'জীবন যেখানে যেমন' আরিফ আজাদের একটি গল্প সংকলন।
লেখক চৌদ্দটা টপিকের উপর গল্প লেখার চেষ্টা করেছেন। টপিকগুলো নিঃসন্দেহে সুন্দর ও শিক্ষণীয়। সাবলীলভাবে ও স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে বইটা পড়ে শেষ করেছি। আমার কাছে অনেক ভালো লেগেছে।
লেখক যেহেতু গল্পগ্রন্থ বলছেন, সেদিক দিয়ে বললে, কিছু গল্প পুরোপুরি গল্প হয়নি। কোনো একটা ঘটনার উপর ব্যাসিস করে গল্প লিখেছেন, যেগুলোতে চরিত্রের স্পষ্ট প্রোফাইল নেই, চরিত্রের পরিণতি নেই। একটা ঘটনা যেভাবে শেষ হয় সেভাবে শেষ হয়েছে। আবার কিছু গল্পে এই ব্যাপারগুলো ঠিকঠাক ও সুন্দর উপস্থাপিত হয়েছে।
লেখকের মতো আমিও মনে করি, ইসলামি সাহিত্যও বাংলা সাহিত্যের একটা অংশ। এই বইটাও তেমন বাংলা সাহিত্যের একটা বই। লেখকের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। এই ধরনের বই থেকে পাঠকেরা ভালো কিছু শিখতে পারবে এবং বেশ উপকৃত হবে বলে মনে করি।
তবে 'লেখকের কথা' অংশে লেখকের দ্বিমুখী বক্তব্য আমার পছন্দ হয়নি। সেখানে তিনি এই বই লেখার পেছনের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন। ইসলামি সাহিত্যকে কেন বাংলা সাহিত্য বলা হয় না— এই আক্ষেপ থেকেই ইসলামি জীবনধারার গল্প লেখার চেষ্টা করেছেন। এটা ���মার কাছে ভালো লেগেছে। ইসলামি জীবনধারার গল্পের বই আরো রচিত হোক, এটাই কামনা করি। ইসলামি জীবনধারার লেখা কেন বাংলা সাহিত্য বলা হবে না— এটা আমারও প্রশ্ন!
কিন্তু লেখক ইসলামি সাহিত্যকে বাংলা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন, আবার সেটাকে উৎখাত করার মনোবাসনাও ব্যক্ত করেছেন। তাই তার এই প্রচেষ্টা কম্পিটিটিভ মনে হয়েছে।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে বাংলা সাহিত্য রচিত হচ্ছে, তার ভেতর সমাজের সব উপাদানই আছে আছে। যারা সাধারণ ধারার গল্প লেখেন সেখানেও অনেক ধর্মীয় সংস্কৃতি উঠে আসে। অর্থাৎ আমাদের দেশের জীবনাচারই বইয়ের পাতায় লিখিত হচ্ছে।
লেখক আরিফ আজাদ দাবি করেছেন, বাংলাদেশের নব্বই ভাগ মানুষের জীবনাচার বাংলা সাহিত্যে স্থান পায়নি। এটা কীভাবে যৌক্তিক? তাহলে অন্য লেখকেরা কি এলিয়েনদের জীবনাচার নিয়ে গল্প লিখছেন?
তিনি যেটা বলতে পারেন, ইসলামি জীবনাচার নিয়ে আমাদের সাহিত্য ততটা সমৃদ্ধ নয়। তিনি সেই ধরনের ইসলামি জীবনাচার সম্বলিত সমৃদ্ধ সাহিত্য প্রত্যাশা করেন, আমি নিজেও করি।
এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশী সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে গল্প লিখবেন, সেখানে ধর্মীয় সংস্কৃতি থাকবে এটা স্বাভাবিক ও ভালো একটা উদ্যোগ। কিন্তু লেখক ইসলামি সাহিত্যকে বাংলা সাহিত্য হিসেবে গণ্য করছেন, অথচ তার ভাষ্য হলো— ইসলামি সংস্কৃতির গল্প, উপন্যাস দিয়ে বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য রচনাগুলো ঢেকে দিতে চাচ্ছেন। তাহলে আপনার উদ্দেশ্যে গণ্ডগোল হয়ে গেল না?
সাধারণ লেখকেরাও এই বাংলার আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেছেন, বাঙালি সংস্কৃতি আর জীবনদর্শন পর্যবেক্ষণ করেই লিখে যাচ্ছেন। সেটাকে মুছে ফেলা অতই সহজ? তারা যা লেখেন, আরিফ আজাদও তাই-ই লিখবেন। পার্থক্য শুধু— কুরআন-হাদিস থেকে মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করবেন। যেটা শিক্ষণীয় ও ইতিবাচক ব্যাপার। আলহামদুলিল্লাহ। তাছাড়া যাদের প্রতি কম্পিটিটিভ মনোভাব পোষণ করেছেন, তিনি তাদের লেখা পড়েই সাহিত্যের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
লেখক আরিফ আজাদ যদি মনেই করেন, ইসলামি সাহিত্যও বাংলা সাহিত্য। তাহলে অন্যান্য লেখকেরাও তার সহযোদ্ধা, শত্রু নয়। সেখানে সহযোগী মানসিকতা থাকাটা বাঞ্ছনীয়। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের বাংলা সাহিত্য সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
যখন তিনি ইসলামি সাহিত্যকে বাংলা সাহিত্য থেকে আলাদা করে দেখবেন, তার লেখাকে প্রতিযোগী করবেন, সেটা একটা নির্দিষ্ট পাঠকদের জন্যই নির্ধারিত হবে। অন্যদিকে বাংলা সাহিত্য হতে হলে সকল বাংলাভাষীর জন্য হতে হবে। সেখানে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বই পড়বে, শিক্ষা নেবে। বুজুর্গ ভাব ধরে থাকলে তো বাংলা সাহিত্যের ভেতরে ঢুকতে পারবেন না। তখন ইসলামি সাহিত্য কেবল ইসলামের সাহিত্য হয়েই থাকবে।
ইসলামি সাহিত্যকে যারা বাংলা সাহিত্য মনে করেন না, তাদের চিন্তাধারার সাথে লেখক আরিফ আজাদের চিন্তাধারার পার্থক্য পেলাম না।
~ কমল উদ্দিন
২১ মার্চ, ২০২৩