"ভালোবাসা ভুল করে বেসে আবার কখনো যদি এই দেখা না হওয়ার রাস্তায় আচমকা দেখি তোমাকেই -! তখন লোহার সুরে যারা বরফ বেচত সন্ধ্যায় জরাথ্রুস্তের স্মৃতি নিয়ে জীবনকে ভেবেছে প্রমায় এখানে জ্বরের ঘোরে কেউ ডেকে যায় 'বরফ বরফ' তারার কুহরে কেঁপে ওঠে লেবুগাছটার মায়াঝোপ- তোমাকে দেখার না দেখায় যদি ভাবি হঠাৎ আবার অদূরে দাঁড়াবে মহাকাল থমকে রাস্তা-পারাপার।"
৩.৫/৫ "মাধুডাঙা-তীর ধরে এসে ধুলাপায়ে এই অবেলায় কোনোদিন জুতা ছিঁড়ে গেলে রাস্তা দীর্ঘ হয়ে যায়— চোখের অদূরে পারাবত ডানা ভেসে উড়ে গেছে মীন মৃত্যুর শীর্ষে বাজায় কে যেন কোমল ভায়োলিন— ! নিজের শরীরটুকু ছুঁয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি কার পাশে মানুষেরা নিরাময়-প্রিয় আদতে অসুখ ভালোবাসে—"
হাসান রোবায়েতের লেখা, আমার প্রথম পড়া বই এটি। এই গ্রন্থের সবগুলো কবিতাই পড়ে ফেললাম, তিন দিনের ব্যবধানে। সচরাচর এরকম হয় না যে কোন কাব্যগ্রন্থের সবগুলো কবিতাই পড়া হচ্ছে, সে যত বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থই হোক না কেন। তবে রোবায়েতের লেখা "মাধুডাঙা তীরে" বইটির সবগুলো কবিতা পড়ে ফেলা যায়। এর তিনটি কারণ হবে সম্ভবত। এক- বইটিতে কবিতার সংখ্যা তেমন বেশি না, দুই- উনার প্রাঞ্জল ভাষা, তিন- অন্ত্যমিল ছন্দে লেখা (পড়তে আরাম)। এই গ্রন্থের সবগুলো কবিতা পড়ে ফেলবার পরে একটা ব্যাপার বারবার মাথায় ঘুরছে, সেটি হলো, হয়তো তিনি, অর্থাৎ কবি হাসান রোবায়েত তাঁর কবিতাগুলো লেখবার সময় শেষের লাইনগুলোর প্রতি অনেক বেশি সচেতন থাকেন। যেন শেষে এসে পাঠকের মনে একটা ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এর মানে এই না যে কবিতাগুলোর শুরু বা মাঝখান দুর্বল, ব্যাপারটা এই যে শেষাংশগুলো সময়ে সময়ে অনেক বেশি সুন্দর।
পূর্ণচ্ছেদ ব্যবহারে বড্ড অনিহা কবি হাসান রোবায়েতের। তাই তো একটি কবিতার শেষেও ব্যবহার করেননি প্রশ্নচিহ্ন বা দাড়ি, ড্যাশ দিয়েই ডুব দিয়েছেন অতল গহীনে। এই পুঁচকে বইয়ের সবগুলো কবিতা যদি চাঁদের বুড়ির চরকা-কাটা সুতোয় সেলাই করা হয়, তবে তা হবে এক মহাকবিতা। কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্র নেই, বরং মোদ্দাকথা, কোনো চরিত্রই না থাকায় সেই প্রাকল্পিক কবিতাকে মহাকাব্যের স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।
তার কবিতাগুলো যদি মানুষ হতো, তবে তাদের উচ্চতা হতো ৩ ফুট ৫ ইঞ্চি, আর আয়ুষ্কাল ২৬ বছর। মুক্ত ছন্দে লেখা কবিতাগুলোর প্রতিটি লাইনে শব্দ আছে ৩.৫টি। দুটো কবিতাকে মুখোমুখি দাঁড় করালে মনে হবে, একই ধাতুর তৈরি ননীর পুতুল। তিতির, গোখরা আর শিউলি ফুলের অবাধ বিচরণ চোখে পড়ে প্রতিটি কবিতায়। কবিতার গূঢ় অর্থতত্ত্ব জানি না, তবে পড়ার সময় একটা কণ্ঠ বলেছিল— এর কোনো মানে নেই, তুমি যা দেবে, তা'ই।
লিঙ্গবৈষম্য আমি করতে চাই না, তবে আমার মাথার ভেতর পুরুষ কণ্ঠে আবৃত হয়েছে প্রায় সবকটি কবিতা। কবিতার গায়ে থাকবে মেয়েলি গন্ধ, থাকবে নূপুরের আওয়াজ আর কমল স্পর্শ। তবে কি কবি খুবই সচেতনভাবে ভাঙতে চাইছেন দেয়াল? বিদ্রোহী?
“আমাদের ফসল ক্ষেত কৃষি নামেই লেখা হোক—”
এই পঙ্ক্তিতে কি প্রকাশ পেয়েছে তার গোপন রাজনৈতিক বাসনা? ফসল ক্ষেত কৃষির নামে না লিখিয়ে অন্য কোনো ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের অধীনস্থ করার বিরুদ্ধে ইঙ্গিত? অথবা—
“বকুল ফুল কি জানে সে কী ফুল?”
অবাঞ্ছিত এই প্রশ্নে তুলে এনেছেন মানুষের দ্বিচারিতা?
“জিভ তুমি ফোটাও শিমুল/হিংসা ও লাল তৃষ্ণায়—”
২০১৬ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত রচিত এই কবিতাগুচ্ছের স্বতন্ত্র কোনো নাম তিনি দেননি। যদিও কবিতাগুলোর মধ্যে ভাবের মিল এবং অবাস্তব পরিপাট্যতা আছে আর সমান ব্যাপ্তিও। মনে হয় যেন বিমূঢ়তায় চোবানো পুঁইশাকের পকোড়া—না খাওয়া পর্যন্ত বোঝা দুষ্কর। ‘মাধুডাঙ্গাতীরে’ স্পষ্টতই এক নগরবিমুখ সংগ্রাম, যেন জীবনানন্দের হাত ধরে হাঁটছেন জসীমউদ্দীন।
“কবিতা যারে খায়, প্লেট সুদ্ধা খায়—”
মারজুক রাসেলের এই বিবৃতি কি পাঠকদের উদ্দেশ্যে, না কবিদের? বেশ গোলমেলে লাগে। কবিতা কি সবাইকেই খায়, জীবনের কোনো এক প্রান্তে বাছবিচার ছাড়া?
অপুকে ধন্যবাদ দেয়া দরকার।সে না হলে হাসান রোবায়েত এর কথা জানতাম না।এমনিতেই আমি আধুনিক বাংলা কবি কারো কবিতা বা কারো কাজের ব্যাপারে চিন পরিচয় নাই।কবিতাই পড়ি কালে ভদ্রে।তবে এবারে ভালোমত ধরলাম।কবিতার পর কবিতার বই পড়ে যাচ্ছি।আগে কবিদের কবিতা গভীর ছিলো।তাই একটা লাইন দুই তিন বার করে পড়তে হত,আর বেশীরভাগ সময় আমি বুঝতাম না।আধুনিক কবিতা সহজই।ঝরঝর করে পড়ে ফেলা যায়।মাধুডাঙাতীরে হাসান রোবায়েত এর ২০২০ সালে প্রকাশিত একটা কবিতা বই।প্রচ্ছদ আর মাত্র তিন কপি আছে রকমারিতে এটা দেখে।সাধামাটা কবিতা।আধ ঘন্টায় পড়ে শেষ। কবিতা নিয়ে লিখতে গেলে ভাবি লিখব কি?কবিতা ব্যাপারটাই আস্ত একটা অনুভুতির ব্যাপার।তার জীবনের ছোট খাট ঘটনা,আবেগ,কল্পদৃশ্য আর বর্ননা মিলে একাকার করে লিখে যান অল্প কথায়।তেমনি কিছু দৃশ্যকল্প পড়লাম।রাজীব দত্তের প্রচ্ছদ দারুন হয়।প্রচ্ছদটাই এত সুন্দর,বইটা পড়তে ইচ্ছা হয়। আমি কি নিজের ভারে নত গরাদের প্রিয় কোনো শিক! বহন করেছি অবিরাম বধিরতা ছাওয়া দশদিক- ঠোঁটভরা মাথা নিয়ে তার মাছরাঙা বসে আছে নীলে কাকতাড়ুয়ার চারদিকে বাঁশপাতা, একা ঝরেছিলে! যে জামা ছিঁড়েছে বহু আগে স্বপ্নে সেসব ফিরে আসে দিনভর উড়ছে সেলাই পরাভূত মুখটার পাশে— কখনো দুপুর এলে ভাবি শাদা ফুল কেন এত ধীর মনে হয় ডাক-হরকরা ডেকে গেল জীবন গভীর। একবার পড়লাম,তখন কিছু কবিতা ভালো লাগল।আরেকবার পড়লাম তখন মনে হলো আরো কিছু যেন বুঝলাম,এভাবে প্রতিবারই নতুন কিছু চিন্তা যুক্ত হয়।আহা,কবিতায় ভেসে গেলাম। এই খানে সন্ধ্যার রঙ পুড়ে যাওয়া করুন ডিজেল নগ্ন পায়ের শিশুগুলো চাঁদকে ভাবছে স্যান্ডেল। আর এভাবেই কবিতা আক্রান্ত মানুষ এখন আমি।কবিতায় ভেসে যাচ্ছি।কোনদিন কবিতা পড়তে পড়তে আমিও হয়ে যাচ্ছি আস্ত একটা কবিতা।
আহা! এক অন্যরকম মুগ্ধতা ও মোহনীয়তার মাঝে বইটি শেষ করলাম।
পাতাকে শিয়র ভেবে বলি ঘুমভরা ধু ধু বালিরেখা পৃথিবীর প্রতিটা সরোদ মনে হয় দিগব্যাপী একা তোমাকেই জেনেছি অতল বহুদূর গান হেঁটে গিয়ে মানুষ আড়ালে চলে যায় শুধু তার মুখটুকু নিয়ে-