রথম সিনেমাতেই অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন করেছিলেন। কিন্তু তারপর তিনি আর সাফল্যের মুখ দেখেননি। সেই প্রথম সিনেমাটি নতুন করে হলে রিলিজ করলে এন.এফ.ডি.সি-র ছাত্র প্রাঞ্জল সিনেমাটি নির্মাণের কাহিনি নিয়ে তথ্যচিত্র বানাতে আগ্রহী হয়। সেই নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে একটা অদ্ভুত রহস্যের সম্মুখীন হয় সে। জানা যায় যে একটি সিনেমার কাজ প্রায় সত্তর শতাংশ শেষ হওয়ার পর হঠাৎই উধাও হয়ে গেছিলেন প্রীতি। কী হয়েছিল তাঁর? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়ে এক কুয়াশাচ্ছন্ন অতীতের মুখোমুখি হয় প্রাঞ্জল। একসময় টুকরো-টুকরো কথাগুলো জুড়ে একটা আস্ত ছবি তৈরি করার লক্ষ্যে সে মুম্বই থেকে এসে পৌঁছোয় কলকাতায়। এরই সমান্তরালে চলছিল এক অন্য জীবনের গল্প। অতি সূক্ষ্ম কল্পনার মোড়কে নিষ্করুণ বাস্তবের পরিবেশন করে লেখক আমাদের আলাপ করিয়ে দিচ্ছিলেন সেই অদ্বিতীয়া অভিনেত্রীর সঙ্গে। সে-বাস্তব রীতিমতো নথিবদ্ধ হয়েছে নানা জায়গায়। তবে তারও পেছনের গল্পটা, বিশেষত তার ফাঁকফোকর আর না-বলা কথাগুলো সম্ভাব্যতা বিচার করে কল্পনার আশ্রয় নিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। ফলে আমরা জেনেছি তাঁর সম্ভাব্য জন্মরহস্য, জেনেছি তাঁর নিরন্তন সংগ্রামের কথা, জানতে পেরেছি রূপে-প্রতিভায় অতুলনীয়া হয়েও তাঁর অসহায়তা আর শোষিত হওয়ার কথা, দেখেছি তাঁর ভালোবাসতে চাওয়ার ও ভালোবাসার জন্য আকুলতা। আর এ-সবের মধ্যে, অজস্র গুজব আর পরশ্রীকাতরতা পেরিয়ে, সত্যিকারের মহুয়াকে হয়তো একটু হলেও জানতে পেরেছি আমরা। কিন্তু বইটাকে মক ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম না করে ফিকশন করেই রাখতে চেয়েছিলেন লেখক। তাই বইয়ের শেষ লগ্নে আমরা মহুয়া আর প্রীতি দু'জনেরই পরিণতির কথা জানতে পারি। কিন্তু... ধন্য লেখক! এতটাই সহানুভূতি আর যত্ন দিয়ে তাঁর চরিত্রদের গড়েছেন তিনি, যে শেষে গিয়ে এটা গল্প জেনেও তেমন ভাবতে ইচ্ছে করে না। মনে হয়, "রোজ কত কী ঘটে যাহা-তাহা— এমন কেন সত্যি হয় না, আহা।"
সেলুলয়েডের পৃথিবীর নানা চরিত্রকে এমনই 'গল্প' আকারে একদা "অঞ্জনা দাশ" ছদ্মনামে পেশ করতেন দুলেন্দ্র ভৌমিক। আলোচ্য বইটি পড়তে গিয়ে তাঁর লেখাগুলোর কথা মনে পড়ছিল এক-একসময়। কিন্তু এই উপন্যাস একটা আলাদাই স্তরে পৌঁছে গেছে লেখকের দুই সমান্তরাল ন্যারেটিভ ব্যবহার এবং রহস্য গল্পের মতো করেই তাদের শেষ অবধি একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেওয়ায়। ফলে কোথাও গিয়ে এই বই শুধু মহুয়ার আখ্যান হয়েই থেমে থাকেনি। খ্যাতি ও অর্থের বহ্নি কীভাবে অজস্র পতঙ্গকে টেনে আনে, আর তাই নিয়ে কীভাবে গড়ে ওঠে ঘৃণ্য বেসাতি— সেটাই যেন আমরা বড়ো স্পষ্টভাবে দেখে ফেলেছি এতে। খেলা ফুরোলে সেই পতঙ্গদের কী হয়, তা-ও আমরা দেখেছি এতে। তবে বইয়ের শেষটা বড্ড বেশি ওপন-এন্ডেড হয়ে গেল। প্রাঞ্জল শেষ অবধি উত্তরের বদলে যা পেয়েছিল তা স্রেফ কিছু সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে। আর আমরা... রাগে, অনুরাগে, সংরাগে আজও আমাদের হাসান, কাঁদান, মুগ্ধ করেন তিনি। আমরা বোধহয় আজও অপেক্ষায় রইলাম শেষ কথাটা জানার আশায়। নাকি তাঁকে ফিরে পাওয়ার আশায়? বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অনুরাগী হোন বা না-হোন, মহুয়া রায়চৌধুরীর কথা জানুন আর নাই-জানুন, এই সুমুদ্রিত হার্ডকভার বইটিকে আদ্যোপান্ত পড়ে ফেলুন। এর কতটা সত্যি, কতটা কল্পনা— এ-সব ভুলে যান; বরং বইটা পড়ুন। অলমিতি।
সত্যি ঘটনা অবলম্বন করে শেষে কি করে মানুষ জিতে যেতে পারে না পড়ে বুঝতাম না, একদমই এটি সত্যি কল্পনা ও সত্যির ককটেল, লেখিকা কে আমার প্রনাম, অন্য মানের লেখা, দারুণ