গদাইয়ের কারবার সাপের বিষ আর জড়িবুটি নিয়ে। তাতে অবশ্য খুব রোজগার হয় না, তবে একার পেট কষ্টেসৃষ্টে চলে যায়। প্রতাপগড়ের জঙ্গলে গাছগাছড়ার খোঁজ করে হয়রান হয়ে পুরনো শিবমন্দিরের চাতালে শুয়ে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙ্গে এক বিভীষণ সাধুর বল্লমের খোঁচা খেয়ে। অশীতিপর সাধুর সঙ্গী বনে যায় গদাই, কতকটা লোভে, কতকটা কৌতূহলে। সাধুর অনেক বয়স, ভীমরতিও একটু ধরেছে, কাজে ভুলভাল হয়। সাধু এই গাঁয়ে এসেছে কী যেন এক দানব কী দত্যিকে খুঁজতে। সে ছাড়া অবস্থায় থাকলে নাকি গাঁয়ের ভীষণ সর্বনাশ হয়ে যাবে!
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
উহু। অনন্যসাধারণ এই গল্পটি ও। অনেক আনন্দ নিয়েই পড়েছি গল্প টি। ভালো লেগেছে সবগুলো চরিত্রকেই। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দানু। সে খুব লম্বা, রোগা আর ঢ্যাঙা। নগেনবাবুর মেয়ের বাড়িতে কাজ করে, বিনিময়ে মাথা গোজার ঠাই আর একটু খাদ্য পেয়েই খুশি। পাড়ার ফুটবল ক্লাবে প্লেয়ার শর্ট থাকায় একদিন দানুকে নামানো হয়। লম্বা দানু দৌড়াতে গিয়ে বারবার পড়ে যায়, ফের উঠে আবার দৌড়ায়।
হেড করলে বল বারের উপর দিয়ে চলে যায়। ওর কাণ্ডকারখানায় সবাই হেসে খুন। তারপরও কিভাবে যেন দুটা গোল দিয়ে দেয় দানু। আন্তঃজেলা লিগের খেলাতেও হবিবপুরের বিপক্ষে পায়েসপুরের হয়ে খেলতে নামে দানু। সেদিনও পাঁচ গোল দিয়ে জিতিয়ে আনে পায়েসপুর কে। এতো কেবল একটা চরিত্র। বাকিগুলো আমার মনে হয় আরো বেশি ইন্টারেস্টিং।
শীর্ষেন্দুর রসিকতাগুলো কেন যেন ঠিক খপ করে ধরতে পারি না, আঙুলের ফাঁক-টাক গলে বেরিয়ে যায়। বেরোবার আগে আবার একটু সুড়সুড়িও দিয়ে যায়, কাজেই হাসিও পায় বটে। জটাধারী সাধু এসে ক্যাঁক করে দশাসই একটা পালোয়ানকে ধরে নিয়ে যাবে—এ চিন্তা হাস্যকর বটে, কিন্তু তাই নিয়ে সবাই যখন মনটন খারাপ করে চণ্ডীমণ্ডপে জড় হয়—তখন আবার হাস্যরসটা উধাও হয়ে যায়। তবু একটা হাসির বুদ্বুদ উঠতে থাকে, কারণ পালোয়ানের বাবা ধামায় করে মুক্তিপণের টাকা ‘কালেকশন’ শুরু করে, কারণ সাধু তো মুক্তিপণ চাইলেও চাইতে পারে, ‘আগে থেকে প্রস্তুত না থাকলেই বিপদ!’
কিংবা, সাধু যখন গম্ভীর গলায় বলে, সম্ভোগ খোঁজা বাদ দিয়ে পরমার্থ খুঁজতে, তখন থুতনিতে হাত রেখে আমাদেরও ভাবতে হয়, বটে, পরমার্থই তো খোঁজা উচিত। এবং পরের লাইনেই ফিক করে হাসিটা বেরিয়ে আসে, যখন শিষ্য হাতজোড় করে বলে, আজ্ঞে, পরমার্থও বড় ‘জব্বর’ জিনিস, তবে আগে আগে সম্ভোগ ভোগ না করলে পরমার্থটা ‘ফেকলু’ হয়ে যাবে।
বলিহারি শীর্ষেন্দু, পরমার্থ আর কবে কার লেখায় এভাবে ফেকলু হয়ে গেছে, জানি না! :3
আর...আর, সাথে কোথায় যেন একটা বার্তাও থাকে। গল্পের শেষে বুড়ো সাধু যখন দাড়ি-গোঁফের ফাঁক দিয়ে মৃদু হেসে বলে, ‘সাধন-ভজন কী আর একরকম রে? ...লোভটোভ করিসনি বাবা, দুনিয়াটাকে একটু ভালবাসিস, আমাকে মনে রাখিস, আর শোন, অল্পে আনন্দ পেতে শিখে নিস,’ কিংবা এই অদ্ভুতুড়ে সিরিজেরই কোন এক গল্পে যেন পড়লাম, ছাই ভুলে যাচ্ছি সব কেবল, সেই গল্পে সারারাত ধরে চার্চের ভেতরে ছোট্ট মেয়েটা দৌঁড়ে বেড়াচ্ছে, সামনে একটা বল গড়িয়ে যাচ্ছে, আর মেয়েটা কেবলই দৌঁড়াচ্ছে, গল্পটার একেবারে শেষে এসে যখন শীর্ষেন্দু দেখালেন, চার্চের মাথায় সূর্যটা উঠছে....তখন কোথায় যেন একটা মাভৈঃ ডাক শুনতে পাই, যেন, যা কিছু সুন্দর, যা কিছু ভালো—এসব যেন আমাদের ঘিরে রাখে, কিংবা আমাদেরকে না হোক, অন্তত পদ্মকে, অন্তত অরিত্রকে....আমি যেন স্পষ্ট শুনতে পাই।
কার্তিক মাসের এই সকালবেলাটায় ঝলমলে রোদ আর মিঠে হাওয়ায় পায়েসপুরের চারদিকেই একটা প্রসন্ন ভাব। সদানন্দ গান গেয়ে ভিক্ষা করতে বেরিয়েছে। তার গলায় সুর নেই বটে, কিন্তু চেষ্টা আছে। কেপুবাবু তার খোলা বারান্দায় মোড়া পেতে বসে একটা খবরের কাগজ পড়ছেন, যদিও কাগজখানা সাত দিনের পুরনো। আসলে তিনি পড়ছেন না, ওইভাবে রোজই তিনি চারদিকে নজর রাখেন। রাধাগোবিন্দবাবু তার বাইরের ঘরে জানালার কাছে টেবিলের ধারে চেয়ার পেতে বসে আত্মমগ্ন হয়ে তার আত্মজীবনী লিখছেন। প্রথমে বইয়ের নাম দিয়েছিলেন ‘এক বীরের আত্মকথা’। তারপর সতেরোবার নাম বদল করে ইদানীং নাম দিয়েছেন ‘দা*রোগার দীর্ঘশ্বাস’।
আজ সকালে হারানবাবু তার চশমা খুঁজে পাচ্ছেন না। গতকাল তার নস্যির ডিবে হারিয়েছিল। পরশু হারিয়েছিল তার হাওয়াই চটির একটা পাটি। তার আগের দিন গায়েব হয়েছিল তার হাতঘড়ি। হারানবাবুর নাম মোটেই হারান নয়। তার নাম হারাধন খাড়া। কিন্তু প্রায়ই জিনিস হারিয়ে ফেলেন বলে লোকে তার নাম রেখেছে হারান। কদমতলায় বসে মদনপাগলা একটা ঝাটার কাঠি দিয়ে মাটিতে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে বলছে, “দুইয়ে-দুইয়ে চার হয় সে না হয় বুঝলুম, তিনে দুইয়ে পাঁচ হয় এটাও না হয় মেনে নেওয়া গেল, কিন্তু চারটে জিলিপির সঙ্গে দু’টো শিঙাড়া যোগ করলে কেমন হয় সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।”
তারক তর্কালঙ্কার বাজার করে ফিরছিল, উলটো দিক থেকে আসছিল সবজান্তা জয়লাল। দুজন দুজনকে দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো। আসলে তারক আর জয়লালের ইদানীং ঝগড়ার জের চলছে। কেউ কারও মুখদর্শন করে না। ‘ইন্ধনহীন রন্ধন’ নামে এক আশ্চর্য উনুন আবিষ্কার করে প্রযুক্তিবিদ হলধর ঘোষ সারা গায়ে হুলস্থুল ফেলে দিয়েছিলেন। গত কয়েকদিন একটি আবিষ্কার নিয়ে মগ্ন ছিলেন হলধর। কাল সারারাত জেগে আজ ভোরেই তার কাজ শেষ হয়েছে। বাইরের ঘরে খগেন তপাদার, নিমাই বিশ্বাস, ব্ৰজেন বোস, গজপতি রায়, নগেন সর্বাধিকারী প্রমুখ গাঁয়ের মাথা-মাথা লোকেরা বসে গুলতানি করছেন। রোজই করেন। কারণ, হলধরের বাড়িতে রোজই সকালে ফুরফুরে চিড়েভাজা আর সুগন্ধি চায়ের ব্যবস্থা থাকে।
দাড়ি-গোঁফ এবং চিন্তায় সমাচ্ছন্ন হয়ে নগেন সর্বাধিকারী এতক্ষণ এক পাশে চুপ করে বসে ছিলেন। বলতে কী, তিনিই পায়েসপুরের সবচেয়ে বলিয়ে-কইয়ে আর হাসিখুশি লোক। অথচ তার মুখে হাসি নেই, কথা নেই দেখে সবাই চিন্তায় পড়ে যায়। অনেক জোরাজুরি করা হলো, প্রথমে তো কিছুতেই বলবেন না শেষে শোনালেন এক আশ্চর্য কথা। তার বাবাকে নাকি একবার এক সাধু একটা প্রদীপ দিয়েছিলেন। প্রদীপ নাকি বেশ পয়মন্ত সাধুবাবার ভাষ্য অনুযায়ী। তো সেই প্রদীপ বংশ পরম্পরায় এতদিন পর্যন্ত ছিল নগেন সর্বাধিকারীর বাড়িতে। চো*র এসে জিনিসপত্রের সাথে সেটাও চু*রি করে নিয়েছে। এখন এত বছর পর সাধুবাবা এসেছেন তার প্রদীপ ফিরিয়ে নিতে। না দিতে পারলে অভিশাপ দিয়ে যদি সব ধ্বংস করে দেন! কিন্তু প্রদীপই তো নেই।
আবার ওদিকে নগেন সর্বাধিকারীর মেয়ে সরযু দেবীর বাড়িতে দানুর আগমন ঘটে। তাকে নিয়েও রহস্যের শেষ নেই। জড়িবুটি বিক্রি করা গরীব গদাই পেল এক সাধুবাবার সন্ধান জঙ্গলে। তিনিই বা কে? লোকটির আশ্চর্য ক্ষমতা আছে!
🍗পাঠ প্রতিক্রিয়া 🍗
"উঁহু" শব্দ দ্বারা আমরা আসলে সাধারণত না বোধক বিষয়কেই বুঝি। সাধুবাবার ঝোলা থেকে ওই গমগমে গলায় উঁহু বলে কে গদাই কে ঝোলায় হাত দিতে নিষেধ করলো তারও আগে জানতে হবে গোটা বইটি আসলে কোন বিষয়ে। এই গোটা সিরিজটিই কিশোর উপযোগী এবং গল্পের প্লটগুলো ঠিক সেইভাবে তৈরি। এবং অদ্ভুতুড়ে সিরিজের এই "উঁহু" বইটি আসলে আমার কাছে ভালো লেগেছে মোটামুটি��� পড়তে গিয়ে অনেকটা পরিচিত এক গল্পের সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম। তবে এই সিরিজের সবগুলো বইয়ের ক্ষেত্রেই বর্ণনায় শীর্ষেন্দু দারুন কাজ দেখিয়েছেন। শব্দচয়ন আমার কাছে উপাদেয় লাগলো। বলা যায় অতি সুস্বাদু বর্ণনা। পড়তে তাই বেশ ভালো লাগে।
কিশোর উপযোগী প্লট হিসেবে দারুণ। বড়দের ভালো লাগবে না বোধহয় তেমন। এখানে চরিত্রগুলোর মধ্যে দানুকে বেশ পছন্দ হয়েছে। রোগা ঢ্যাঙা ছেলেটিকে আমি আবার কী ভেবেছিলাম! পুরো বইয়ে দানুর উপস্থিতি ভালো লাগলো। এছাড়া বৃদ্ধ সাধুবাবার ভুলভাল কর্মকাণ্ড সেটাও বেশ খাসা। কয়েক জায়গায় বেশ হাসি পেয়েছে। এবং বইটি শেষ করেও ভালো লেগেছে। অদ্ভুতুড়ে সিরিজের এই এক গুণ আছে, মন ভালো করে দেয়।
অদ্ভুতুড়ে সমগ্রের চার নম্বর বইয়ের বোধয় এইটাই সবচেয়ে সাধারণ লেখা। একেবারে ঈশপের উপকথা হয়ে গেলো। কিন্তু তাই বা মন্দ কী? খুব সাধারণ অদ্ভুতুড়েও একটা গোটা আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকীর সেরা গল্প হয়। সেজন্যই - পাঁচে চার।
"পায়েসপুর" নামটা যেন "অদ্ভুতুড়ে সিরিজ" নামের স্বার্থকতা প্রমান দিচ্ছে। নাহলে পায়েসপুর নামের কোনো গ্রামের নাম আমি এখনো পর্যন্ত শুনিনি।
নাম যেমন অদ্ভুত তা সে গাঁয়ের মানুষ গুলোও তেমন অদ্ভুত চরিত্রের। হলধর ঘোষ একজন সায়েন্টিস্ট। নানা কিছু আবিষ্কার করেন। তবে দুঃখের বিষয় শেষ অবধি কোনো আবিষ্কারই সফল হয় না। তবু তাঁর গবেষণা থেমে থাকে না।
প্রতহ্য প্রভাতে তাঁর বাড়ির উঠোনে গাঁয়ের মাথা - মাথা লোকগুলো জড়ো হয় আড্ডার আশায়। আড্ডায় প্রধান ভুমিকা রাখে সুগন্ধি চা আর চিঁড়েভাজা। মূলত সেকারণেই তাঁরা হলধরের বাড়ি আসে। হলধর ঘোষ যখন মাঝে মাঝে ইউরেকা ইউরেকা বলে চিৎকার করতে থাকে তখন তাদের তেমন একটা উৎসাহী দেখা যায় না। কারন এটা নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। বেশী কিছু বলে না, বলতে গেলে যদি আবার চা আর চিঁড়াভাজা কপাল থেকে উঠে যায় এই ভয়ে।
আড্ডার প্রবীণ ব্যাক্তি 'নগেন সর্বাধিকারী' রোজ রোজ সভায় আসলেও আজ কিছুদিন তেমন একটা রাও করেন না। কেমন যেন নিঁতিয়ে থাকেন। এমনিতে মানুষটা বেশ রসিক। মন খারাপের বেশ কয়েকটি কারন সভাসদরা বলেনও। সব গুলোই সত্যি। কিন্তু তারপরও আসল কারন উদ্ধার হয় না।
একসময় নিজের অজান্তেই নগেন বাবুর মুখ ফসকে কিছু অদ্ভুত কথা বেরিয়ে যায়। আর তক্ষুনি বাকিরা চেপে ধরেন তাঁকে ঝেড়ে কাঁশতে। তখন বলবো না, বলবো না করেও বলেদেন… স্বাভাবিক ভাবেই কেউ বিশ্বাস করে না। তবু মুখের উপর কিচ্ছু না বলে বরং শুনে যান বাকি ঘটনা।
"হারান বাবু"। নাম তাঁর হারাধন তবে, তিনি প্রায়সই জিনিস হারান বলেই ঐ নামকরন সকলের। সকালে পায়ের জুতো হারানতো বিকালে হারান তাঁর ছাতা। কখন কোন জিনিস কোথায় রাখেন তা আর মনে রাখতে পারেন না।
তবে তিনি তাঁর গ্রাম 'পায়েসপুরের' খুব ভক্ত। তিনি চান তাঁর গাঁয়ের নাম একদিন পৃথিবীবাসির মুখে মুখে থাকবে। তার কিছু কারনও আছে, এই গ্রামে আছে মুগুর ভাজা বডি বিল্ডার 'বটেশ্বর' (যদিও তার দ্বারা এখন পর্যন্ত কোনো উপকার হয়নি কারো বা বলতে গেলে তেমন সুযোগ কখনো আসেনি)। আছেন বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী হলধর বাবু (যদিও কোনো আবিষ্কার এখনো সফল না। তবে তিনি মানেন কোনো একদিন কিছু একটা ঘটে যাবে)। তাঁর গ্রামে আছে মনভুলানো 'কুমড়া', বিশ্ব নন্দিত 'গামছা' দেশ বিখ্যাত 'মাটির পাতিল'। এত কিছু যার গ্রামে থাকে সে গ্রামতো বিখ্যাত হবেই হবে।
কিন্তু হঠাৎ করে কোথাথেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলো 'দানু' নামের একটি ছেলে। পাটকাঠির মত সরস শরীর, তাল গাছের মত লম্বা। বগার মত লম্বা লম্বা পা নিয়ে যখন ফুটবল নিয়ে দৌড়ায় তখন কেমন কার্টুনের মত লাগে। "প্রানারাম" দানুকে প্রথম এই পাড়ায় আনে। এনে রাখে তার পিসির কাছে। প্রানারাম নগেন বাবুর নাতি এবং পায়েসপুর ফুটবল টিমের অধিনায়ক।
দানু কেমন করিৎকর্মা ছেলে, একদিনে পুকুরের সব কচুরিপানা তুলে ফেলে, দুই দিনেই ১০/২০টা নারকেল গাছের নারকেল পেড়ে ফেলে। সেই দানুই আবার পায়েসপুর ফুটবল টিমের হয়ে 'হবিবপুর' ফুটবল দলকে পাঁচ গোল দিয়ে জিতে যায়। কিন্তু এই দানুটা কে? কেন সে এই গাঁয়ে আসলো?
এদিকে হঠাৎ করে গ্রামে এক সাধুবাবার আবির্ভাব। তিনি নগেন বাবুকে শাসিয়ে যান, এক সপ্তাহের মধ্য তাঁর জিনিস তাঁকে ফিরিয়ে না দিলে স্বপরিবার ধ্বংস হয়ে যাবেন। সাধুর বর্তামন অবস্থান পায়েসপুরের পাশেই প্রতাপগড়ের জঙ্গলে। তার নতুন শিষ্য বুটিজড়ি ফেরিওয়ালা গদাই। স্বভাবে লোভী হলেও সে মানুষ ভালো।
সাধুর দাবি তার বয়স নাকি ৫০০ ছাড়িয়ছে। কে এই জটাধারী, রক্তলাল চক্ষু সাধুবাবা? কি করছেন তিনি এই প্রতাপগড় জঙ্গলে? কেনইবা ধরে আনলেন পায়েসপুরের সাবেক পুলিশ রাধাগোবিন্দ আর বডি বিল্ডার বটেশ্বর কে? কি আছে তাঁর কাছে যার কারনে তাঁর শিষ্য হলো গদাই? সাধুর ঝোলাতে কি এমন আছে যে গদাই সাধুর অগোচরে হাত দিতে গেলেই ভিতর থেকে বজ্রকন্ঠে হুঁশিয়ারি আসে "উঁহু"...
---
'শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের' রচিত 'আনন্দ পাবলিশার্স' থেকে ১০৪ পৃষ্ঠার বই " উঁহু" যদিও কিশোর উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত, তবু আমি খুব আনন্দ নিয়ে পড়েছি। আমার মতে সকলেই এই 'অদ্ভুতুড়ে সিরিজ'টা পড়তে পারেন। সকলের কাছেই গ্রহনযোগ্যতা পাবে বলে আশাকরি। কারন যেমন তাঁর লেখনশৈলী তেমন তাঁর শব্দচয়ন। হাস্যরস যা আছে তা সকলেই উপভোগ করারমত।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এমন এক পরশ পাথর, তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন সেটাই সোনায় পরিনত হয়েছে। আমাদের সৌভাগ্যযে তিনি এখনো লিখে যাচ্ছেন। তাঁকে নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। কারন ভালো পাঠক মানেই উনার সম্পর্কে অবগত থাকেন।
বইটা হয়তো পড়া হতো না আমার, কিন্তু গ্রুপে নিভিয়া হক এবং রুপন্তি শাহরিনের রিভিউ পড়ে আমার পাঠক মন বইটা পড়তে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ ধন্যবাদ জানাই তাঁদের।
দারুণ একটি গল্প। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এই অদ্ভুতুড়ে সিরিজের একটি মজার বিষয় হলো যে জায়গাগুলোতে গল্পের প্রেক্ষাপটটি সংগটিত হয় সেই জায়গাগুলোর নামগুলো খুব মজার। যেমন এই গল্পে যে গ্রামকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি আবর্তিত হয়েছে সেটি হলো 'পায়েসপুর'। ভীষণ সুন্দর একটি নাম।
গল্পের চরিত্রগুলো খুব সার্থকতার সাথে চরিত্রায়িত হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে মজার যে চরিত্রটি 'দানো' তার সাথে গল্পকার সঠিক বিচার করেননি। চরিত্রটি এমন যে নিজেই হতে পারত Pivotal Character। Climax-এ গিয়ে তেমনটা মনে হলেও শেষে গিয়ে একেবারে নিষ্প্রভ থেকে গেছে চরিত্রটি। খুবই প্রানবন্ত একটি চরিত্র।
আর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের যে কয়টি গল্প এখন পর্যন্ত পড়া হয়েছে তার মধ্যে এটিতে 'ভূত' হিসেবে কোনো চরিত্র পাওয়া যায়নি। তবে অতি মানবীয় চরিত্রের দেখা মেলে। সেটা ভূত না হলেও তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ভুতুড়ে বল্লে হয়তো ভুল হবে না খুব একটা।
আর গল্পের নামকরণের একটি চরম সার্থকতা এই গল্পের অন্তে প্রকাশিত হয়। নামকরণটির সাথে গল্পের একটি Socio-psychological meaning উপলব্ধ হয়।
বারবার পড়ি। বারবার ফিরে আসি। জীবনে কখনও কোনদিকে যাওয়ার দোটানায় পড়ি, সহজ অথচ আমোরাল রাস্তাটা ধরলেই, কানের কাছে কে যেন জলদ-গম্ভীর-অমিতাভ-বচ্চন কন্ঠে বলে ওঠে "উঁহু" !
একই ধরণের কাহিনী, কিন্তু শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজ যখন, উদ্ভট সব কাণ্ডকারখানা আর লেখার জোরেই পড়ে যাওয়া যায়। সিরিজের অন্য বইগুলোর সাথে তুলনা করলে, আমার রেটিং ৩।
২০২৪ সালে পড়া প্রথম বই যদিও শুরু করেছিলাম ৩১ ডিসেম্বর ২৩ কিন্তু এতদিনে এসে শেষ করলাম। অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বাকি বইয়ের মতোই এটাও দারুণ উপভোগ্য সাথে হাস্যরসের মাধ্যমে কিছু নৈতিক উপদেশও ছিল।