প্রতিদিন একঘেয়ে সূচিতে দিন কাটাই৷ কর্মক্ষেত্রে যাই, সেখানে ভালোমন্দ নানা বিষয় নিয়ে গল্প হয়। কখনো কখনো হাসির হুল্লোড় ওঠে, কখনো কখনো দেশ নিয়ে, নিজেদের অবস্থান নিয়ে হতাশা জাঁকিয়ে বসে৷
জীবনটাকে একটু অন্যরকম আনন্দ শেখাতে বইয়ের আসলেই বিকল্প নেই। তাই হঠাৎ এমন একেকটা মণিমাণিক্যের সন্ধান পাই, যা মনকে কানায় কানায় পূর্ণ করে তোলে। মনে করিয়ে দেয়, আমি লালল-কবীর-বাউল-ফকিরদের দেশের লোক। কত অত্যাশ্চর্য অজানা রয়েছে ছড়িয়ে, কিছুই না জেনে, অল্প জেনে, নিজেকে পণ্ডিত ভেবে অকারণে আফসোস করে বর্তমানকে নষ্ট করি।
বাউল সম্প্রদায়! এক রহস্যময় ক্ষেত্র। আপাতদৃষ্টিতে তাঁদের নিজেদের চেয়ে খুব দূরের, খুব গ্রাম্য কেউ মনে হয়। ধুলোমাখা বসন আর রুক্ষ মুখের কোন বাউলকে দেখলে বা তাঁদের গ্রাম্যসুরের গান কানে ভাসলে খুব আগ্রহ বোধ করেন সবাই, এমন দাবি করতে পারবেন না। তলিয়ে ভাবিনা গানের কথার অর্থ৷
কত ধরনের বিশ্বাস ছড়িয়ে রয়েছে সহজিয়া বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে। একটি উল্লেখযোগ্য ধারা সাহেবধনী সম্প্রদায়। অগ্রদ্বীপের মেলা তাদের বাৎসরিক অনুষ্ঠান। সবাই এসে মেলাতে জুটে তখন, পঞ্চতত্ত্ব দিয়ে দীনদয়ালের ভোগ সারে। নিজেরা আনন্দ করে, গান গায়। সুধীর চক্রবর্তী এসব এলাকায় নিজে ঘুরেছেন। নিজে মিশেছেন শরৎ পাল, মাযহারুল খাঁ কিংবা গণেশ পাড়ুইদের সাথে। দীনদয়ালের ভক্তদের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম ভেদ একেবারেই নেই। সকলে দীনদয়ালের প্রজা, এইই সবার ভাবনা।
বাউল সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ ভাবনাই গুহ্য, তাদের দর্শন অতি উচ্চমার্গীয়, গানের প্রতিটি শব্দের অন্য ব্যাখ্যা রয়েছে। কৃষ্ণ তাঁদের কাছে যিনি কর্ষণ করেন তিনি, রাধা ক্ষেত্র। আবার অন্য অনেক অর্থ ও রয়েছে। নানান সম্প্রদায়ের নানান দর্শন, শুক্র বা বিন্দুই যার মূলে।
পরকীয়া কেন বাউল সম্প্রদায়ে এত প্রচলিত এরও রয়েছে নানা উত্তর। আবার চারচাঁদ গ্রহণের মতো গোপনীয় প্রথাও রয়েছে। এর অনেকগুলোই সভ্য সমাজের সাথে সাংঘর্ষিক।শহুরে অবিশ্বাসী মানুষের কাছে এর সব ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য মনে হবে না। কিন্তু যাঁরা বিশ্বাসী, তাঁরা এখনো মানুষে সর্বোচ্চ বিশ্বাস রেখে টিকে তো রয়েছেন!
তাঁদের ভাবনাগুলো জানলে চমকে উঠতে হয়, অন্য আঙ্গিকে ভাবতে হয় জগতের প্রতিটি নিত্য ঘটনার কথা।
সুধীর চক্রবর্তী এর এই প্রবন্ধগুলো এত চমৎকার কাজ! আমি প্রায় ১০ দিন লাগিয়ে অল্প অল্প করে বইটি পড়েছি। একেক লাইন কয়েকবার করে পড়েছি, সব বিশ্বাস যৌক্তিক না লাগলেও মনে হয়েছে নতুন করে দৃষ্টি পেয়েছি। দৃষ্টি পেয়েছি মানুষকে, ধর্মকে নতুন চোখে দেখার। এত কষ্ট, এত পরিশ্রম করে লেখক এই প্রবন্ধগুলোর রসদ জোগাড় করেছেন, গবেষণা করেছেন, সাজিয়েছেন চমৎকার ভাষায়, খোলা গলায় স্বীকার করেছেন নিজের অক্ষমতার কথা, যে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে গিয়েছি।
বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলকে দূরে রেখে গভীর নির্জন পথে পাঠককেও হাঁটিয়েছেন লেখক, পাঠক হিসেবে আমি পেয়েছি অপার শান্তি, মূল্যবান এক অভিজ্ঞতা। বইটি শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি, মনে মনে বলেছি আজীবন মনে রাখার মতো একটি বই পড়ে শেষ করলাম। লেখকের মতোই প্রশ্ন জেগেছে মনে,
'আমি ভাবলাম, দীনদয়াল কোথায় থাকেন? হুদোয় শরৎ পালের ভিটেয়, হরিমতী দিদির বিশ্বাসে না গণেশ বা পচার মতো মানুষের দুঃখের অতলে?'