রায় পরিবারের শৈশব মানেই ভীষণ মায়ামাখা জাদুরাজ্য - ভাঁড়ারে লুকিয়ে রাখা আমসত্ত্বের মতোই টক-মিষ্টি! পূণ্যলতার কালীর আঁচড়ে রায় পরিবারের ভারী মজার ছেলেবেলার গল্প বলা আছে এই বইয়ে। পূণ্যলতা চক্রবর্তীর পিতা ছিলেন বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও সন্দেশের স্রষ্টা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। আর বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ব্রাহ্ম সমাজের দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মেয়ে বিধুমুখী দেবী ছিলেন তাঁর মাতা। আর দাদা ছিলেন প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে ননসেন্সের প্রবর্তক সুকুমার রায়।
স্মৃতিকথার পুরোটা সময় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী-র রাশভারি ব্যক্তিত্ব অথচ প্রচন্ড বিনয় মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে রাখে। খেয়ালি এই মানুষটি সারাক্ষণ আপনমনে ছবি আঁকছেন নতুবা বেহালায় সুর তুলছেন। ছেলেমেয়েদেরকেও আদর স্নেহে সঠিক শিক্ষা দিতে ভুলছেন না। নিমন্ত্রণ বাড়িতে গরীব ভদ্রলোকদের কেবল ঠান্ডা লুচি দিয়ে আপ্যায়ন করছিল বলে উপেন্দ্রবাবুকে গরম লুচি দিতে চাইলে তিনি প্রচন্ড বিনীতভাবে উত্তর দিচ্ছেন- "কিন্তু আমার পাতের ঠান্ডা লুচি তো ফুরোয়নি?"
বিধুমুখী দেবী তখনকার যুগেও দিব্যি চমৎকার প্যারেন্টিং বিদ্যা রপ্ত করেছিলেন। তাইতো মেয়ে পূণ্যলতা দেবী হাতের সাপমুখো বালা ভেঙে সামনে এসে দাঁড়ালে একটুও না বকে হেসে বলছেন, "তোমাকে দেখছি এবার লোহার বালা গড়িয়ে দিতে হবে!" নিজের ছেলেমেয়েদের সমান আদরে রোগ সারাচ্ছেন মালীর ছেলের। আর শিখিয়ে দিচ্ছেন জীবনের অদ্ভুত সুন্দর মন্ত্র, "দিয়ো কিঞ্চিৎ, না করো বঞ্চিত!"
সুকুমার রায় ছিলেন ননসেন্স রাইমসের মতোই মজাদার একজন মানুষ। ছোটবোন টুনী মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে ছিল বলে তাকেও পেন্সিল খাতার সাথে তুলে নিয়ে ডেস্কবন্দী করে মুচকি হেসে বলছেন, "মাস্টারমশাইর অর্ডার - যা কিছু মাটিতে পড়ে থাকবে তাই ডেস্কে ভরতে হবে!" আবার পূণ্যলতার গাছে আর সব ভাইবোনের মতো নীল ফুল ফুটেনি বলে সাদা ফুলকে রং তুলি দিয়ে রঙ্গীন করে দিচ্ছেন! কারও উপর বিদ্বেষ কিংবা হিংস্র ভাব থাকলে তা দূর করার জন্য বানিয়ে বানিয়ে মজার গল্প বানানোর একটা খেলা বের করেছিলেন তিনি। খেলার নাম দিয়েছিলেন "রাগ বানানো"!
পূণ্যলতার জন্ম বেড়ে উঠা কলকাতা শহরেই- তেলের বাতি আর টানা পাখার যুগে। তবে বছরান্তে বাড়ির সবাই মিলে দার্জিলিং, পুরী, মধুপুর, চুণার, পচম্ভা ঘুরে ঘুরে সবুজ বনে, রেললাইনের বাঁকে আর সমুদ্রের আদরে ঝুড়িভর্তি স্মৃতি কুড়িয়েছে। বাড়ি ভর্তি সর্বদা মানুষ থাকতো বলে উৎসবমুখর সময় কাটতো প্রতিদিন। রবিবাবু, জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র -এই মজার এবং গুণী মানুষগুলোর সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছিল সেই ছোটবেলা থেকেই।
পুরো বইটি লিখেছেন নিত্য কথোপকথনের ঢংয়ে, একেবারে সহজ সুন্দর ভাষায়। একরাশ মায়া আর একগাদা শৈশব বারবার যেন স্পষ্ট চোখের সামনে ভেসে উঠছিল! অদ্ভুত সুন্দর একটা বই!
বইটি রিকমেন্ড করার জন্য হাঁটুপানির জলদস্যুকে কৃতজ্ঞতা এবং মুঠোভর্তি হাওয়ায় মিঠাই!
বাংলা সাহিত্যে দুটি পরিবারের অবদান যে অবিসংবাদিত তা কে না জানে! একটি ঠাকুর পরিবার, অন্যটি রায় পরিবার। গতকাল পড়লাম ঠাকুর বাড়ির এক কিংবদন্তী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর স্মৃতিকথা। আর আজ পড়ে নিলাম রায় পরিবারের এক সুলেখিকা পুণ্যলতা চক্রবর্তীর লেখা স্মৃতিকথা ছেলেবেলার দিনগুলি। উপেন্দ্রকিশোরের তৃতীয় সন্তান অর্থাৎ সুকুমার রায়ের সহোদরার লেখনী পারিবারিক ঐতিহ্যেই বোধহয় মিঠে আর সরস। তাই খুব বেশি না লিখলেও, যা লিখেছেন তাই একেবারে সোনায় মোড়া। রায় পরিবারের ছেলেবেলার কাহিনী বৈচিত্র্যময় আর মধুর হবে সেতো অনুমেয়ই ছিল। কিন্তু, পুণ্যলতার জাদুর কলমে তা যেন হয়ে উঠেছে খাঁটি হীরের মতো দ্যুতিময়৷ পড়ছিলাম আর পড়ছিলাম, মাঝে মাঝে মুচকি হাসছিলাম, মাঝেমধ্যে হচ্ছিলাম অবাক, কিন্তু বইখানাতে একটু বিরতি নিতে ইচ্ছে করছিল না। লেখিকা বলেছেন, তাঁর নাতি নাতনীরা তাঁর শৈশবের কাহিনী শুনতে ভালোবাসে। সেগুলোই ডায়েরি আকারে লেখা ছিল, ছাপানোর ইচ্ছে ছিল না। ভাতৃতনয় সত্যজিৎ এর উৎসাহে এবং তাঁরই করা প্রচ্ছদ এবং নানান সুন্দর ছবিতে অলংকৃত হয়ে বাজারে এলো বইখানা শেষে। এক লহমায় বোধহয় গোটা পাঠলকুলই নাতি-নাতনীর আসরে যোগ দিতে বসে গেল! সোনালি দিনগুলোতে নিষ্পাপ দুষ্টুমির ফাঁকে ফাঁকে সুকুমারের বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরসের যোগান আর উপেন্দ্রকিশোর এর স্নেহময়, সূক্ষ্ণ শাসনের অপরূপ মিশেল মনকে তৃপ্ত করেছে৷ সকলেই সমান এবং সকলের সময়ের সমান দাম আছে, এমন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা উপেন্দ্রকিশোর যে দুটি ঘটনার মাধ্যমে বোঝান, সত্যিই সেগুলো শিক্ষণীয়। প্রথম বাঙালি নারী চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলির এক মায়াময়, ঘরোয়া রূপের কথাও লেখিকা বয়ান করেছেন। তাঁর নিজের মা, মানে বিধুমুখী যে কত শিশুর আশ্রয়স্থল ছিলেন! ধৈর্যে, স্থৈর্যে তিনি যথার্থই ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর এর সার্থক সঙ্গী এবং সত্যিকার অর্থেই পরিণত এক মা। কথাপ্রসঙ্গে এসেছে লীলা মজুমদার এর পিতৃকূল এর কথা। লেখিকার কাকা মানে প্রমদারঞ্জন রায়ের সাথেই বিয়ে হয় তাঁর এক মাসী সুরমা এর, যাঁদের সুযোগ্য সন্তান ছিলেন লীলা মজুমদার। ছেলেবেলা আক্ষরিক অর্থেই ছেলেবেলা বলে সেখানে বড়কালের কোন কথাবার্তা নেই। যদিও জানতে খুব ইচ্ছে করছিল এমন স্বাদু লেখনীতে। মধুমাখা এক চিরন্তন অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে বইটি।
মায়ের পুরনো জামায় একটা গন্ধ থাকে, মনে হয় আঁকড়ে ধরেই থাকি। এই বইটা সেরকম। ৫০০-৬০০ পৃষ্ঠা হলে ভাল হতো। নিজেই পড়ে দেখে নিন, এরকম স্নিগ্ধ মধুর লেখার রিভিউ হয় না।
ইচ্ছা ছিল ঠাকুরবাড়ির গল্প পড়বো তাই দক্ষিণের বারান্দা পড়লাম বেশিদিন হয়নি, হুট করেই রায়বাড়ির গল্পের এই বই দিলো আপু। এতো আদরমাখা এক ছেলেবেলার গল্প, শেষ হয়েও রেশ কাটতে চায়না এমন বই। রায় পরিবারের একেক সদস্যের বেড়ে ওঠা, শিল্প সাহিত্যে অবদানের কথা যেমন উঠে এসেছে তেমনি সমাজ পরিবর্তনে তাদের ভূমিকাও তুলে ধরেছেন সুন্দর করে। তবে ছোটবেলার সেই হাজারো গল্পের মাঝেও তাদের বিশাল পরিবারের অটুট বন্ধনটা ছিল চোখে পড়ার মতো। সময় হলে আরো বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা আছে এই বই নিয়ে।
নাম দেখেই বুঝা যায় এই বইটি পূণ্যলতা চক্রবর্তীর ছেলেবেলার কাহিনী নিয়ে লেখা যিনি হচ্ছেন বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর মেয়ে এবং সুকুমার রায়ের বোন। বইটিতে সুন্দর লেখনীর মাধ্যমে লেখিকার ছেলেবেলার ছোট ছোট মজার কাহিনী তুলে ধরেছেন। তখনও উড়োজাহাজ এর প্রচলন শুরু হয় নি। প্যারাসুট এর মাধ্যমে উড়তে পারার আনন্দটা মানুষ উপভোগ করার চেষ্টায় আছে। সর্বপ্রথম ছোটদের বাংলা পত্রিকা "সখা ও সাথী" তখনই প্রকাশ হয়।তখনকার দিনে প্লেগের আক্রমণের ঘটনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জ্ঞানীগুণী মানুষ দের ঘটনা, বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর বুদ্ধিদীপ্ত ও শৈল্পিক জীবনযাপন, অপর দিকে মা বিধুমুখী রায়চৌধুরীয়ের ভালবাসা আর যত্ন দিয়ে কাছের দূরের মানুষগুলোকে আগলে রাখার গল্প অনেককিছুই ছোট ছোট অংশ হিসেবে বইটিতে সাজানো আছে। এই বইটির মূল বিশেষত্বই হচ্ছে সহজ সুন্দর ভাষায় সবগুলো কথা বলে যাওয়া। পড়তে পড়তে একবারও বিরক্ত লাগে নি। বরং মনে হয়েছে লেখিকার সাথে যে বইটি পড়ছে সেও যেন সেইখানে উপস্থিত থাকতে পারবে।
বইটা বড্ড ছোট। কেন যে এসব বই বড় হয় না।এই বই পড়ে আসলেই নিজের ছেলেবেলায় চলে গিয়েছিলাম যদিও আমি অথরের মত সম্পদ প্রাচুর্যে বড় হইনি বরং তার বিপরীত, তবুও এই বই যেন আমার ছেলেবেলার কথাই বলে গেল নিভৃতে।