গ্রিক মিথোলজিতে প্রতিশোধের দেবী নেমেসিস। নেমেসিস শব্দটির বাংলা করলে হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ। বই শেষ করার পর নামটিকে সত্যিই সার্থক মনে হয়েছে। লেখকের লেখার ধরন বেশ ভালো, গল্প একটুকুও ঝুলে যায় নি। ছোট ছোট অধ্যায় দিয়ে বইটাকে ভাগ করা হয়েছে। অধ্যায়ের শেষের টুইস্টগুলো অসাধারণ। এগুলোর জন্য বইটা পড়ার মধ্যে বিরিতি নেওয়া খুব কঠিন। একেকটা অধ্যার শেষ করার পর মনে হয়, ‘এইতো, আর একটা…’ । প্রায় ২৭০ পৃষ্ঠার বইটা পড়তে একটুকুও বেগ পেতে হয় নি। আর একটা অধ্যায় শেষ করতে করতে কখন যে বইটা শেষ হয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি। খুনের যে বর্ননা দেওয়া হয়েছে সেটা এককথায় অসাধারণ।
.
গল্পের প্রোটাগনিস্ট জেফরি বেগ কে একটু দুর্বল মনে হয়েছে, এটা হয়ত লেখকের পরিকল্পনা মাফিকই হয়েছে। বেশ কিছু ক্লু সে মিস করে গেছে। প্রথমেই ইমেইলের বইটা পড়লেই ইনভেস্টিগেশন অনেক দূর এগিয়ে যেত। এবং সেটা করাই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু জেফরি বেগ তা করেন নি। তাছাড়া লেখকের মখের ওপর বালিশ দেখেও তারা যে সিধান্তহীনতায় ভুগেছে, সেটা খানিকটা আহাম্মকিই মনে হয়েছে। তবে আমার মনে হয়েছে লেখক এন্টাগনিস্ট বাস্টার্ড চরিত্রটিকে খুব শক্তিশালী ভাবে সৃষ্টি করতে চেয়েছেন, এবং করেছেন ও তাই। যদিও তার উপস্থিতি গল্পে সামান্যই, কিন্তু তার ব্যাক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা, ক্ষিপ্রতা, হিউমার অনেক উচু লেভেলের। তার সাথে তুলনা করলে জেফরি বেগকে ব্যার্থই মনে হয়। নামগুলো দেখে আবার এটাকে কোন বিদেশী প্রেক্ষাপটের থ্রিলার মনে করবেন না। এটি সম্পূর্ন দেশীয় প্রেক্ষাপটে রচিত। আর একটা কথা বাস্টার্ডের মতো এত দুরন্ধর একজন কীভাবে খুন করার পর লেখকের মুখের ওপর বালিশ রেখে দিয়ে যায়, এটা ভেবে অবাক হয়েছি।
.
মূল গল্পের পাশাপাশি সম্পর্কযুক্ত আরোও কিছু গল্প ছিল সেগুলো পড়তে বেশ মজা লেগেছে। গল্পের কিছুই বলতে চাচ্ছি না, পড়লেই বুঝতে পারবেন, তবে গল্পের পারিপার্শ্বিক কিছু চরিত্র বেশ ভালো লেগেছে। সি ই সিদ্দীকি কে বেশ ভালো লেগেছে আমার, যদিও তাকে ভালো লাগার কোন কারন আমার জানা নেই। তবে তাকে বেশ শক্তিশালী একটা চরিত্র বলেই মনে হয়েছে। তাছাড়া অমূল্য বাবু, পাভেল, প্রকাশক (নাম ভুলে গিয়েছি !) চরিত্র গুলোকেও লেখক বেশ ভালো ভাবে গঠন করেছেন।
.
এবার একটা খারাপ লাগা দিক নিয়ে বলি। গল্পের লেখক এর সাথে বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় লেখক, তর্কসাপেক্ষে সমসাময়িক সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের অসম্ভব রকমের মিল, যেটা কোন ভাবেই কো-ইন্সিডেন্স না। এটা পরিকল্পিত ভাবেই করা হয়েছে। আমি ওই লেখকের সাথে গল্পের লেখকের মোট নয়টা মিল পেয়েছি, বলার প্রয়োজন নেই, দুই এক পাতা পড়লেই বুঝতে পারবেন। কোন সত্যিকারের ক্যারেক্টারের সাথে ফিকশনাল কোন ক্যারেক্টারের মিল পাওয়া নেগেটিভ কিছু না, কিন্তু নেমেসিসে লেখক কে যেভাবে দেখিয়েছেন এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী কে যেভাবে দেখিয়েছেন, সেটা সত্যিই বিব্রতকর।নাজিম উদ্দীন কেন এটা করেছেন জানা নেই, তবে আমি জিনিসটা ভালোভাবে হজম করতে পারিনি। এমন না যে কেউ জনপ্রিয় হলেই তিনি খারাপ হতে পারবেন না বিষয়টা এমন না, তবে জিনিসটাকে এভাবে প্রেজেন্ট করাকে ঠিক বলে মনে হয়নি। আর আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছি একটা জিনিস দেখে যে, এই বইটা লেখা হয়েছে ওই ‘লেখক’এর মৃত্যুর আগে।
.
বইয়ে কিছু বানান ভুল ছিল, তবে আমার পড়তে সমস্যা হয় নি। প্রচ্ছটা খুব এট্রাক্টিভ এবং মানানসই। ভিতরের অধ্যায় শুরুর ইলাস্ট্রেশনগুলো অনেক সুন্দর এবং প্রাসঙ্গিক।
ওভারঅল, বেশ ভালো লেগেছে বইটা। সিরিজটা শুরু করেছিলাম অনেক এক্সপেকটেশন নিয়ে। নেমেসিস হতাশ করে নি আমাকে। পরবর্তী বইগুলোও হতাশ করবে না, আশা করি।