পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন একটি দেশের মধ্যে আরেকটি দেশ। সেখানে নিসর্গ আর মানুষ সমতলবাসীর চেয়ে আলাদা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে সেখানে জন্ম নিয়েছে জুম্ম জাতীয়তাবাদ। ফলে তৈরি হয়েছে বিরোধ। একসময় তা গেছে সশস্ত্র ধারায়। একপর্যায়ে তারা হাতে তুলে নিয়েছে অস্ত্র। রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। দুই পক্ষেই রক্ত ঝরেছে অনেক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক অনুসন্ধানী সাংবাদিকের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও জেনারেল আবুল মনজুরের বিয়োগান্ত উপাখ্যান। আছে জুমপাহাড়ের রাজনীতির ভাঙাগড়ার কাহিনি। শেষমেশ দুই পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে। কিন্তু শান্তি কি ফিরে এসেছে? গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ এ বইয়ে তুলে ধরেছেন তার পূর্বাপর।
জন্ম ১৯৫২, ঢাকায়। পড়াশোনা গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ১৯৭০ সালের ডাকসু নির্বাচনে মুহসীন হল ছাত্র সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বিএলএফের সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দৈনিক গণকণ্ঠ-এ কাজ করেছেন প্রতিবেদক ও সহকারী সম্পাদক হিসেবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সুংকোংহে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মাস্টার্স ইন এনজিও স্টাডিজ’ কোর্সের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক। তাঁর লেখা ও সম্পাদনায় দেশ ও বিদেশ থেকে বেরিয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা অনেক বই।
পার্বত্য চট্টগ্রাম রীতিমত একটা রহস্যময় জায়গা। এখন তো এই কয়দিন পরপর মানুষজন সাজেক যায়। ছবি তোলে। আজকে গেলাম, দুইদিন পর চলে আসলাম। কিন্তু সেটাও নির্দিষ্ট একটা রাস্তা, একটা ম্যাপ ধরে। শুনছি আলীকদমের ঐদিকে গেলে নাকি স্থানীয় বা পথ চেনা মানুষ ছাড়া অন্যরা হারাইয়া যাবে। কোনো না কোনোভাবে এই কারণে চট্টগ্রাম নিয়েও নানা কথা তৈরি হইছে। যেমন এই বইয়ের লেখকই বলেছেন তিনি একটা সময় শুনেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘জংলী’ থাকে। এখন আমরা অনেক ‘অচেতন’ হলেও বছর কুড়ি আগেও চট্টগ্রাম নিয়ে ব্রিটিশদের চোখে দেখা আফ্রিকার মতো কিছু ধারণা ছিল। আর এর মধ্যে ‘শান্তিবাহিনী’র কল্যাণে সেখানে এসেছিল আরেকটা আলোচনা। সেটা রাজনৈতিক।
চট্টগ্রামেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যার ঘটনাটি ঘটে। স্বাভাবিকভাবেই মহিউদ্দিন আহমদের এ বই দেখে মনে হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থার সাথে জিয়াউর রহমানের হত্যার কোনো যোগ আছে। অর্থাৎ, শান্তিবাহিনী, বাহাত্তর থেকে নেওয়া সরকারের নানা সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তীকালে সরকার কর্তৃক সেটেলার বসানো নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে তৈরি হওয়া অসন্তোষ এই হত্যার সঙ্গে জড়িত বা লেখক এ ধরনের কোনো তথ্য উপস্থাপন করবেন। কিন্তু আদতে এখানে সে রকম কিছু উপস্থাপিত হয়নি। উপস্থাপিত হয়েছে ব্রিটিশ আমল থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস—তবে সেটা রাজনৈতিক, শান্তিবাহিনী এবং সরকারের সঙ্গে জড়িত—ইতিহাসের নানা পর্যায় এবং কিছু ক্ষেত্রে তার বিশ্লেষণ।
মহিউদ্দিন আহমদের অন্যান্য বইয়ের তুলনায় এ বইয়ের লেখার ধরণ খানিক ভিন্ন। এমনিতে জটিল ইতিহাসের বই মহিউদ্দিন আহমদ সহজ করে লেখেন, বিশ্লেষণের মধ্যে গল্প বলার ঢঙ থাকে কিন্তু এ বই পড়ে মনে হবে রীতিমত রোমাঞ্চকর কোনো উপন্যাস পড়ছি। বিশেষত রাঙ্গামাটিতে সাংবাদিক সালিম সামাদের অভিযান, শান্তিবাহিনীর ডেরায় যাওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যু থেকে বেঁচে আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে একটা উপন্যাস দাঁড় করানো যায়। ইতিহাসের পাঠক হোন কিংবা সাহিত্যের, এই বইয়ের মধ্যভাগ রুদ্ধশ্বাসে পড়বেন। এর মধ্যে কৌতূহলী পাঠক একাধারে রাজনীতিবিদ, সরকারের নানা সিদ্ধান্ত, সেনাবাহিনীর লোকেদের মনস্তত্ত্ব এবং সাংবাদিকদের কার্যক্রম বের করে নিতে পারবেন। অন্যান্য অনেক বইয়ের মতো এখানে লেখক অনেক কিছুই ‘তথ্য’ আকারে উপস্থাপন না করে বিবরণীর মধ্যে রেখে দিয়েছেন।
তবে কিছু জায়গায় আফসোস থেকে যায়। যেমন কেন যেন মনে হয় সন্তু লারমা পুরোপুরি উঠে এলেন না। জনসংহতি সমিতির কার্যক্রম, কার্যপ্রণালী থেকে ভাঙন পর্যন্ত সবকিছুই এসেছে কিন্তু কেন যেন মনে হয় আরও অনেক কিছু ছিল। হয়ত তা লেখা যায় না কিংবে এখনও ভেঙে আনা যায়নি। তবে বইয়ে যা এসেছে তাও কম না। সালিম সামাদের অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে মুহম্মদ ইবরাহীমের সাক্ষাৎকার আমাদের এমন কিছু সত্য এবং বিস্ময়কর মুহূর্তে নিয়ে যায় যেখানে পাঠক নিজেকে প্রশ্ন করতে বাধ্য হবে। তবে এই বই পড়ার ক্ষেত্রে আগে থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু পড়াশোনা করে নেওয়া ভালো। যদিও লেখক ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করেছেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রাথমিক বই হিসেবেও সহজেই পড়া যায়।
বাংলাদেশে যারা রাজনীতি নিয়ে কিছু জ্ঞান রাখে বা আলোচনা করে তাদের কাছে একটা প্রশ্ন খুব পরিচিত। প্রশ্ন বা তুলনা। বলা হয়ে থাকে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তান যা করেছে, পাহাড়ে বাঙালি সেনাবাহিনী ঠিক তাই করেছে। মহিউদ্দিন আহমদের যে বিষয়টা আমার ভালো লাগে, তিনি দেশের লোকের মুখে থাকা এসব প্রশ্ন তুলে আনেন এবং উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এ বইয়ে তিনি এই প্রশ্নটি তুলে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। সেখানে নানাজনের নানা রকম বক্তব্য এবং বিশ্লেষণ এসেছে। এর সবই বাস্তব এবং সঙ্গত। বইটি পড়তে গিয়ে তাই পাঠককেও বারবার ভাবতে হবে যে ঘটে যাওয়া একেকটি বিষয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, পাহাড়ের মানুষের প্রতি অবহেলায় করা হয়েছে নাকি কিছু জিনিস ঘুরে ফিরে আসে বারবার?
৩.৫/৫ পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে লেখাগুলো সাধারণত খুবই বায়াসড হয়। তাই যতোটা না তথ্য পাওয়া যায় তার চেয়ে বেশি চিন্তায় থাকতে হয় তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। মহিউদ্দিন আহমদের এই বইটা যে পুরোপুরি নিরপেক্ষ জায়গা থেকে লেখা তা নয়। তবু এই বইটার সবচেয়ে ভালো পয়েন্ট সম্ভবত পুরো টাইমলাইনে ঘটে যাওয়া মূল ঘটনাগুলো এবং তার প্রেক্ষাপটের মোটামুটি ধারণা দিতে সক্ষম।
পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাটা স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের ভুগিয়েছে অনেক। এই সমস্যাকে একেক সরকার একেকভাবে দেখেছে। সেভাবে সমাধানের চেষ্টাও করেছে বহুবার কিন্তু সেভাবে সমাধান করা যায়নি। এর দায় ঠিক পুরোপুরি নির্দিষ্ট কারো উপর চাপানো যায়না। তবে সব পক্ষের ব্যর্থতার ফলেই সমস্যাটা জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। বহু ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, প্রাণ ঝরেছে, মানুষকে এখনো অনিশ্চিত জীবন যাপন করতে হচ্ছে।
রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে কাজ করা মহিউদ্দিন আহমদের এটা একটু ভিন্নধর্মী কাজই বলা যায়। মূল কারণ সম্ভবত লেখকের ব্যাক্তিগত আগ্রহ। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারটা রাজনীতির বাইরে নয় মোটেই। অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক বহু হিসেব নিকেশই এর সাথে জড়িত৷ সেসব হিসেব নিকেশের ব্যাসিক ধারণা পাওয়া জন্য এই বইটা ভালো অপশন হতে পারে।
(জিয়া হত্যা এবং মঞ্জুর খুনের ঘটনার সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার যোগসূত্র আমার চোখে খুবই ক্ষীণ লেগেছে। মাঝখানে যখন এই ঘটনাটা ঢুকানো হলো তখন বরং মনে হয়েছে মূল ঘটনার ফ্লো নষ্ট হয়ে গেছে। বইয়ের কাটতি বাড়ানোর জন্য করা হলো কিনা জানিনা!)
বাসা থেকে দুই কদম হাঁটলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের শুরু! যাওয়া হয়নি যদিও। বন্ধুবান্ধবরা ক'দিন পর পরই দলবেঁধে চলে যায় ঘুরতে। সাজেক সীতাকুণ্ড কাপ্তাই! সীতাকুণ্ড গিয়েছিলাম ছোটোবেলায়৷ রাবার ডেম দেখেছিলায়, সাথে ঐ বিখ্যাত পাহাড়টা! রামগড় টিলার উপর একটা মাজার আছে। ঢাকা থেকে কেউ আসলেই তাকে সেখানে নিয়ে যেতে হয়। চট্টগ্রামের ঐ গহীনের ব্যপারে অনেক গুজব শুনি। অবশ্য আমাদের এই সমতলবাসীদের এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই নেই। আমরা সাজেক গিয়ে ছবি তুলে আসতে পারলেই খুশি!
গত বছর মহিউদ্দিন আহমেদের একটা সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কাজ করছেন, একটা বই লিখবেন। তখন থেকেই অপেক্ষা! শেষমেশ পড়ার ভাগ্যি হল।
চট্টগ্রাম কখনো সম্পূর্ণ অথবা আংশিকভাবে আরাকানের অংশ ছিল। নামটাও আরাকানি ভাষারই। কালক্রমে এই চট্টগ্রাম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ হলো। উনিশ শতকের শেষের দিকে এই অঞ্চলে পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পেয়ে আসেন টি এইচ লুইন। লুইন তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে চট্টগ্রাম নিয়ে দুটো বই লিখেছিলেন - আ ফ্লাই অন দ্য হুইল এবং দ্য হিল ট্র্যাক্টস অভ চিটাগং। তৎকালীন সময়কে বোঝার জন্য অনেক ইনফর্মেটিভ বই।
দেশভাগের সময় নেহেরু পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁকে আশ্বস্ত করে লর��ড মাউন্টব্যাটেন চিঠিও লিখেছিলেন কিন্তু র্যাডক্লিফের করা মানচিত্রে দেখা যায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে। এর প্রতিবাদে সেখানে ভারতের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
পঞ্চাশের দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেয় পাকিস্তান সরকার। অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্র। '৬২ সালে চালু হলো এটি। এই কৃত্রিম হৃদের জন্য ডুবে গিয়েছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার একর বসতি ও চাষের জমি। জমি ঘর হারিয়ে নিঃস্ব হয় দশ হাজার পরিবার। এদের ঐ অসহায় অবস্থার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ আছে বইতে।
এরপরে যুদ্ধের পরে স্বাধীন দেশে সংবিধান প্রণয়ন হয়, সংসদ নির্বাচন হয়। এই সংবিধানে স্বীকৃতি চেয়ে সংসদে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বারবার প্রস্তাব উত্থাপন করে ব্যর্থ হন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত হয় জনসংহতি সমিতি এবং তাদেরই দ্বারা পরিচালিত শান্তিবাহিনী। বইয়ের একটা বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে শান্তিবাহিনীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং এর সাথে সম্পর্কিত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ।
মহিউদ্দিন আহমেদের এই বইটা অন্যরকমই বটে তবে সেই চিরচেনা থ্রিলার ফ্লেভারটা বজায় রেখেছেন, যদিও একটু বেশিই! এখানে লেখক শান্তিবাহিনীর পারস্পেক্টিভ এবং ক্ষমতাসীনদের পারস্পেক্টিভ দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। যদিও এসব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই নিজ নিজ যুক্তিতে নিজেকে সঠিক মনে করে। এছাড়া পাহাড়ি এবং সমতলবাসীদের বক্তব্যও তুলে এনেছেন। লেখকের বইয়ের আরেকটা বিশেষ দিক হলো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারের অংশ।
সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তথাপি তাঁকে তুলনামূলক কম ফোকাসে রাখা হয়েছে। তবে আইডিয়া করছি হয়ত লেখক তাঁকে নিয়ে আলাদা বই লেখার পরিকল্পনা আঁটছেন!
বাইরের থেকে দেখতে পার্বত্য চট্টগ্রাম সুন্দর,সরল।কিন্তু এই এলাকার ভূ-রাজনীতি আর ইতিহাস আঁকাবাকা পাহাড়ী রাস্তার থেকেও একটু বেশি জটিল। বিভিন্ন দল-উপদল-সরকার-সেনাবাহিনী-বন্ধুদেশ- সেটলার নিয়ে সহজে সমাধানযোগ্য না এরকম কিছু সমস্যা আছে।বইটাতে সেই বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে ১৯৯৭ এর 'পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি' হওয়া পর্যন্ত একটা ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনার মাধ্যমে সমস্যাগুলোর পিছনের প্রেক্ষাপট তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এজন্যে লেখক বিভিন্ন সময়ের চিঠি,পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ,পার্বত্য অঞ্চলের সাথে সম্পৃক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় বিভিন্ন দলীয় নেতাদের সাক্ষাতকার তুলে ধরেছেন। বাঙালি শাসকদের দ্বারা বিভিন্ন সময়ে গৃহীত পদক্ষেপের পেছনে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন এটাও জানার চেষ্টা করেছেন।এসকল বিষয় একাধিক পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে সমস্যাগুলোর কারণ বুঝতে সাহায্য করবে।এক্ষেত্রে সন্তু লারমা এবং কর্নেল ইবরাহীমের সাক্ষাতকার অংশ দুইটি খুবই ইফেক্টিভ মনে হইছে। তাছাড়া সাংবাদিক সেলিম সামাদের দুঃসাহসিক সাংবাদিকতা,কিডন্যাপড হওয়া,সদ্য স্বাধীন দেশের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ওয়ান ম্যান আর্মি মানবেন্দ্র লারমার স্পিস কিছুটা ফিকশনাল ভাইভ দিছে। জিয়া,মঞ্জুর খুন এই পার্টটা সরাসরি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে সংযুক্ত না।বাদ দিলেও বইয়ের যা পারপাস তা ব্যাহত হতো না।তবে সম্ভবত ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যে লেখক এই ঘটনাগুলো প্রবেশ করিয়েছেন।
History proceeds on its own, and for most of us, we don't find it interesting to peruse through texts to find out what happened to distant people in distant times. That leaves the rest of us who watch history from far away like a web series as mere observers, with a strange feeling of helplessness. To me, however, history is a continuous tale – has various narratives and counter-narratives – and that's the fun of it. Mohiuddin Ahmad's books offer just that opportunity. He takes a fact-based approach to history by including multiple perspectives, use of previous literature and archive files, and presenting it all using his easy-to-follow pleasantly sober writing style. For many of us, including myself, his books are the stepping stone to our entwined past. Ahmad carefully keeps aside his personal opinions and presents a verifiable account of happenings. He is the definitive contemporary writer attempting to craft a tale of Bangladesh that is both trustworthy and widely accepted by readers. This time, Mohiuddin Ahmad takes on the gruesome task to entangle the 'mystery' of the Chittagong Hill Tracts (CHT) region in his latest published title, Parbotto Chattogram: Shantibahini Zia Hotya Monjur Khun. The book begins with the prologue of CHT problems, and covers from the colonial era till the ‘97 Peace Accord. Ahmad introduces readers to the pivotal players in the indigenous peoples’ struggle for self-determination. The first-gen revolutionaries of the ‘70s – leading the movement Manabendra Narayan Larma and Jyotirindra Bodhipriya Larma, popularly known as the Larma Brothers – institutionalized the idea of Jumma Nationalism by forming Jana Samhati Samiti (JSS) and their military wing Shanti Bahini. The book follows these key catalysts and those who came after them throughout the ‘70s till the ‘90s. This creates a more engaging historical tale that keeps the readers hooked. Ahmad attempts to emphasize on both sides of the conflict – the civic movement turned into a war of liberation for the Jumma people and the Government of Bangladesh identifying this as an insurgent uprising and the military finding itself in an open confrontation. His most used source of information is interviews with the people who were at the center of the conflict. Besides, he uses a lot of extractions from books and articles by the leaders of the Jumma movement and the military personnel commanding the counter-insurgency operation. Moreover, he manages to include a lot of official documents from the JSS party that reveal the party’s power and authority in that region. A particular person leaves a large footprint in the middle chapters – Salim Samad, a Dhaka-based journalist, then working for the New Nation magazine who was the first Bengali journalist to visit the CHT. His articles brought the spotlight, which was totally non-existent in the national media scene, on the ongoing conflict. Ahmad incorporated a lot from Samad’s first-hand account which helps to understand the otherwise opaque interpersonal dynamics. Interviewing Samad allowed Ahmad to create a detailed portrayal of the inner workings of Shanti Bahini and the regional military apparatus of that era. Also, as a bonus, the book slightly covers the assassination of President Zia and the murder of Major General Monjur. This is only included to demonstrate the complicated national political landscape and its consequence on the CHT conflict. Here the book’s subtitle can cause a little confusion. One will be disappointed if they brought the book only to read about these events. In the preface, Ahmad writes about his personal experience with the region and its people. A trip from his university days to CHT, later writing about the Bengali transmigration and involvement with international development works – all that led to the making of this book after so many years. The outcome, Parbotto Chattogram: Shantibahini Zia Hotya Monjur Khun, will serve as the authoritative text that will challenge many to think critically of the everlasting conflict going on with the people and the government in CHT. In doing this, the book’s biggest accomplishment would be bringing people together in a meaningful way that may lead to a sustainable solution.
ব্রিটিশ আমল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য ছিল আলাদা নীতিমালা। দেশ স্বাধীন হবার পর এই অঞ্চলের আদিবাসীদের ব্যাপারে কিছুটা উদাসীনতা দেখা দেয়। তাদের সবাইকে বাঙ্গালি পরিচইয়ে পরিচিত হবার জন্য বলা হয়। এই বিষয়টি আদবাসীদের কাছে কখনোই পছন্দ হয় নি কারণ তাদের নিজেদের সংস্কৃতি আছে, ভাষা আছে। প্রতিটি জাতিই তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধারন করতে চায় এইটাই স্বাভাবিক। সেখান থেকেই আদিবাসীদের ভেতরে দানা বাধে নিজেদের স্বকীয়তা ধরে রাখার আন্দোলন। শেখ মুজিবর রহমান এই সমস্যা সমাধান করার আগেই মারা গিয়েছেন। জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন বাঙ্গালি সেটেলার দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে। পাহাড়িরা নিজেদের সমস্যা সমাধান করার জন্য বেছে নেয় সশস্ত্র সংগ্রাম। বিভিন্ন ধাপে ধাপে চলতে থাকে সংঘর্ষ। একসময় শান্তিবাহিনীর ভেতরে সৃষ্টি হয় দুই গ্রুপ। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যিনি জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা তিনি মারা যান বিদ্রোহীদের হাতে। তারপর নেতৃত্ব আসে তার ছোট ভাই সন্ত লারমার হাতে। বাংলাদেশ সরকার একসময় নমনীয় হতে শুরু করে, তারপর হয় শান্তিচুক্তি। শান্তিচুক্তিকে বিরোধিতা করে গড়ে ওঠে ইউপিডিএফ। এখন পাহাড়ে একাধিক দল যারা একে অপরের প্রতি খড়গহস্ত। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় অনেকেরই অবদান, অনেকে এর মূল্য দিয়েছেন জীবন দিয়ে।
ছোটবেলা থেকেই দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে আমার কৌতুহল অনেক। এর কারণ হয়তো পাহাড়ের প্রতি আমার প্রবল আকর্ষণ। এটা আরো বেড়ে যায় যখন ২০১১ সালে প্রথমবার রাঙামাটি যাই। তখন থেকেই এই অঞ্চল সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। এই বইটি দ্বারা সেই কৌতুহল কিছুটা হলেও নিবারণ হয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ, সবসময়ই পার্বত্য চট্টগ্রাম গিয়েছে বিভিন্ন সংকট ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। এই অঞ্চলের ইতিহাস, যাদের উপর ঘটনাগুলি প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলেছে তাদের বক্তব্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সংকট নিয়ে সরাসরি কাজ করা সমতলের মানুষদের বক্তব্যের মাধ্যমে লেখক মোটামুটি পরিষ্কার ভাবে তুলে ধরেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি।
আমাদের ও তার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম এর অজানা সময়ের অনেক অজানা ঘটনাবলী জানার জন্য আমি অগ্রাধিকার দেব এই বইটিকে। বইটির সকল ঘটনার বিবরণ অনেকের ভাষ্য থেকে নেয়া সেজন্য কোনটা সঠিক সেটা বিবেচনা করার দায়িত্ব পাঠকের উপর বর্তায়। এরপরেও আদি থেকে বর্তমান সময়ের পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার কারণগুলোর প্রতিচ্ছবি বইটিতে সহজভাবে ফুটে উঠে, যার ফলে সমস্যাটিকে নানা আঙ্গিকে পর্যবেক্ষণ করতে পাঠকের জন্য বইটি সহায়ক।
"বুধবার, ২৫ শে অক্টোবর, ১৯৭২ স্থানঃ গণপরিষদের অধিবেশন শাহ আবদুল হামিদ (স্পিকার): আপনি কি বাঙ্গালি হতে চান না? শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (স্বতন্ত্র সদস্য): আমরা নিজেদের কোন দিনই বাঙালি মনে করি নাই... আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদের বাংলাদেশি মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙ্গালি বলে নয়।"
পার্বত্য চট্টগ্রাম বলতে আপনার মনে কি আসে?? খুব সম্ভবত আকাশ ছোঁয়া পাহাড় আর তার ওপর সাদা মেঘের লুকোচুরি, পাহাড় গা ধরে নেমে আসা ছোট-বড় ঝিরির কলতান, এঁকেবেঁকে চলা পাহাড়ি রাস্তা। আর একই প্রশ্ন যদি করেন কোন পাহাড়ের মানুষকে? আমার বিশ্বাস উত্তর হবে সংগ্রাম, বঞ্চনা আর বেদনার। কারো কাছে পর্যটন আর কারো কাছে অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই প্যারাডক্সের পূর্বাপর মহিউদ্দিন আহমেদের "পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি*বাহিনী জিয়া হ*ত্যা মনজুর খু*ন"
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিনতাবাদের শুরু কবে তা স্পষ্টত বলা মুশকিল। তবে ১৮৬১ সালে পৃথক জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই ব্রিটিশ ভারতীয় প্রশাসন বিভিন্ন নামে এই জেলাটিকে রেখেছিল নিয়মিত শাসনের বহির্ভূত অঞ্চল করে। এইক্ষেত্রে রক্ষাকবচের ভূমিকায় ১৯০০ সালের হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন এক্ট। আর টায়শিয়ারি যুগের এই অঞ্চলকে বাংলার অন্য অংশ থেকে পৃথক করেছে জন্ম থেকেই। ৪৭ এর দেশভাগের সময় আরো স্পষ্ট হয় এই অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রবণতা। সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের ভূখণ্ড ওড়ে বার্মিজ আর ভারতের পতাকা। পাকিস্তান এই বিদ্রোহী অঞ্চলকে স্বেচ্ছায় নিজের অঙ্গীভূত করে। কাপ্তাই বাঁধ নামক অভিশাপ চাপিয়ে বাস্তুচ্যুত করে নিজ দেশেরই ১০ হাজার পরিবারকে। দেশ স্বাধীন হলে বাঙালি জাত্যভিমানী নেতারা পাহাড়ের সন্তানদের বাঙালি হয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে পাহাড়ে জন্ম নেয় জুম্ম জাতীয়াবাদ। রাষ্ট্রীয় মদদে পাহাড়ে শুরু হয় বাংলায়ন। সংখ্যাগুরু পাহাড়ি নৃগোষ্ঠী হঠাৎ নিজেদের আবিষ্কার করে নিজ বাসভূমে সংখ্যালঘু হওয়ার আতংকে
শান্তিবাহিনী উত্থান পতন অনেকটা ঢেউয়ের মতো। ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি জন্মলাভ করলেও ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এর কার্যক্রম ছিল ঢিলেঢালা। ৭৫ থেকে এই বাহিনী ভারত থেকে অ*স্ত্র সহায়তা পেতে শুরু করে। তবে ভারতের সাহায্য ছিল যা দিয়ে সীমিত পরিসরে গেরিলা যুদ্ধই করা সম্ভব৷ ৭৫ এর সেপ্টেম্বর দলের ফিল্ড কমান্ডার সন্তু লারমার গ্রেফতার হওয়ায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায়। জেনারেল জিয়া পাহাড়ে বাংলায়ন শুরু করলে জনসংহতি সমিতিতে প্রীতিকুমার চাকমার নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী ধারা শক্তিশালী হয়৷ দলের অন্ত:কোন্দলে নি*হ*ত হন মানবেন্দ্র লারমা। অন্ত:দ্বন্দ্বের জেরে ভারত থেকে সাহায্য আসা কমে গেলে বিদ্রোহীরা বসে আলোচনার টেবিলে। ফলাফল "শান্তিচুক্তি। এই সময় র*ক্তস্নাত হয়েছে ৩৪৩ জন সামরিক অফিসার ও ৩৩৬ জন শান্তিবাহিনীর সদস্যের র*ক্তে। র*ক্তস্নাত সেইসময়ই ধরা দিয়েছে মহিউদ্দিন আহমেদের কলমে।
মহিউদ্দিন আহমেদের এই লেখায় জিয়া আছেন, মনজুর আছেন, সেলিম সামাদ আছেন তার অনুসন্ধানী ক্যামেরা তাক করে, সন্তু লারমা আছেন তার জুম্মজাতির ধ্বজা নিয়ে। সাথে আছে লেখকের ট্রেডমার্কড লেখার ধরণ, এই লেখা বোরিং হওয়ার কোন কারণ নেই। বোরিং লাগেও নি। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে জেনারেল মনজুর ও জেনারেল জিয়ার গল্প খুব একটা মিশ খায় নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা কোন গল্পগাঁথা না, নিরেট বাস্তব। যার সমাধান ৫৪ বছরেও হয় নি। একটা বইয়ের ছোট্ট গন্ডিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা পুরোপুরি ফুটিয়ে আনা অসম্ভব। লেখক পুরোপুরি সফলও হন নি৷ তবে যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে জানা শুরু করতে চান তাদের জন্য এ বই অবশ্য-পাঠ্য।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল ইতিহাসের এক অনবদ্য দলিল পার্বত্য চট্টগ্রাম—বাংলাদেশের এক ব্যতিক্রমী ভূখণ্ড, যেখানে প্রকৃতি যেমন অপূর্ব, তেমনি ইতিহাসও রক্তাক্ত। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, বাঙালি সেটলার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বন্দ্বে এই অঞ্চল বারবার হয়েছে অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু। মহিউদ্দিন আহমদের লেখা পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তিবাহিনী, জিয়া হত্যা, মনজুর খুন বইটি এই অঞ্চলের ইতিহাস, রাজনীতি ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করে তুলে এনেছে। বইটি শুধুমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করে না, বরং ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি পর্যন্ত বিস্তৃত সময়সীমায় এই অঞ্চলের ইতিহাস ও রাজনৈতিক পরিবর্তনকে তুলে ধরে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা মোতায়েনের পেছনের কারণ, শান্তিবাহিনীর উত্থান, ভারতীয় সম্পর্ক, জিয়াউর রহমান ও জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড—এসব বিষয় বইটিতে অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
বইয়ের মূল বিষয়বস্তুঃ ১.ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: লেখক ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তন বিশ্লেষণ করেছেন। দেশভাগের সময় পাহাড়িদের দ্বিধা, কাপ্তাই লেক তৈরির ফলে তাদের বাস্তুচ্যুতি, মুক্তিযুদ্ধকালীন পাহাড়িদের ভূমিকা—এসব বিষয় বইটিতে গুরুত্ব পেয়েছে। • শান্তিবাহিনী ও সংঘাত: পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই কীভাবে সহিংস আকার ধারণ করল, সেটেলার বসানোকে কেন্দ্র করে কীভাবে সংঘর্ষ তীব্র হলো, এবং শান্তিবাহিনী কীভাবে গঠিত হয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করল—এসব বিষয় বইটিতে গভীরভাবে উঠে এসেছে। • সাংবাদিক অভিজ্ঞতা ও থ্রিলারধর্মী বর্ণনা: সাংবাদিক সালিম সামাদের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা, সেনাবাহিনী ও শান্তিবাহিনীর দ্বন্দ্বের বিবরণ বইটিকে শুধুমাত্র তথ্যনির্ভর গ্রন্থে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং এক ধরনের রুদ্ধশ্বাস থ্রিলারের আবহ সৃষ্টি করেছে। • জিয়া ও মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড: পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত বিবরণও বইটিতে স্থান পেয়েছে। যদিও এটি বইটির প্রধান আলোচ্য বিষয় নয়, তবে এই অধ্যায় বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বইটির বিশেষত্বঃ মহিউদ্দিন আহমদ বইটিকে শুধু তথ্যের সংকলন হিসেবে লেখেননি,বরং ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণ করেছেন রাজনৈতিক, সামরিক ও সাংবাদিকদের দৃষ্টিকোণ থেকে। লেখক কেবল একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি না নিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাতে জড়িত সব পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরেছেন, যা বইটিকে আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
বইয়ের কিছু ঘাটতিঃ ১. সন্তু লারমার চরিত্রের গভীর বিশ্লেষণ অনুপস্থিত: পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেও, সন্তু লারমার ভূমিকা বইটিতে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।
এই বইটি পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল ইতিহাস বোঝার জন্য প্রাথমিক একটি বই। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে আগ্রহী পাঠকের কাছে বইটি উপভোগ্য হবে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে আরও গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন ছিল, তবুও সামগ্রিকভাবে এটি একটি তথ্যবহুল ও আকর্ষণীয় বই।
মহিউদ্দিন আহমদের ❝পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিবাহিনী জিয়া হত্যা মনজুর খুন❞ বইটি পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল ইতিহাস ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বিশদভাবে তুলে ধরেছে। বইটিতে কাপ্তাই বাঁধের নির্মাণ, মুক্তিযুদ্ধে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভূমিকা, ৭১-এর পর তাদের সংগ্রাম, শেখ মুজিব, জিয়াউর রহমান, জেনারেল মনজুরের সম্পৃক্ততা এবং ৯৭-এর শান্তি চুক্তি পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। লেখক ঐতিহাসিক ঘটনা ও ব্যক্তিত্বদের জীবনকে এত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন যে পাঠক তাদের সাথে নিজেকে যুক্ত করে ফেলতে পারবে। এম.এন. লারমা, রাজা ত্রিদিব, সালিম সামাদ, প্রীতি চাকমা, সন্তু লারমা, মেজর বদরুল, মেজর জে. মনজুর, কর্ণেল ইব্রাহিম সহ আরো অনেক—এই সকল ব্যক্তিত্বের জীবন ও সংগ্রামের গল্প পাঠককে মুগ্ধ করবে। লেখক তাদের ব্যক্তিত্ব, মতাদর্শ এবং এই সংগ্রামে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। বইটি শুধুমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কেও তুলে ধরে। এখানে বাঙালি ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যকার সম্পর্ক, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা, সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ড এবং ভারতীয় হস্তক্ষেপের প্রভাব—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য সালিম সামাদের সাহসী সাংবাদিকতা, যা কাউখালি গণহত্যার ভয়াবহ চিত্র এবং পরবর্তীতে শান্তিবাহিনী, সেনাবাহিনী ও পাহাড়িদের জীবন ও সংগ্রামের অজানা দিকগুলি উন্মোচন করে এক অনন্য অবদান রেখেছে। তাঁর অনুসন্ধানগুলি বিশেষ করে পাহাড়িদের দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাগুলিকে তুলে ধরে একটি গভীর প্রভাব ফেলেছে। পরবর্তীতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে তাদের বিশ্বাস অর্জনের মাধ্যমে কর্নেল ইব্রাহিম শান্তি আলোচনায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। তিনি সনাতনী রীতিনীতি ভুলে তাদের সাথে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জন করেছিলেন। মহিউদ্দিন আহমদের বইটি পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস ও রাজনীতির একটি গভীর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছে। বইটিতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার, সরকারের ভূমিকা এবং এই অঞ্চলে সংঘাতের কারণগুলি খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে। বইটিতে উত্থাপিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, "পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তান যা করেছে, পাহাড়ে বাঙালি সেনাবাহিনী ঠিক তাই করেছে" এই দাবিটি কতটা সত্য? লেখক এই প্রশ্নের জটিলতা এবং বিভিন্ন দিকগুলিকে তুলে ধরেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের ভূমিকা, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো বইটিতে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। সার্বিকভাবে, এই বইটি পাঠকদের পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কে একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে এবং ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আগ্রহী তারা অন্তত একবার হলেও এই বইটি পড়ে দেখতে পারে। এখান থেকে অনেক আজানা বিষয় জানা যাবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু ঘুরতে যাওয়ার জন্য বা সাজেক, কাপ্তাই এ সীমাবদ্ধ না এর রয়েছে বিস্তর ইতিহাস।
স্বাধীনতার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি সমস্যা, একটি আর্তনাদ, এক হাহাকারে পরিণত হয়। কই যেন পড়েছিলাম বর্তমানে প্রতিটি রাষ্ট্রের না চাইতেও একটি করে ফিলিস্তিন সিচুয়েশন আছে। আমাদের ক্ষেত্রে সেটা হয়ত পার্বত্য চট্টগ্রাম।
জাতিগত অস্তিত্ত্ব বিলীনের ভয়ে জেগে ওঠা বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ক্ষুত্র একাধিক জাতিসত্ত্বার নিজেদের অস্তিত্ব হারাবার ভয়কে তুচ্ছজ্ঞান করাটা আসলেই হতাশাজনক। তাদের হতাশা আর কামনা তাদের যে রেবেলিয়াস দিকে নিয়ে গেছে তার পরিণতি তাদের জাতিগত অস্তিত্ত্বকেই বিপদে ফেলে দিয়েছে। জাতিগত হিসাবে পাহাড়ে এখন বাঙালিরাই ম্যাজোরিটি।
বাঙালি এবং বাংলাদেশ সরকার ব্যাপারটা হয়ত আরও ভালভাবে হ্যান্ডেল করতে পারত।
এখন আসা যাক বইয়ের কথায়।
একদম যতটুক দরকার ততটুক ইতিহাস টেনেই বইটি শুরু হয়েছে। পাহাড় ব্যাপারে জানে না, জানতে ইচ্ছুক এমন ব্যক্তিকে হাতেখড়ি থেকে শুরু করে এই বই ইন্টারমিডিয়ারি লেভেলে নিয়ে যাবে।
ইতিহাস, রাজনীতি, ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জাতীয়তাবাদী দ্বন্দ এবং এসপিওনাজ কি নেই এতে।
বইটা সমৃদ্ধ এতে কোন সন্দেহ নেই।
তবে সমৃদ্ধ দেখেই কিছু মিসিং এলিমেন্ট একদম চোখে পড়ার মত লেগেছে,
১. ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনের কথা একাধিকবার বলা হলেও সেটা নিয়ে ডিটেইল আলোচনা নেই, যেটা থাকা উচিত ছিল। নাই বিধায় ধরে নিতে হবে; বই পড়ার পূর্বশর্ত হল রেগুলেশনের ব্যাপারে জানা থাকতে হবে নাইলে ঐটা পড়ে তারপর বইটায় হাত দিতে হবে।
২. আদিবাসী কারা, পাহাড়িতরা আদতেই আদিবাসী না কিনা আর পাহাড়িরা আদিবাসী হলে বাঙালিরা কি এই বিতর্কটা একটি পপুলার এবং অন্ধকার বিতর্ক যা এই বইতে উল্লেখিত হলেও লেখক এই বিতর্ক নিয়ে আলোচনায় যান নি। এই বিতর্কের তত্ত্বতালাশ লেখক পাঠকের নিজ উদ্দ্যোগের উপরই ছেড়ে দিয়েছেন। হতাশাজনক
লাস্টলি বইটাতে জিয়া-মনজুর খুনের পোর্শনটা এই বইয়ের মেইন বিষয়বস্তুর সাথে যায় না। তাও লেখক টেনে এনে ৬০ পৃষ্ঠায় খেলে দিসেন। এটা বইয়ের মেইন থিম আর জিয়া-মনজুর কারো প্রতি জাস্টিস করে নাই।
জিয়া-মনজুর নিয়ে আলাদা কাজ করলে ভাল হত বলে মনে করি।
পাহাড়ে বসবাসরত মানুষদের অধিকার আদায়ের গল্প উঠে এসেছে এই বইটিতে। লেখক মহিউদ্দিন আহমদ খুবই সাবধানতার সাথে তুলে এনেছেন পক্ষে বিপক্ষের নানান দৃষ্টিভঙ্গি। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে প্রতিনিয়ত একটু একটু করে অধিকার হারানো পাহাড়ী জনতার আকাঙ্খা, ভুল-ভ্রান্তি ও শাসনক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ের সাথে তাদের দ্বন্দ্বের কথা তুলে এনেছেন লেখক তাঁর লেখায়।
পাহাড়ীদের নিয়ে আমরা গৎবাঁধা একচেটিয়া একটা দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করি। অনেকের চোখেই তারা হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি হুমকি(!) অনেকের চোখেই তারা কেবলই অধিকারবঞ্চিত এক পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠী। কিন্তু কেউ শুনতে চায় না, জানতে চায় না কেন এই জনগোষ্ঠী সশস্ত্র বিদ্রোহের মত ভয়ানক কাজে লিপ্ত হলো। কতটা নির্যাতিত নিষ্পেষিত হলে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হয় তার সাক্ষী বাঙালী জাতি মুক্তিযুদ্ধের সময়ই হয়েছে। তৎকালীন পাকিস্তানের শোষণ নিপীড়ন থেকে লড়াই করে স্বাধীন হওয়া জাতি একই ভূখণ্ডে বাস করা অন্য জাতির শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে করা সংগ্রামকে দেখে 'বিদ্রোহ' হিসেবে।
লেখক একটা পর্যায়ে মন্তব্য করেছেন এমন যে ভাড়াটিয়া বাড়ির মালিক হলে দৃষ্টি ভঙ্গি বদলে যায়!
পাহাড়ী জনতার এই পরিস্থিতি এবং বিদ্রোহী হয়ে ওঠা ও সবশেষ শান্তিচুক্তি (যা ফলপ্রসূ হয়নি এখনও) সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে এই বইটি একটি অসাধারণ সোর্স।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে জানার আগ্রহ অনেকদিন থেকেই, সেই আগ্রহ থেকে বইটা নিয়ে বসা। লেখক ও গবেষক হিসেবে মহিউদ্দিন আহমেদ এর বইগুলো আমার বরাবরই ভালো লাগে। বইটাকে পুরোপুরি নিরপেক্ষ বলতে পারছি না তবে লেখক চেষ্টা ছিল এটা বোঝা যায়। এছাড়া সম্পূর্ণ ঘটনা প্রবাহকে একটু কাছের থেকে ও সহজভাবে বোঝার জন্য বইটা একদম যথাযথ। মাঝে এক দুইটা অধ্যায় একদম অদরকারি মনে হয়েছে আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে। এছাড়াও আরেকটা বিষয় যা আমার কাছে উল্লেখযোগ্য বলে মনে হয়েছে তা হলো এর প্রচ্ছদ ডিজাইন। এটা নিয়ে মুসার বইযাত্রা চ্যানেলে একবার কথা বলতে শুনেছি। সব মিলিয়ে বইটা এ বিষয়ে জানতে আগ্রহি সকলকে অবশ্যই রেকমেন্ড করবো।
কিছুটা বায়াসনেস লক্ষ করা যায় এন্টি জিয়া সেন্টিমেন্ট এর সাইড থেকে সম্ভবত । তবে বেশ ভালো একটা ইতিহাসের এবং প্রেক্ষাপট এনালাইসিস পাওয়া যাবে পার্বত্য শান্তিচুক্তি এবং জিয়া হত্যা নিয়ে
পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে আরও একটু বিস্তারিত আলাপ নিয়ে আসা উচিত ছিল বলে মনে হইছে। সাথে জিয়াউর রাহমানের হত্যাকাণ্ড নিয়েও। দুইটা বিষয়ই কেমন অসম্পূর্ণ মনে হইছে এই বইয়ে।
The writer painted a picture of the crisis that has plagued CHT since the inception of Bangladesh. Informative book with interviews & personal experiences of key players.