বই: জীবনের জলছবি
লেখক: প্রতিভা বসু
প্রকাশনী: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড
প্রথম প্রকাশ: ১৯৯৩
পৃষ্ঠা: ৩৮৮
মূল্য: ৮০০ রূপী (১৪৪০ টাকা)
“স্বেচ্ছায় কে বেদনায় দু'হাত বাড়ায়?"
এক.
আপনি কখনো হাওয়াই মিঠাই পড়েছেন?
"পড়েছেন" শব্দটা ভুল টাইপ করলাম কিনা ভাবছেন? "খেয়েছেন" হবে? না - স্বজ্ঞানে এবং ইচ্ছে করেই লিখেছি। কারনটা পুরো পোষ্ট পড়লেই ক্লিয়ার হবে।
জীবনের জলছবি। "জীবন" আর "জলছবি" এর মধ্যে হাইফেনের মতো একটা প্রশ্ন ঝুলে থাকে। প্রশ্নটা জলছবি ঘীরে। আনমনা বা উন্মুখ হয়ে ঝুঁকে থাকা স্বচ্ছ জলের মাঝে প্রতিচ্ছবির মতো এই জলছবি? নাকি কোন শিল্পীর ওয়াটার কালারে আঁকা জলছবি? একটা হলেই হলো যেমন ঠিক, তেমিন কিছুটা পার্থক্য তো থাকেই দুটোর মধ্যে। পার্থক্যটা কালারে। প্রথমটা যতোটা না রঙিন হবে, দ্বিতীয়টা তার থেকে বেশি হবে। তবে "স্মৃতিকথা" কি অতোটা রঙিন হয়? নাকি কিছুটা বিবর্ন হয়ে ধরা দেয়? উত্তরটা তো যার যার দৃষ্টিভঙ্গির উপর।
সাধারনত যে কোন স্মৃতিকথা একধরনের মেলানকোলিক মুড নিয়ে পড়া হয়। অথবা শুরুটা যেভাবেই হোক, প্র্রগ্রেসটা সেদিকেই টার্ন নেয়। পড়তে পড়তে আপনি যখন একদম ডুবে যাবেন বইয়ে উল্লেখিত নানা স্মৃতিতে তখন খেয়াল করে দেখবেন বইয়ের অনেক মানুষের ভীড়েও আপনি এতোটা নিবিষ্ট হয়ে আছেন যে আপনার হুট করে মনে হবে আপনি একা। আপনার নিজেকে মনে হবে লোনার। প্রতিভা বসুর "জীবনের জলছবি" এখানে কিছুটা ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা দেয়। প্রথমত, ওই মেলানকোলিক মুড টা আপনার আসবে না। তবে মেলানকলি বিউটি তো বটে। বিষন্ন সু্ন্দর। বিষন্নতা থাক। শুধু সুন্দর নিয়ে কথা বলি। আনন্দ নিয়ে কথা বলি।
দুই.
আনন্দ। জন্মই তো আনন্দ। ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগনার হাঁসাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন রানু সোম। সাল ১৯১৫, ১৩ মার্চ। তখনও তিনি প্রতিভা বসু হয়ে ওঠেননি। ডাক নাম ছিল রানু এবং পিতার নামের পদবী ধারন করে রানু সোম। প্রতিভা বসুর "জীবনের জলছবি" বইয়ে উঠে এসেছে তার শৈশবের নানা কাহিনি। যে সময়টার কথা বলা হয়েছে সেই সময়ের নারী মানেই চিক পর্দার আড়ালে অথবা দরোজার ওপাশে ক্ষয়ে যাওয়া নারীদের সময়। তবে প্রতিভা বসুর ক্ষেত্রে ছিল আলাদা। এর সবচেয়ে বড় কারন ছিল তার পিতা আশুতোষ সোমের দেয়া অবাধ স্বাধীনতা এবং কন্যার প্রতি অগাধ ভালোবাসা। তাই সেই সময়ের ঠুনকো সামাজিকতা এবং খল-সামাজিক নখের আঁচড়কে পাত্তা না দিয়ে খোলা অকাশে ঘুড়ির মতোই উড়ে বেরিয়েছেন রানু সোম, মানে প্রতিভা বসু।
জীবনের প্রথম ২০ বছর ঢাকায় কেটেছে প্রতিভা বসুর। সে সময়ের ঢাকা এবং তার আদি রূপ উঠে এসেছে "জীবনের জলছবি" ঘীরে। ঢাকার স্মৃতিময় বর্ণনার পাশাপাশি উঠে এসেছ তৎকালীন সময়ের ঢাকা কেন্দ্রিক অজস্র গুণীজনের নাম। তাদের মধ্যে ওস্তাদ চারু দত্ত, মেহেদী হাসান, ভোলানাথ মহারাজ, গুল মোহাম্মদ খাঁ, প্যারীন্দ্র বসাক উল্লেখযোগ্য। জলছবিতে আঁকা হয়েছে পুরানা পল্টন, উয়ারী (ওয়ারী), শা'বাগ(শাহবাগ), নবাবপুর, বকশীবাজার, যুগীনগর এবং এমন আরো অনেক জায়গার বর্ণনা। ঢাকার নাট্যচর্চার ইতিহাসেরও একটা পোর্ট্রেট বলা যায় "জীবনের জলছবি" আত্মকথাকে।
প্রতিভা বসুর বর্ণনায় ঢাকার সেই আদি রূপ যেন স্মৃতি আর ঘোরের ভেতর দিয়ে একটা স্বপ্নময় যাত্রার মতো। একবারেই সরল, ঝরঝরে একটা বর্ণনাভঙ্গি পাঠককে স্বপ্ন আর রিয়ালিটি এর মধ্যবর্তী একটা জায়গায় ল্যান্ডিং করায়। বই বন্ধ করে একটা অসীম কৌতূহল ভরে এখনি রওয়ানা দেই সেই বুড়িগঙ্গার ছইওয়ালা নৌকায় অথবা নববপুরের পরাটা-গোস্তর ঘ্রানময় পরিবেশে। এই ঘোর যেন পাঠকের একটা পোয়েটিক ঘোরের মতো।
তিন.
"জীবনের জলছবি" আত্মকথায় উঠে এসেছ তার গানের কথা। লেখার কথা। প্রেমের কথা। বিরহরে কথা। জীবনযাপনের প্রতিটা নিঃশ্বাসের ফুটপ্রিন্ট যেন এই বই। যে কোন গান বা সুর নিজের কন্ঠে তুলে নেবার ঈর্ষনীয় প্রতিভার কারনে মাত্র ১১ বছর বয়সেই “হিজ মাস্টার্স ভয়েস” থেকে বের হয় প্রথম গানের রেকর্ড। পরবর্তী সময়ে সিনেমায় "লিপ মুভমেন্ট" এর অফার এবং আকর্ষনীয় সম্মানী এর প্রস্তাব পেলেও সেটা আর তার করার সম্ভব হয়নি "সামাজিক চোখ রাঙানিতে"। যদিও প্রতিভা বসু গানের প্রতি অতোটা যত্নশীল ছিল না।
অথচ এই গানের কারনেই কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আরো অনেকের সংষ্পর্শে আসেন প্রতিভা বসু। স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম তার বাড়িতে এসে হাজির হন, এবং তাকে গান শেখান। প্রখ্যাত ডি.কে রায় ওরফে দিলীপ কুমার রায় এর মুখে শুনে আমন্ত্রিত হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর দ্বার এবং সেখানেও একটা আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের রেশ ধরেই উল্লেখ করে রাখি যে, প্রতিভা বসুর প্রথম কন্যার মীনাক্ষী এর নামটিও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্বারা প্রণিত।
এই গান নিয়েও কম পানি ঘোলা হয় নি। শৈশবে লেখিকার মঞ্চে অভিনয়ের কারনে বিখ্যাত (পড়া ভালো কুখ্যাত) "শনিবারের চিঠি" প্রত্রিকার রোষানলে পড়তে হয়। প্রচুর আজেবাজে কথা লেখা হয়। কলকাতায় যেমন "শানিবারের চিঠি", ঢাকায় তেমনি বের হতো "রবিবারের লাঠি"। সেই পত্রিকায় কাজী নজরুল ইসলাম এবং প্রতিভা বসু কে নিয়ে লেখা হয় নানা রকম কথা। এর জের ধরে কাজী নজরুল ইসলামের উপর হামলাও হয়। তবে এই যে গান নিয়ে এতো কাহিনি অথবা যে গান নিয়ে এতো স্বীকৃতি পাওয়া প্রতিভা বসুর, সে গাল তিনি ছেড়ে দেন বিয়ের পর। যদিও সেটার কারন প্রতিভা বসুর অনিচ্ছা এবং সাংসারিক জীবনের ব্যস্ততা। কোন ভাবেই তার স্বামী বুদ্ধদেব বসু না।
"জীবনের জলছবি" তে আপনি খুঁজে পাবেন ‘ডাকাবুকো’সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর সাথে প্রতিভা বসুর প্রথম দেখার মুহূর্ত, তাদের বিয়ের প্রস্তাবনার মুহূর্ত এবং সাংসারিক জীবনের খুঁটিনাটি। প্রতিভা বসুর "পরিমিত বোধ" এক কথায় অনবদ্য। বুদ্ধদেব বসুর সাথে প্রথম দেখার মুহূর্ত তিনি যেভাবে খুব সামান্য কথায় লিখেছেন এবং অল্পতেই থেমেছেন সেটা তার ওই পরিমিতি বোধেরই প্রকাশ। একজন লেখক যখন জানেন তাকে ঠিক কতখানি টানতে হবে এবং কখন ছাড়তে হবে - এর থেকে সুখপাঠ্য কিছু নেই। "জীবনের জলছবির" প্রতিটা পাতায় সেই পরিমিতি বোধটা স্পষ্ট।
চার.
বৈচিত্র্যময়তার আরেক নাম প্রতিভা বসু। সেই বৈচিত্র্যময়তার নানা রঙের সমাহার "জীবনের জলছবি"। জীবনের জলছবি যদি হয় আত্মকথার একটা রাজপ্রাসাদ, তবে তার প্রতিটি ইট বা পাথরে রয়েছে ওই সময়ের নানা জ্ঞানী, গুনী এবং প্রতিভাবান ব্যক্তিদের নাম। এই আত্মকথা প্রতিভা বসুর সাহিত্যিক জীবনেরও মানচিত্র। তার প্রথম উপন্যাস "মনোলীনা" এর গল্প যেটা কিনা বুদ্ধদেব বসু এবং প্রতিভা বসুর যৌথ ভাবে লেখার কথা। আছে বাড়ির গল্প, বাড়ি বদলের গল্প, এবং বদল করতে করতে রাসবিহারী অ্যাভিনিউর ২০২ নম্বরের দৃষ্টিনন্দন বাড়িটির গল্প। যেটা পরবর্তীতে হয়ে ওঠে "কবিতাভবন"। এবং আছে "কবিতা" পত্রিকার গল্প।
আর "কবিতা" পত্রিকার কথা উঠে আসা মানেই তো গুটি গুটি পায়ে হেঁটে আসেন জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সমীর সেন, জ্যোতির্ময় দত্ত (ইনি পরবর্তীতে বিবহা করেন তাদের কন্যা মীনাক্ষী কে), প্রেমেন্দ্র মিত্র, নরেশ গুহ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবং এমন অজস্র কবি সাহিত্যক যাদের "প্রথম লেখা বা বই" বের হয় কবিতাভবন থেকে। কবিতাভবনে আড্ডার যে শৈলী তারও রূপরেখা ফঁটে উঠেছে প্রতিভা বসুর "জীবনের জলছবি" তে।
"জীবনের জলছবির" এইসব মহানায়কেরা পাঠককে তাড়া করবেন। মুরাকামির গল্পের চরিত্রগুলো যেমন নানা অন্ধকার অলিগলি ঘুরে আবার এসে হানা দেয় আমাদের চেনা পৃথিবীর বলয়ে, ঠিক ���েমনি এই মহারথীরাও বইয়ের প্রতিটা পৃষ্টায় আপনাকে তাড়া করবে মেমরি লেনে এবং পরক্ষনেই এসে আপনাকে দাঁড় করাবে রিয়েলিটির সামনে। নস্টালজিয়াগুলো বারবার ফিরে আসে এদের হাত ধরে বইয়ের পাতায়। তবে প্রতিভা বসু কোন চরিত্রেই অযাচিত ভাবে কলম চেপে ধরেননি। মানে কোন মহারথীকেই আলাদাভাবে বোল্ড করে ফোকাস করেননি। ঠিক এই কারনেই প্রতিভা বুসর আঙ্গুল ধরে স্মৃতির বাগিচায় ঘুরে এসেও আপনি খুব মোলায়েম ভাবেই আচ্ছন্ন হয়ে থাকবেন। মনে হবে, এরা তো আমাদর মতোই সাধারন মানুষ যাদের সাথে আমাদের প্রতিনিয়তই দেখা হয়। কুশল বিনিময় হয়।
পাঁচ.
"জীবনের জলছবি" তে উঠে এসেছে নিবিড় ভাবে প্রতিভা বসুর পরিবারের কথা, অন্দরমহলের কথা, তার সন্তানদের কথা। একমাত্র পুত্র শুদ্ধশীল বসু এবং স্বামী বুদ্ধদেব বসুর মৃ/ত্যুর কথা। প্রতিভা বসুর পরিমিতি বোধের দৃষ্টান্ত এখানেও বেশ সবল। অথবা এই অকাল মৃ/ত্যুগুলো লেখিকা হয়তো অতোটা বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করতে চান নি। সেটা একদিক দিয়ে বেশ ভালোই হয়েছে। সব অনুভূতি যে শব্দের রঙে ফোঁটাতেই হবে এমন তো না। প্রতিভা বসুর ভাষায়:-
"আমাদের জীবনটা যে আয়ুর তুলনায় খুব দীর্ঘ তা নয় কিন্তু ঘটনাপঞ্জী সে তুলনায় অতিমাত্রায় দীর্ঘ।"
অনেক অনেক বছর পূর্বে পড়া একটা কবিতার কথা মনে পড়ছে "জীবনের জলছবি" এর শেষের বিষন্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে। কবির নাম স্মৃতির পাতা হতে পুরোটই হারিয়ে গেছে যদিও।
"বালিকারা বাস করে ভুবনের স্বর্গে
পৃথিবী নরকসম, ভীড় বাড়ে মর্গে;
বালিকারা বড় হলে কোথায় হারায়?
স্বেচ্ছায় কে বেদনায় দু'হাত বাড়ায়?"
স্বেচ্ছায় কে বেদনায় দু'হাত বাড়ায়?
স্বেচ্ছায় কে বেদনায় দু'হাত বাড়ায়? ….. …… ……. ……. …… …… মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু এই লাইনগুলো! আত্মকথা বা স্মৃতিচারন কি অনেকটা এই "স্বেচ্ছায় কে বেদনায় দু'হাত বাড়ানোর" মতো একটা বিষয়? পিছন ফিরে দেখাটা হয়তো তাই। একজন লেখকের জন্যে এবং একজন পাঠকের জন্যেও। "জীবনের জলছবি" ও তো "স্বেচ্ছায় বেদনায় দু'হাত বাড়ানোর মতোই" শক্ত দুটো মলাটে বন্দী একটা অসীম সময়।
প্রতিভা বসুর বয়ানেই সেই বিষন্নতার সুরটাকে শোনা যাক:-
"সবই তো সত্য তবু কেন রাতের অন্ধকারে, দিনের স্তব্ধ প্রহরে, কালো হয়ে আসা সন্ধ্যায় বিমর্ষ বেলায় যে নেই সে এসে দাঁড়ায়, আমার কাছে, বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে যায়। এ থেকে মৃ/ত্যু ছাড়া মুক্তি নেই জানি, শুধু জানি না সেই মৃ/ত্যু কবে আমাকে দয়া করবে।"
ছয়.
রানু সোম যেমন ছড়িয়েছেন স্মৃতির রেণু, তেমিন প্রতিভা বসু ছড়িয়েছেন সাহিত্যের প্রভা। একটা জীবন তার, শুধু অনেকগুলো পরিচয়। প্রতিভা বসুর "জীবনের জলছবি" সেই সব পরিচয় বহন করে বর্ণাঢ্য একটা জীবনের গল্প হয়ে ওঠে। এই গল্প খুব সাধারন ভাবে তরতরিয়ে বেড়ে ওঠা বারান্দার মানিপ্লান্টের মতো। পিছনে তাকিয়ে দেখা সেই হাওয়াই মিটাইয়ের মতো গোলাপি মেঘ যেন,যা আপনার মুখে গলে যাবে হালকা মিষ্টি একটা স্বাদ নিয়ে। "জীবনের জলছবি" একজন রানু সোম এর গল্প না, একজন প্রতিভা বসুর গল্প না, একজন লেখিকার গল্প না, না বুদ্ধদেব বসুর সহধর্মিণীর গল্প।
"জীবনের জলছবি" একজন খুব মেয়ের গল্প। একজন সাধারন নারীর গল্প। একজন অসম্ভব সুন্দর মনের মানুষের গল্প। যার নাম - প্রতিভা বসু।