বীরব্রতী ভাসিয়া রূপের ডালি খেলা পাশা সেদভের উত্তরাধিকার কোথায় আকাশের শুরু রুটির ফুল কিজিল কাঠের ছড়ি আমার জানা এক জলহস্তী উর্স আর কেট চলল তারা পাশাপাশি আমার বোলতাটি পালা বদল স্কেট্স্ বগলে ছেলেটা
৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় আব্বা এ বইটা নিয়ে এসেছিলো আমার জন্য। প্রবল উৎসাহ নিয়ে পড়তে যেয়েই হোচট। কেমন যেন গল্পগুলো। বিষণ্ণ, ঘটনার ঘনঘটা নেই, নেই কোনো অভিযান বা মজার কাণ্ড। এ কেমনধারা ছোটদের বই? এতো বিরক্ত হয়েছিলাম তখন! কিন্তু মনের একটা অংশ জানতো এসব কাহিনির মধ্যে কিছু একটা আছে, ধরতে পারা যায় না, তবে আছে। ভাসিয়া, নিনকা, সেদকা, স্কেটিং করা ছেলেটা আর আহত সৈনিকের কথা আবছা মনে ছিলো। আগের বইটা হারিয়ে গেছে, এই এতোদিন পর নীলক্ষেতে "রূপের ডালি খেলা" খুঁজে পেলাম। ইয়াকভলেভ ছোটদের জন্য লিখেছেন।কিন্তু তার গল্পে ছেলেভুলানো কিছু নেই। ইয়াকভলেভের সৃষ্ট জগৎ নির্মম, এখানে একজনের ভালো কাজের পুরস্কার পায় অন্যে, আহত বাবাকে রেখে ছেলে দিব্যি চলে যায়, কারো চেহারা বা শরীর নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য করতে বাঁধে না অন্যদের। কিন্তু এটা মুদ্রার এক পিঠ। অন্য পিঠে আছে মানুষের জন্য ভালোবাসা ও কর্তব্যপরায়ণতা, অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের সখ্য, অসম বন্ধুত্ব আর অনিঃশেষ আশাবাদ। শেষ গল্প "স্কেটস হাতে ছেলেটা"য় পরস্পরবিরোধী অনুভূতিতে পূর্ণ, ঘটনাবহুল ক্লান্তিকর দিনের শেষে শীতে কাতর ছেলেটা দেখতে পায় "এসে যাচ্ছে বসন্ত, শিগগিরই ফুটে উঠবে সেই সবুজ পাতাগুলো।" আসবে বসন্ত। কেটে যাবে সব জড়তা, মুছে যাবে সব বিষণ্ণতা। আসবে বসন্ত। আদতেই আসবে তো?
এ বইটার কথা আমি সহজে কাউকে বলি না, খুব বেশি মানুষকে পড়তেও বলিনি। ভয় হয় যদি পড়ে একটা বাজে মন্তব্য করে বসে। স্বল্প পরিচিত এক লেখকের অল্প পরিচিত এক বই, বিশ্ব সাহিত্যে একশটা বইয়ের নাম নিলেও যার নাম আসে না- এমন বই নিয়ে বাগাড়ম্বর করাও ভাল চোখে না দেখার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু সাহস করে বলে ফেলি-এ বইয়ের গল্পের মত বিশুদ্ধ গল্প আমি আর পড়িনি, রুচি বদলে কত প্রিয় বই অপ্রিয়ের খাতায় চলে গেছে। কিন্তু আজও এই বইটি আমার পড়া সর্বশ্রেষ্ঠ গল্প সংকলন। কেন- সে ব্যাখ্যা আমার জানা নেই।
All grown-up were once children, but only few of them remember it...
রাদুগা-প্রগতির বইগুলোর ব্যাপারে আমার বাড়াবাড়ি আদিখ্যেতা নিয়ে কতিপয় ঘনিষ্ঠ নিন্দুক দুষ্টু দুষ্টু কথা বলে থাকে, যথাক্রমে; খুকিপনা আনলিমিটেড, শিশুসুলভ বইতেই তো মজবেন, বড় তো আসলে হন নাই এখনো ইত্যাদি। কবি বলেছেন 'কা তব কান্তা', মানে পৃথিবীতে কে কাহার, মানে পরের কথায় কান দিতে নেই। আমি যে এই আমি, সেটা এই রুপকথাগুলো সমেত-ই, বাদ দিয়ে তো নয়। :)
রূপের ডালি খেলা অতি পছন্দের বই, মালাকাইটের ঝাঁপির চাইতেও বেশি। আমার কপিটা অনেক পুরোনো, যাত্রাবাড়ির 'মোমেনবাগ পাঠাগার ও সমাজকল্যাণ সংগঠনের' সদস্য ছিল একসময়। কোন বোকচন্দর বা অসাধু পড়ুয়া বিক্রি করে দিয়েছিল হয়তো ঠোঙাওয়ালার ঝুড়িতে। হায়, মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর, নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর... এরপর শিউলির হাতে, শাহানার মারফত, উপহার। ফরিদাবাদ, বাহাদুর লেন, ঢাকার জেইড.এইচ.সিরাজীর সংগ্রহে ছিল কিছুদিন, সিলমোহরের ছাপ তাই বলে। শেষমেশ নীলক্ষেতের ফুটপাথ, সেখান থেকে রিসার শেলফে। ভাগ্যিস! :D
১২টা গল্প নিয়ে, ১২১ পাতার বই। সবচেয়ে প্রিয় গল্প দুটো, কোথায় আকাশের শুরু আর রূপের ডালি খেলা।
খোয়ারে বাঁধানো পাড়ার আঙিনাতে রোজ জমতো ছেলেমেয়েদের খেলা। পপলার গাছের নিচে লুকোচুরি, ডাংগুলি, বল ছোঁড়াছুড়ির ফাঁকফোকরে রোজ কেউ না কেউ ধুয়ো তুলতো, চল.. রূপের ডালি খেলা খেলি। সাত নম্বর ফ্ল্যাটের গুণী মেয়ে নিন্কা, যার একমাত্র আয়না ছিলো সঙ্গী খেলুড়েদের অমলিন মিথ্যে স্তুতি, রোজ বাছাই হতো সে খেলার রানী হিসেবে। বোকা মেয়েটা ভুলেই গিয়েছিল, আদতে সে রূপহীনা, ছুলির দাগ গালে, খাঁদা নাক। জানতোই না আসলে, আসল রূপসী কাদের বলে।
মাঝে মাঝে নান্দনিকতা বা সৌন্দর্যবোধ জিনিসটা আদতে একধরনের অভিশাপ-ই মনে হয় আমার কাছে, বিশেষত মেয়ে হয়ে জন্মে। মনে আছে, 'কালো, তা সে যতোই কালো হোক' নামে এক ব্লগপোস্ট নিয়ে তক্কো হয়েছিল আরেক ব্লগারের সংগে। গায়ের রং নিয়ে আজীবন মনে কতো 'বেতা' পেয়েছি টাইপের সে লেখায় লোকজন খুব চোখ মুছে দিচ্ছিল লেখিকার, কালো হলেও তুমি কত্তো সুন্দর আপ্পি... হেহ! :3
শোনেন, সুন্দর মানে জাস্ট সুন্দর। যা আছে আর যা নেই, সবকিছুই নিয়েই। সিম্পল। শ্যামলা হলেও সুইট, মোটা হলেও কিউট, বেঁটে হলেও মায়াবতী; এই 'হলেও' শব্দবন্ধ মাথা থেকে বের করুন,তারপর সিমপ্যাথি দিতে/নিতে নামুন। লাখ লাখ বেকুব দেশে-বিদেশে না থাকলে এমনি এমনি তো আর ফেয়ার এন্ড লাভলি স্টুপিড মডেল হিসেবে ইমামি গৌতমকে পয়সা দেয় না। আহা, কী মোহনীয় ভাষায় বিজ্ঞাপনের বেসাতি বাজে--এই নিন জাদুর মলম, মাত্র ৭দিনে দেখুন ভেলকি! খাপসুরাত হুর, আব বাহার আও, দেখাও তুমহারি গোরে নিখারকি ঝালাক.. এহহে, শিশুতোষ বইতে ফেমিনিজম ঠেসে দিচ্ছি যে। ষাট ষাট!
আকাশের শুরু কোথায় গল্পে পরিচয় হয়েছিল ছোট্ট আরেকটা বোকা ছেলের সাথে। ছড়ে যাওয়া রক্তমাখা তার হাঁটু, বড়ো বড়ো কালচে চোখের মণি, হাতে বালিশের ওয়াড় দিয়ে বানানো এইটুকুনি ভেজা, ন্যাতাকানি প্যারাশুট। ও নিয়েই ঝাঁপ দিয়েছিল ছেলেটা, আকাশ নাগালে পাবে বলে। আধ গজ কাপড়ের ঐ প্যারাশুট নিয়ে পাঁচতলার ছাদ থেকে ঝাঁপাতেও ওর বাধতো না, ভয় পেতেই এখনো শেখেনি যে! যতক্ষণ জানো না ভয় কাকে বলে, ততোক্ষণ ভয় কাকেই বা?
তাসনীম ভাইয়া জিজ্ঞেস করেছিলেন কিসে ভয় পাও? বেড়াল, বিছে বা তেলাপোকা টাইপ ভয় নয়, জাগতিক ভয়। ভয় পাই অনিশ্চয়তা, ভয় নিঃসঙ্গতায়, সবচেয়ে বেশি ভয় পরনির্ভরশীলতাকে। আরো বেশি ভয় শৈশব হারানোর। বুকের ভেতর যাকে নিয়ে ঘুরি, নিন্কার জন্য যার এখনো চোখ ভিজে যায় কিংবা সাগরতীরে'র সাশুক...
জীবন; সতত উদযাপন কারো কাছে, কারো কাছে নিতান্ত অনিচ্ছুক যাপন বা বহন। শৈশব হারিয়ে গেলে জীবন বহনের পারানি কড়ির ঝুড়িতে আর থাকবে কী? :)
চমৎকার সব গল্প। সমবয়সী আর পূর্বপ্রাজন্মিকদের প্রতি সমানুভূতি একটা সমাজের জন্যে খুব জরুরি, বেশিরভাগ গল্পেই চরিত্রগুলোয় সে সমানুভূতির উদয়পর্ব দেখানো হয়েছে। "কিজিল কাঠের ছড়ি" গল্পে বুড়ো যখন ছেলেটাকে বলে, "তুই একটা মানুষ", সেটাই যেন এ সংকলনের মূলসুর: মানুষ সে-ই, যে তার সাথে জগৎ ভাগ করে নেয়া আরেকটা মানুষের ইষ্টানিষ্ট নিয়ে ভাবে। "রূপের ডালি খেলা" আর "রুটির ফুল" গল্পদুটো একেবারে বুকে গিয়ে বেঁধে। "বীরব্রতী ভাসিয়া", "কোথায় আকাশের শুরু" আর "চলল তারা পাশাপাশি"ও খুব ভালো লেগেছে।
কি বিষণ্ণ রকমের সুন্দর একেকটা গল্প। আচ্ছা রাশান গল্পগুলোর অনুবাদ একইরকম হয় কেন? এটা কি অনুবাদকদ��র গুণ নাকি রাশান ভাষাটাই এমন? ফুটপাত থেকে কেনা ৫০ টাকার এই বইটা একটা কুঁড়িয়ে পাওয়া রত্ন আমার জন্য। কোন এক পুরনো বইয়ের গ্রুপে দেখলাম ৯০০ টাকায় শোচনীয় অবস্থার একই বই বিক্রি হচ্ছে। টাকাটা ব্যপার না, এন্টিকতা (!) হচ্ছে আসল। যাই হোক, রাশান গল্পের / সাহিত্যের প্রতি আলাদা টান আছে, মোহ আছে। নিজে যদি রাশান ভাষা জানতাম কি মজা নিয়েই না পড়তাম। এর আগে আন্না কারেনিনা পড়তে গিয়ে মনে হয়েছিল একই কথা। সেতো এখন আর পারবোনা। তবে এমন অনুবাদ এ রসগোল্লা পেলে আফসোস নেই।
পাঁচ তারকা না দিয়ে সত্যিই পারা গেল না। প্রথম দিকটা ঝিমঝিমে লাগলেও, এ ধরণের গল্প সংকলন পড়ার মুড না থাকলেও, অনুবাদকের সর্বনাম পদ ব্যবহারের আধিক্য প্রাথমিক ভাবে চোখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত পাঁচ তারকাই দিতে হলো।
আমার চোখে পাঁচ থেকে ছয়টি গল্প অনন্য, জেগুলোর জন্য এই বইটি পাঁচ তারা রেটিং পাবার যোগ্যতা এক অর্থে ছিনিয়ে নিয়েছে...
১ - স্কেটস বগলে ছেলেটি। ২ - চলল তারা পাশাপাশি। ৩ - পালা বদল। ৪ - রূপের ডালি খেলা। ৫ - রুটির ফুল। ৬ - কিজিল কাঠের ছড়ি।
কোথায় আকাশ শুরু, গল্পটাও এখন খারাপ মনে হচ্ছে না। বাকিগুলো তেমন একটা টানেনি। ভালো লাগার ক্রম অনুয়ায়ি গল্পের তালিকা উপরে দিয়েছি।
অনুবাদকের দক্ষতা ঠিক কতটা তা শেষ গল্পে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। কী সাবলীল ভাষা, কী নিপুন বর্ণনা! সত্যিই অনবদ্য। ননী ভৌমিকের অনুবাদের বিচার করতে যাওয়া আমার মত নগণ্য পাঠকের জন্য ধৃষ্টতার পর্যায়ে পড়ে। সর্বনাম ব্যবহারে আধিক্য? ফুঁ! উড়িয়ে দিলাম ক্রিটিসিজম, এমন সুন্দর অনুবাদ যে করতে পারে তার সাত খুন না একশ খুন মাফ। :D
নাহ সত্যিই, দারুণ একটা বই পড়লাম। জীবনবোধের এক অসাধারণ গুচ্ছ এই বইটি। সবার সংগ্রহ করে পড়া উচিত।
শীতটা বেশ জোরালো ভাবেই পড়েছে। তাই তো গায়ে কম্বল চেপে পড়তে শুরু করেছিলাম দীর্ঘদিন ধরে চোখের সামনে থাকা বই "রূপের ডালি খেলা"।
" বীরব্রতী ভার্সিয়া " পড়লাম। প্রথম গল্প। নিতান্ত সাদাসিধে,সরল,একটু ধীর ধাঁচের ছেলে ভার্সিয়া। ক্লাসের সবার উপহাসের পাত্র। কিন্তু নিজের কাছে ভার্সিয়া ঠিক উল্টো। সব সময় কল্পনা করে সে দুর্ধষ এক সৈনিক। তারপর একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটল,যাতে ভার্সিয়ার কল্পনা হলো সত্যিতে রূপান্তরিত । অথচ কেউ জানল না,ভার্সিয়াও জানালো না। নিজের স্বপ্ন আর নিজেকে নিয়ে ভার্সিয়া থেকে গেল,একটা সাধারণ আটপৌরে ভার্সিয়া হয়ে।
কি অদ্ভুত একটা গল্প। সাদামাটা সব কিছু, অথচ আমার ভেতরটা দারুণ ভাবে প্রভাবিত করল। মোহিত হয়ে গেলাম। এরপর দ্বিতীয় গল্প " রুপের ডালি খেলা"। এরপর "পাশা সেদভের উত্তরাধিকার "। একের পর এক গল্প, যেন একেক টা শেল। প্রতিটা গল্প গভীর ভাবে দাগ কেটে যাচ্ছে ভেতরে। একেই বলে " অত্যাশ্চর্য সুন্দর লেখনী",সাথে ননী ভৌমিকের অপূর্ব অনুবাদ। বছরের শুরুটা কি চমৎকার একটা অভিজ্ঞতা। আহ্!
২৫ এর শুরুতে এমন চমৎকার একটা বই পড়লাম,যা আমার বছরের প্রারম্ভ ভীষণ ভাবে রাঙিয়ে দিল। আমার সব সময়ের প্রিয় বইয়ের একটা হয়ে থাকবে " রূপের ডালি খেলা"। এই বইয়ের কাছে আমার বার বার ফিরতে হবে। বার বার।
A smidge too macabre for My taste and mood. I was hoping for Sivka-burka or Dunno kind of happiness. I guess today is not one of those days when I want reality printed and ready to slap Me hard; on a second thought, I do not want that any day really. The book is a literary masterpiece, but just not My type.
একটা চমৎকার বই পড়লাম। বইটায় ছোট ছোট আদর মাখা, কেমন বিষণ্ন সুন্দর সব গল্প। খুব স্পর্শকাতর বিষয়ে খুব মমতা নিয়ে খুব যত্নে একজন রাশিয়ান লেখক লিখেছিলেন, একজন বাঙালি আরো অনেক যত্নে সেটির অনুবাদ করেছেন। দীর্ঘদিন আমার হৃদয়ের খুব কাছাকাছি থাকবে এই বইটা।
"মানুষের স্বভাবই এই যে গ্রীষ্মে তার মন কেমন করে নীলাভ তুষার কণা আর শার্সিতে বরফের নকশার জন্য। আবার শীতে তার চাই তপ্ত সূর্য, পল্লবের সবুজ খস-খস, বিলবেরির গন্ধ।" "কিন্তু অনেকদিন সিংহকে এই প্রশ্নটা খুঁচিয়েছে: খাঁচায় থাকলে সবাই তাকে কেন ভালোবাসে আর স্বাধীনতা পেলেই পালায়?" বইয়ের গল্পগুলো চমৎকার। বিশেষ করে শেষের দিকের গল্পগুলো। কিজিল কাঠের ছড়ি, পালা বদল আর স্কেকটস বগলে ছেলেটা; এই তিনটি গল্প সবচেয়ে ভালো লেগেছে।