গভীর অতীতের যে যুগে প্রথম জন্মাতে শুরু করে রূপকথা নামক গল্পের ধরন, তখন গল্পগুলো বড়দের জন্যই ছিলো। দৈত্য আর রাজকুমার, যুদ্ধ আর জাদুর রূপকে তুলে ধরা হতো জীবনের উপেক্ষিত সত্য। গদ্যবস্ত্র পরে নিজেদের সাজিয়ে নিতো অভিজ্ঞতা আর পরামর্শ। বিনোদনের বেশে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার জীবনে অতিথি হয়ে এতো রূপকথা, তারপর থেকে যেতো আপনজন হয়ে।
এই উপন্যাসটি সেই প্রাচীন ধারার বর্তমান সংস্করণ। জাদুর ফাঁকে ফাঁকে এখানে উঁকি দিয়েছে বাস্তবতা, কল্পনার স্পর্শে নতুনত্ব পেয়েছে কিছু পরিচিত প্রেক্ষাপট। বলা হয়েছে এমন কিছু কথা, যেগুলো হয়তো সরাসরি বলা সম্ভব নয়।
বিরূপকথার জগতে আপনার নিমন্ত্রণ রইলো। হয়তো এখানে হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে এমন মুখের সাথে যা খুব পরিচিত। হয়তো সেই মুখ কোনো বন্ধুর, প্রেমিকার। বা আপনার নিজের।
শেষ কবে কোনো বইয়ের প্রতিটা পাতা এভাবে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে পড়েছি মনে নেই। প্রত্যেকটা পাতা ওল্টানোর সময় এক আদুরে আশঙ্কা, এই বুঝি বইটা শেষ হয়ে গেল। লেখক দাবি করেছেন বইটা বড়দের রূপকথা, যে রূপকথা জল টলমলে আয়না-হৃদের মতো আমাদেরই খুব চেনা কিছু চেহারা, চেনা কিছু গন্ধ-ঘ্রাণ-অনুভূতি প্রতিফলিত করে। সে দাবি শতভাগ সত্য, এই বইটা এতো আলাদা, পশ্চিমাদের ঠিক করে দেওয়া জনরা নামক ছোট ছোট খোপওয়ালা কাঠবাক্সের কোনো খোপে একে পুরে দেওয়া সহজ হবেনা। ফ্যান্টাসির ছাপ্পা লাগিয়ে দিতে নারাজ। এটা সত্যিকার অর্থেই বড়দের রূপকথা। মানুষের রূপকথা।
মায়ামাখানো শব্দ, আদুরে মিষ্টি বাক্য আর অপরূপ এক জাদুময়তা দিয়ে লেখক বইয়ের প্রথম এক চতুর্থাংশে পাঠককে ভীষণ মুগ্ধ করে দেন, এক নরম জ্বলজ্বলে স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যান সেই রূপকথার জগতে, এরপর ধীরে ধীরে সেই আলোঝলমলে জগতে একটু একটু করে মেশাতে থাকেন আমাদের চিরচেনা জীবনের ধূসরতা। যে ধূসরতায় আমরা বাঁচি, হাসি, প্রেমে পড়ি। যে ধূসরতায় আমরা শহর নিয়ে গান লিখি, কবিতা উড়ে এসে পংক্তির ফুল হয়ে ফোটে আমাদের ঠোঁটে কিংবা পরাগের রঙ মাখানো তুলি দিয়ে কাগজে আঁচড় কেটে ছবি আঁকি। বইয়ের মাঝামাঝি এসে পাঠকের মনে দুই-এক ফোঁটা ভ্রান্তি ঝড়ে পড়ে, আবার আগের কিছু পৃষ্ঠা উলটে দেখে আসে সতর্ক পাঠক, কোথায় যাচ্ছে বইটা? রূপকথার মতো কোনো দানো-দত্যি বা মহাপরাক্রমশালী কোনো খল-দেবতা তো এখানে নেই। বরং আছে একটা শহরে এক আগন্তুকের গল্প, যে গল্পটা শুরু হয়েছিলো জাদুমাখা চকমকি কালিতে লেখা এক রূপকথার মতো, কিন্তু ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে এক পারদ-মাখানো আয়নায়।
সে আয়নায় পাঠক নিজেকে খুজে পায়। পায় তার সঙ্গীসাথি, পরিবার বা আস্ত শহরটাই। হয়তো সেটা পাঠককে আরও টানে, কিংবা জড়িয়ে রাখে এক প্রকার আগ্রহভরা অস্বস্তিতে। বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় এসে সেই সুখী অস্বস্তিগুলোও উড়ে যায় কাগুজে পায়রা হয়ে, পরে থাকে পরিতৃপ্তির অনুভূতি।
বিরূপকথার নাম বাংলা ভাষার সবচেয়ে আলাদা, অনন্য বইগুলোর ছোট্ট তালিকায় ঝুলে থাকবে। নরম এক আলোতে জ্বলজ্বল করবে, কান পাতলে শোনাবে এক ভিন্ন ভাষার অদ্ভুত চেনা এক গান।
"আমার মনে হয় আমার মধ্যে একধরনের খালি জায়গা তৈরি হয়েছে। একটা শূন্যতা। যে সময়টা অলস ছিলাম, তখন তৈরি হয়েছিলো। একসাথে থাকতে থাকতে এই শূন্যতা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।সময়ের সাথে আমি বদলে গেছি, আমার সবকিছু বদলে গেছে--শুধু শূন্যতা বাদে। এখন আমার ভয় হয়। যদি শূন্যতা না থাকে, তাহলে কি আমি থাকবো?"
বইটা শেষ করার পরে আমার ফার্স্ট রিয়েকশন হচ্ছে, মনে হলো আমি কোন গাইম্যানের বই পড়ে শেষ করলাম!
তানজীম ভাইয়ের এই ধরনের এক্সপেরিমেন্টাল লেখা আমার খুবই ভালো লাগে। শুরু থেকে বইটা একটা প্রশ্নবোধক জার্নি ছিলো, যা আমি খুবই এনজয় করেছি। আর পুরো বই জুড়ে তিনি শব্দ নিয়ে খেলেছেন, যা পড়ে আমার অনেক ভালো লেগেছে।
রূপকথা যে বড়দের জন্যও হতে পারে সেটা তানজীম ভাই লিখে দেখিয়েছেন।
আমিতো রিভিউ লিখতে পারিনা, যা মাথায় আসে তাই লিখি, আমার এসব হাবিজাবি রিভিউ না পড়ে বইটা কিনে পড়েন, বিশ্বাস করেন, আপনারা হতাশ হবেন না।
তবে, আরেকটা কথাও মাথায় রাখবেন বইটা সবার ভালো লাগার কথা না, আপনার যদি ভালো না লাগে ধরে নিবেন আপনার জন্য বড়দের রূপকথা না, ছোটদের রূপকথাই পারফেক্ট মনে করবেন।
"হয়ত আজকে প্রথমবারের মতো মল্লার বুঝতে পারলো রাগ আর অভিমানের মধ্যে একটা বিচিত্র জায়গায় পার্থক্য আছে। রাগ হলে মনে হয় মনের ভিতর যা আছে সব বেরিয়ে আসতে চাইছে, সামনে যে আছে তাকে উড়িয়ে দিতে চাইছে। অভিমান সে তুলনায় চাপা, লাজুক, নীরব। অভিমানের সময় মনে হয় পুরো মহাবিশ্ব ষড়যন্ত্রে নেমেছে আজ আমার বিরুদ্ধে। ছোট ছোট ভুল হলে, বিরক্তিকর ঘটনা ঘটলে মনে হয় হ্যাঁ, হবেই তো, আমার সাথে না হলে আর কার সাথে হবে?"
“শূন্যতা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সময়ের সাথে আমার সবকিছুই বদলে গেছে। শুধু শূন্যতা বাদে। এখন ভয় হয়। যদি শূন্যতা না থাকে, তাহলে কি আমি থাকবো?”
ছোটবেলায় আমরা অসংখ্য রূপকথা শুনে বড় হই। মনে দাগ কেটে থাকে ওগুলো। বড়দের তো রূপকথা হয় না। কিন্তু বিরূপকথা হল বড়দের রূপকথা। মেঘমল্লার নামের এক গ্রামের দেবতার ইচ্ছা হয় শহরের দেবতা হবে। অনেক খুঁজে দেবতাহীন এক শহরে যায় দেবতা হওয়ার জন্য। সেখানে গিয়ে পাত্তা পায় না। তখন মানুষ সেজে মিশতে শুরু করে মানুষের সাথে। তার কী দেবতা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে?
সুলেখক তানজিম রহমানের নতুন বই বিরূপকথা। সুন্দরভাবে বড়দের রূপকথা সাজিয়েছেন তিনি। এক্সপেরিমেন্টাল কাজ। আগেই বলে দিই, এই বইয়ে টানটান উত্তেজনা, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ভূতপ্রেতের আশা করলে হতাশ হবেন। তবে লেখকের সুনিপুণ দক্ষতায় ফুটে উঠেছে একজন গ্রাম্য দেবতার, শহুরে দেবতা হওয়ার অভিযানের কথা। কাহিনীতে এসেছে গ্রাম্য দেবতা মেঘমল্লারের স্ট্রাগল, শহরের বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে মেশার অভিজ্ঞতা। পড়ার সময় দৃশ্যগুলো ভেসে উঠবে চোখের সামনে। অদ্ভুত খাবারের দোকান, প্রশ্নকাক নামক অদ্ভুত শহুরে বাসিন্দা ও এরকম কিছুর দেখা মিলবে। এসব নিয়ে সুন্দর কিছু জাদুবাস্তব ও পরাবাস্তব দৃশ্যের অবতারণা ঘটিয়েছেন লেখক। যেগুলো সবথেকে ভালো লেগেছে আমার। একদম শেষ পৃষ্টায় একটা ধাক্কা দিয়ে গল্পের ইতি টেনেছেন লেখক। ধীরেসুস্থে পড়েছি বইটা। প্রথমে একটানা পড়তে গিয়ে ঠিক উপভোগ করতে পারছিলাম না। মেঘমল্লারের সাথে জার্নিটা সবমিলিয়ে মন্দ হয়নি। ভিন্ন কিছু পড়তে চাইলে বিরূপকথা উঠিয়ে নিয়ে সঙ্গী হতে পারেন মেঘমল্লারের অভিযানের।
“While my chosen form of story-writing is obviously a special and perhaps a narrow one, it is nonetheless a persistent and permanent type of expression, as old as literature itself. There will always be a certain small percentage of persons who feel a burning curiosity about unknown outer space, and a burning desire to escape from the prison-house of the known and the real into those enchanted lands of incredible adventure and infinite possibilities which dreams open up to us, and which things like deep woods, fantastic urban towers, and flaming sunsets momentarily suggest.” ― H.P. Lovecraft, Notes On Writing Weird Fiction - বিরূপকথা - মেঘমল্লার, সবুজহাতি নামক এক গ্রামের স্থানীয় দেবতা। তার জীবনের বড় একটি ইচ্ছে ছোট হলেও কোন শহরের দেবতা হবে। সেই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদ্ধতিতে মেঘমল্লার এমন এক শহরের খোঁজ করা শুরু করে যেখানে এখনো কোন দেবতা নেই শহর রক্ষার কাজে।
অনেক প্রচেষ্টার পরে সে এমন এক শহরের খোঁজ পায় যা দেবতাশূন্য। সেই শহরে গিয়ে মেঘমল্লারের শুরু হয় অদ্ভুত এক জীবনযাত্রা। সেই জীবনযাত্রার নানা ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই "বিরূপকথা" উপন্যাসটি লেখা। - "বিরূপকথা" বইটিকে প্রচার করা হয়েছে বড়দের রূপকথা হিসেবে। বইটি পড���ার পরে আমার কাছে মনে হয়েছে গল্পের এই ধারাকে উইয়ার্ড ফিকশন হিসেবে আখ্যায়িত করাই বেশি যথোপযুক্ত। অন্তত বাংলা ভাষায় এধরণের উইয়ার্ড এবং ইউনিক প্লটের গল্প আমার খুব একটা পড়া হয়নি। এই বইয়ের দুনিয়ায় ঢুকতে তাই বেশ কিছু সময় লেগেছিলো। গল্পের ভেতরে প্রচুর মেটাফোর থাকায় আমার মনে হয় পাঠকদের বইটির আসল স্বাদ আস্বাদনের জন্য বইটিকে একবারে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। গল্পের মাঝে মাঝে নানা ধরনের রূপকথা এবং রূপক দারুণভাবে মিশে গিয়েছে, সে কারণে পাঠকের দেশি বিদেশী রূপকথা নিয়ে আইডিয়া থাকলে ভালো লাগার সম্ভাবনা বেশি। বইয়ের আরেক ইউনিক দিক হচ্ছে এর বর্ণনাভঙ্গি। বইয়ের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একেবারে একটানা গল্পের বাহন চলেছে। এই বইয়ের মাঝে কোন অধ্যায় বা কোন ধরনেরই আলাদা পরিচ্ছেদ নেই, এ ধরণের গল্পের ধাঁচ বাংলা সাহিত্যের হিসেবে বেশ ইউনিক লাগলো। - "বিরূপকথা" বইয়ের আরেক চমকপ্রদ দিক এর চরিত্রগুলো। মেঘমল্লার থেকে বাকি প্রায় সব চরিত্রের নামকরণ থেকে কাজকর্ম আপাতদৃষ্টিতে বেশ অদ্ভুতুড়ে যা গল্পের প্লটের সাথে পারফেক্টলি মিশে গেছে, যা সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে গেলে হয়তো স্পয়লার সহ আরেকটি পোস্ট লেখা লাগবে। বইয়ের ফিকশনাল দুনিয়ার কথাটাও এ প্রসঙ্গে বলা লাগে- এমনভাবে এই দুনিয়াটি, বিশেষ করে শহরটি নির্মাণ করা হয়েছে যেন এক মুহূর্তে মনে হবে যে এটাতো আমাদেরই পরিচিত কোন শহরের গল্প, শহরের মানুষদের গল্প; আবার পরমুহূর্তেরই এমন কিছু ঘটনার সম্মুখীন হওয়া লাগবে যা পাঠকদের চিন্তারও বাইরে। গল্পের এদিকটাও ভালো লেগেছে যে লেখক পাঠকদের চিন্তাশক্তি নিয়েও খেলেছেন। - তবে বিরূপকথা বইটির প্রাণ বা সবচেয়ে শক্তিশালী দিক যাই বলি না কেন- আমার মতে তা হচ্ছে বইটির সংলাপ এবং উক্তিসমূহ। প্রচুর ভালোলাগার, মনোমুগ্ধকর সংলাপ ছিলো বইতে যার গূঢ় রহস্য ধরতে পারলে সেগুলো ভালো লাগতে বাধ্য। বেশ কিছু সময় দেখা গিয়েছে বইটির কিছু সংলাপ পড়ে থেমে গিয়েছি, সেই সংলাপ গুলোই বারবার পড়ছি, এতই ভালো লেগেছে সেগুলো। - অনেক সময়েই শোনা যায় বাংলা সাহিত্যে নাকি থ্রিলার বা speculative ফিকশন সাধারণ ফিকশনের চেয়ে নিম্নমানের এক সাহিত্য। আমার মনে হয় যারা এ ধরণের ধ্যান-ধারণা পোষণ করেন তাদের এ ধরণের ধ্যান-ধারণা ভাঙার জন্য হলেও একবার বিরূপকথা পড়া উচিত। সাধারণ উপন্যাস হিসেবে ধরলেও সাহিত্যমানের দিক থেকেও আমি বিরূপকথাকে উচ্চস্তরেই রাখবো। বিরূপকথা বইটি এমনভাবে লেখা তাতে অনেকে হয়তো বিভিন্ন সমকালীন দেশি-বিদেশী লেখকের ছায়া পাবেন, কিন্তু আমার দৃষ্টিতে লেখক নিজেই তার লেখার এক অনন্য ধারা তৈরী করে ফেলেছেন, তাই সে ধাঁচের লেখাগুলোকে আর অন্যান্য লেখকের ছায়া বলা উচিত হবে না। - বাংলা সাহিত্যে ফিকশনাল পাঠকদের ভিতরে সমকালীন উপন্যাসের পাঠকদের বাদ দিলেও speculative ফিকশনের পাঠকদের ভেতরে বেশিরভাগই থ্রিলার ঘরানার পাঠক। এখানে আমি স্পষ্ট করেই বলতে চাই- থ্রিল, টুইস্ট, সাসপেন্স, কিংবা হরর এ সবকিছু মাথায় রেখে এই বইটি পড়তে গেলে তারা হতাশ হবেন, কারণ এটি এই ধারার বইই না। লেখক নিজের মতো করে নানা ধরণের রূপকথা বলতে চেয়েছেন এবং সেদিক থেকে তিনি অনেকটাই সফল আমার মতে। তাই এত ভালোমানের সাহিত্য হবার পরেও এই বইয়ের পাঠকশ্রেণী আমার দৃষ্টিতে খুবই কম। এখানে অবশ্য আরো কিছু কারণ থাকতে পারে- যেমন বইয়ের মূল্য হয়তো অনেকের কাছে বেশি মনে হতে পারে কিংবা লেখক-প্রকাশক কারো তরফ থেকেই বইটি নিয়ে প্রচার প্রচারণা তেমন না হওয়ায় বইটির খবর পাঠকদের কাছে তেমনভাবে পৌঁছায়নি। যে কারণেই হোক, যে ধরণের আলোচনা হওয়া উচিত এই বইটি নিয়ে তার ধারে কাছেও কিছু এখনও আমার দৃষ্টিতে দেখিনি দু:খজনক ভাবে। - বিরূপকথা বইয়ের প্রডাকশনের দিক থেকে বইয়ের বাঁধাই, কাগজ ইত্যাদি ভালোই ছিলো। তবে আমার মনে হয় বইয়ের সাথে বুকমার্ক থাকা উচিত ছিলো যেহেতু বইটিতে কোন অধ্যায় বা ব্রেক পয়েন্ট নেই। বইটির প্রচ্ছদ এবারের বইমেলায় আমার দেখা অন্যতম ইউনিক প্রচ্ছদ, যা একদম পারফেক্টলি বইয়ের কন্টেন্টকে প্রতিফলিত করেছে। বইয়ের সম্পাদনা সহ বাকি টেকনিক্যাল দিক গুলোও ভালোই ছিল, আমার চোখে তেমন বানান ভুল বা টাইপো চোখে পরেনি। - এক কথায়, বাংলা সাহিত্যের উইয়ার্ড ফিকশনের জগতে এক অনন্য সংযোজন হচ্ছে "বিরূপকথা"। তাই যাদের ফিকশনের দিক থেকে গতানুগতিক থ্রিলার, টুইস্টভিত্তিক সাহিত্য ছাড়াও অন্য ধরণের লেখা পছন্দ তাদেরকে বইটি পড়ার এবং আলোচনা করার আহবান রইলো। এমনিতেই এ ধরনের সাহিত্য বাংলা ভাষায় একেবারেই হাতেগোনা, সেগুলোও যদি সঠিকভাবে আলোচনা না হয় পরবর্তীতে লেখকেরা এ ধারায় লিখতে মনে হয় না তেমন আগ্রহ বোধ করবেন। বিরূপকথা বইটি তার সঠিক পাঠক সমাজে পরিচিতি পাক, এই প্রত্যাশা করছি।
এই রূপকথার বই তথাকথিত রূপকথার থেকে বেশ আলাদা। নামও তা-ই বলছে; "বি" উপসর্গকে ধরে নিয়ে বিশেষ রূপকথা বলা যায়, বড়দের রূপকথা।
সবুজহাতি গ্রামের দেবতা মেঘমল্লার; মেঘ-বৃষ্টি যার হাতের মুঠোয়। ছোট্ট, ছিমছাম সবুজহাতি গ্রামে নেই কোনো জটিলতা, গ্রামের লোকেরা দেবতা হিসেবে মেঘমল্লারকে বেশ মানে। কাজেই মেঘমল্লারেরই বা অশান্তি কিসে? তারপরও কেউ কি আর তুষ্ট থাকতে চায়!? ওর অনেকদিনেরই ইচ্ছা একটা শহরের দেবতা হয়; বেশি বড়সড় নয়, মাঝারি মানের শহর হলেই চলবে। দেবতাবিহীন শহর খুঁজে পাওয়া মুশকিল। খোঁজ-খবর করতে করতে মিললো এক শহরের সন্ধ্যান যেখানে কোনো দেবতা নেই। সুযোগ হাতছাড়া করতে পারে না মেঘমল্লার। অতএব, যাত্রা শুরু! কিন্তু ওখানে পৌঁছানোর পর দেখা গেল শহরের মানুষদের কাছে পাত্তাই পাচ্ছে না আমাদের এই গ্রামের দেবতা। দেবতা নিলেন মানুষের রূপ; ভাবখানা এমন যে, আচ্ছা! পাত্তা দিচ্ছো না! ঠিক আছে, আমিই সব জেনে নিচ্ছি! যার প্রেক্ষিতে ওর যোগাযোগ হয় প্রশ্নকাকদের সাথে; চাকরিতেও নামে মেঘমল্লার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, শহরের মানুষের রূপ নেয়া মেঘমল্লার আবার এই শহরের দেবতা হয়ে উঠবে কিভাবে? কিংবা আদৌ হতে পারবে কিনা?
বিরূপকথার জগৎ আমাদের এই জগতের মতোই। ব্যস্ত শহরের মানুষদের মতোই ব্যস্ত ঐ শহরের মানুষ। তবে কাল্পনিক বিষয়গুলোর সাথে অবশ্যই মিল নেই। বিরূপকথা বই একদম সাদামাটা, কোনো ধরনের টানটান উত্তেজনা নেই, থ্রিল ব্যাপারটার আশা করা একদম বোকামি হবে।
এবার আসি আমার কাছে কেমন লাগলো এই বিশেষ রূপকথা। বইটার কনসেপ্ট খুব সুন্দর ছিল। কিন্তু ওভারঅল তেমন ভালো লাগে নি। প্রশ্নকাকদের উপর খুউউব বিরক্ত হয়েছি🐸 প্রশ্নকাকরা হচ্ছে ঐ শহরের কিছু ছেলেপেলে, যারা নিজেদের এক সংঘ টাইপ কিছু একটা বানিয়ে রেখেছে; এরা পালক লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর সব কথা বলে প্রশ্ন করার ভঙ্গিতে; ইভেন এরা নিজেদের নামও পালটে ফেলেছে কোনো প্রশ্ন দিয়ে। যেমনঃ একজনের নাম "কী দরকার", আরেকজনের নাম "তোর চোখে কী হয়েছে😪 আর আরেকটা উল্লেখযোগ্য কথা হচ্ছে সাধারণ মানুষজন এদের গালিগালাজ করে আবার কখনও দৌড়ানিও দেয়। আমি নিজে ঐখানে থাকলে তাই-ই করতাম😂 Don't take it seriously. But... মেঘমল্লারের অবস্থা দেখে আমি ওকে একদম বাস্তব জীবনে টানাটানি করতেছিলাম। মেঘমল্লার এই শহরে এসেছিল দেবতা হতে, অথচ কাজ বাদ দিয়ে সবকিছু বোঝার জন্য ঘোরাঘুরি করতেছে প্রশ্নকাকদের সাথে। মনে হচ্ছিল সফলতা অর্জন করার পণ নিয়ে ভার্সিটিতে আসা ফ্রেশার কিছু নেশাগ্রহণকারী বড়-ভাইয়াপুদের পাল্লায় পরে নিজের অস্তিত্ব খুইয়েছে এগেইন, ডোন্ট টেইক ইট সিরিয়াসলি😪🐸
বইটির ৩/৪ অংশই ভালো লাগে নি, শেষের দিকে একটু আগ্রহ বেড়েছিল। যেমন ভেবেছিলাম তেমনই হয়েছে। বোতল থেকে মাটিতে গড়িয়ে পড়া পানির মতো, মাটি যেমন পানিকে শুষে নেয়! এটা আমার দ্বিতীয় তানজীম রহমান পাঠ। এর আগে পড়েছি উনার "আর্কন"। আর্কন অত্যন্ত কষ্টে শেষ করেছিলাম, এই বইটার ক্ষেত্রেও তেমনি হয়েছে। আর্কন কিংবা বিরূপকথা যেটাই ধরি না কেন মনে হয়েছে -একটি ভালো প্লটের মুভি ভালো ডিরেকশন না পাওয়ায় অভিনেতারা তাদের বেস্টটা দিতে পারে নি, যার ফলে ফ্লপ হয়ে গেছে। আসলে যা বুঝলাম, উনার লেখনি আমার ভালো লাগে না। মাই ব্যাড! :/ বইটার নির্মাণ ভালো লাগেনি কিন্তু কনসেপ্ট যেহেতু ভালো লেগেছে তাই বইটাকে মন্দ লাগা ভালো বই এর তালিকায় ফেলা যেতে পারে।
উপন্যাসের শুরুটা দুর্দান্ত, শেষটাও তাই।কিন্তু মাঝখানে খুব একটা ভালো লাগলো না।খুবই উচ্চাভিলাষী লেখা,কিছু কিছু জায়গায় বর্ণনাশৈলী অসাধারণ।একদম শেষপাতার উন্মোচন বিমূঢ় করে দেয় কিন্তু মাঝখানের একটানা ঢেউবিহীন গল্পের কারণে তৃপ্তি পেলাম না।
কাহিনি সংক্ষেপঃ মেঘমল্লার বাতাসের দেবতা। সে চাইলে বাতাসের সাথে সাথে ঝড়-বৃষ্টিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সবুজহাতি নামের একটা গ্রামের দেবতা হিসেবে অনেকদিন ধরে সে দিনাতিপাত করলেও তার অনেকদিনের একটা সুপ্ত ইচ্ছা আছে। আর ইচ্ছাটা হলো, মল্লার একদিন গোটা একটা শহরের দেবতা হবে। ভাগ্যনির্দেশক হবে পুরো শহরের মানুষের। তার এই ইচ্ছাটা যতোই দিন যাচ্ছিলো, ততোই বাড়ছিলো। তাই একদিন সে সত্যি সত্যিই খুঁজতে শুরু করলো এমন এক শহর, যে শহরে কোন দেবতা নেই। যে শহর মল্লারকে মেনে নেবে নিজেদের দেবতা হিসেবে।
মেঘমল্লারের ইচ্ছাটা বোধহয় পূরণ হতেই চললো। বিশাল এক শহরের খোঁজ পেলো সে, যে শহরে কোন দেবতা নেই। যে শহরের অধিবাসীরা কোন শক্তির উপাসনা করে না৷ তাই পরিকল্পনা মোতাবেক মল্লার এসে পৌঁছালো সেই শহরের আকাশে। শহরবাসীদের সম্মুখে কয়েকটা অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে সে নিজেকে শহরের রক্ষাকর্তা ও দেবতা হিসেবে দাবী করলো। কিন্তু ব্যস্ত এই শহর ওর ডাকে সাড়া দিলো না। এতে দমে না গিয়ে মল্লার একটা অদ্ভুত পরিকল্পনা করলো৷ আর পরিকল্পনাটা হলো, মানুষের রূপ নিয়ে সে সেই শহরের মানুষের ভিড়ে মিশে যাবে। শিখবে তাদের জীবনাচরণ আর তারপর নিজেকে আবারো তাদের দেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবে।
মানুষের রূপ নিয়ে শহরে প্রবেশ করতেই মল্লার সব অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হতে থাকলো। দেখা হলো প্রশ্নকাকদের সাথে, যারা প্রশ্নের মাধ্যমেই কথাবার্তা বলে আর যাদের মূল পেশা হলো চুরি। পরিস্থিতির ফেরে পড়ে মল্লার ভিড়ে গেলো প্রশ্নকাকদের দলে। সেখানে ওর পদ হলো ক্ষুদ্রচঞ্চু, যাকে প্রশ্নকাক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তোর চোখে কি হয়েছে নামের এক অদ্ভুত নামের বন্ধুবৎসল ছেলে ওকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে, যার নিজের ভেতরেও রয়েছে রহস্য। আর সেই ছেলেটাই মল্লারকে পরিচয় করিয়ে দেয় নকশিছবির (অনেকটা সিনেমার মতো ব্যাপার) সাথে। ছদ্মবেশী দেবতা ভালোবেসে ফেলে নকশিছবি জিনিসটাকে।
এরপর মল্লারের শুধু ভেসে বেড়ানোর কাল শুরু হয়। আর এভাবেই সে পরিচিত হয় খবরদার (চাকরির এজেন্ট) সমন কাকার সাথে। নকশিছবি নিয়ে কাজ করার অভিপ্রায়ে সে যোগাযোগ করতে থাকে সমন কাকার সাথে। নকশিছবিতে গল্পকথক হতে চায় মল্লার। আর সেই ইচ্ছাটাকে পূর্ণতা দিতেই যেন মরিয়া হয়ে ওঠে সে। তার এই স্বপ্নপূরণের পথে সে দেখা পায় প্রলয়া নামের এক আকর্ষণীয় নারীর, লৌহলণ্ঠন নামের এক আমুদে মানুষ, সর্পসঙ্গীতে পারদর্শী বলিরেখা নামের এক রাগী মহিলা সহ অনেকের। একদিন অচেনা সেই শহরে পা রাখা ছদ্মবেশী দেবতা মল্লার নিজের অজান্তেই হয়ে যায় শহরেরই এক অংশ।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ 'বিরূপকথা'-কে তানজীম রহমানের নিরীক্ষাধর্মী কাজ বলা যায়। আমাদের শৈশবে শোনা রূপকথার ধাঁচে গল্প না বলে তিনি চেষ্টা করেছেন কিছুটা আধুনিক ধাঁচে ও অন্যরকমভাবে একটা রূপকথার গল্প বলতে। যে গল্পটার প্রধান চরিত্র একজন দেবতা, যে কি-না একটা যান্ত্রিকতার চাদরে ঢাকা ব্যস্ত শহরের দেবতা হতে গিয়ে হয়ে যায় সেই শহরেরই একটা অংশ। তানজীম রহমানের এই উপন্যাসের কাহিনিতে প্রচুর দর্শনের দেখা পেয়েছি আমি। ঠান্ডা মাথায় বসে এই দর্শনগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে ভালোই লেগেছে।
উপন্যাসের কাহিনি এগিয়েছে বেশ ধীর গতিতে। লেখক পারিপার্শ্বিকের বর্ণনা দিয়েছেন শান্তশিষ্ট ভঙ্গিতে। হুট করে যে কোনকিছু ঘটে যাওয়া - তেমন কিছু হয়নি 'বিরূপকথা'-তে। বইটা পড়তে গিয়ে মাঝেমাঝে অবাক লাগছিলো এই ভেবে যে, কিভাবে লেখক এমন অদ্ভুত একটা প্লটের খোঁজ পেলেন! বইয়ের অর্ধেক পর্যন্ত পড়ার পর আক্রান্ত হয়েছিলাম একঘেয়েমিতে। মাঝে মাঝে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হচ্ছিলো আমার জন্য। এর আগে তানজীম রহমানের তিনটা বই পড়েছি। তিনটাই ছিলো হরর থ্রিলার। ওই তিনটা বইয়ে আমার একঘেয়েমি আসেনি। তাই 'বিরূপকথা' পড়তে গিয়ে যখন ব্যাপারটার মুখোমুখি হলাম, কিছুটা হতাশ লেগেছে। অহেতুক পৃষ্ঠাসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে বলে মনে হয়েছে আমার কাছে বইটা অর্ধেক পড়ার পর। নিরীক্ষাধর্মী কাজ হিসেবে 'বিরূপকথা'-কে সাধুবাদ জানানোই যায়, কিন্তু এটাকে কোনভাবেই ২০০+ পৃষ্ঠা পর্যন্ত টেনে যাওয়ার যৌক্তিকতা পাইনি। তবে সমাপ্তিটা ভালো লেগেছে আমার।
বানান জনিত কোন সমস্যা আমি খেয়াল করিনি 'বিরূপকথা' বইটাতে। সম্পাদনার ব্যাপারে অবসর প্রকাশনা সংস্থা-এর সিরিয়াসনেস ভালো লাগলো। শুধু একটামাত্র অনিচ্ছাকৃত ভুল চোখে পড়েছে। তা হলো, ৬৪ পৃষ্ঠায় তোর চোখে কি হয়েছে-এর বোন-কে তার মা লেখা হয়েছে৷
আবীর সোমের করা প্রচ্ছদটা ইউনিক লেগেছে। বইটার বাঁধাই আর কাগজের মানও ছিলো প্রিমিয়াম। একটা কথা, ব্যক্তিগতভাবে 'বিরূপকথা' আমার তেমন ভালো না লাগলেও অনেকেরই লাগতে পারে। বইটার গুডরিডস রেটিং ভালো আছে এবং অনেক পজিটিভ রিভিউও আছে৷ সেগুলোও চেক করতে পারেন। চাইলে আপনারা পড়ে দেখতে পারেন 'বিরূপকথা'।
"বিরূপকথা" something unlikely to be seen প্রতিটা বইতে তানজীম ভাই নিজেকে ভেঙ্গে আবার গড়ার প্রত্য্য নিয়ে নেমেছে বলে মনে হচ্ছে। উনার যে বইগুলো নিয়ে তুমুল আলোচনা হয় চাইলে ওই টাইপের বই বের করা ছিল উনার কাছে পানিভাত। কিন্তু গত বছর 'অবয়ব'এর পর এবছর "বিরূপকথা" বের করে সেই ধারার ধারে কাছেও থাকেননি তানজীম ভাই। বইয়ের শুরুতেই যেটা বলা আছে, বিরূপকথা আসলে বড়দের রূপকথা। আমি নিশ্চিত এই বইটা আমাদের পাঠক শ্রেণী খুব সহজে হজম করতে ���ারবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবাস্তব, অবান্তর মনে হবে। বইতে ঘটনা কম মনস্তাত্ত্বিক জীবনবোধ এবং একটা শূন্যতাতে বর্ননা করা হয়েছে। বইয়ের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো বুঝার জন্য হলেও একটু ম্যাচিউরড পাঠক হতে হবে। না হলে বইটা ভালো লাগার চান্স কম (কেউ অফেন্ড হলে দুঃখিত। কিন্তু এটাই সত্যি)। বইটা পড়ার সময় কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমার কাছে চরম বিরক্তি লেগেছে আবার কিছু কিছু জায়গায় দারুণ লেগেছে। যে বিষয়গুলো আমার ভাবনার সাথে মিলে গেছে সেগুলো পড়ে উৎফুল্ল লেগেছে যেগুলো মিলে নাই কিংবা বলা ভালো যে বিষয়গুলো বুঝার মতো মানসিক পরিপক্কতা আমার হয় নাই সে নাই সেগুলো তেমন কিছুই মনে হলো না। ব্যাপারটা আসলে "নিঃসঙ্গতার একশো বছর" এর মতো। বুঝলে "নিঃসঙ্গতার একশো বছর" এর মতো অমৃত আর নাই, আর না বুঝলে এর মতো বাকোয়াজ বই আর নাই। আমাদের বাংলা ভাষায় এই জনরার বই খুব একটা নেই বললেই চলে। আমি বরং রূপকথা নয় উইয়ার্ড ফিকশন বলতেই বেশি সাচ্ছন্দ্যবোধ করবো।
বইয়ের ভিতরের মূল থিম আসলে বর্ননা করাটা টাফ। একেবারে অন্যরকম জগত। হুট করে পাঠক বইয়ের ভিতরে ঢুকতে পারবে না। কিছু সময় নিয়ে মনযোগ সহকারে পড়লেই কেবল বইয়ের সাথে নিজেকে মেলাতে পারবে। বলা যায় বাস্তব আর পরাবাস্তব জগতকে যেভাবে লেখক এক বিন্দুতে মিলিয়েছেন সেটা শুরুতেই হুট করে ক্যাচ করতে সমস্যা হবে। আমাদের দেশি বিদেশী রুপকথাকে ��েভাবে লেখক ব্যবহার করেছে সেটা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।
কাহিনী সংক্ষেপ বলে আসলে কোন লাভ নেই। কারণে যে মাইন্ড সেটাপ নিয়েই আপনি বইটা হাতে তুলে নেন না কেন হুট করে মেলাতে পারবেন না। তাই এখানে কাহিনী সংক্ষেপ মুখ্য নয়। মুখ্য হচ্ছে আপনি বইটা হাতে নিয়েছেন, ধীরে ধীরে বইটার সাথে মিশে যেতে পেরেছেন কিনা। যদি বইটার সাথে মিশে যেতে পারেন তাহলে এক অন্যরকম স্বাদ আস্বাদন করবেন আর যদি কাহিনীর সাথে মিশতে না পারেন তবে কয়েক পাতা পড়ার পড়ে ফেলে রেখে দিবেন। তাই আমার সাজেশন থাকলে কাহিনী সংক্ষেপের উপর জোর না দিয়ে লেখকের উপর বিশ্বাস রেখে পড়ে যান। something unlikely to be seen
ছোটবেলার রূপকথার খুব পরিচিত লাইন। আগে অনেক রূপকথা পড়েছি। প্যারোডি রূপকথাও। বিরূপকথাও কিন্তু রূপকথা। 'ফ্যান্টাসি' বলতে যা বোঝায় অমন না, ডাহা রূপকথা। তবে বড়দের রূপকথা। বলতে দ্বিধা নেই, এরকম বই আমি এর আগে কখনোই পড়িনি। অনেক স্বাদের অনেক জনরার অনেক রকমের বই-ই পেয়েছি, কিন্তু এরকম অদ্ভুত অনুভূতি দেবার মতো বই ঠিক কোনোদিনই পড়া হয়নাই। প্রথম প্রথম দারুণ লাগছিলো, ঘটনা শুরু হতে হতে খেয়াল করলাম বইটার শব্দগুলো, বাক্যগুলো পঙতির মতো কিছুটা অপরিচিতভাবে ব্যবহার হচ্ছে। আমি এই শব্দ শব্দ খেলার সাথেও পরিচিত নই, তাই কিছুটা কঠিন তো লাগছিলোই। তবে কয়েক পাতা এগুনোর পর সয়ে গেছে। আর তুখোড় কল্পণাশক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ দেখে আরও হতবাক বনে গেছি।
'... কিন্তু ঝগড়ার রেশটা থেকে যাবে। আবহাওয়ার মতো, মেঘের মতো চেপে থাকবে মনের আকাশে। শুধু তাই নয়, তোমার সবগুলো চিন্তাকে ঘিরে ধরবে এই মেঘ। কোনো বাচ্চাকে হাসতে দেখে এক মুহূর্তের জন্য খুশি-খুশি লাগলো? না, তা তো লাগা যাবেনা, আজ মন খারাপের দিন।'
গল্পটা এক গ্রাম্য দেবতার, নাম মেঘমল্লার। যে শহুরে দেবতা হবার স্বপ্ন বোনে। ধুমকেতুতে চড়ে গ্রামের মানুষদের ফেলে যখন দেবতাবিহীন এক শহরে এসে নেমে দেখে এখানে তার মূল্য দিচ্ছেনা কেউ। তখন মানুষ হয়ে মানুষের সাথে মিশে মানুষকে বোঝার চেষ্টা করে সে। মানুষের সাথে মিশে মানুষের মতো সব সমস্যা মোকাবেলার চেষ্টা করে সেই অদ্ভুতুড়ে শহরে। এই গল্পে ফিসকুরি, প্রশ্নকাকদের সমাজ, নেকড়ে ছোটা বাহন, আজব খাবার হোটেল, কারেন্সি সিস্টেমে পত্র, গান শোনানো তোতা, নকশাছবি ইত্যাদি কাল্পনিক আজব সব এলিমেন্ট যতটা প্রকট, তারচাইতে স্পষ্ট কল্পনার আদলে বলা বাস্তবতার গল্প।
আমি তানজীম রহমানের লেখা আগে পড়েছি। ওনার দুটো বই আমার অনেক পছন্দের, সব খানে সাজেস্ট করে বেড়াই। ভিন্নধারার লেখা লিখে এর আগেও চমক দিয়েছেন তিনি। তবে এবার একেবারেই মনেহয় নিজেকে ভেঙেচুরে একদমই নতুন ভাবে উপস্থাপন করলেন। আমি কয়েকবার লেখক পরিচিতি পড়ে নিশ্চিত হচ্ছিলাম এই লোক একই ব্যক্তি কিনা। বাক্যগঠন, শব্দশৈলীর দারুণ পরিবর্তন বইতে। কোলকাতার ভাষার কিছুটা ছোঁয়া পাচ্ছিলাম। তবে যাইহোক এই অভিনবত্বের জন্য এই বইটা বাংলা সাহিত্যে একটা দারুণ সংযোজন হয়ে থাকবে। আমি মোটাদাগে বলতে চাচ্ছিনা 'বইটা সবার জন্য না'। তবে একটা মানসিক প্রস্তুতি আর সময় নিয়ে পড়া ভালো। আমি কিছুটা তাড়াতাড়িই শেষ করেছি বাধ্য হয়ে। আরেকটু সময় নিলে বোধহয় আরও ভালো হতো। একটু ভিন্ন স্বাদই যদি না নিলেন বই পড়ে মজা কি?
শব্দ নিয়ে যেমন ইচ্ছেমতো খেলা যায়, তেমনি শব্দ বুনে শিল্পও বানানো যায়। বিরূপকথা তেমনই একটা শব্দের শিল্প। উৎকৃষ্ট, অভিনব আর অসাধারণ এই 'শব্দশিল্পের' পরতে পরতে আছে মায়া, জাদুময়তা। দুর্দান্ত শব্দশৃঙ্খল আর আদুরে বর্ণনার ফাঁদের সাহায্যে লেখক কল্পনার সাথে বাস্তবতা মিশিয়ে সম্পৃক্ত এক দ্রবণ তৈরি করেছেন। এই দ্রবণে যতটা কাল্পনিক সুমিষ্ট তরল আছে, ঠিক ততটা কঠোর বাস্তবতাও মিশে আছে, একদম অবিচ্ছেদ্যভাবে।
বিরূপকথা। ভেবেছিলাম গল্পসঙ্কলন হবে, লেখকের আগের বই 'অবয়ব'-এ যে নামটার উল্লেখ এসেছিল। আমার বিশ্বাস একটা বড় সংখ্যক পাঠক অবয়ব পড়েই বিরূপকথা পড়তে এসেছিলেন, সবুক্তগীনের জন্তুর খোঁজে। পড়তে গিয়ে দেখলাম, উপন্যাস। জনরা? সবাই এতদিনে যেটা জেনে গেছেন- 'বড়দের রূপকথা'।
বিরূপকথা লিখতে গিয়ে লেখক যেন পাঠকের কল্পনাশক্তির চূড়ান্ত পরীক্ষা নিতে নেমেছিলেন। যে দুনিয়ার চিত্র এঁকেছেন উপন্যাস জুড়ে, তার উপকরণগুলো নিয়ে ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ড বানানো যাবে ভালোভাবেই। যেমন ধরুণ, মেঘমল্লার, মূল চরিত্র। এক গ্রামের দেবতা; মেঘ-বৃষ্টির দেবতা, যেমনটা তার নামেই প্রকাশ পায়। প্রতি গ্রামে একজন করে দেবতা আছে তাদের দুনিয়ায়, তারা ধূমকেতুয় চড়ে বাৎসরিক উৎসবে যান একসাথে। সে ধূমকেতুর বরফপিন্ড-চূড়োয় মাহুত বসে মশাল হাতে ধূমকেতুকে ভয় দেখান, আর গলে যাবার ভয়েই দুর্বার গতিতে ছোটে ধূমকেতু।
মল্লার ভেবেছিল, নেহাত গ্রামের দেবতা হয়ে থাকার চেয়ে শহরের দেবতা হওয়া বরং উত্তম, মানুষের বৈচিত্রময় জীবনের মাঝে বেশি সমীহ মিলবে। এক দেবতাহীন শহর খুঁজে বের করেও ফেলে সে উদ্দেশ্যে, কিন্তু সেখানে পৌঁছে আর কাঙ্ক্ষিত দাম পায় না সে মানুষের আপন-আপন জীবনযাত্রার ভিড়ে। তাই মল্লার মানুষের মাঝে মানুষ সেজে মেশার চেষ্টা করে, তাদের অভাবগুলো সমাধান করে দেবতার আসনে আসীন হবে ভেবে।
উপকরণের কথা বলছিলাম। শহরের মোড়ে মোড়ে পুরো শহরের ম্যাপ অঙ্কিত আছে। তা কিসে আবার, পিঁপড়ের ঢিবিতে! ঠিক শহরের মতোই রাস্তাঘাট সেই ঢিবিতে, মানুষের মতোই পিঁপড়ের ঝাঁক, আর "মানুষগুলোও যেন পিঁপড়েরা যা করছে তার অনুকরণ করে যাচ্ছে"।
শহরের রাস্তায় ছোটা যানবাহনও অভিনব। যাত্রীর আসনের সামনে বাঁধা হরিণ, আর পেছনে বাঁধা বাঘ। বাঘের তাড়ায় হরিণ ছুটবে, আর দুইয়ে মিলে ছুটিয়ে নিবে 'বাহন'-কে। সেই বাহন ডাকারও 'Uber' আছে! কেমন? নিয়মিত যাত্রীদের কাছে খোপে পোরা পাখি থাকে, যাদের ছেড়ে দিলে নির্দিষ্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের যানের কাছে পৌঁছে যায় তারা। তখন যানচালক পাখির যাত্রাপথ খুঁজে উদ্দিষ্ট যাত্রীর পিক-আপ পয়েন্টে পৌঁছে যায়।
পাখির ব্যবহার এখানেই শেষ না। নামকরা শিল্পীদের প্রচুর কদর সেই দুনিয়ায়। গায়কদের তো আর সম্মানী দিয়ে ভাড়া করে গান শুনবার সামর্থ্য সবার হয় না, তাই মাঝে মাঝে শিল্পীদের রেওয়াজস্থলে দেওয়াল ঘিরে গায়ক-পাখীদের খাঁচা সাজানো হয়। শিল্পী সপ্তাহখানেক বা মাসখানেক গান করেন, আর সে গান শুনতে শুনতে পাখিরা কন্ঠস্থ করে নেয়। তাদের পাঠানো হয় দূর-দূরান্তে, মানুষ পাখির মুখেই শিল্পীদের গান শোনেন।
গান কি কেবল আমোদের উপায়? গ্রামবাংলার 'বিলাপ'-এর মতো আছে 'বিদায়গীতি'। কনে বিদায়ের সময় দুইপক্ষ মিলে এই গান গাওয়া হয়। তাতে কনেপক্ষের ভাষায় মেয়ে বিদায়ের কালে তাদের ভয়, কষ্ট গীত হয়। অন্যপক্ষে, একই গানে বরপক্ষ ব্যক্ত করেন অভয়, আনন্দ, আস্থাসঙ্গীত।
তবে শিল্পীদের মূল কদর হলো 'নকশিছবি'র এন্টারপ্রাইজে। এন্টারপ্রাইজ কেন বলছি, তা বলার আগে নকশিছবির ধারণা পরিষ্কার করি। আপনারা গাজীর গান শুনে বা দেখে থাকলে, তার সাথে সাদৃশ্যটা দেখতে পাবেন। এ অনেকটা বায়োস্কোপের বাংলাদেশী রূপ, যেটা আরো বাহারি হয়েছে বিরূপকথায়। সান্ধ্য আসরে দড়ির ওপর নকশী কাঁথা টাঙানো হয়, সে কাঁথায় আঁকা গল্পকথা প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে আলোর কারসাজিতে। তার সাথে গান করেন গায়ক এবং অর্কেস্ট্রা। আবার আবহের সাথে মিলিয়ে ধীরে অথবা দ্রুত ছবির পট পালটে যায়, টাঙানোর তার টেনে কাঁথা পালটে নতুন ছবি দেখানো হয়।
এন্টারপ্রাইজ বলেছি, কারণ এই নকশিছবির প্রদর্শনী, বিরূপকথার দুনিয়ায় বিশাল একটা ইন্ডাস্ট্রি। এখানে শিল্পীদের খুঁজে বের করা এবং রিক্রুট করার জন্য 'পরিচায়ক'রা ছড়িয়ে আছেন। আছেন কাঁথা বুননের লোক, দড়ি বোনার জন্য 'দড়িকর', বাদক আর নানান রকম খুচরো শিল্পীরা, যাদের প্রদর্শনী হয়তো নকশিছবির আসরে ভিন্ন স্বাদ যোগ করে। একেকটা নকশিছবির দলের কার্যালয়ে প্রত্যেক ধরণের মানুষের জন্য আলাদা তলা বরাদ্দ করা আছে। আমাদের প্রটাগনিস্ট, মল্লার, সবথেকে আগ্রহী ছিল এমন একটা নকশিছবির দলে চাকরি পাবার জন্য।
"চাকরি যেন সোনার হরিণ"- সে আমাদের দুনিয়ায় যেমন, তেমনটা বিরূপকথাতেও। চাকরির খোঁজ দেবার জন্য আছেন 'খবরদার'-রা, হাটের মাঝে যাদের ঘিরে সবথেকে ভিড় জমে, আর সবার কেন্দ্রে বড় বড় ছাতার ছায়ায় চোস্ত হয়ে বসে যারা জনে জনে চাকরির খবর বিলায়। তাদের কাছে অগ্রাধিকার পাবার জন্য পূর্বপরিচয় যেমন কাজের, তেমনই থাকতে হয় পর্যাপ্ত পরিমাণে 'প্রশংসাপত্র', যত বেশি তত উত্তম। এই প্রশংসাপত্র বস্তুটা এক হিসেবে যেমন 'রেকমেন্ডেশন লেটার', তেমনই 'কারেন্সি'-ও।
এই তুমুল অদ্ভূত, অভিনব, উৎকট চিত্রায়নের মাঝ দিয়ে পাঠক এবং মেঘমল্লার এক অবাক-করা যাত্রায় আসীন হবেন। যত এগোবেন, তত দুনিয়া চিনবেন। আর মল্লার যতই মানুষের বেশে মানুষের পৃথিবীতে মানিয়ে নিতে থাকবে, পাঠক ততই বিরূপকথার মাঝে খুঁজে পেতে থাকবেন নিজেকে। এক বিষন্নকর অভিযাত্রায় নিজের জীবনকেই দেখতে পাবেন এক দূরবর্তী, ভিন্নরূপী দুনিয়ার ছায়ায়। এই সবটুকু অভিজ্ঞতার ব্যাপারে পয়লা ফ্ল্যাপেই সতর্ক করেছেন লেখক, যেটা আসলে এগোতে এগোতে আরো বোধগম্য হয়।
" নকশিকাঁথায় যেসব পশুপাখি, ফুল, মাছ বোনা থাকে, তাদের সাথে বাস্তবের প্রাণী বা উদ্ভিদের তেমন একটা মিল নেই। রঙ, আকৃতি, আকার সবই বদলে দেওয়া হয়। তারপরেও আমাদের চিনতে সমস্যা হয় না। কারণ সেটা সত্যের সাথে আপস নয়। বা প্রকৃতির সাথে। সত্যকে উপস্থাপনের অন্য একটা ধরনমাত্র। কিছু অংশকে সহজ করা, যেন বাকিটার জটিলতা স্পষ্ট হয়। কিছু অংশকে রাঙিয়ে তোলা, যেন মনে, মাথায় আর চোখে সত্যটা গেঁথে যায়। পরিচিতির আড়ালে যেন হারিয়ে না যায় সৌন্দর্য চেনার ক্ষমতা। প্রকৃতিকে জানার ক্ষমতা। বিশ্বকে বঝার-অন্তত মানুষের পক্ষে যতটুকু বোঝা সম্ভব- ক্ষমতা। রূপকথাও অনেকটা তেমনই। "
বইটার রেটিং কি দিবো সেইটা নিয়ে সামান্য দ্বিধা কাজ করছে। আপাতত ৩.৫।
এই লেখকের পড়া প্রথম বই। বইয়ের শুরু থেকে প্রশ্নকাক আসার আগে পর্যন্ত খুবই চমৎকার ছিল। এক বসাতেই মুগ্ধ হয়ে ৪০ পৃষ্ঠা পড়লাম। তারপর থেকে গল্প থেকে কেমন যেন সংযোগ হারালাম। কি হচ্ছে ,কেন হচ্ছে বা কি রূপক আছে এইগুলা ঠিকভাবে বুঝি নাই। কাহিনীর মাঝে মাঝে কিছু দর্শন এবং কিছু আলাপন বেশ ভালো লাগছিল। মল্লার এর চাকরির গল্প থেকে আবার গল্পে কিছুটা সংযোগ ফিরে পেলাম।
গুডরিডস এ রিভিউ পড়েছিলাম, বইটা কেনার আগে। প্রায় সবার এ অভিন্ন একটা মত ছিল, বই এর শেষটা খুব ভালো। শেষটার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি ছিল যে শেষে খুবই চমকপ্রদ কিছু একটা হবে। কিন্তু দেখলাম বইয়ের শেষ মাত্র ৩-৪ পৃষ্ঠা বাকী, তখনও বইটা তার নিজের গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছে। এমনকি শেষ পৃষ্ঠার আগে পৃষ্ঠাতেও কোন রকম তাড়াহুড়া বা কাহিনী ব্যাখ্যা দেবার কোন দায় নেই।
বইয়ের শেষের মাত্র একটা লাইন দিয়েই পুরো বইয়ের কাহিনীর প্যারাডাইম শিফট করে দিয়েছে। তারপর পিছন ফিরে দেখে নিজের মন মত অনেকগুলো থিওরি দাঁড় করালাম। পরবর্তীতে সময় নিয়ে বইয়ের কিছু কিছু অংশ আবার পড়ার চেষ্টা করবো, নিজের থিওরিগুলোর সাথে কতটা সংযোগ ঘটানো যায় দেখার জন্য।
অনর্থক জটিলতা বেশি। বড়দের রূপকথার গল্প বলতে গিয়ে রূপক আর বাস্তবতার ব্যালেন্স হারিয়ে গিয়েছে সবকিছুকেই রূপকের রূপ দিতে গিয়ে। তবে বিষয়বস্তুর নতুনত্ব আর বেশ কিছু জায়গায় গল্পে অনুভূতির গভীরতা ভালো লেগেছে।
বড়দের রুপকথা। ছোটদের রুপকথায় যেমন দৈত্য, রাজা, সুয়ো রানী দুয়ো রানী, জলপরী বা আশ্চর্য জাদু থাকে বড়দের রুপকথা কেমন হয়? ফ্ল্যাপে "বড়দের রুপকথা" দেখে ভেবেছিলাম সায়ক আমানের ফ্যান্টাসি জাতের কিছু হবে। কিন্তু না, এ নেহাত রুপকথা। সেই দেব-দেবতা, অবাস্তবতা আর জাদুকরী কারবার সব। আমার কাছে রুপকথা মানে ছোটসময় ছিলো ঠাকুরমার ঝুলি আর নানুর গল্প। এমন বই আমি পড়িনি আগে। আমার মতো ক্ষুদে পাঠকদের জন্য অপরিচিত প্লটই ছিলো বলা চলে। লেখকের চিন্তাশক্তি প্রখর বলতেই হয়। নাহয় এসব চিন্তা কিভাবে মাথায় আনলেন জানিনা। ওমন অদ্ভুত শহর, অদ্ভুত সব নাম, প্রশ্নকাক সংঘ বা খাবারের বর্ননা, আর পুরো শহরের সব কারবার, এইসবকিছুই কল্পনার জন্য প্রখর কল্পনা শক্তি লাগে। এবং এদিক দিয়ে সে প্রশংসনীয় অব্যশই। কিন্তু............................. বইয়ের কনসেপ্ট খুবই ইউনিক ছিলো বটে, তবে কেমন জানি স্বেচ্ছায় কাহিনী আগায় নি। বরং মনে হয়েছে জোর করে কাহিনী আগানো হচ্ছে। শুরু থেকে দারুন একটা ফ্লো ছিলো, মাঝে ধীর হয়ে এলো সব যে পড়াই বন্ধ করে দিই। মনোযোগ ধরে রাখতে খুবই বিপাকে পড়তে হয়েছে। তবে শেষে এসে সেই শুরুর চমকটা আবার ফিরে এসেছিলো। হয়তো শুরু আর শেষের সুন্দর মিলবন্ধনের জন্য আর ভেতরের সুন্দর সুন্দর উক্তির জন্য একে ৩ তারা দেওয়া যায়। হ্যাপি রিডিং
পড়া শুরুর আগে এক বন্ধুকে বিরূপকথা কেমন জিজ্ঞেস করায় উত্তর পেয়েছিলাম, "এটা এবসার্ড একটা বই"। পড়া শেষ করে আমি একমত, বিরূপকথা আসলেও কিম্ভুতকিমাকার অদ্ভূত একটা বই। এমন বইয়ের রিভিউ করাটা কষ্টসাধ্য। তবুও মনে হলো বইটার আরেকটু বেশি প্রচারণা দরকার, তাই নিজের বিচ্ছিন্ন অনুভূতিগুলো জানানোর চেষ্টা করতে এলাম৷
সবুজহাতি গ্রামের দেবতা মেঘমল্লার। নামের সাথেই মিল রেখে তার আছে মেঘ, বৃষ্টি, বাতাস নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। অনেকদিন���র ইচ্ছা কোনো এক শহরের দেবতা হওয়ার। দেবতা বিবর্জিত এক শহর খুঁজে পেয়ে মল্লারের সেখানকার দেবতা হয়ে ওঠা বা না ওঠার গল্পই বিরূপকথা। লেখকের ভাষ্যমতে বইটা বড়দের জন্য লেখা রূপকথা, অনেকটা রূপকথার আদলেই লেখা পুরোটা। ফ্যান্টাসী গল্পগুলোকে আমার সবসময়ই আয়না বলে মনে হয়। কল্পনার রাজ্যে জাদুটোনা আর ব্যখ্যাতীত জিনিসপাতির আড়ালে যেন বাস্তবতাই উঁকি দিয়ে যায়৷ বিরূপকথাও ব্যতিক্রম নয়৷ চরিত্রগুলোর মাঝে, তাদের কাজকর্মের মাঝে একাধিকবার খুঁজে পেয়েছি নিজেকে অথবা পরিচিত কোনো মুখকে।
মাত্র ২১৫ পৃষ্ঠার বইতে যেমন মোহনীয় জগৎ আর কাহিনীর গভীরতা সৃষ্টি করেছেন সত্যিই প্রশংসনীয়। বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় ছিলো অসংখ্যা মেটাফোর, যাট অর্ধেকও আসলে বুঝিনি। বাকি অর্ধেক নিজের মতো করে বুঝে নিয়েছি। এই বইয়ের টার্গেট অডিয়েন্স আসলে কারা সে সম্পর্কে এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা, পরিচিত যারা পড়েছেন তাদের মাথায়ও ঘুরে বেড়াচ্ছে এই একই কথা। বইয়ের পিছনের দর্শণটা আসলেও হয়তো বুঝি নাই তবুও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপভোগ করছি বইটা, এর ঘোর কাটতেও বেশ সময় লাগবে।
ফ্যান্টাসী বই হওয়া স্বত্বেও এখানে মুহূর্তে মুহুর্তে ম্যাজিক ছিলো না। বইয়ের আসল জাদু ছিলো লেখনীতে। বছর কয়েক আগে মাঝরাতে লেখকের অক্টারিন এক চ্যাপ্টার পড়ে ভীষণ ভয় পেয়ে রেখে দেওয়ায় পরবর্তীতে লেখকের অন্য কোনো বই পড়া হয়ে ওঠেনি। তবে বিরূপকথার লেখনী অসম্ভব সুন্দট মনে হয়েছে আমার। বই দাগানো ভীষণ অপছন্দের একটা কাজ, তবুও এই বই দাগিয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছি। কারণ লাইনে লাইনে অদ্ভুত মায়াবী কিছু উক্তি আছে, যা বারবার পড়তে মন চায়৷ কিছু উক্তি হৃদয় ছুয়ে যায়, কিছু আবার তীক্ষ্ণ তীরের ফলার মতো হৃদয়ে গিয়ে বিঁধে। কিছু প্রিয় উক্তি জুড়ে দিলাম।
* হয়ত আজকে প্রথমবারের মতো মল্লার বুঝতে পারলো রাগ আর অভিমানের মধ্যে একটা বিচিত্র জায়গায় পার্থক্য আছে। রাগ হলে মনে হয় মনের ভিতর যা আছে সব বেরিয়ে আসতে চাইছে, সামনে যে আছে তাকে উড়িয়ে দিতে চাইছে। অভিমান সে তুলনায় চাপা, লাজুক, নীরব। অভিমানের সময় মনে হয় পুরো মহাবিশ্ব ষড়যন্ত্রে নেমেছে আজ আমার বিরুদ্ধে। ছোট ছোট ভুল হলে, বিরক্তিকর ঘটনা ঘটলে মনে হয় হ্যাঁ, হবেই তো, আমার সাথে না হলে আর কার সাথে হবে?
* এতোদিন মনে হতো ভবিষ্যৎ একটা গন্তব্য। পর্বতশৃঙ্গ। চূড়া পর্যন্ত পৌঁছানোটা কষ্টের, তবে পৌঁছাতেই হবে। মাঝে মাঝে না চাইতেও পথটা চূড়ার দিকে টেনে নিয়ে যায়, পাদু’টোকে গেঁথে রাখে পাহাড়ের রুক্ষ মাটির বুকে। কিন্তু চূড়ায় পৌঁছানো হবে একসময়, তারপর শান্তি। আজকাল মনে হচ্ছে ভবিষ্যৎ একজন শিকারি। ধেয়ে আসছে মল্লারের দিকে। তার গতিতে কোনো অস্থিরতা নেই। কোনো তাড়া নেই। মাথা ঠান্ডা, দৃষ্টি ভাবলেশহীন। মায়া নেই, নিষ্ঠুরতা নেই। শুধু আছে একটা জিনিস: নিশ্চয়তা। শিকার চেষ্টা করবে লুকাতে। চেষ্টা করবে পালাতে। ভান করবে শিকারির চোখ তার ওপর পড়েনি। তাতে শিকারির কিছুই আসে যায় না। সে জানে ঠিকই এসে পৌঁছাবে, জানে শিকারের পালাবার কোনো জায়গা নেই।
* "মনে হয় জীবন আমার জন্য না। কারণ আমি জানি কোনোকিছুই টেকে না। খারাপ, ভালো - কেনোকিছুই। এই যে কষ্ট করে সব বদলাচ্ছি, এসব আবার নিজে থেকে বদলে যাবে। যা পেয়েছি মুছে যাবে, সম্পর্ক জটিল হবে। শুধু কিছুদিনের মধ্যে যে ভালো জিনিসগুলো হয়েছে সেগুলো মনে থাকবে, আর বছর-বছর আগে যে খারাপ জিনিসগুলো হয়েছে সেগুলো মনে থাকবে। আমার মনে হয় আমার মধ্যে একধরনের খালি জায়গা তৈরি হয়েছে। একটা শূন্যতা। যে সময়টায় অলস ছিলাম, তখন তৈরি হয়েছিলো। একসাথে থাকতে থাকতে এই শূন্যতা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সময়ের সাথে আমি বদলে গেছি, আমার সবকিছু বদলে গেছে- শুধু শূন্যতা বাদে। এখন আমার ভয় হয়। যদি শূন্যতা না থাকে, তাহলে কি আমি থাকবো?"
❝কিছু মানুষ পাত্তা পায় না প্রতিভার অভাবে, কিছু প্রতিভা পাত্তা পায় না পরিচিতির অভাবে।❞
প্রাসঙ্গিক ও অপ্রাসঙ্গিকতার মিশেলে কিছু সাধারণ ঘটনাকে অসাধারণভাবে উপস্থাপনা করার যে কাজটি লেখক ❛বিরূপকথা❜ উপন্যাসের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তা কতটুকু আলোচনার অথবা সমালোচনার যোগ্য—তা নিয়ে দুকথা প্রকাশ করার জন্য রিভিউটি লেখা।
প্রথমে বলি ‘পাত্তা না পাওয়া’ উক্তি নিয়ে। যেটা আমি শুরুতে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য লিখেছি উদ্বৃতিচিহ্নের ভেতরে। ❛বিরূপকথা❜ উপন্যাসের সমাজ আর আমাদের বাস্তবিক সমাজের মধ্যে তেমন আহামরি কোনো পার্থক্য নেই। আছে শুধু চরিত্রায়নের নামে আর কামে। এই নিয়ে পরে আলোচনা করছি। বাস্তবিক উক্তি আর দার্শনিক চিন্তার মিশেলে লেখক এমন এক দুনিয়ার সৃষ্টি করেছেন; যা আপনার পাঠক সত্তার সর্বোচ্চ সহ্য ক্ষমতা বিচারের পরীক্ষা নিতে বাধ্য। আপনি পালাতে চাইবেন, হাঁপিয়ে যাবেন, বইটি ছুড়ে ফেলে দিতেও দ্বিধাবোধ করবেন না; মানসিক এক নিদারুণ যন্ত্রণায় যে হাবুডুবু খাবেন না তার গ্যারান্টিও দিতে পারছি না। বিশ্বাস করেন, এই বইটি পড়ে আমার পাঠক সত্তার ‘ভীত ভ্রমণ’-এর ছোট্ট একটি অভিজ্ঞতা বই কম কিছু হয়নি। তাই অনুরোধ করব, যদি আনন্দের বশবর্তী হয়ে রূপকথার জগতে হারিয়ে মজা লোটার জন্য বইটি পড়বেন বলে ঠিক করেন—তাহলে এখনই সেই চিন্তা বাতিল করুন। কারণ ❛বিরূপকথা❜ উপন্যাসের ‘বি’ উপসর্গটি আপনাকে দেখাবে বিষণ্ণতা, বিভীষিকা, বিক্ষুব্ধ বিশেষণে বিশেষায়িত হওয়ার ক্ষমতা। সোজা কথায়—এই ❛বিরূপকথা❜ দ্রুত পাঠ সম্পন্ন, বিলাসি মস্তিষ্ক এবং পদে পদে রোমাঞ্চিত হওয়ার পাঠকদের জন্য একেবারেই না।
❛বিরূপকথা❜ বইটি পাঠকদের নিকট পরিচিত না। তাই হয়তো পাঠকদের থেকে যতটা পাত্তা পাওয়ার কথা ততটা পাচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে, না পাওয়াটা কিছু দিক দিয়ে খারাপ না। এই বই গিলতে যেখানে মাথার ঘাম পায়ে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হতে থাকে; হজম করতে না জানি কী কী করা লাগে। ভয় দেখাচচ্ছি না। একটি বই প্রকাশিত হয়েছে, প্রকাশ হওয়ার অর্থ জনপ্রিয় হয়ে যাওয়া না। দুনিয়ায় এমনও বই আছে, যা শুরুতে জনপ্রিয় বা পাঠক প্রিয়তা পায়নি। পাওলো কোয়েলহো-এর ‘দি আলকেমিস্ট’ উপন্যাসের কথা নাহয় ধরুন। ❛বিরূপকথা❜ তেমনই একটি বই। আপনি চাইলে, আপনি না আমি। আমি চাইলে বইটিকে গার্বেজ বলে একতারা দিতে পারি অথবা ইচ্ছা করলে প্রতিটি পয়েন্টের মোমেন্টাম বিশ্লেষণ করে পাঁচতারা-ও দিতে পারি। বইটি পড়ে কী বুঝতে পেরেছি; সেইটে হচ্ছে মূল কথা। অতটা কঠিন কিছু নয়; কিন্তু লেখকের উদ্ভট উপস্থাপনা বইটি সহজ করে ভাবতে বাধা দিয়েছে। এর আরেকটি কারণ হচ্ছে জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া।
জাদুবাস্তবতা অথবা ম্যাজিক রিয়েলিজম জনরার সাথে আমরা কমবেশি সকলে পরিচিত। ১৯২৫ সালে ফ্রান্জ রোহ জাদুবাস্তবতা শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন। ১৯৫৫ সালে অ্যান্জেল ফ্লোরেস ল্যাটিন আমেরিকায় ম্যাজিক রিয়েলিজমে ধারণার প্রয়োগ ঘটালেও—ফ্লোরেসের মতে এই কাজটি ১৯৩৫ সালে আর্জেন্টাইন লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসের মাধ্যমে সূত্রপাত হয়। যিনি আবার ইউরোপীয়ান লেখক ‘মেটামরফসিস’ খ্যাত ফ্রান্জ কাফকার মতোই নিজস্ব ঢঙে মৌলিকত্ব বজায় রেখে লেখালিখি করতেন।
বর্তমানে জাদুবাস্তবতা নিয়ে লেখালিখি সফল কয়েকজন লেখক হচ্ছেন—নেইল গেইম্যান, গুন্টার গ্রাস, মার্ক হেলপ্রিন, এলিস হাফম্যান, হারুকি মুরাকামি, টনি মরিসন, সালমান রুশদি প্রমুখ। তবে নোবেল পুরষ্কার জয়ী লেখক গ্যাব্রিয়াল ��ার্সিয়া মার্কেজের 'ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচু্যড' প্রকাশিত হওয়ার পরপরই বিশ্বসাহিত্য মার্কেজকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়। মার্কেজ হচ্ছেন ল্যাটিন আমেরিকা সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার সুদক্ষ কারিগর।
বাস্তবতা বহির্ভূত কোনো মতবাদের সাথে আপনি জাদুবস্তবতা অথবা পরাবাস্তবতাকে একই নিক্তিতে মাপাজোখা করতে পারবেন না। আপনি পাঠক হয়ে যা কল্পনা করতে অক্ষম; লেখক সেই অক্ষম কল্পনাকে রূপ দিবে বাস্তবতা কেন্দ্র করে জাদুবাস্তবতার মাধ্যমে। বেশ উইয়ার্ড জিনিস। কাইন্ডলি ফ্যান্টাসির সাথে এই জাদুবাস্তবতা মেলানোর চেষ্টা করবেন না। শুধু ফ্যান্টাসি না; লোককথা, উপকথা, হরর গল্প, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, আধিভৌতিক থেকে এই জনরা সম্পূর্ণ আলাদা। তবে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং পার্ট কি জানেন? এই জাদুবস্তবতায় কিন্তু উপকথা, কুসংস্কার, ধর্মীয় রূপক, অলৌকিকতা, জাদু, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং সমাজ ও রাজনৈতিক বিষয়বস্ত পুঁজি করে গল্প তৈরি করা হয়।
আমাদের দেশের সৈয়দ শামসুল হক এবং শহীদুল জহির দু’জনই কিন্তু দেশজ পটভূমিতে জাদুবাস্তবতার ফসল বুনেছেন। সেই আশির দশকের কথা। মার্কেজ থেকে অনুপ্রাণিত অথবা প্রভাবিত হয়ে ওনারা এই কার্য সম্পাদনা করতে সফল হয়েছেন বটে। বর্তমানে সেই সংযোজনে ❛বিরূপকথা❜ উপন্যাসের লেখক তানজীম রহমানের নামও সম্মানের সহিত নেওয়া হবে বলে আশাবাদী। তবে সেটা জাদুবাস্তবতা অথবা পরাবাস্তবতা তৈরিতে সহায়তা করেছেন বলে না; লিটেরারি ফিকশনে যে কনট্রিবিউট তিনি করেছেন সে-জন্য।
জাদুবস্তবতা কী তা নিয়ে আরেকটু সহজ উদাহরণ দিলে—ছোটোবেলায় পড়া ঈশপের গল্প কিন্তু জাদুবাস্তবতার মোড়কে মোড়ানো। বর্তমানে আমি ‘সহস্র এক আরব্য রজনী’ পূর্ণাঙ্গ সংস্করণটি পড়ছি; যেখানে জাদুবস্তবতার ছোঁয়া পুরোদস্তুরে রয়েছে। জাপানের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির উদাহরণ তো ইতোমধ্যে দিয়েছি। বর্তমানে দেশে মুরাকামির কাজ অনেক জনপ্রিয়। যাহোক, বলতে গেলে অনেক কথা আসবে—লেখা বেরোতে থাকবে। তার চেয়ে বরং দেশিয় পটভূমি ভিত্তি করে লেখকের লেখা ❛বিরূপকথা❜ উপন্যাসে নিয়ে বরং আলোচনা করি।
✱ আখ্যানপত্র—
রূপকথা কি বড়দের জন্য হতে পারে?
গভীর অতীতের যে যুগে প্রথম জন্মাতে শুরু করে রূপকথা নামক গল্পের ধরন, তখন গল্পগুলো বড়দের জন্যই ছিলো। দৈত্য আর রাজকুমার, যুদ্ধ আর জাদুর রূপকে তুলে ধরা হতো জীবনের উপেক্ষিত সত্য। গদ্যবস্ত্র পরে নিজেদের সাজিয়ে নিতো অভিজ্ঞতা আর পরামর্শ। বিনোদনের বেশে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার জীবনে অতিথি হয়ে এতো রূপকথা, তারপর থেকে যেতো আপনজন হয়ে।
এই উপন্যাসটি সেই প্রাচীন ধারার বর্তমান সংস্করণ। জাদুর ফাঁকে ফাঁকে এখানে উঁকি দিয়েছে বাস্তবতা, কল্পনার স্পর্শে নতুনত্ব পেয়েছে কিছু পরিচিত প্রেক্ষাপট। বলা হয়েছে এমন কিছু কথা, যেগুলো হয়তো সরাসরি বলা সম্ভব নয়।
বিরূপকথার জগতে আপনার নিমন্ত্রণ রইলো। হয়তো এখানে হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে এমন মুখের সাথে যা খুব পরিচিত। হয়তো সেই মুখ কোনো বন্ধুর, প্রেমিকার। বা আপনার নিজের।
✱ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
❛বিরূপকথা❜-কে লেখক বড়োদের রূপকথা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। দ্যাটস গুড। বইটির এক একটি পৃষ্ঠায় যেন একশ পৃষ্ঠার বর্ণনা দেওয়া রয়েছে। খুব মনোযোগ সহকারে না পড়লে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাস্তবতার সাথে সখ্যতা গড়ে তোলা কোনোভাবে সম্ভব না। ওপরে সহ্যের সর্বোচ্চ প্রয়োগের কথা তো ইতোমধ্যে বলেছি। এতক্ষণ বইটি কেন পড়বেন না—সেই বিষয়ে ধারণা দিয়েছি; এ-বার কেন পড়বেন তা নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া শেয়ার করি।
২১৫ পৃষ্ঠার বইটি পড়তে গিয়ে বিতিকিচ্ছি এক অবস্থায় পড়তে হয়েছে। কম করে হলেও একশ বারের বেশি বইটি হাত থেকে নামিয়ে রেখেছি আর তুলেছি। কখনও তিন-চার পৃষ্ঠা পড়ে রেখে ভেবেছি, আবার হাতে নিয়ে দশ পৃষ্ঠা পড়ে আধা ঘণ্টার জন্য অন্য কোনো কাজে বিচরণ করতে বাধ্য হয়েছি। টানা এই বই পড়া আমার পক্ষে অন্তত সম্ভব ছিল না। এমনিতে ২১৫ পৃষ্ঠার বই দিনের মধ্যে শেষ করা দেওয়া যায়; কিন্তু এই বই সেই সম্ভবকে অসম্ভব করে দিয়েছে। একটা কথা বলে রাখা ভালো, দিনের হিসাব অথবা এত ঘণ্টায় একটি বই শেষ করব—ওই অনুযায়ী কোনো গল্প-উপন্যাস না পড়া ভালো। কখনও ৭০০ পৃষ্ঠার বই চার দিনে শেষ হয় আবার কখনও ২০০ পৃষ্ঠার বই শেষ করতে প্রয়োজন হয় এক সপ্তাহ। বইয়ের কনটেন্টের ওপর নির্ভর করে সেটা।
তবে ❛বিরূপকথা❜ শেষ করে পূর্ণতার পাশাপাশি অনীহাও যে ভর করেনি একদমই না। কীভাবে বইটিকে নিয়ে কিছু লিখব তা ভাবতে আমার চিন্তার সুতো কেটে যাচ্ছিল। আমি সর্বভুক পাঠক, গল্পের ভেতরে দেওয়া মেটাফোর ধরতে কখনও কষ্ট করতে হয়নি। মনোযোগী থাকি বলে হয়তো। যাহোক, জাদুবাস্তবতা অথবা পরাবাস্তবতা নিয়ে লেখালিখি আমাদের দেশে কতটা জনপ্রিয় সেই হিসাব আমি জানি না। নতুনত্ব অথবা গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে, এই জনরায় লেখালিখি করা কম কষ্টসাধ্য কোনো কাজ নয়। তবে লেখক যে অসাধ্য সাধন করে কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে স্বাতন্তর্য বজায় রেখে পুরো উপন্যাসটি শেষ করতে পেরেছেন সে-জন্য সাধুবাদ জানাতে হয়।
অধ্যায়বিহীন এই উপন্যাসে লাল বাতির কোনো গোল অথবা নির্দেশনা চিহ্ন আপনি দেখতে পাবেন না। সুখের নীড় ছেড়ে আসার মনস্তাপ, যোগ্য করে নেওয়ার প্রয়াস—সবকিছু যেন পরীক্ষার এক প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড। অশান্ত বাক্যের খেলায় মেঘমল্লার যে কায়দায় লড়েছে—তা বিরাট এক আশার যোগান দিয়ে বাধিত করেছে। লেখক সেই অর্থে হয়তো উক্তিটি দিয়েছেন—
❝আশা বড়ই শক্তিশালী নেশা। বর্তমানকে ফিকে করে দেয়। কথা দেয় ভবিষ্যতে যে আনন্দ আসছে, যে সন্তুষ্টি আসছে সেটার তুলনায় এখনকার সময়টা নরকতুল্য। আর একটুখানি অপেক্ষা, আর একটুখানি চেষ্টা, ব্যস। সবকিছু বদলে যাবে। শেষমেশ একটু বিশ্রাম মিলবে, নিজেকে থামতে দেওয়ার অনুমতি পাওয়া যাবে।❞
● সূত্রপাত—
❛বিরূপকথা❜ গল্পটি সবুজহাতি গ্রামের মেঘমল্লার নামের এক দেবতার। বজ্র আর বৃষ্টি যার হাতিয়ার। কিন্তু গ্রামের দেবতা হয়ে থাকার আর ইচ্ছে নেই মেঘমল্লারের। যদিও সুখে-শান্তিতে দিন কেটে যায় তার। কিন্তু এত সুখ দিয়ে হবে কী? খ্যাতির যেখানে ঘাটতি! সে হতে চায় শহরের দেবতা। যে শহরে তাকে নিয়ে সৃষ্টি হবে নানান কিংবদন্তি। এক নামে তাকে চিনবে সবাই। অল্পতে তুষ্ট না হলে যা হয় আরকি। এর পরে শুরু হয় শহর খোঁজার কার্যক্রম। পাঠানো হয় পাতা আর দখিনা বাতাসকে। কয়েক বছরের অপেক্ষায় মিলে যায় এক শহর। মেঘমল্লার যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। এ-দিকে গ্রামের মানুষ বেজায় ক্ষিপ্ত, নাস্তিকরা ছাড়া। কিন্তু মেঘমল্লার সেইসব গ্রাহ্য করার সময় কোথায়? চলল সে শহরের দেবতা হতে। তারপর?
কাহিনির শুরুটা বেশ মজাদার। লেখক দারুণ সব শব্দ—জট পাকিয়ে বস্তু ও ব্যক্তির নামকরণ করেছেন; যার রেশ পুরো উপন্যাসে জুড়ে বিদ্যমান ছিল। গল্পের শুরু ও শেষভাগ দ্রুত শুরু আর হুট করে শেষ হলেও মধ্যভাগ হচ্ছে সাহারা মরুভূমি। মরুভূমি হওয়াতে চমকের দেখা পাওয়া যায় মাঝে মাঝে। একটি দর্শনকে লেখক সাধারণ গল্পে যে স্থান দিয়ে লিখতে পারতেন—সেটাকে জাদুবস্তবতায় ডুবিয়ে উপস্থাপনা করেছেন বলে কঠিন আর মেজাজ বিগড়ানো মনে হতে পারে। ধৈর্য শক্তি সহ্য ক্ষমতার মধ্যে থাকলে তবেই বইয়ের সম্পূর্ণ রস আস্বাদন করতে পারবেন। যা কোনো অলৌকিক গুণে আমার ক্ষেত্রে সম্ভব হয়েছে।
● গল্প বুনট » লিখনপদ্ধতি » বর্ণনা শৈলী—
লেখকের খুব বেশি গল্প বা উপন্যাস পড়া না থাকলেও, ইউনিক প্ল্ট এবং স্টোরিটেলিং-এর জন্য তিনি অত্যন্ত সুপরিচিত। উক্ত উ���ন্যাসের মাধ্যমে সেই পরিচিতি অনেকটাই সদ্ব্যবহার তিনি করেছেন। কোনো অধ্যায় ছাড়াও যে গল্প লেখা সম্ভব, তা উনি দেখিয়ে দিলেন। কাহিনির টাইমলাইন নিয়ে কোনো প্যাঁচ নেই। আছে শুধু হরেক রকম শব্দের লেখা। পুরো উপন্যাসটি টিকে আছে শব্দের বহুবিধ খেলার ওপর। এমন বিচিত্র সেই নাম ও নামকরণের খেলা; যা না পড়লে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
লেখনশৈলীতে যে প্রভাবটা পড়েছে তা হচ্ছে চরিত্রের নাম; আর অনিষ্পন্ন ছোটো ছোটো সংলাপের কারণে। অদ্ভুত সংলাপের প্যাটার্ন। আরেকটি পরীক্ষিত দিক হচ্ছে বর্ণনা শৈলী। তবে এ-দিকটি বেশ সাবলীল লেগেছে। ‘নকশিছবি’র মতো। এই নকশিছবি, নকশিকাঁথার একটি রূপভেদ বলতে পারেন। এমন অনেক শব্দের রূপভেদ আর সেগুলোর কাজের অভাব পুরো উপন্যাসে বিচরণ করে বেড়িয়েছে।
বইটি যেহেতু ধীরগতি, বিশেষ করে মিডল পার্ট। সেটার কারণ অযাচিত কিছু ঘটনা আর কথোপকথন। বিবরণী অংশটুকু আরও কিছুটা সীমিত করলে ভালো ব্যতীত খারাপ হতো না বইকি। এমনিতে বাস্তবিক দর্শনের আলাপ-আলোচনার কোনো কমতি লক্ষ করিনি।
● চরিত্রায়ন—
এই উপন্যাসের চরিত্রগুলো মানুষই; তবে একটু ভিন্ন ধরনের। রাগ, অভিমান, চাহিদা সবই আছে কিন্তু প্রকাশের প্রক্রিয়া বিচিত্রধর্মী। যেহেতু লেখকের মস্তিষ্ক প্রসূত তারা। তবে বাস্তবতার সাথে মিল কোনো অংশে কম নেই। যে অনুভূতি আমাদের হয় বা যে সমস্যায় আমরা প্রতিনিয়ত ভুগতে থাকি; লেখক ওনার উপন্যাসে সেই হতাশা ও ব্যর্থতা—মুনশিয়ানার সাথে উপস্থাপনা করেছেন। বিচিত্র নামের সাথে তাদের বিস্ময়কর ভাবনাও একেবারে ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল। সুন্দর সামঞ্জস্যপূর্ণ।
● অবসান—
শেষটা বিষণ্ণতার ধাক্কা দিয়ে পূর্ণতা পাইয়ে দেওয়ার মতো। লেখকের ভাষায়, শূন্যতা থেকে উঠে আবারও শূন্যতায় ডুব দেওয়া। যাহোক, এত গভীর সব পর্যবেক্ষণ; শক্ত করে বলার দরকার নেই। শুধু বলব, আপনি যদি শুরুটা করে মাঝ অবধি যেতে পারেন; তবে বাকিটাও শেষ করতে সক্ষম হবেন।
◆ খুচরা আলাপ—
❝কোনোকিছু নিয়ে যতো বেশি ভাবা হয়, তা যেন ততো বেশি জটিল হয়। চিন্তার যেন আঙুল আছে, সযত্নে সেই আঙুল সমস্যার দড়িতে একটার পর একটা নতুন প্যাঁচ খুঁজে বের করে।❞
আমাদের জীবনের সাথে এই উক্তিটি বেশ মিলে। ভরপুর এমন আরও উক্তি রয়েছে পুরো উপন্যাসের আনাচেকানাচে। যা করা কাজ আর ভাবা চিন্তাগুলোকে নিয়ে আলাদা করে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে। লেখকের এই মননশীলতাকে প্রশংসা করার জন্য হলেও বইটি কিয়দংশ হলেও পড়ে দেখা উচিত বলে মনে করি।
বর্তমান সমাজে আমাদের কীসের অভাব আর কেন এত তাড়াহুড়ো? কীসের নেশায় ধুঁকছে মানুষজাতি? কেন-এর উত্তর হয়তো আপনাকে ❛বিরূপকথা❜ সরাসরি দিবে না তবে উপলব্ধি করাবে কয়েক গুণ। যদি ভাবতে ভালোবাসেন, লেখকের চিন্তা শক্তির প্রশংসা করতে পছন্দ করেন তবে মেঘমল্লারের এই যাত্রায় আপনাকে স্বাগত। একটু মিশে দেখুন প্রশ্নকাকদের সাথে, যারা শুধু প্রশ্নের মাধ্যমে কথা বলতে পছন্দ করে। ঘুরে আসবেন নাহয় ‘সুস্বাগতম’ থেকে। পরিচিত হতে পারেন ছত্রদূর্গ, ছাতাবাড়ি, জাদুক্লান্তি, খবরদারদের সাথে।
ক্লান্ত বোধ করছেন?
এত বড়ো রিভিউ তার ওপর আবোল-তাবোল বকবক শুনে রাগ হচ্ছে আপনার? তবে নিচের উক্তিটি পড়ুন—
❝রাগ হলে মনে হয় মনের ভেতর যা আছে সব বেরিয়ে আসতে চাইছে, সামনে যে আছে তাকে উড়িয়ে দিতে চাইছে। অভিমান সে তুলনায় চাপা, লাজুক, নীরব। অভিমানের সময় মনে হয় পুরো মহাবিশ্ব ষড়যন্ত্রে নেমেছে আজ আমার বিরুদ্ধে।❞
আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নামার মতো কোনো মহান কার্য এখনও করে ফেলিনি। তাই সেই ভয় আপাতত নেই। দুয়েক জনের চোখের বালি হতে পারি; এর ব্যতীত আর কিছু নয়। অভিমান যেমন আপনার হয়, আমার হয় তেমন লেখকেরও হয়। তাই রাগ করে দুয়েকটা কটু বাক্য জ্যা টেনে ধরার পূর্বে তির ছুটে গেলে—একটু নাহয় আপস করে নিলেন। অভিমানে থাকলে যত সমস্যা। ষড়যন্ত্র তখন উভয় দিকের সংকট হয়ে দাঁড়ায়। দোটানায় থাকা যাকে বলে।
◆ লেখক নিয়ে কিছু কথা—
‘কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিন্যাস রহস্য’-এর মাধ্যামে লেখকের লেখার সাথে পরিচিত। ছোট্ট কিন্তু সুন্দর একটি উপন্যাসিকা। মাঝে জনপ্রিয় আর্কন, অক্টারিন, অবয়ব প্রকাশিত হলেও পড়া হয়নি। ভালো কিছু আমি একটু দেরি করে পড়ি বা দেখি। তবে ❛বিরূপকথা❜ পড়ে যে অনুভূতি আমি পেয়েছি তা সম্পূর্ণ নতুন। মিশ্র সব অনুভূতি আমাকে ঘিরে রেখেছে, যতক্ষণ অবধি বইটি শেষ করতে না পেরেছি। লেখক যা চেয়েছেন; হয়তো সেটাই হয়েছে। এর বেশি কিছু বলার নেই।
● সম্পাদনা ও বানান—
সম্পাদনা ভালোই হয়েছে সামান্য দুয়েক জায়গা বাদ দিয়ে। প্রচলিত কিছু বানানে ভুল রয়েছে এবং তা সহনীয়।
● প্রচ্ছদ—
এত দারুণ ক্রিয়েটিভ প্রচ্ছদ আমি খুব কমই দেখেছি। বইয়ের গল্পের সাথে মিলিয়ে দারুণ এক প্রচ্ছদ করেছেন প্রচ্ছদ শিল্পী। এই বছরের পড়া এখন পর্যন্ত সেরা প্রচ্ছদ হয়তো এটি।
● মলাট » বাঁধাই » পৃষ্ঠা—
দাম অনুযায়ী বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ দুই জায়গার প্রোডাকশন বেশ ভালো। অভ্যন্তরীণ বেশি ভালো লাগার কারণে ভালো লাগার মাত্রাটাও বেশি। প্রকাশনাকে সাধুবাদ জানাতে হয়, এইরকম একটি বই আমাদের মতো ভাবতে ভালোবাসে পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য।
≣∣≣ বই : বিরূপকথা • তানজীম রহমান ≣∣≣ জনরা : লিটেরারি ফিকশন ≣∣≣ প্রথম প্রকাশ : মার্চ ২০২১ ≣∣≣ প্রচ্ছদ : আবীর সোম ≣∣≣ প্রকাশনা : অবসর প্রকাশনা সংস্থা ≣∣≣ মুদ্রিত মূল্য : ৪০০ টাকা মাত্র ≣∣≣ পৃষ্ঠা : ২১৫
বিরূপকথা! আমার আশেপাশেএমন কেউ মনে হয় নেই যাকে এই বই পড়তে বলতে বলতে বিরক্ত করে ফেলিনি। ২০২১ সালে পড়া বইগুলোর মাঝে ' বিরূপকথা ' কে বেশ উপরেই রাখবো। বাংলা ভাষায় লেখা এমন এবসার্ড ফ্যান্টাসি জাতীয় জনরার বই আগে কখনও পড়িনি। এতো চমৎকার ওয়ার্লডবিল্ডিং, আর এতো অদ্ভুতভাবে অর্থহীন ও অর্থপূর্ণ একটি বই! কল্পনাশক্তিকে প্রতি পাতায় পাতায় চ্যালেঞ্জ করে যাচ্ছিলো! লেখকের লেখনীর প্রতি মুগ্ধতা এখনও কাটাতে পারিনি।
কল্পনা করা মানুষের সহজাত স্বভাব কারণ কল্পনায় মানুষ থাকে সবচেয়ে স্বেচ্ছাচারী, সর্বোচ্চ স্বাধীন। এই বইয়ের পরতে পরতে এটাই মনে হয়েছে যে এ বইটা লেখকের যেমন খুশি তেমন কল্পনার খাতা। কল্পনাজগতে কী পরিমাণ জোর দখল থাকলে এরকম উদ্ভট কারুকাজে গল্প নির্মাণ করে ফেলা যায়, আমার জানা নেই। শুরু থেকে শেষতক গল্প অর্থহীনভাবে মোড় নিয়েছে, তবু মনোযোগ ছাড়তে চায় নি। ঠাসা ঠাসা অদ্ভুত সব মেটাফোরে মন-মগজও নেড়েচেড়ে বসেছিল। এমন আজব ভাবেও ভাবা যায় নাকি আবার। সেটা ভাবতে গিয়েও কতবার যে খাবি খেয়েছি!
তবে কল্পনাতেই ক্ষান্ত দেন নি লেখক, এর সাথে মিশিয়েছেন জীবন ও বাস্তবতাকে। তুলে ধরেছেন কিছু সত্য উপলব্ধি। সেই উপলব্ধিগুলো খুবই পরিচিত, জীবন ও যাপনের সাথে ভীষণভাবে সম্পৃক্ত তবু কখনও যেন এদের নিয়ে আলাদা করে ভাবার সুযোগ হয় নি।
দৈনন্দিন ব্যস্ততায় অনেক সময়ই মন অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে। দৃষ্টির সম্মুখে প্রতিনিয়ত ভাঙা-গড়া হতে দেখে টেরই পাই না কখন যেন কল্পনা জগতে তালা লেগে গেছে। সেই বিরূপ মুহূর্তে এই বইয়ে দাগানো অংশগুলো মুক্তি দিবে চিন্তা জগতে পথ মাড়ানোর। ঝালাই করে নেওয়া যাবে কল্পনাশক্তির। সে জন্যে হলেও এই সাংঘাতিক কিম্ভূতকিমাকার বইটা শেল্ফের হাতের নাগালে থেকে যাবে।
মেঘমল্লার। সবুজহাতি গ্রামের দেবতা। গ্রামের দেবতার মাঝে সৃষ্টি হয়েছে উচ্চাকাঙ্ক্ষার। মল্লার শহরের দেবতা হতে চায়। সেই এম্বিশন সাথে নিয়ে শহরের দিকে যাত্রা করে প্রচন্ড ক্ষমতাশালি এই দেবতা।
শহরে পৌছে মল্লারের মাঝে নতুন উপলব্ধির সৃষ্টি হয়। সেখানে তার মত দেবতার প্রয়োজন নেই। নগরবাসী কোন উদ্ধারকর্তায় বিশ্বাসী নন মনে হয়। তাছাড়া গ্রামের মানুষের চাহিদার সাথে কি আর শহরের মানুষেরটা মিলবে?
মল্লার সিদ্ধান্ত নেয় যে তাকে মানুষের ভীড়ে মিশে যেতে হবে। সেজন্য দেবতার অনেক ক্ষমতা বিসর্জন দিতে হবে মল্লারকে। শহরের অধিবাসিদের বুঝতে হবে তো তাকে! নগরে বাস করার অনভিজ্ঞতার ফলে পদে পদে বিভিন্ন বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখিন হতে থাকেন গ্রামের প্রাক্তন দেবতা।
রূপকথা মূলত বড়দেরই বিষয়। ছোটদের কল্পনাশক্তি দারুন হলেও তাদের নিমিত্তে সৃজন করা রূপকথার গল্পগুলো বড়দেরই তৈরি। যে রূপকথা বাস্তবের সাথে আপস না করেও নির্মম বাস্তবতাকে পরোক্ষভাবে জানতে, বুঝতে শিখায়।
তানজীম রহমান বলেছেন বিরূপকথা। যে কথা হয়তো অনেক সময় সরাসরি বলা যায় না তা জাদুবাস্তবতার বয়ানে লিখিত হয়। জাদুবাস্তবতার ন্যারেটিভে যারা অভ্যস্ত নন তাদের কাছে এই বইয়ের কন্টেন্ট নিছক ফ্যান্টাসি, এমনকি আবোলতাবোল কথাবার্তা মনে হতে পারে।
তবে বিরূপকথা মূলত জাদুবাস্তবতার থেকে উইয়ার্ড ফিকশন বেশি মনে হয়েছে আমার। তানজীম রহমানের 'আর্কন' এর বড় ফ্যান আমি। জ্যামিতিক কল্পনাশক্তির প্রয়োগ দেখা যায় বেশ কিছুটা তার লেখনীর মধ্য দিয়ে এক ধরণের উইয়ার্ড যাত্রার মধ্যমে।
এই ধরণের বই মূলত দ্রুতগতিময়তার গল্প শুনাবে না আপনাকে। বইটি আসলে স্লো বার্ণ। ধীরে-সুস্থে পড়া লাগবে। গ্রন্থে কোন অধ্যায় নেই। একইসাথে নেই ফাস্ট রিড রাইটিং, টুইস্ট, ক্লিফহ্যাঙ্গারের উপস্থিতি। উপন্যাসটি নয় কোন "হিরো'জ জার্নি"।
তানজীম রহমানের লেখনী আমার ব্রিলিয়ান্ট লাগে। কিছু গল্পসংকলনে তার গল্প, 'আর্কন' পড়ে। তিনি খুব সম্ভবত নিজেকে বারবার ভেঙে গড়তে চান একজন লেখক হিসেবে। এই ধরণের এক্সপেরিমেন্টাল লেখা আমার মতে বাংলা সাহিত্যে দরকার আছে।
কল্পনাপ্রতিভাহীন, ম্যাড়ম্যাড়ে গদ্য বা প্রমিতের পর প্রমিত বসিয়ে কঠিন বাক্যসম্ভার যা অনেক শব্দের হলেও বলে খুব কম, এই ধরণের উপাখ্যানের চেয়ে এই ধরণের লেখা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব রাইটিং এ জিওম্যাট্রিক কল্পনাশক্তির কিছুটা দেখা পাওয়া যায়।
বিরূপকথার পিছিয়ে থাকাটা অংশগুলো হল, উপন্যাসটি দরকারের চেয়ে বেশি লম্বা করাটা। আমার মতে একটি নভেলে অনেক অদরকারি কথা থাকবে। সেই দরকার ছাড়া কথাগুলো একসময় এসে মিলে গিয়ে একটি সম্পূর্ণ ছবি দেখাবে অথবা হয়তো না-ও দেখাতে পারে।
বিরূপকথায় মল্লারের দেবতা হওয়ার এম্বিশন থেকে আপাত মানুষের লেভেলে চলে আসাটায়ও আমার কাছে খারাপ লাগেনি। আমার মতে এই উপন্যাসটি বিভিন্ন দিকে ঘুরে বেড়িয়েছে বেশি, পাঞ্চলাইন দিয়েছে অপেক্ষাকৃত কম। মল্লারের মনোলোগ আমার কিছু ক্ষেত্রে বেশ ভালো লেগেছে। মানুষের জীবনের বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং স্ববিরোধীতা লেখক মল্লারের চিন্তায় সুন্দরভাবে নিয়ে এসেছেন। এই ধরুন পৃষ্ঠা নাম্বার ৭৮ এ...
"বললো একেকজন মানুষ আসলে একেক ধরণের শূণ্যতা। কেন তারা এই মহাবিশ্বে এলো জানে না, পরমুহূর্তে কী হচ্ছে জানে না, আগে যা হয়েছিলো এক পা বাড়ালেই মুছে যাচ্ছে, এবং তাদের জীবন কেটে যাচ্ছে শূণ্যতাকে কিছু দিয়ে পূর্ণ করার কাজে। এই 'কিছু'টা যে কি সে ব্যাপারে তারা একটু অনিশ্চিত, তবে মল্লারের ধারণা 'কিছু'কেই অনেকে 'আমি' বলে।
এরকম গুরুত্বপূর্ণ সারকথা আছে কথাবার্তা এই বইয়ের মূল শক্তি বলে মনে করি। তবে উপাখ্যানটি একটি, দুটি জায়গায় অনেক বেশি কালক্ষেপন করে ফেলেছে বলে আমার মনে হয়েছে। তাই উক্ত নভেলকে ম্যাজিক রিয়্যালিজমের চেয়ে উইয়ার্ড ফিকশন বলে আমার কাছে বেশি মনে হয়েছে।
আরেকটি বিষয়ে অবশ্য তানজীম রহমানকে ক্রেডিট দিতে হয় এবং সেটি হল, উইয়ার্ড ফিকশন বা জাদুবাস্তবতা যা-ই বলুন না কেন, তিনি তা পাঠকদের বুঝার সহ্যের সীমানার বাইরে নিতে চান নি। বইটি সুখপাঠ্য। প্রতীকী ব্যাপার-স্যাপার গুলো ধরতে পাঠকের বেশি পরিশ্রম করতে হবে না।
বিরূপকথায় মানবমনের বেশ কিছু ফিলসফিক্যাল প্রশ্নের অবতারনা দেখানো হয়েছে। শেষের দিকে একদম অপ্রত্যাশিত টুইস্টটি অতটা বিস্মিত করার কথা না, টুইস্টটি আশ্চর্য করেছে লেখকের পুরো বইয়ে পাঠকের মনকে ভুলিয়ে রাখার মত গল্পকথনের কারণে।
বই রিভিউ
বই : বিরূপকথা লেখক : তানজীম রহমান প্রথম প্রকাশ : মার্চ ২০২১ দ্বিতীয় মুদ্রণ : এপ্রিল ২০২২ প্রকাশনা : অবসর প্রকাশনা সংস্থা প্রচ্ছদ : আবীর সোম জঁরা : জাদুবাস্তবতা / উইয়ার্ড ফিকশন রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
এই গল্পের মেঘরাজা হচ্ছে মল্লার। সবুজহাতি গ্রামের দেবতার বেশে গ্রামের মানুষকে সে যথাসময়ে রোদ-বৃষ্টি, আলো-বাতাস দিয়ে পরিপূর্ণ করে রাখে। হঠাৎ, মল্লার স্বপ্ন দেখে সে শহরের দেবতা হবে। গ্রামের দেবতা বলে নেহাৎ কম সম্মান পায় তা কিন্তু না। তবে ওই যে, মানুষের মত দেবতাদের ও বোধহয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা হয়!
গল্পের শুরুটা দুর্দান্ত। শেষটাও আশানুরূপ এবং বিস্ময়কর! কিন্তু মাঝের অংশটুকু পড়ে মজা পাচ্ছিলাম না, কেমন যেন জোর করে আগাচ্ছিলাম এমন লাগলো! মনোযোগ হারিয়ে ফেলছিলাম বার বার। তবে মাঝেমধ্যে কেন জানি মনে হচ্ছিলো আমি খুব নামডাক ওয়ালা কোনো ইংরেজি ফ্যান্টাসি বইয়ের অনুবাদ পড়ছি। এজন্য না যে বাক্যগঠন বা বর্ণনাশৈলী খুব ছিমছাম বা সাবলীল বরং এজন্য যে, এমন ধাচের বাংলা বই আমি আগে পড়িনি কিংবা এমন ধরনের বাংলা বই আর একটাও আছে কিনা তাতে সন্দেহ! আর লেখকের মাথায় এমন অদ্ভুৎ চমকপ্রদ চরিত্র কিভাবে আসলো তা ভেবেই কূল পাচ্ছি না।
তো বিরূপকথা নিয়ে বিরূপ সমালোচনাও দেখেছি। ভালো কথাও শুনেছি অনেক। আর বিরূপকথা সবার কাছে ভালোলাগবেও না। তবে যাদের এমন ধাঁচের বই পড়তে ভালোলাগে তাদের কাছে "বিরূপকথা" অসাধারণ লাগবে! বাকিদের কাছে একঘেয়েমি লাগতে পারে! চাইবো, সামনে লেখক যাতে আরো দারুণ দারুণ গল��পের আবির্ভাব ঘটান। তবে একটা জিনিস কি—এ গল্পের মাধ্যমে লেখকের যে ইউনিক এক্সিকিউশন তা দিয়ে বাংলায় বিশ্বমানের এনিমেটেড ফিল্ম তৈরি করা সম্ভব!
বই হাতে নিয়েই প্রথম যেই জিনিসটা চোখে পড়ে, তা হলো এর নাম। বিরুপকথা। রুপের বিরুপে বিরুপকথা।
বই পড়ে বেশ কিছু অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। শুরুতে পড়া শুরু করে কিছুটা বিরক্ত লেগেছে। কারণ বর্ণনার ধরনটা একেবারেই আলাদা। কিছুটা পড়তেই ঝিমুনি লেগে আসে। বেশ কিছু জায়গায় কয়েকবার করে পড়তে হয়েছে, কী বলা হয়েছে তা বুঝতে। তবে ঘটনাপ্রবাহ আমার মতো কম ধৈর্যের পাঠককেও ধরে রাখতে পেরেছে। ধীরে ধীরে বোঝা যাচ্ছিলো যে এই গল্পের গভীরতা অনেকটাই বেশি। একদম শেষ পাতায় গিয়ে মূল চরিত্রের শেষ অভিব্যক্তিতেও একটা গভীরতা আর টান রয়ে গেছে। পাঠকের মনে অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে লেখক তার গল্পের ইতি টেনেছেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লেখক সাবলীল ভাবে তার গল্প সাজিয়ে গেছেন। শব্দচয়ন ভালো ছিলো। বর্ণনাভঙ্গি ব্যক্তিগত ভাবে অপছন্দের হলেও বর্ণনাকৌশল আর গল্প সাজানোর সামঞ্জস্যতার জন্য প্রশংসা না করে উপায় নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে এই বই কাওকে পড়তে রিকমেন্ড করবো কি না। সেভাবে ভাবতে গেলে অবশ্যই করবো। কিন্তু সাথে একটা সতর্কতা বার্তাও থাকবে। 'পড়া শুরুর আগে ২ পাতা পড়ে সেভাবে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে পড়া শুরু করবেন। এতে পড়ে শান্তি পাবেন।'
ফ্যান্টাসি আমার পছন্দের জনরা না; তবুও এই বইটা ভালো লাগলো। আরো স্পেসিফিক ভাবে বলতে গেলে পুরো বইটা না মূলত, কনসেপ্ট আর তানজীম রহমানের লেখনী ভালো লেগেছে আর শেষের রিভেলেশন টাও ভালো ছিল। আর বইয়ের প্রচ্ছদটা এত্ত সুন্দর! এই বছরে পড়া বই গুলোর মধ্যে এ পর্যন্ত এটার প্রচ্ছদ সবচেয়ে ভালো লেগেছে।
বইয়ের কাহিনী মেঘমল্লার নামক এক গ্রামের দেবতাকে নিয়ে যে শহরের দেবতা হবার জন্য গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে, তারপর দেখতে থাকে শহরের মানুষজনের জীবন, মিশতে থাকে তাদের সাথে। কী হবে শেষ পর্যন্ত সে কী পারবে শহরের মানুষদের দেবতা হয়ে যেতে? নাকি ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হবে? তবে বইয়ের মূল উদ্দ্যেশ্য এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা না, মুখ্য বিষয় হচ্ছে মেঘমল্লার এর জার্নি, মানুষের মধ্যে থেকে শহরকে জানার, মানুষকে বোঝার সর্বোপরি নিজেকে খোঁজার জার্নি।
তানজিম রহমানের অন্যে লেখার রেফারেন্স ও সমকালীন নানা বিষয়ের ইস্টার এগ গুলো ধরতে পেরে বেশ মজা পেয়েছি। নিজের খুব বেশি পছন্দ না হলেও আমি জনরা হিসেবে ফ্যান্টাসি কে অনেক শক্তিশালী ভাবি । বাংলাদেশে এই জনরায় খুব বেশী কাজ মনে হয় হয়নি। বিরুপকথার মত এক্সপেরিমেন্টাল বই আরো পড়তে পারলে ভালো লাগবে।
বড়দের রূপকথা বলতে কিছু আছে? যদি থাকেও সেখানে বিরূপকথা'র অবস্থানটা কোথায়?
সত্যি বলতে বইটা পড়ে আমি হতাশ! কিছু রিভিউ পড়ার কারণে বেশ আগ্রহ জেগেছিল বই নিয়ে। তবে সে আশায় গুড়ে বালি। কেমন যেন লাগলো বইটা।
গল্পটা মেঘমল্লার নামক এক গ্রাম্য দেবতার। যার স্বপ্ন সে কোন শহরের দেবতা হবে। তাই গ্রাম ছেড়ে দূরে চলে আসে সে। তবে নতুন শহরে দেবতা হতে গিয়ে সে আবিষ্কার করে কাজটা অতটা সহজ নয়। শহরের মানুষকে বুঝতে সে নিজেও মানুষের খোলসে রূপ নেয়। তারপরই শুরু হয় ভাঙাগড়া নানান ঘটনা।
প্রথমদিকে গল্প ভীষণ উপভোগ করছিলাম। লেখক তার সমস্ত কল্পনাদের লাগাম ছেড়ে দিয়েছিলেন যেন। ইউনিক কিছু চরিত্রের সাথে পরিচয় হতে থাকে। যা ভীষণ আগ্রহ জাগায়। তবে মাঝ বরাবর এসে সেসব চরিত্র কেমন পানসে লাগছিল। শতচেষ্টাতেও টানা যাচ্ছিল না গল্প। হয়তো এই সময় ভেকেশনে আছি বলে পুরোটা পড়ার ধৈর্য আমার হলো। নাহলে হয়তো এই বই ফেলেই রাখতে হতো।
মুল চরিত্র মেঘমল্লার বেশ কনফিউজিং একটা চরিত্র। প্রথমদিকে তার উদ্দেশ্য বোঝা গেলেও শেষদিকে সব কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল। তার উদ্দেশ্য কি? সে কি করতে চাচ্ছে কিছুই ঠাহর করতে পারলাম না। পুরো জার্নিটা কেমন অথহীন মনে হলো। হ্যাঁ, মেঘমল্লার নিজেকে অন্যভাবে চিনতে হয়তো পেরেছে তবে সেটুকু যথেষ্ট মনে হয়নি আমার কাছে।
শুরুটা ঠিক রূপকথার মত হলেও শেষে এসে গল্পটা আমাদেরই আশপাশে ঘটে যাওয়া কোন সাধারণ কাহিনিতে পরিণত হলো যেন। যার সাথে সামান্য জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া লাগানো।
তানজিম রহমানের লেখনশৈলী চমৎকার। গদ্যের আকারে চমৎকার গল্প বলে গেছেন বইটায়। বইয়ের কিছু কিছু লাইন রীতিমতো মনে দাগ কেটে যেতে বাধ্য। তবে সেটুকু যথেষ্ট ছিল না বইটাকে উপভোগ্য করতে। লেখক যদি তার গল্পের মাঝে নিগূঢ় কিছু বোঝাতে চেয়ে থাকেন তবে সেটা ধরতে সম্পুর্ন ব্যর্থ আমি বলতে হবে। বেশ কিছু প্রশ্ন প্রশ্নই থেকে গেছে। উত্তর পাইনি। শেষে যে ছোট্ট একটা টুইস্ট সেটা বেশ লেগেছে অবশ্য। তবে সেখানেও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।
শেষে বলতে হবে, রূপকথা নয়। কেমন আজগুবি এক গল্প মনে হলো পুরো বইটা।
রূপকথার খুব বড়ো ভক্ত নই আমি। যে বয়সটা রূপকথা পড়ার, সে বয়সে তেমন রূপকথা পড়া হয়নি বলেই হয়ত, আমার কল্পনাশক্তি খুব একটা উর্বর নয়। রূপকথা পড়তে এক বিশেষ প্রকারের মন প্রয়োজন- আমার বিশ্বাস।
বন্ধু জোয়ার উপহার এই বইটি পড়া হয়েছে ঈদের ছুটিতে। বিশেষ ব্যস্ততায় থাকায় বইটা নিয়ে তখন লিখতে পারিনি।
বিরূপকথা আসলে বড়োদের রূপকথা, যেমনটা লেখক নিজেই বলে দিয়েছেন ফ্ল্যাপে। তবে বড়ো বয়সে রূপকথা পড়তে গেলে কিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। একটু আগেই বলেছি, রূপকথা পড়তে এক বিশেষ প্রকারের মন প্রয়োজন হয়। রূপকথা মানেই তো অবাস্তব গল্প, সেখানে অর্থ খুঁজতে যাওয়া বোকামি। বলছি না যে রূপকথায় অর্থ থাকে না, খুব থাকে! ছোটোবেলায় যে অল্প স্বল্প রূপকথা পড়েছি, সেগুলোর কিছু না কিছু অর্থ তো খুঁজে পেয়েছি বড়ো হয়ে। কিন্তু যখন পড়েছি, এবং পড়ে আনন্দ পেয়েছি, তখন অর্থ খোঁজার চিন্তা মাথায় ছিল না।
অর��থের খোঁজ না করলেই সম্ভবত বিশুদ্ধ আনন্দের দেখা মেলে।
কিন্তু বড়ো হতে হতে তো আমাদের মন মগজ দূষিত হয় ক্রিটিক্যাল থিংকিং দিয়ে। তখন আর বিশুদ্ধ আনন্দ নিয়ে রূপকথা পড়া যায় না। হয় মন লজিক্যাল ফ্যালাসি খুঁজে বেড়ায়, নয়ত গুঢ় অর্থ। এসব সার্চিং চলেছে ব্রেইনের ব্যাকগ্রাউন্ডে- যতক্ষণ পড়েছি বইখানা। এবং প্রতি পাতায় মুগ্ধ হয়েছি। হাজার খুঁজেও একটা বিগ হিডেন মেসেজ খুঁজে বের করতে পারিনি বইটি থেকে। এক অংশ এক অর্থ, অন্য অংশ আরেক অর্থ নিয়ে ধরা পড়েছে রাডারে।
পুরোটা সময় জুড়ে এই যে রিলেট করার চেষ্টা এবং উপর্যুপরি ব্যর্থতা, এই লুকোচুরি ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে লেখার ধরণ, চরিত্রগুলোর নামকরণ এবং ভাষার ব্যবহার। এরকম জনরার লেখা বাংলায় আমি আর পড়িনি। রূপকথা পড়ায় নিজের অস্বস্তির জন্যই এক তারা কেটে রাখা- সে মোটেও লেখকের দোষ নয়!
কেন যেন অন্যান্য বইয়ের মতো ঝটপট পরে শেষ করা গেলো না বইটা। বিরাম নিয়ে নিয়ে পড়া লাগলো। নিঃসন্দেহে ইউনিক একটা এক্সপেরিয়েন্স ছিলো। এরমভাবে গল্প লিখতে ভালো রকমের ক্যালিবার লাগে। কিছু কিছু যায়গায় খুবই স্লো মনে হচ্ছিলো, কিন্তু তেমন মাত্রাতিরিক্ত কিছু না। তানজীম রহমানের অন্যান্য জনপ্রিয় বইয়ের থেকে আলাদা স্বাদ, কিন্তু লেখক যে এফর্ট দিয়েছেন এটার পিছনে সেটা বোঝা গেছে। ফিলসফিক্যাল কথাবার্তা(?) একেবারে চা চামচ পরিমানে একেক জায়গায় এমনভাবে দেওয়া যে একটু মুচকি হেসে উঠবেন কথাগুলোর সাথে রিলেট করে। আর অপ্রত্যাশিতরকম সুন্দরভাবে হুট করে কাহিনী শেষ করা হলো, সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট।
এত সুন্দর! এত সুন্দর বইটা হুট করে শেষ হয়ে গেল! শেষ কবে কোন বই এমন তন্ময় হয়ে পড়েছি মনে নেই। গল্পের চরিত্রায়ন, দিক পরিবর্তন সবকিছুই হয়েছে পারফেক্টলি। নাহ, পারফেক্ট বলতে চাইনা, বলতে চাই গল্পটা একদম "মনের মতো"! বাস্তবতার মিশেলে কিঞ্চিৎ রুপকথা, যেন নিয়মিত বাস্তবতাটাকেই আরও বেশি চিত্রায়িত করেছে। " এই শহরে সব মানুষই শুরুতে দেবতা হয়ে আসে।"- এই বাক্যটাই যেন পুরো গল্পের অর্থ বয়ে নিয়ে চলেছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। বইটি সব পাঠকের লিস্টে থাকুক। তানজীম রহমানের জন্য শুভকামনা!