যদি আপনার প্রতিবিম্বের শরীরে একটা ক্ষতচিহ্ন দেখা যায়, যেটি আপনার শরীরে নেই, তখন কী করবেন? যদি লুকোচুরি খেলতে যেয়ে এমন জায়গায় লুকিয়ে পড়েন যেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব নয়? কোনো বইয়ের উৎসর্গপত্রে কি গল্প লুকিয়ে থাকতে পারে?
২১টি গল্প আছে এ বইয়ে। প্রতি গল্পে পাবেন এমন কোনো বিচিত্র প্রশ্ন, এবং আরও বিচিত্র উত্তর। ভয়, কৌতুহল, বিভ্রান্তি, বিষাদ—অনেকরকম অনুভূতি মিশে আছে গল্পগুলোর মধ্যে। যদি কল্পনার জগতের অভিযাত্রী হতে আপত্তি না থাকে, যদি একবার ঘুরে আসতে চান নিজের অবচেতন পৃথিবীতে—তাহলে বইটা হাতে নিন, আর অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতে প্রস্তুত থাকুন।
হরর গল্পের মনস্তাত্ত্বিক দিক আমাকে আকর্ষণ করে সবসময়।অরণ্য, লুকাশনি, চুল গল্পগুলো পড়তে পড়তে চেতন অবচেতনের খেলা উপভোগ করেছি খুব।তবে সব গল্প সম্পর্কে একই কথা বলতে পারছি না।কয়েকটা হরর আর অন্যরকম গল্প,দুইটা থ্রিলার গল্প সাধারণ মানের মনে হয়েছে।কল্পবিজ্ঞানের গল্প দুইটা দারুণ। বিশেষ করে "স্টোরি অফ ইওর লাইফ" প্রভাবান্বিত "কারখানা" পড়ে মুগ্ধ হয়েছি।কিছু গল্প পড়ে যেমন লেখকপ্রতিভার আশ্চর্য স্ফূরণ টের পাওয়া যায়, তেমনি কিছু গল্প পড়ে নিতান্তই হতাশ হতে হয়।সব মিলিয়ে "অদ্ভুত স্বপ্ন" নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। তবে তানজীম রহমানের সব লেখার মতো এই গল্পগ্রন্থও উচ্চাভিলাষী এবং নতুন কিছু করার প্রচেষ্টায় উন্মুখ। যে কারণে তার পরের বইটিও আগ্রহ নিয়ে পড়বো।
তানজীম রহমান তার হরর গল্প লেখার অসাধারণ ক্ষমতা দেখিয়েছেন "অরণ্য" গল্পে, সংকলনের সেরা গল্প এটাই। মধ্যযুগের এক নিষিদ্ধ অরণ্যে একদল সৈন্যের পৈশাচিক অভিজ্ঞতার গা শিউরে ওঠা গল্প। দ্বিতীয় সেরা গল্প "চুল", আলো আর অন্ধকার শক্তির চিরন্তন লড়াইয়ে এক ছাপোষা নাপিতের জড়িয়ে পড়ার গল্প। "আখতার সাহেবের ই-মেইল" গল্পটার দুর্দান্ত বাস্তব আবহ আর ডেমনিক অস্তিত্বগুলোর বর্ণনা বেশ ভালো। এর বাইরে বাকি হররগুলো জমেনি। "জ্যমেয় ভু" একটা দুর্দান্ত হরর হয়ে উঠতে গিয়েও একদম যাচ্ছেতাই এন্ডিংয়ের কারণে ধরা খেল। "শ্রোতা" গল্পটাকে কোনোভাবেই হররের কাতারে ফেলা যায় না, রহস্যময় বাঁশিওয়ালা যে কিনা পাওনা টাকা নিয়ে খুব সিরিয়াস আসলে কে হতে পারে সহজেই বোঝা যায়। "লুকাশনি" গল্পটা ছেলে ভুলানো টাইপ হরর গল্প, শুধুমাত্র মাছ ধরা পিশাচের অংশটুকু ভালো। "কর্ম পুলিশ" আর "ক্ষতমানব" গল্পদুইটাই ক্লাইমেক্সে যাওয়ার আগেই হুট করে সাদামাটাভাবে শেষ হয়ে গেল। "ষোল নাম্বার বাড়ি চেনার তেরটি উপায়" আর "অকৃতজ্ঞ" গল্প দুইটা ফাঁকিবাজি গল্প।
কল্পবিজ্ঞান গল্প দুইটার মধ্যে "সুর" গল্পটা ভালোই, ভিনগ্রহের অদ্ভুত জেব্রা টাইপ প্রাণী আর ভেসে আসা অদ্ভুত সুরের ব্যাপারটা মজার। "কারখানা" গল্পটা সংকলনের আরেকটা সেরা গল্প, সায়েন্স ফিকশন আর হিউমারের সেই লেভেলের মিশেল।
থ্রিলার গল্প দুইটাই নীচু মানের, একদম ভালো লাগেনি।
অন্যরকম গল্পগুলোর মধ্যে "শরনপন" গল্পটা ইন্টারেস্টিং, মুখে ঢাকনা লাগানো চরিত্রের কনসেপ্ট ভালো লেগেছে। দার্শনিক টাইপ গল্প "হাসি" আর "নিখোঁজ" গল্প বলার ধরণ আর লেখনীর গুনে ভালো লেগেছে। "স্বদেহভোগী" মনে হয় সংকলনের সবচেয়ে যাচ্ছেতাই গল্প, একদম ভালো লাগেনি। "একটি লজ্জাজনক ঘটনার ব্যবচ্ছেদ" মুগ্ধ করেছে। "প্রতিবিম্ব" গল্পটার কনসেপ্ট পুরনো হলেও ভালো লেগেছে। অন্যরকম গল্পগুলোর মধ্যে সেরা গল্প "জ্ঞান", হাজার বছর আগের বাগদাদের প্রেক্ষাপটে মুসা-আল-খারিযমীর কাহিনি।
কতগুলো গল্প আগেই বিভিন্ন সংকলনে পড়া ছিল। নতুনভাবে সেগুলো আবার পড়তে যেয়ে একটু মেজাজ খারাপ হয়েছে। কিছু গল্প বেশ ভালো লেগেছে। কিছু গল্প মনে হয়েছে অযথাই টেনে বড় করা হয়েছে। কল্পবিজ্ঞান আর থ্রিলারের গল্পগুলো খুব একটা যুতসই হয়নি। (ব্যক্তিগত মতামত) অন্যরকম জনরার গল্পগুলো বেশ ভালো লেগেছে। শেষের দুটো গল্প আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে। তানজীম রহমানের বর্ণনা চমৎকার, একেবারে চোখে দৃশ্য দেখিয়ে দেয়া। কিন্তু কয়েকটা গল্পের ক্ষেত্রে কিছুটা একঘেয়ে লেগেছে। মনে হয়েছে স্রেফ টানার জন্যই গল্পগুলো টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রচ্ছদ অসম্ভব সুন্দর।
কাগজের মান ভালো তবে বাঁধাই নিয়ে আমার অভিযোগ আছে। বই খুলে পড়তে গিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে।
কয়েকটা গল্পের চমৎকার প্লট অথচ শেষটা এমন বাজে। জ্যময়ে ভু, অরণ্য এরকম আরও কয়েকটা গল্প শুরুতে এত ভালো লাগতেসিলো...শেষে গিয়ে 🥲 সাইন্সফিকশন দুইটাই মারাত্মক। আর শরনপন গল্পটা সত্যিকারের অদ্ভুত লাগসে। প্রথমে পুরাই বিরক্তিকর মনে হলেও একটু চিন্তা করে দেখলাম ব্যপারটা আসলে খারাপ না। ২/১ টা ফাও গল্পও ছিল৷ লুকাশনি গল্পটা আবার দুঃখের।
হরর গল্প পড়ার কিছু নিয়ম আছে। পড়তে হবে রাতের বেলা, অল্প আলোতে, একা একা। তবেই হরর গল্প পুরোপুরি উপভোগ করতে পারবেন। অন্তত লোকে তো তাই বলে। কিন্তু আমার মতো ভীতু মানুষ নিজের জন্য আলাদা নিয়ম বানিয়ে নেয়৷ হরর গল্প পড়তে হবে দিনের বেলা, অনেক মানুষজন পরিবেষ্টিত অবস্থায়, এমনকি রাতে রুমে একা ঘুমানো হবে না এমন দিনে। আসন্ন পরীক্ষা উপলক্ষে যখন রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিলো তখন এই বই পড়া শুরু করি৷ সকালবেলা উঠে একটা করে গল্প পড়তে বসে যেতাম। ইউনিভার্সিটির হলে থাকার সুবাদে রাতে রুমে একা একা থেকে ভয় পাওয়ার সুযোগই নেই, এক রুমমেট টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে রাত জেগে পড়ছে তো আরেকজন ভোরবেলা উঠে পড়তে বসছে। এভাবেই পুরো বইটা পড়ে ফেললাম (যদিও হরর গল্পের বর্ণনা যখনি একটু বেশি ভীতিকর বোধ হচ্ছিলো সেই অংশগুলো চোখ বুলিয়ে গেছি শুধু)। তবুও মাঝে মাঝে এমন সাহসী পদক্ষেপের জন্য নিজের পিঠ চাপড়ে দিতে ইচ্ছা করে।
সে যাই হোক, এবার রিভিউতে ফেরত আসি। বইটাতে লেখক তানজীম রহমানের এখন পর্যন্ত লেখা ছোটগল্পগুলো সংকলিত হয়েছে। মোট চার ঘরানার গল্প আছে এখানে। দশটা হরর, দুটো থ্রিলার, দুটো কল্পবিজ্ঞান আর সাতটা অন্যরকম গল্প।
হরর গল্পগুলোতে ভৌতিক পরিবেশ স্পষ্ট, কল্পবিজ্ঞানে কল্পনার মাত্রা অসাধারণ, থ্রিলার গল্পদুটোই যা একটু কম উপভোগ করেছি। তবে কিনা অন্যরকম গল্পগুলোতে লেখকের সৃজনশীলতা আর কল্পনাশক্তি পূর্ণরূপে প্রকাশ পেয়েছে। একেকটা একেক ধাঁচের, মারাত্মক এক্সপেরিমেন্টাল প্রত্যেকটা গল্প। এবং আমার মতে সবগুলোই সফল। এখানে প্রচলিত কাঠামোর গল্পের পাশাপাশি আছে মেটাফিকশন - যেখানে গল্পের চরিত্রগুলো লেখককে ডিঙ্গিয়ে গল্প করে গেছেন পাঠকের সাথে, আছে ফ্ল্যাশ ফিকশন - যেখানে দুটো বাক্য দিয়েই পূর্ণাঙ্গ একটা গল্প গড়েছেন লেখক, আবার কখনো লেখকই সরাসরি কথা বলে গেছেন পাঠকদের সাথে।
অদ্ভুত সব পরিস্থির অবতারণা করে তার মাধ্যমেই সোশাল কমেন্টারি দেওয়ার বা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিগুলো, চেনা পরিচিতগুলো আবেগগুলো ফুটিয়ে তুলতে লেখকের পারদর্শিতা আগের বই 'বিরূপকথা' পড়েই টের পেয়েছিলাম। এই বইয়ের বেশিরভাগ গল্পেও সেটা লক্ষনীয় ছিলো।
সংকলনের সব গল্পই কী আমার ভালো লেগেছে? উত্তর হলো না, সংকলনের ক্ষেত্রে সেটাই স্বাভাবিক। তবে যেই গল্পগুলো ভালো লেগেছে সেগুলো বেশিমাত্রায় উপভোগ করেছি। যারা একটু নতুন ধরণের এবং এক্সপেরিমেন্টাল লেখা পড়তে পছন্দ করেন তাদের ��িঃসন্দেহে ভালো লাগবে বইটা। যারা হরর উপভোগ করেন তাদের জন্য তো হলি গ্রেইল। আর যারা আমার মতো ভীতু তারাও হরর বাদে বাকি গল্পগুলো পড়তে পারেন। আর গল্পগুলো নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবলে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতেই পারেন।
অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতে যে গল্পগুলো পড়বেন লেখক : তানজীম রহমান
যদি আপনার প্রতিবিম্বের শরীরে একটা ক্ষতচিহ্ন থাকে যা আপনার শরীরে নেই? কিংবা লুকোচুরি খেলতে গিয়ে এমন জায়গায় লুকোলেন যেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব নয়? কোন বইয়ের উৎসর্গপত্রে কি গল্প লুকিয়ে থাকতে পারে?
বর্তমান সময়ের ভিন্ন ধাঁচের মনস্তাত্ত্বিক ও কল্পনাভিত্তিক ভৌতিক গল্প নিয়ে কাজ করা সুলেখক তানজীম রহমানের ২১টি গল্পের এই সংকলনের কভার স্লিপ থেকে উপরের উদ্ধৃত অংশটুকু নেয়া। বুঝাই যাচ্ছে, লেখক খুবই রহস্যময় সব গল্পের ইঙ্গিত দিচ্ছেন আমাদের! তাই বরাবরের মতোই নতুন ভিন্ন আঙ্গিকে হরর পড়বো ভেবে বইয়ের ভেতর ঢুকে যাই।
২১টি গল্পের মধ্যে ১০ টা হরর, ২টা থ্রিলার, ২ টা কল্পবিজ্ঞান সহ আরো ৭ টা অন্যরকম গল্প আছে, যেগুলো কোন জনরা তে ফেলা যায়না। প্রথমেই লেখকের লেখা সম্পর্কে যদি বলা হয়, পূর্বে আর্কন পড়া থাকায় আমি ধরেই নিয়েছিলাম লেখকের লেখনশৈলি আর বিস্তৃত বর্ণনাভঙ্গিই আমার ভালো লাগবে বেশি। এবং শেষমেষ তাই হয়েছে।এত চমৎকার ভাবে মানুষের জীবন এবং মন এর ভেতরের অত্যন্ত সেনসিটিভ সব ইস্যু নিয়ে উনি খুব সাবলীল ভাবে লেখে যেতে পারেন।এই গল্পগুলো তেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। আরেকটি সুন্দর দিক হলো লেখকের ইস্টার এগ আর পপ কালচার রেফারেন্স দেয়াটা। যদিও হরর কিংবা কল্পবিজ্ঞান মূলক গল্পে এরকম ডিটেইল্ড লেখা কিংবা মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা অনেকেই আশা করে না, তবু আমার কাছে অভিনব লেগেছে এগুলোই।
এখন আসি গল্পগুলোর কাহিনীর বেলায়। আমি সাধারণত হরর বই কিংবা সিনেমা কোনটা দেখেই ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠার মত ভয় পাইনা, তাই আমি গল্পের মূল ক্লাইম্যাক্স এর চেয়ে কিভাবে গল্পে ভৌতিক উপাদান গুলো আস্তে আস্তে সুন্দর করে উপস্থাপিত হচ্ছে তাই উপভোগ করি। হরর গল্পগুলোর মধ্যে আমি সেই ফ্লেভারটা পেয়েছি। যদিও পুরো বইয়ের সবগুলো গল্পই আক্ষরিক অর্থে "শেষ হইয়াও হইল না শেষ" টাইপ ছোটগল্প। অনেক সময় পড়ে মনে হয়েছে এই সব বর্ণনার গল্পের সাথে কোনো যোগসাজশ নেই।কিন্তু লেখার মধ্যে যে একটা রহস্যময় পরিবেশ, চরিত্রগুলোর মধ্যে দিয়ে পাঠকের নিজেকে সেই পরিবেশে আবিষ্কার করা এই ব্যাপারগুলো গল্পে অন্য মাত্রা যুগিয়েছে। তবে "আখতার সাহেবের ইমেইল" নামের একদম শেষ হরর গল্পটা সত্যি পিলে চমকে দেয়ার মত। পুরো বইয়ের বেস্ট গল্প বললে আমি এটার নাম বলব। এছাড়াও অকৃতজ্ঞ,চুল,ষোলো নম্বর বাড়ি চেনার তেরোটি উপায় এগুলোয় লেখক অনেক সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।
থ্রিলার এবং কল্পবিজ্ঞান এর গল্পগুলো ভালো হলেও আমার তেমন আহামরি মনে হয়নি। কারখানা গল্পটির থিম অনেক পরিচিত মনে হলেও এর ভেতর লেখক যে সুন্দর করে আমাদের দেশ ও সমাজের বর্তমান অবস্থার সূক্ষ্ম সমালোচনা করেছেন তা ভালো লেগেছে। তবে বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি হলো শেষের অন্যরকম গল্পগুলো। শরণপন ও নিখোঁজ গল্প দুটি এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে।যেহেতু প্রথমেই গল্পগুলোকে 'অন্যরকম' তকমা লাগানো হয়েছে, তাই আপনি পড়ার সময় সবকিছুই অন্যরকম মিশ্র অনুভূতি নিয়ে পড়বেন।অদ্ভুত কিংবা উদ্ভট কিংবা এই দুইয়ের মিশেলে এক নতুন চিন্তা মাথায় আসবে প্রতিটা গল্পের শেষে। লেখক অনেকগুলো গল্পেই কিছু ওপেন এন্ডিং ও দিয়েছেন, তাই ওইসব গল্পের পরিণতি পাঠক অনুযায়ী ভিন্ন হবে।
সর্বোপরি পুরো বইটি এর নামের মতোই অদ্ভুত, মানে এগুলো নিয়ে বেশি ভাবলে হয়তো আসলেই অদ্ভুত স্বপ্ন দেখা যাবে। স্বপ্নে যেমন আমরা কোন যুক্তি ছাড়া উল্টাপাল্টা জিনিস দেখি কিন্তু দেখার সময় মনে হয় যা হচ্ছে তাই স্বাভাবিক! এই গল্পগুলোও অনেকটা সেরকম। পড়ার সময় মনে হবে এইতো বুঝলাম এরকম কিছু একটা হবে হয়তো, কিন্তু শেষে এর কোনোটাই হবে না।হয় আপনি আশাহত হবেন, কিংবা অভিভূত।কিন্তু পড়ার সময়ের সেই অনুভূতিটা রয়ে যাবে।
অনেক বেশি এক্সপেক্টশেন নিয়ে শুরু করেছিলাম...যার কারনে হয়ত বেশি আশাহত হলাম...খারাপ লাগে নি...তবে অনেক "ভাল" ও লাগে নি...কয়েকটা গল্প ভাল লেগেছে খুব..এই আর কি!!!
তানজীম রহমান হরর জন্রায় বেশ শক্তিশালী লেখক। তার এই গল্প সঙ্কলনের সিংহভাগ বইই তাই হরর নিয়ে। সেসব হরর আবার বিচিত্র ধরনের, সেখানে তার নিজের মনের জানালায় উঁকি দিয়ে দেখতে পারছে পাঠক। উনার হরর মূলত বর্ণনানির্ভর, কাজেই বই পড়ে ঠিকভাবে বোঝা কষ্ট। কিছুটা জুঞ্জি ইতোর ছায়া উনার লেখায় আছে, যেখানে হরর এলিমেন্ট আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে যায় অপ্রাকৃত ধরনের দেহাবয়বের মধ্যে দিয়ে। "জ্যময়ে ভু" সেকেন্ড পার্সন বা মধ্যম পুরুষ pov দিয়ে লেখা গল্প, যেখানে গল্পের প্রধান চরিত্র আসলে পার্শ্ব চরিত্র। তবে গল্পটা আরেকটু বড় হতে পারতো। "শ্রোতা" ভালো লাগে নি, কিছুটা বোঝা যাচ্ছিলো চরিত্রটা কে, আর এন্ডিংটা সাদামাটা। "ক্ষতমানব" আর "লুকাশনি" বইয়ের আরবান লিজেন্ড ধরনের গল্প, এটা ভালো লেগেছে। "অরণ্য" গল্প একদমই ভালো লাগে নি, কারণ একগাদা হরর এলিমেন্টকে জাস্ট ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে। "চুল" বেশ ভালো লেগেছে মিথিক হরর হিসেবে। "ষোল নম্বর বাড়ি চেনার তেরটি উপায়" আর "অকৃতজ্ঞ" তো একদম ছোটো এক দুই লাইনের হরর স্টোরিগুলোর মত। "কর্ম পুলিশ" ভালো লেগেছে, লাগেনি "আখতার সাহেবের ইমেইল"। থ্রিলার গল্প দুইটা একদম বেসিক, যদিও ওকামের ক্ষুর নিয়ে আরও কাজ করা যেত। কল্পবিজ্ঞানগুলোও বেসিক লেগেছে, তবে কল্পবিজ্ঞানের মধ্যে দর্শন বেশি দেয়ার প্রবণতা আছে উনার। শেষে রইলো অন্যরকম ছয়টি গল্প। এক "জ্ঞান" বাদে কোনোটিই ভালো লাগে নি। উনার মধ্যে ফোর্থ ওয়াল ব্রেকের প্রবণতা দেখা গেছে একাধিক গল্পেই এখানে। সব মিলিয়ে মোটামুটি। তবে গল্পগুলোর মধ্যে সাদৃশ্য ছিলো, কাজেই কিছুটা স্টেরিওটাইপড লেগেছে এই বই।
৩.৫★ ছোটগল্পের বই। ২১ টা গল্প। হরর, কল্পবিজ্ঞান, থ্রিলার আর অন্যরকম- চার সেকশনে ভাগ করা। হরর জনরায় তানজীম রহমানের দখল আছে বেশ। এখানকার গল্পগুলোই ভালো লেগেছে সব থেকে বেশি। অন্যরকম সেকশনের গল্পগুলো ভাবিয়েছে। রিলেটেবল, ননডেস্ক্রিপ্ট জিনিসগুলোকে দেখিয়েছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে।
অন্যদের বেলায় কী হয় জানি না, আমার বেশিরভাগ স্বপ্নই অমীমাংসিত রহস্য হয়ে থাকে; হয় ভয় পেয়ে ঘুম ভেঙ্গে যায় বলে স্বপ্নের শেষটা আমার জানা হয় না, নতুবা স্বপ্নের শেষটা মনেই থাকে না। স্বপ্নের মতোই অদ্ভুতুড়ে একুশটি গল্প নিয়ে এই বই। গল্পগুলোকে ভাগ করা হয়েছে তিনটি অধ্যায়ে। প্রথম অধ্যায় “হরর”-এর গল্প দশটা আসলেও অদ্ভুত এক ভয়ের মুখোমুখি করিয়ে দেবে পাঠককে; ভীতিটার উৎস মূলত প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে যাওয়া; গল্পের চরিত্রগুলির জন্য অস্থিরতা কাজ করা। আমার মতে বইটার মূল আবেদনই হচ্ছে গল্পগুলোর অমীমাংসিত থেকে রহস্যময় হয়ে ওঠা। কিন্তু পাঠকমনে খচখচানি না রেখে শেষ হয়ে যাওয়া “থ্রিলার” অধ্যায়ের “সাক্ষাৎ” আর “ওকাম-এর উলটো ক্ষুর” গল্প দু’টো সেই আবেদনে কিঞ্চিৎ বালুচাপা দেয়ায় “থ্রিলার” অধ্যায়টাই হয়ে গিয়েছে বইটার চাঁদের কলঙ্ক! থ্রিলার গল্প হিসেবেও গল্প দু’টো মোটামুটি মানের। “কল্পবিজ্ঞান” অধ্যায়ের “সুর” আর “কারখানা” গল্প দু’টোতে বৈজ্ঞানিক কপচপানি নেই বললেই চলে, পরিধিও ছোট। কিন্তু লেখক জিতেছেন শেষ দানে, দু’টো গল্পেরই শেষটা এমন যে পড়ে পাঠক বলে ফেলবে, “এভাবে তো ভেবে দেখিনি!” অন্যরকম অধ্যায়ের গল্প সাতটা বাস্তবিকই অন্যরকম; পড়ে না ভয়ে কাঁটা দেয়, না দুঃখ দুঃখ বোধ হয়, না হয় আনন্দ-অনেকটা ঝাঁঝহীন স্প্রাইটে চুমুক দেয়ার অনুভূতি। সবমিলিয়ে, খাপছাড়া থ্রিলার অধ্যায়টা বাদ দিলে বইটা একটা ভালোবাসা। লেখকের লেখনী মাখনের মতো বলে অদ্ভুত সব গল্পের উপস্থিতি থাকার পরেও তেমন ধাক্কা না খেয়ে, দুই রাতে দুই বসায় বইটা শেষ করে ফেলা সম্ভব হয়েছে। আরেকটা কারণ হয়তো আদী প্রকাশনের এই বইটার পাতায় পাতায় বানান-ছাপার ভুলচুক তেমন চোখে না পড়া। বাঁধাই যদিও তেমন আরামের হয়নি। বইয়ের গল্পের মতো বইয়ের প্রচ্ছদও কেমন যেন অদ্ভুত ঘোর লাগিয়ে দেয়ার মতোন। এত সুন্দর যে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে; তাকিয়ে থাকতে থাকতেই গোলমান লেগে যায়- ঐ যে নীচে বাম কোণায় ওটা কি গ্যাস সিলিন্ডার?! গ্যাস সিলিন্ডারের পাশে এগুলো দাঁড় করিয়ে রাখা বই? অতিপ্রাকৃত গল্প পাঠকের কাছে সুখপাঠ্য করার একটা বিশাল অস্ত্র হচ্ছে সত্যের সাথে কল্পনা মিশিয়ে পাঠককে গল্পগুলো “অবাস্তব হলেও অবিশ্বাস্য নয়” এমন একটা অনুভূতি দেয়া। এই কাজে লেখক শতভাগ সফল। তাই তো গল্প ফুড়োলেও আমার প্রশ্নগাছটি মুড়োয় না... ওরা কে কোথায় কেমন আছে জানার জন্য ভেতরের ছটফটানি কমে না...
আমি প্রায়ই ইচ্ছা করে স্বপ্ন দেখি। ইচ্ছা করে স্বপ্ন দেখার সিস্টেমটা হলো, আপনার যে রাতে ঘুম হচ্ছেনা, চোখ বন্ধ করে পড়ে আছেন শুধু...সে রাতে আপনি একটা অন্যরকম বিষয় নিয়ে ভাববেন। যেইটা আপনি সচরাচর ভাবেন না, বা আপনার ভাববার কথাও না। ভাবতে ভাবতে যদি ঘুমায় যেতে পারেন, এবং বিষয়টা যদি যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং হয়, আপনার অবচেতন মন সেই চিন্তাটা কন্টিনিউ করবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বপ্নটা আমার আজব দিকে মোড় নেয়। একসময় তাল রাখতে পারিনা। যাহোক, এই বই প্রকাশের ঘোষণার পরপর আমি 'অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতে যে গল্পগুলো পড়বেন' বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে বইটি ঘরে আনি, উদ্ভট স্বপ্ন দেখাই লাগবে। তো, সবগুলো গল্প আদতেই অদ্ভুত না হলেও কিছু গল্প উল্লেখযোগ্যভাবে অদ্ভুত। সেটা বিষয়, ন্যারেটিভ বা মুদ্রার উল্টাপিঠের চিন্তার যেকোনোটার কারণেই হতে পারে। এই যেমন, চুল, অরণ্য, জ্যমেয় ভু, লুকাশানি, কারখানা, প্রতিবিম্ব, জ্ঞান গল্পগুলো আলাদা আলাদা স্কেলে দারুণ। চুল গল্পটা ইনক্রেডিবলি ডিস্টার্বিং যদি আপনি ভালোভাবে পড়েন। 'হেরিডেটারি' সিনেমাটা আমার খুবই প্রিয়। ওই সিনেমার মতো শান্ত, অথচ কি কেয়োটিক গল্পটা। অরণ্য গল্পটার বর্ণণা খুবই জীবন্ত, এড্রেনালিন রাশ। লুকাশানি গল্পটা মডার্ন ডে হরর এর আরেকটা ফ্যান্টাস্টিক বহিঃপ্রকাশ। সাইফাই 'কারখানা' গল্পটা খুবই মজা লেগেছে। হিউমার আর গল্পের গুণে প্রচুর এঞ্জয় করেছি। শেষ দুটি গল্প পরিচিত কিন্ত সত্যই অন্যরকম। বিষয়গতভাবেও আবার রুচির তারতম্যেও। প্রচুর এক্সপেরিমেন্টাল ব্যাপার স্যাপার। সমস্যাটা লেগেছে 'জ্যমেয় ভ্যু গল্পটা নিয়ে। এই গল্পটা এত আগ্রহ নিয়ে পড়ছিলাম, ফাটাফাটি একটা সেটাপ। হঠাৎ গল্পটা বিশ্রীভাবে শেষ! প্রথমে তো রেগে গেলাম, লেখক করলেন কি এইটা। পরে আবার স্বপ্নের কোনো আগামাথা হয়না বলে গল্পটার লজিক মেনে নিয়েছি। বইটা ওভারঅল ভালো লেগেছে, উপভোগ করেছি। কিন্তু উল্লেখিত গল্পগুলো বাদে বাকিগুলো মনে রাখবার মতো ছিল না। লেখক তানজীম রহমানের সিগনেচার স্টাইলে লেখা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট মিস করেছি কিছুটা। বইয়ের সাজসজ্জাটাও ঠিক পছন্দ হয়নি। উল্লেখ করে বিষয় ভাগ না করে এলোমেলো রাখলেই বোধহয় মজাটা বেশি পেতাম। লেখকের কাছে নতুন ধরণের হররের যে এক্সপেরিমেন্ট টা তিনি চালাচ্ছেন, সেটি চালিয়ে যাবার আর্জি জানাই।
তানজীম রহমানের সব মৌলিক লেখা না পড়লেও বেশ কয়েকটাই পড়া হয়েছে এবং প্রত্যেকটা বই পড়েই মনে হয়েছে এখানে সময় ব্যয় করাটা স্বার্থক ছিল। এটাও তেমনই একটা বই।
প্রথমেই আসছে বইএর নামকরণের ব্যাপারটা। এখানে লেখক ১০/১০। সত্যি বলতে গেলে শুধু মাত্র টাইটেল টা দেখেই অর্ডার করে দেই। বইএর মূল্যও দেখা হয় নি। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে কেনাটা আসলেই ভালো ডিসিশন ছিলো।
বইটির আরেকটি ভালো দিক হলো একই সাথে কয়েক জনরার গল্পের স্বাদ আস্বাদন করা যায়। হরর, থ্রিলার, কল্পবিজ্ঞান, মিসেলিনিয়াস কিছু গল্প। আমার ব্যক্তিগত ভাবে “কর্ম পুলিশ”, “সুর, আর “কারখানা” বেশি ভালো লেগেছে। লেখক সাই-ফাই ঘড়ানার লেখা খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করতে পারেন। বাকি গল্প গুলো ও খারাপ না। কাজের ফাঁকে, ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিংবা লাঞ্চ/ডিনার ব্রেকের সঙ্গী হিসাবে বেশ ভালো একটা বই। ছোট ছোট গল্প হওয়ায় পড়াটাও সহজ।
সব মিলিয়ে ভালো অভিজ্ঞতা। এখন অপেক্ষায় আছি তানজীম রহমানের নতুন কোনো বই পড়ার।
Purchased the ebook version from Boighor app. Enjoyed most of the the horror stories. The author should be lauded for building ambience in those stories. The sci-fi and thriller ones were so-so. All in all, an easy and intriguing read.
বেশ কিছু গল্প চমৎকার হয়েছে, আবার কিছু গল্প একদমই বাজে লেগেছে। সায়েন্স ফিকশন গল্পগুলোকে একচুয়ালি সায়েন্স ফ্যান্টাসি মনে হয়েছে। লেখকের বর্ণনাভঙ্গি বেশ ভালো, যার কারণে গল্প পড়তে ভালো লেগেছে।