ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল অনেক আগে, যখন পরিভদ্র কোডেক্স কুয়েটজালকোয়াটল তাঁর হাতে পেয়েছিলেন। অ্যাজটেকদের সৃষ্টিতত্ত্বের দেবতা নিজে এই কোডেক্স লিখেছিলেন। কারণ, তিনি চেয়েছিলেন তাঁর পৃথিবীর মানুষেরা এসব কথা জানুক। অথচ এই কোডেক্সটি অভিশপ্ত! যে দু'জন ব্যক্তি এটি প্রকাশের চেষ্টা করেছিলেন, দু'জনই মারা গেলেন; এমনকি পরিভদ্রও।
কী ছিল এই কোডেক্সে? কুয়েটজালকোয়াটলের সাথে কীভাবে গ্রিক পুরাণের অবিসংবাদিত চরিত্র প্রমিথিউসের দেখা হয়েছিল? জিউস কি সত্যিই চেয়েছিলেন ট্রয়ের যুদ্ধে গ্রিক বাহিনী জয়লাভ করুক? নাকি এই যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হয়েছিল সেই 'কেউ একজন'-এর ইশারায়, ব্রহ্মা যার কথা জিউস, প্রমিথিউস এবং কুয়েটজালকোয়াটলকে বলেছিলেন?
সেই 'কেউ একজন' কে? ব্রহ্মা কি তাঁকে শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছিলেন? কোডেক্স কুয়েটজালকোয়াটলের শেষ অংশের অনুবাদ পরিভদ্র কেন নিয়াজকে দেননি? গাছের বাঁকলে রহস্যময় ভাষায় কী লেখা ছিল? কেন নিয়াজকে সব রহস্যের সমাধানের জন্য মেক্সিকো যেতে হবে?
সবকিছু মিলিয়ে 'পুরাণের সমান্তরালে' হচ্ছে তিনটি বিখ্যাত পুরাণকে একসাথে মিশিয়ে জানা গল্পকে নতুন করে সাজিয়ে সেই 'কেউ একজন'-কে খোঁজার এক ঐকান্তিক প্রয়াস।
প্রচন্ডরকম একঘেয়েমিতে পেয়ে বসছিল আমাকে। পুরাণ জিনিসটা আসলে আমার মতো পাঠকের জন্য না। গাদা গাদা চরিত্র। আর এসব চরিত্রগুলোর চরিত্রটাও ফুলের মতো পবিত্র। পড়লেই বুঝবেন।
রেটিং ২ শুধু পুরাণের এইসব ফালতু গল্পের জন্য। লেখকের যা কাজ সেটা সে দারুণ দেখিয়েছেন। সে ব্যাপারে কোন অভিযোগ নেই।
অ্যাজটেকদের দেবতা কুয়েটজালকোয়াটল সময় ঘূর্ণির মধ্যে পরে চলে আসেন গ্রীক সভ্যতায়। বন্ধুত্ব হয়ে যায় প্রমিথিউসের সাথে। কুয়েটজালের বুদ্ধিতেই প্রমিথিউস মানুষ সৃষ্টি করেন, তাদেরকে আগুন এনে দেন, পশুপালন ও কৃষিকাজ শেখান। কুয়েটজালের জবানীতে চলতে থাকে আমাদের চেনা-জানা গ্রীক পুরাণের কাহিনী। টাইটানদের থেকে গল্প শুরু হয়ে শেষ হয় ট্রয় যুদ্ধ দিয়ে।
বইয়ের একদম শেষ সময়ে পুষ্পকরথে চড়ে হাজির হোন ব্রহ্মা। তিনি একটা প্রশ্ন ইত্থাপন করেন যে প্রশ্ন নিয়ে কুয়েটজাল ও জিউসও ভাবনায় পরে যায়। তারাও উত্তর চায়। পাবে কি না সে ভবিতব্যই জানে! এরপর আরেকবার সময় ঘূর্ণির মাধ্যমে কুয়েটজাল ফিরে যায় তার সভ্যতায় তার মানুষদের কাছে। লিখতে শুরু করেন তার এই ভ্রমণের কাহিনী। সেই কাহিণীর কোডেক্সই অনেক অনেক হাত ঘুরে চলে আসে লেখকের হাতে। তার সাথে করেই আমরাও পড়ে ফেলি এই কাহিনীটি।
যদিও বইয়ের নাম শুনে মনে হয় যেন অ্যাজটেক-গ্রীক-হিন্দু পুরাণকে একই সমান্তরালে আনা হয়েছে। অ্যাজটেক পুরাণ নিয়ে কিছু ঘটনা থাকলেও বইয়ের মূল বিষয় আসলে গ্রীক পুরাণ সাথে খুবই সামান্য আছে হিন্দু পুরাণ। তবে বলতেই হচ্ছে চেনা-জানা গ্রীক পুরাণকে এমন অভিনবভাবে উপস্থাপন করার আইডিয়া দারুন লাগলো।
মহাকাব্যের সাথে পুরাণের যোগ কতটুকু? মহাভারত, কতটা হিন্দু পুরাণ? অথবা ইলিয়াড কতটা গ্রীক পুরাণের আখ্যান? আমরা যতটা ভাবি, তারচেয়ে অনেক বেশি! ইলিয়াড-ওডিসি-মহাভারতের মতো মহাকাব্যগুলোর মূল কাহিনীতে আমরা পুরাণকে অতোটা উপস্থিত দেখতে না পেলেও, কাহিনীর 'গড়ে ওঠা'র পেছনে পুরাণের হাত আছে ষোলআনা। যেমন সাগরদেবী থেসিসের ছেলে একিলিস-এর জন্ম হওয়ার পেছনে ছিল গোটা গ্রীক প্যান্থিয়নের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা, কারণ প্রমিথিউস এমন এক ভবিষ্যদ্বানী করেছিল থেসিসের ছেলেকে ঘিরে, যার সাথে জড়িয়ে আছে অলিম্পাসের ভাগ্য! ট্রয় নগরী গড়ে ওঠার পেছনেও ছিল জিউসের হাত, এমনকি হেলেনের ইতিহাস হয়ে ওঠার পেছনেও, যে হেলেন ছিল দশ বছরব্যাপী মহাযুদ্ধের নিয়ামক।
মহাকাব্যের যে অংশটাতে আমরা চোখ রাখি, যেমন ইলিয়াড-এর ক্ষেত্রে যুদ্ধপর্ব, অথবা মহাভারতের ক্ষেত্রে পঞ্চপান্ডবের পুনরাবির্ভাব থেকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, এর অনেক আগে থেকেই সেসব মহা কাহিনীর সূত্রপাত ঘটে থাকে। আর সেখানে জড়িয়ে থাকেন পৌরাণিক চরিত্ররা। সেদিক থেকে, মহাকাব্যগুলো নিজেরা কোনো অংশে পুরাণের চেয়ে কম নয়! পুরাণের সমান্তরালে : কোডেক্স কুয়েটজালকোয়াটল, ব্রহ্মা এবং ট্রয়ের যুদ্ধ বইয়ের গল্পে লেখক গ্রীস-ট্রয়ের এই মহাযুদ্ধের কাহিনীতে এসেছেন একদম গোড়া থেকে, যখন প্রমিথিউসের হাতে মানবজাতির সূত্রপাত হলো, সেই থেকে মানুষের পৃথিবীর অনেক বছরের ইতিহাস আর ট্রয়ের যুদ্ধের সূত্রপাত পর্যন্ত। বাঙালীদের জন্য গ্রীক মিথলজি'র মূল গল্পগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে জেনে থাকার সুযোগ ঘটে শৈশব থেকেই, সে ডিজনি'র কার্টুন বলুন আর সিনেমা। আবার ট্রয়ের যুদ্ধের যে মূল অংশটুকু (রাজপুত্র প্যারিস কর্তৃক আফ্রোদিতি'স বরপ্রাপ্তি এবং হেলেন অপরহরণ থেকে ট্রোজান হর্স আর ট্রয়ের পতন) আমরা সিনেমায় অথবা নানান গল্পে জেনে থাকতে পারি। কিন্তু এই দুইয়ের মাঝের অংশটুকু, অর্থাৎ গ্রীক পুরাণে মানবজাতির সূচনা আর ট্রয়ের যুদ্ধের মাঝের যে পথটুকু, সেটা নিয়ে খুব বেশি গল্প হয় না। অথচ এখানেই লুকিয়ে আছে একটা দরকারি প্রশ্ন, "ট্রয়ের যুদ্ধ কেন ঘটেছিল?" জনপ্রিয় উত্তর হতে পারে "হেলেনের জন্য," কিন্তু মূল কারণ আসলে পুরোই ভিন্ন—জিউস!
হ্যাঁ, মহাভারতের পেছনে যেমন শ্রীকৃষ্ণের মহা-পরিকল্পনা ছিল, তেমনি ট্রয়ের যুদ্ধ ঘটা এবং পরিণতিতে এত এত মানুষ আর ডেমিগডের মৃত্যুর পেছনে ছিল জিউসের আরো বড় পরিকল্পনা এবং অভিসন্ধি। যেটা আবার মনে করিয়ে দেয় গ্রীক দেবতারা মানুষের প্রতি কতটা যত্নহীন, অনেক ক্ষেত্রে হিংসুটে!
সব দেবতারা তেমন ছিলেন না, যেমন গ্রীক প্যান্থিয়নের-ই প্রমিথিউস, অথবা অ্যাজটেক দেবতা কেটজালকোয়াটল। যে কেটজালকোয়াটল নিজ মুখে বয়ান করেছেন এই বইয়ের কাহিনী। ভাবতেই পারেন, অ্যাজটেক দেবতা গ্রীক কাহিনীতে কী করে এলেন? পুরাণে হয়তো এক প্যান্থিয়নের দেবতা অন্য প্যান্থিয়নে বেড়াতে যান না, যেমন তাদের পুজারীরা-ও ভিন্ন দেশ ভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে অতোটা জানতেন না, কিন্তু আমাদের সামনে যখন সব পুরাণ হাজির আছে এবং সব পুরাণের উৎসভূমি-ও ম্যাপে দৃশ্যমান আছে, আমরা তো কল্পনা করে নিতেই পারি, না?
পুরাণের সমান্তরালে : কোডেক্স কুয়েটজালকোয়াটল, ব্রহ্মা এবং ট্রয়ের যুদ্ধ বইয়ের গল্পের একদম শুরুতেই, দেবতা কেটজালকোয়াটল রাজ্যহারা হয়ে ভেলায় ভেসে চলেন নিজের আদি বাসভূম ছেড়ে। পথে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের সাথে সাক্ষাৎ হয় তাঁর, এবং অবাক হয়ে তাঁদের দ্বারা নতুন নতুন দেবতাদের পূজা দেওয়া, ভিন্ন ভাষায় কথা বলা দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেন মধ্য আমেরিকা, আফ্রিকা ছাড়িয়ে। যাত্রাপথে তিনি উপস্থিত হন অলিম্পাসে, যেখানে দেবতারা তখনো মানুষ সৃষ্টি করেননি। তারমানে অতীতে পৌঁছে গেছেন কেটজালকোয়াটল! সেখান থেকে গ্রীক মিথলজি'র সাথে কেটজালকোয়াটলের গল্পের শুরু। লেখক এখানে অল্টারনেট হিস্টরি রচনা করতে পারতেন, কিন্তু সে পথে আর যাননি, গ্রীক মিথের জানা ইতিহাসের পাশেই কেটজালকোয়াটলকে রেখে দিয়েছেন সাক্ষীরূপে... তবে কিছু কিছু জায়গায় তাঁর অবদান-ও ছিল বৈকি! এই যেমন, মানুষের সৃষ্টি!
অ্যাজটেক মতে, দেবতারা তাঁদের উপাসনার জন্য মানুষদের সৃষ্টি করতে ইচ্ছুক হলে, সবাই একত্র হয়ে একটি পাত্রে একতাল মাটির মাঝে নিজেদের রক্ত ঢালেন। পরে সেখান থেকে তৈরী হয় প্রথম মানুষ,দেবতাদের রক্ত-জাত। গ্রীক পুরাণেও মানুষের উৎপত্তির কাহিনী অনেকটাই এক, প্রমিথিউস পাত্রে মাটি নিয়ে তাতে জিউসকে থুতু ফেলতে বলেন, যেখান থেকে মানুষের সৃষ্টি। কে জানে, নিজ রক্তে তৈরী বলেই অ্যাজটেক দেবতারা মানুষের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ কি না, আর থুতু ফেলে গড়েছেন বলেই জিউস মানুষের প্রতি এত বিরূপ কি না!
পুরাণের ক্রস-কানেকশ বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম না। মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ-এর চন্দ্রাহত, তানজীম রহমান-এর কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিনাশ রহস্য, ওয়াসি আহমেদ রাফি-এর হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে বইগুলোর প্রতিটা নিজ-নিজ টোনে বা জনরায় গল্প বলেছে আর প্রতিটাতে একটা উপাদান ছিল, এক পুরাণের সাথে অন্য পুরাণের সংযোগ। বিশেষত কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিনাশ রহস্য-তে একইরকম যাত্রা দেখা যায়, দেবতা কেটজালকোয়াটল তাঁর ভাইয়ের খোঁজে পাড়ি জমান জাপানি নর্স ঈজিপশিয়ান আরো অন্যান্য মিথলজি'র দুনিয়ায়। লেখক এস এম নিয়াজ মাওলা তাঁর বইয়ে এই ক্রস-কানেকশনকে মূল উপজীব্য করেননি, বরং মূল গল্পে পৌঁছানর একটা মাধ্যম করে, সবশেষে একটা বড় প্রশ্নে উপনীত হয়েছেন—নানা দেশ, নানা জাতি, নানা দেবতা। এই সবের পেছনের উদ্দেশ্যটা আসলে কী?
যেকোন পুরাণ-সমঝদার পাঠককে লেখক যেমন ভাবাতে চেয়েছেন, সেটা বেশ উপভোগ করেছি। লেখকের লেখার ধাঁচ খুব একটা উপভোগ করিনি শুরুর দিকে, তবে পড়তে পড়তে এক পর্যায়ে মানিয়ে নিয়েছি। এবং সবথেকে মজা লেগেছে নিজের বইটা নিয়ে তাঁর মেটা-ফিকশন এপ্রোচ। পুরো গল্পটাকে তিনি দাবী করেছেন স্বয়ং কেটজালকোয়াটলের লেখা একটা কোডেক্স (পুঁথি) হিসেবে, আর নিজের পরিচয় দিয়েছেন 'অনুবাদক'! সেই ঠাট বজায় রাখতে, গল্পের শুরুতে আর শেষে পুরো ভিন্ন একটা কাহিনী সাজিয়েছেন, কেমন করে এই কোডেক্স তাঁর হাতে এলো এবং কোডেক্সের প্রভাবে বাস্তব পৃথিবীতে কী ঘটতে পারে, এরকম।
'আজব প্রকাশ' সংগ্রহে রাখার মতো সব বই বের করে, তথাপি 'পুরাণের সমান্তরালে' প্রডাকশনে যথেষ্ট ভালো। কিন্তু, যে বয়সের পাঠক বইটা পড়তে পারে, তাদের পক্ষে ক্রাউন সাইজ ২৭০ পৃষ্ঠার বই ৬০০ টাকা গায়ের দামে কেনা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
পুরাণের সমান্তরালে লেখক : এস এম নিয়াজ মাওলা প্রকাশক : আজব প্রকাশ প্রকাশকাল : বইমেলা ২০২৪ জনরা : পৌরাণিক, ফ্যান্টাসি পৃষ্ঠাসংখ্যা : ২৭২ মুদ্রিত মূল্য : ৬০০ টাকা
একটি কোডেক্স! কালক্রমে হারিয়ে যাওয়া এক গল্প। যে গল্প লিখে রেখেছিলেন এমন একজন, যিনি হয়তো কোনো এক সৃষ্টিতত্ত্বের দেবতা। এমন কিছু কথা তিনি লিখে রেখেছিলেন, যার কথা কেউ জানে না। হয়তো অনেকেই জানে— অন্য কোনো পৃথিবী বা অন্য কোনো পুরাণে ঠিকই জানা যায়! কিন্তু নিজ ভূখণ্ডের মানুষদের জানানোর তাগিদেই তিনি লিখে রেখেছেন, সেই প্রাচীন এক গল্প। কোনো একদিন কারো হাতে পড়বে সেই কোডেক্স। মানুষ জানবে অজানা অনেক কিছুই, যায় সাথে জড়িয়ে আছে নিজের অভিজ্ঞতাও। কিন্তু সত্যিই কি জানানোর মতো কিছু আছে? না-কি সবই মরীচিকা, মিথ্যের প্রহসন! কী ছিল সেই কোডেক্সে?
এই উপাখ্যানের প্রধান চরিত্র কুয়েটজালকোয়াটল। অ্যাজটেক মিথলজির প্রধান দেবতা। যার বাবার দরুন জন্ম হয়েছিল মনুষ্য জাতির। সৃষ্টি হয়েছিল এই পৃথিবী। দেবতাদের মানবজাতি তৈরির মূল কারণ ছিল, যেন মানুষেরা দেবতাদের উপাসনা করে। আর সেই কারণেই বলি দেওয়ার প্রচলন হয়। কিন্তু নিজেদের উপসনার জন্য যে জাতির সৃষ্টি করা হয়, তারাই কীভাবে নিজেদের বলি দেয়? এর বিরুদ্ধে নিজের ভাইয়ের বিপক্ষেই দাঁড়িয়েছিলেন কুয়েটজালকোয়াটল। ফলে এক শত্রুতা তৈরি হয়। আর এই শত্রুতার বশবর্তী হয়েই ভাইয়ের ষড়যন্ত্র। ফলে নিজ শহর, নিজ ভূখণ্ড ছেড়ে অন্য কোথাও ছুটে যাওয়া। কিছু প্রশ্নের উত্তর যে পেতেই হবে!
নিজ হাতে তৈরি ভেলা ভাসিয়ে চলেছেন অজানার পথে। সমুদ্রের এক ঘূর্ণিতে হারিয়েছেন সময়। ঠিক কোথায় চলে গিয়েছেন, সে জানে না। অন্য কোনো জগৎ? অন্য দেবতাদের রাজ্যে যেন বিস্ময় অপেক্ষা করছিল তার জন্য। তিনি পৌঁছে গিয়েছেন গ্রীক মিথলজির সময়ে!
কুয়েটজালকোয়াটলের সাথে দেখা হয় পার্সের। প্রথম দেখাতেই যার প্রতি মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে। দেখা হয় প্রমিথিউসের সাথে। যাকে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী হিসেবে ধরা হয়। পরিচয় হয় দেবতাদের রাজা জিউসের সাথে। কুয়েটজালকোয়াটল দেখেছেন গ্রীক পুরাণ অনুসারে কীভাবে মানবজাতির সৃষ্টি হয়। দেখেছেন কীভাবে মানুষের জন্য দেবরাজের বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন প্রমিথিউস। চাক্ষুষ সাক্ষ্য করেছেন, কীভাবে বিরোধের জেরে জিউসের শাস্তির খড়গ নেমে এসেছিল প্রমিথিউসের ঘাড়ে।
মানুষের উন্নতির গল্প এখানে প্রাধান্য। কীভাবে বিন্দু বিন্দু থেকে সিন্ধু হয়, কীভাবে গড়ে ওঠে শহর-সভ্যতা— সবকিছুই নিজ চোখে অবলোকন করেছেন কুয়েটজালকোয়াটল। আবার দেখেছেন দেবতাদের ঈর্ষার তেজ কীভাবে ধ্বংস করার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। রোগ-বালাইয়ের ঘটনা ঘটেছিল, মহাপ্লাবনের স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সবকিছু। সবকিছু নিজ চোখে অবলোকন করেন কুয়েটজালকোয়াটল। যে ছিল প্রমিথিউসের বন্ধু। সময়ের পালাবদলে সে হয়ে গিয়েছিল জিউসের সঙ্গী। কুয়েটজালকোয়াটলের অপার জ্ঞানে মুগ্ধ হয়েছিল জিউস।
জিউসের সাথে থাকতে থাকতে শুনেছেন প্রমিথিউসের ভবিষ্যতবাণী। সেই ভবিষ্যতবাণীকে প্রতিরোধ করতে এক ষড়যন্ত্র করেছিল জিউস। যার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। দেবতাদের রাজা জিউসের দূরদর্শী এ পরিকল্পনায় শুরু হয়েছিল এক ভয়ংকর যুদ্ধ! প্রায় দশ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল এ যুদ্ধ। ইতিহাস যাকে চেনে “ট্রয়ের যুদ্ধ” নামে।
“পুরাণের সমান্তরালে” তিন ধরনের পুরাণের মিশ্রণ বলা হলেও মূলত এর উপজীব্য বিষয় গ্রীক পুরাণ। শুরুর দিকে অ্যাজটেক মিথলজির কিছু অংশ রয়েছে। আর পুরোটা সময় কুয়েটজালকোয়াটল ছাড়া অ্যাজটেক মিথলজি সম্পর্কে তেমন বর্ণনা না থাকলেও, অন্য এক পুরাণের দেবতার চোখ দিয়ে লেখক গ্রীক পুরাণকে দেখিয়েছে। গ্রীক পুরাণের পুরো ইতিহাস এখানে মূল আলোচ্য বিষয়।
গ্রীক পুরাণের সূচনা থেকে মনুষ্য জাতির শুরু ও তাদের বংশবিস্তার, কাজকর্ম, নতুন সভ্যতা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া— সবকিছুই পুরাণ অনুসারে দেখানো হয়েছে। এখানে মানুষের মানুষে হানাহানির চেয়েও বড়ো করে দেখানো হয়েছে দেবতাদের হানাহানি। পুরাণ সত্য বা মিথ্যা, সে আলোচনা তোলা থাক! আমরা যদি মানুষ জাতির দিকে লক্ষ্য করি, তবে দেখা যায়— মানুষ নিজেদের ক্ষমতা দখলের জন্য কী না কী করতে পারে। মারামারি, হানাহানি, ঈর্ষা, নিজেকে বড়ো করে দেখানোর যে প্রবণতা, নারী জাতির প্রতি লোলুপ দৃষ্টি— সবকিছুই যেন গ্রীক মিথলজি ও তাদের দেবতাদের জিনগত বৈশিষ্ট্য। এখানে দেখানো হয়েছে, দেবতারাও যেখান লোভ লালসার উর্ধ্বে নয়, দোষত্রুটিবিহীন না। সেখানে মানুষ শতভাগ খাঁটি হবে, এই ভাবনা করা বিলাসিতা।
নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য দেবতা কিছু মানুষকে ব্যবহার পর্যন্ত করেছিল। নিজের ক্ষোভ উগড়ে দিতে মহামারী কিংবা দুর্যোগ ছড়িয়ে দিয়েছিল। দেবতারা যেন মানুষদের চেয়েও বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। ট্রয় নগর ধ্বংসের কারণ কি কেবল হেলেনকে নিয়ে আসা? না-কি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে? অবশ্য কেউ কেউ সত্যিকারের ভালোও চায়। যেমন প্রমিথিউস মনিব জাতির কল্যাণের জন্যও কাজ করে গিয়েছেন। ভালো করতে গিয়েই দেবতাদের রাজার চক্ষুশূল হয়েছেন। যদিও প্রমিথিউস ঠিকঠাক দেবতা নন। দেবতাদের নারী জাতির প্রতি দুর্বলতা বেশ লক্ষ্যনীয়। বিশেষ করে। জিউসের চরিত্র নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। দেবী থেকে মানুষ, কোনো নারীই যেন নিরাপদ নয়।
লেখক এস এম নিয়াজ মাওলাকে আমরা চিনি মিথলজি - আদি থেকে অন্ত নন ফিকশন সিরিজের লেখক হিসেবে। মিথলজি নিয়ে তার অপার জ্ঞান জন্ম দিয়েছে “পুরাণের সমান্তরালে”। গল্প লেখায় লেখক কেমন করলেন? এক কথায় বলতে গেলে, খুবই দারুণ এক অভিজ্ঞতা হলো। লেখকের সহজ ও সাবলীল লেখনী যেন মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। পুরো বইটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়েছি। গতিশীল লেখা, পড়তে আরাম লাগে। পুরো বইয়ের সাথে এক ধরনের সংযোগ স্থাপন হয়েছিল বেশ ভালোভাবেই। আমিও যেন গ্রীক পুরাণের সেই সময়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম। লেখক যেভাবে গল্প পরিচালনা করেছেন, আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। বিশেষ করে, শুরুর দিকে আর সমাপ্তির সময়। পাঠকের মনে এক ধরনের দ্বিধা তৈরি করে। এই দ্বিধা থাকা জরুরি। এতে করে বইয়ের গল্পগুলো মাথায় থাকে বেশ কিছু সময়।
লেখক বইটিকে তিনটি পর্বে বিভক্ত করেছেন— প্রথম পর্ব : প্রমিথিউসের ভবিষ্যতবাণী, দ্বিতীয় পর্ব : ষড়যন্ত্র পড়ব, তৃতীয় পর্ব : যুদ্ধ পড়ব। এই তিন অংশের গতিপ্রকৃতি দারুণ ছিল। প্রথম পর্বের শেষ হয়েছিল প্রমিথিউসের ভবিষ্যতবাণী দিয়ে। কী ছিল সেই ভবিষ্যতবাণী? সেই বাণীর উপর ভিত্তি করেই চলে দ্বিতীয় পর্ব। জিউসের ষড়যন্ত্রের সূচনা এখন থেকেই। আর শেষভাগে সেই ষড়যন্ত্রের পূর্ণ আঘাত। জিউস কথা দিয়েছিল, হেলেনকে অমর করে তুলবেন। কিন্তু যেভাবে সেই চেষ্টা করেছেন, সেটা ঠিক ছিল কি না সেই প্রশ্ন অবশ্য করা যায়। সামান্য এক নারীর জন্য এক ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা। কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, কত কিছু ধ্বংস হয়েছে। কত বীর একক প্রচেষ্টায় লড়াই করে শেষমেশ নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। যাদের বেঁচে থাকা দরকার ছিল। এমন এক দীর্ঘস্থায়ী, ধ্বংসের এক যুদ্ধ যেখানে বাস্তব; সেখানে অমরত্ব পেতে আর কী করা যায়?
গ্রীক পুরাণের এতকিছু জানা যায় কুয়েটজালকোয়াটলের লেখা থেকেই। যে নিজের জাতির জন্য লিপিবদ্ধ করে যায় তার বাস্তব অভিজ্ঞতা। এত কিছু লেখার মাধ্যমে নিজের অবস্থানও সে পরিষ্কার করে। যদিও গল্পের মাঝে এই অংশটির অনুপস্থিতি বেশ লক্ষ্য করেছি। শুরুর দিকে কুয়েটজালকোয়াটল তার করণীয় বলছিলেন, কিন্তু মাঝে এসে কেবল গল্পই বলে গিয়েছেন। এই দিকে কুয়েটজালকোয়াটলকে আরো ভূমিকা দেওয়া যেত। তার অনুভূতি, কাজকর্ম ব্যাখ্যা করা যেত বলে মনে হয়েছে। শেষের দিকে আবির্ভাব হয়েছিল ব্রহ্মার। যদিও আমি আশা করেছিলাম ব্রহ্মার আরও কিছু ভূমিকা বইতে থাকবে। যদিও ব্রহ্মার আবির্ভাব ও তার কথোপকথন হয়তো অনেক ভাবনার খোরাক যোগায়। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্নের জন্ম নেয়।
শেষের অংশটা বেশ ভালো লেগেছে। অন্য মিথ থেকে আসা কুয়েটজালকোয়াটল যে কথা দিয়েছিল, আবার ফিরে যাবে নিজের সময়ে। কিন্তু সে কি যেতে পেরেছিল? কিছু প্রশ্নের উত্তর কখনো পাওয়া যায় না। সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিতে হয়। খুঁজে পাওয়া যাবে তো?
“পুরাণের সমান্তরালে” বইটি এমন এক উপাখ্যান যা হয়তো সংক্ষিপ্ত আকারে পুরো গ্রীক মিথলজি বুঝতে সাহায্য করবে। এছাড়া বেশ কিছু ফুটনোট ছিল, যা আরও বেশি উপকারী ছিল। বইয়ের সম্পাদনার দিক দিয়ে বেশ ভালই কাজ হয়েছে। খুব একটা বানান ভুল চোখে পড়েছি। ত্রুটিও তেমন দেখা যায়নি। ফলে পড়তে গিয়ে অভিজ্ঞতা ভালো ছিল।
পরিশেষে, এই যে পৃথিবীতে এত এত পুরাণ, এত এত গল্প! এর সবকিছুই কি আলাদা? না-কি সবগুলোর কোনো না কোনো যোগসাজস আছে? নাহলে প্রতিটি পুরাণের গল্পে কেন মহাপ্লাবন প্রাধান্য পায়? সীতাকে হরণ করার গল্প যে যুদ্ধের সূচনা করে, তার সাথে কি গ্রীক পুরাণের কোনো অংশের মিল আছে? বিভিন্ন পুরাণ অনুসারে যারা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তাদের কে সৃষ্টি করেছে? ভিন্ন ভিন্ন পুরাণ, ভিন্ন ভিন্ন দেবতাদের গল্প — কিন্তু নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
▪️বই : পুরাণের সমান্তরালে ▪️লেখক : এস এম নিয়াজ মাওলা ▪️প্রকাশনী : আজব প্রকাশ ▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৭২ (ক্রাউন সাইজ) ▪️মুদ্রিত মূল্য : ৬০০ টাকা ▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫
অ্যাজটেক দেবতা কুয়েটজালকোয়াটল, যিনি কিনা পৃথিবীর স্রষ্টা ওমেটেওটলের সন্তান। স্রষ্টার পুত্র দেবতা মহান হবেন এমনটাই কি স্বাভাবিক নয়! কিন্তু কি এমন হয়েছিল যে তাকে পৃথিবীর মানুষদের জানানোর জন্য কোডেক্স লিখে রেখে যেতে হয়েছিল? কী ছিল এই কোডেক্সে?
চিমাহলির মাধ্যমে পরিভদ্র কোডেক্স কুয়েটজালকোয়াটল খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়ে কাহিনীর আরম্ভ হয়েছে। কুয়েটজালকোয়াটল নিজের হাতে নাহুয়াটল ভাষায় লেখা এ কোডেক্সের পাঠোদ্ধার কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। পরিভদ্র ইংরেজি অনুবাদ করার পর তা থেকেই বাংলা অনুবাদ করেছেন নিয়াজ। পাঠকের সুবিধার্থে সাথে যুক্ত করা হয়েছে কিছু টীকাও।
মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে দেবতাদের আরাধনার জন্যে। কিন্তু কুয়েটজালকোয়াটল দেখলেন সে মানুষরাই দেবতার সন্তুষ্টির জন্য নিজ ভাইদেরকে হত্যা করছে। একজন দেবতা হয়েও এ বর্বরতা তিনি কখনোই মেনে নিতে পারেননি। টোলানে চলে আসার পর বলি দেওয়া বন্ধ করতে গেলে এক পুরোহিত তার প্রতি দারুণ ক্ষুব্ধ হয়। এ বলি আর কারও জন্য নয় বরং কুয়েটজালকোয়াটলের বড় ভাই তেজকাটলিপোকার উদ্দেশ্যেই ছিল। এর ফলে তাকে বড় ভাইয়ের বিপুল প্রতিশোধের সম্মুখীন হতে হয়। তেজকাটলিপোকা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয় টোলানের সভ্যতাকে। বিপুল হতাশায় পর্যুবসিত হয়ে পালকযুক্ত সাপ নামে পরিচিত এ দেবতা সাপের ভেলা বানিয়ে সমুদ্রে পাড়ি দেন। সময়ের ঘূর্ণি তাকে বয়ে নিয়ে যায় অপর এক সভ্যতায়, অপর এক সময়ে কিংবা অপর এক পৃথিবীতে।
গল্পটি এখানে অ্যাজটেক পুরাণ থেকে গ্রীক পুরাণে মোড় নেয়। কুয়েটজালকোয়াটলের ধারণা ছিল তিনি দেবতা মানে সকল সময়, জাতি, সকল পৃথিবীর জন্যই দেবতা। কিন্তু ধারণা ভুল প্রমাণ করে দেখা গেল, এ পৃথিবীর রাজা জিউস নামে একজন। আছে অত্যধিক জ্ঞানী প্রমিথিউস, তার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা- সমুদ্রের পরি পার্সে, ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি, জিউসের স্ত্রী হেরা, জ্ঞানের দেবী এথেনাসহ আরো অনেকে।
প্রমিথিউসের কাছে কুয়েটজালকোয়াটল জানতে পারে পৃথিবীর স্রষ্টা ক্যায়োসের কথা। পৃথিবীর স্রষ্টা একেকবার একেকজন, এ আবার কেমন কথা! এখানের কেউ তার পিতা ওমেটেওটলকে চেনে না।
একদিন জিউস তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুর সাথে পরামর্শ করতে আসে এমন একটি প্রজাতি সৃষ্টি করার ব্যাপারে কথা বলতে যাদের দুটো হাত, দুটো কান, চোখ, বিবেক থাকবে এবং দেবতাদের উপাসনা করবে। কুয়েটজালকোয়াটলের পৃথিবীর মানুষদের সাথে তাদের ছিল ব্যাপক মিল। প্রমিথিউসকে দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করানো হলো ঠিকই, কিন্তু জিউস এ জাতিকে উন্নতির শিখরে দেখতে প্রস্তুত ছিলেন না। মানুষের বিবেক বুদ্ধি দেওয়া হলেও জিউস তাদেরকে কেবল দেবতার উপাসনা করা ছাড়া অন্য কোন কাজ করুক তা চাইতেন না। কিন্তু প্রমিথিউসের মানুষের নিজ সক্ষমতা অর্জনের জন্য, বিবেক বুদ্ধি দিয়ে সব কাজ করতে সক্ষম হওয়ার জন্য নানা প্রচেষ্টা চালানোর কারণে জিউসের সাথে প্রবল বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং জিউস তাকে কঠিন শাস্তি দেওয়ার সাথে সাথে তার ভাই সমুদ্রের দেবতা পসাইডনকে দিয়ে জাতিটিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেন।
স্বর্গের বুকে বসে মর্ত্যের মানুষ কিংবা দেবতাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন জিউস। কাহিনীর প্রবাহে এক পর্যায়ে তাকে প্রমিথিউসকে মুক্তি দান করতে হয়।
গ্রিক মিথলজি থেকে গল্পকে ধীরে ধীরে মোড় ঘোরানো হয়েছে ট্রয়ের যুদ্ধের দিকে। হেলেনকে কেন্দ্র করে জিউসের কুটচালের ফলস্বরূপ দশ বছরব্যাপী এ যুদ্ধের ফলাফল কারোই অজানা নয়।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে পুষ্পবাহনে চড়ে ব্রহ্মার আগমন জিউস এবং কুয়েটজালকোয়াটলের বিভ্রান্তির পরিমাণ আরো বাড়িয়ে তুলেছে। পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা ক্যায়োস, ওমেটেওটল, রুগ কিংবা ব্রহ্মা যে-ই হোন না কেন, তাদের তো বাকি স্রষ্টাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকার কথা ছিল না। তবে কি তারা একই পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন অংশের স্রষ্টা? সকল মানুষকেই শাস্তিস্বরূপ মহাপ্লাবনেই কেন নিমজ্জিত করা হলো? কি করে মানুষদের একই রকম গঠন সম্ভব হলো যেখানে স্রষ্টা ভিন্ন ভিন্ন? নাকি কেউ একজন আছে যিনি সকল স্রষ্টাকেই নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন প্রতিনিয়ত?
আর কি-ই বা ছিল সে কোডেক্সে যার ফলে তা হলো অভিশপ্ত? জানতে হলে পড়তে হবে বইটি।
পাঠপ্রতিক্রিয়া: বইটা আমার হাতে এসে পৌছানোর ৩য় দিনেই পড়া শেষ হয়ে গেছে। আমি মিথলজির খুব বড় ভক্ত বললে ভুল হবে। তবে বইটা হাতে নেয়ার পর কেবল পাতার পর পাতা উল্টানোর হুশ ছিল। কাহিনীর গতিপ্রবাহ ছিল ফ্ললেস, লেখার গতি দারুণ।
বইটি লেখা হয়েছে প্রধান তিনটি অংশে ভাগ করে- প্রমিথিউসের ভবিষ্যৎবাণী, ষড়যন্ত্র পর্ব ও যুদ্ধ পর্ব।
'কোডেক্স কুয়েটজালকোয়াটল, ব্রহ্মা ও ট্রয়ের যুদ্ধ' নাম দেয়ার কারণে অ্যাজটেক, গ্রীক, ভারতীয় তিনটি পুরাণের কাহিনীর সমান বিস্তারে পরিব্যাপ্তি আশা করেছিলাম। কিন্তু বইতে অ্যাজটেক দেবতা থেকে গ্রীক পুরাণে ভ্রমণ, ট্রয়ের যুদ্ধ নিয়ে বিস্তর আলোচনা থাকলেও সে অনুপাতে ব্রহ্মার আগমন নিয়ে, অর্থাৎ ভারতীয় পুরাণ নিয়ে লেখার ঘাটতি পড়ে গেছে। তবে তা গল্প উপভোগে কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। তিনটি পুরাণের ব্লেন্ডিং-এ লেখক দারুণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। এতোটা সাবলীলভাবে গুরুগম্ভীর মিথলজিকে টেনে নেওয়া সহজ কাজ বলা চলেনা। লেখার সাবলীলতা প্রশংসার দাবিদার।
মিথলজি নিয়ে সত্য-মিথ্যার দোলাচলে ঘুরপাক খাওয়ার অনুভূতি বই শেষে আবারো এসে ধাওয়া করে। এ কি নিছক কল্পনা, নাকি বাস্তব- তা পাঠকই ঠিক করবেন।
গ্রীক পুরাণের জিউস যদি এতোটা নারীলিপ্সু না হতেন, তবে মিথলজি ভিন্নরকমই হতো। এর দরুণ জিউসের প্রতি বিরক্তি মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে বলাই বাহুল্য। একইরকমভাবে লেখক ব্যাপক সফট কর্ণার তৈরি করিয়েছেন কুয়েটজালকোয়াটলের প্রতি। হাজারখানেক চরিত্রের অবতারণা ঘটিয়ে তাদেরকে দক্ষতার সাথে সামাল দিয়েছেন লেখক।
মিথলজিতে অপারদর্শী হিসেবে টীকাগুলো সংযুক্ত থাকায় পড়ার ক্ষেত্রে বেশ সুবিধা হয়েছে।
অসাধারণ লেখনীর ২য় পর্বের অপেক্ষায় থাকবো।
প্রোডাকশন ও অন্যান্য: প্রোডাকশন কোয়ালিটি এর চেয়ে ভালো হওয়া সম্ভবই ছিল না। পেইজ কোয়ালিটি থেকে শুরু করে বাঁধাই, ছাপা, সম্পাদনা একদম স্মুথ। প্রচ্ছদকার হিসেবে বিশেষ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য রিয়াজুল ইসলাম জুলিয়ান।
ব্যক্তিগত রেটিং- ৪/৫ বই- পুরাণের সমান্তরালে: কোডেক্স কুয়েটজালকোয়াটল, ব্রহ্মা এবং ট্রয়ের যুদ্ধ লেখক- এস এম নিয়াজ মাওলা জনরা- মিথলজিকাল ফিকশন প্রকাশনী- আজব প্রকাশ মূদ্রিত মূল্য- ৬০০৳ পৃষ্ঠা সংখ্যা- ২৭২
হেলেন অব ট্রয়! সুন্দরী এক নারী; যার জন্য গ্রিক ও ট্রোজানদের মাঝে দীর্ঘ দশ বছর যুদ্ধ হয়েছিল। ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল ঐতিহাসিক ট্রয় নগরী। ব্র্যাড পিট অভিনীত ট্রয় মুভিতে ট্রয় নগরীর বাইরে দাঁড়িয়ে একিলিস যখন হেক্টর বলে ডাক দেয়; সেই দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে।
লেখক এস এম নিয়াজ মাওলা চিন্তা করলেন অ্যাজটেক মিথলজি নিয়ে কিছু লিখবেন। কিন্তু মালমশলা তেমন হাতের কাছে নেই। তাই পরিভদ্র নামের এক ব্যক্তির সাহায্য কামনা করেন। পরিভদ্র নামক ব্যক্তিটি মেক্সিকোর জাতীয় গ্রন্থাগারে বিভিন্ন বইপত্র ঘেঁটে তথ্য সংগ্রহের কাজে নেমে পড়েন। সেইখানেই পরিভদ্রের সাথে পরিচয় হয় চিমাহলি নামক এক ব্যক্তির সাথে। অ্যাজটেকদের ইতিহাস নিয়ে অনেক জানাশোনা আছে তার। একদিন হঠাৎ করে দেখা গেল চিমাহলির পাত্তা নেই। পরিভদ্র খোঁজ নিয়ে চিমাহলির বাড়িতে চলে যান। চিমাহলির নিকট হতেই পরিভদ্র জানতে পারেন, গ্রিক দেবতা প্রমিথিউসকে কৃষিকাজ শিখিয়েছিল অ্যাজটেক দেবতা কুয়েটজালকোয়াটল। পরিভদ্র অবাক হয়ে যান। গ্রিস ও মেক্সিকো ত অনেক দূরত্বে অবস্থিত। তাছাড়া দুই সভ্যতার দেবতার মধ্যে সম্পর্কই কীভাবে হলো? এই সম্পর্কে আরো জানতে চাইলে চিমাহলি পরিভদ্রের হাতে একটি কোডেক্স তুলে দেন। কোডেক্সটি নাকি কুয়েটজালকোয়াটল লিখেছিল নাহুয়াটল ভাষায়। কী ছিল সেই কোডেক্সে?
অ্যাজটেক মিথলজি অনুযায়ী কুয়েটজালকোয়াটলের বাবা ওমেটেওটল বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছিল। সেই ছিল আদিসত্তা। ওমেটেওটলের আরেক সন্তান ছিল তেজকাটলিপোকা। দুই ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হলে কুয়েটজালকোয়াটল টোলান ছেড়ে সমুদ্রপথে যাত্রা শুরু করে। যাত্রার এক পর্যায়ে পরিচয় হয় গ্রিক দেবতা প্রমিথিউসের সাথে। প্রমিথিউসের সাথে কুয়েটজালকোয়াটল হয়ে যায় গ্রিক সভ্যতার ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী। কুয়েটজালকোয়াটল প্রত্যক্ষ করে ট্রয়ের যুদ্ধ এবং এর পূর্বের সকল ঘটনাবলী। সেসবই নিজের কোডেক্সে লিখে রাখে। ট্রয়ের যুদ্ধের এক পর্যায়ে উপস্থিত হয় হিন্দু পুরাণের দেবতা ব্রহ্মা। অর্থাৎ তিন পুরাণের তিন দেবতার সমাবেশ হয় ট্রয়ের যুদ্ধে। ট্রয়ের যুদ্ধের পরিণতি ত সবারই জানা। হেলেন নামের এক সুন্দরী নারীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধে প্রাণ হারায় বহু মানুষ এবং ধ্বংস হয়ে যায় ঐতিহাসিক ট্রয় নগরী। কিন্তু তিন পুরাণের তিন দেবতার সমন্বয় কি কোনো রহস্যময় ঘটনা? কোডেক্স কি লেখককে নিয়ে যাবে কোনো বিপদজনক পথের দিকে?
বইটিতে মূল বিষয় হলো গ্রিক মিথলজি। অ্যাজটেক মিথলজি দিয়ে গল্প শুরু হলেও গ্রিক মিথলজিতে গিয়ে গল্পপ্রবাহ গতি পেয়েছে। পৃথিবী সৃষ্টি, মানুষের সৃষ্টি, প্রেম, যুদ্ধ সবকিছুই উপস্থিত গ্রিক মিথলজিতে। তিনটা পুরাণের মিশ্রণ করে নতুন এক ধরনের লেখা। অ্যাজটেক দেবতার দৃষ্টিতে গ্রিক মিথলজির বর্ননা ভালো ছিল। বইটি পড়লে গ্রিক মিথলজির অনেক কিছুই জানা হয়ে যাবে।
যদি কেউ গ্রিক মিথলজি নিয়ে মোটামুটি ধারণা রেখে থাকেন তাহলে আশাহত হতে পারেন গল্পগুলো জানা থাকায়। নন-ফিকশন মিথলজির মতোই কাহিনি এগিয়েছে। এত বেশি সাবপ্লট আছে গ্রিক মিথলজির গল্পে যা পাঠককে দ্বিধান্বিত করে ফেলে। লেখকের এই ব্যাপারটাতে দৃষ্টি দেওয়া উচিত ছিল; যেহেতু এটা একটা উপন্যাস। গল্প সরলরৈখিক হলে আরেকটু ভালো হতো! তারপর লেখক যেহেতু মিথলজি নিয়ে নন-ফিকশন লিখেছেন অনেকগুলো এবং এই বইটি সেই বইগুলোরই ফিকশন রূপ; তাই বইটিতে নন-ফিকশন ধাঁচেরই বর্ননা দেখা যায়। হ্যাপি রিডিং।
❛এক দেশের বুলি আরেক দেশের গা লি। তবে এক সভ্যতার ইতিহাস, আরেক সভ্যতার মিথের সাথে কীরকম সম্পর্ক থাকতে পারে? কখনো কি মনে হয় বিচ্ছিন্ন এই বিশাল ইতিহাসের মূল কোথাও গিয়ে এক? কে জানে!❜
কুয়েটজালকোয়াটল, যিনি পৃথিবীর স্রষ্টা ওমেটেওটলের সন্তান। তিনি লিখে গিয়েছেন এক ইতিহাস। যে ইতিহাসের কথা হয়তো কেউ জানে না। সেখানে লিখেছেন নিজের কথা, নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। সেই আখ্যান আছে এক কোডেক্স আকারে। হয়তো ভবিষ্যতের পৃথিবীর কেউ এই কোডেক্স উদ্ধার করে জানতে পারবে তার ইতিহাস। দেবতা হয়েও যিনি একসময় নিজ জাতি থেকে সরে গিয়েছিলেন। শিকার হয়েছিলেন ভাইয়ের ষড়যন্ত্রের। আজকে যেটা খারাপ মনে হচ্ছে, সেটা ভবিষ্যতে হয়তো কোনো ভালো কিছুর ইঙ্গিত। তাইতো কুয়েটজালকোয়াটলের নিজের রাজ্য ছেড়ে সা পে র ভেলায় করে সময়ের ঘূর্ণিতে পতিত হয়েছিলেন আর রচনা করতে পেরেছিলেন এক ইতিহাসের। কুয়েটজালকোয়াটল অন্যান্য দেবতাদের কথায় যখন মানুষ সৃষ্টি করলেন তখন দেখলেন মানুষকে তৈরি করা হয়েছে দেবতার আরাধনার জন্য। আবার এই দেবতারাই নিজেদের সন্তুষ্টির জন্য তাদের তৈরি মানুষকে বলি দিচ্ছে। সহজ সুন্দর দেবতা কুয়েটজালকোয়াটলের কাছে এ আচার ভালো লাগলো না। তাইতো নিজের রাজত্বে বলি প্রথা বন্ধ করে নতুন শাসনের মাধ্যমে সভ্যতাকে এক অনন্য পর্যায়ে নিয়েছিলেন। তবে আপন ভাই এই উন্নতিতে খুশি হতে পারেনি। এজন্যই ছলনার আশ্রয়ে নিঃশেষ করে দিয়েছিল তার রাজত্ব। যাই হোক, সময়ের ঘূর্ণিতে পড়ে কুয়েটজালকোয়াটল এমন এক এলাকায় বা পৃথিবীতে আসলেন যার কিছুই সে চিনে না। দেখলেন এখানেও নাকি স্রষ্টা আছে। যে এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। এখানে আবার কেউ চিনে না তাদের স্রষ্টা ওমেটেওটলকে! আচ্ছা মুসিবত তো! তাহলে কি অনেকগুলো পৃথিবী আছে? যার আলাদা আলাদা স্রষ্টা! তবে সব পৃথিবীতেই কেন মানুষ আছে, যাদের আকার গড়ন প্রায় একই রকম। যেমন, কুয়েট ঘূর্ণিতে পরে এসে পড়েছে গ্রীক সভ্যতার সময়ে! যেখানে আছে জিউস নামক দেবতাদের রাজা, আছে জ্ঞানী প্রমিথিউস, আছে দেবী হেরা, এথেনা সহ অনেকেই। কুয়েট জানতে চায় কী করে পৃথিবীর আলাদা আলাদা স্রষ্টা থাকতে পারে, না-কি এই সব আলাদা পৃথিবীর স্রষ্টাদেরও কোনো মাথা আছে। যে আড়াল থেকে সব চালাচ্ছে। জানার এই যাত্রায় সে গ্রীক সভ্যতার সময়ের অনেক কিছু দেখে, শিখে। মানুষে মানুষে বিবাদ তাকে অবাক করলেও, সে সবথেকে বেশি অবাক হয় এই একই হিংসা, বিবাদ আছে দেবতাদের মধ্যেও। দেবতারাই যেখানে ভুলের উর্ধ্বে নয় সেখানে মানুষ তো লাইন ছাড়া হবেই। এক দেবতা যেমন আরেক দেবতার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় আবার একজনের সাথে আরেকজনের ষড়যন্ত্র বাঁধিয়ে দেয়। দেবতাদের রাজা হয়েও জিউস এমন বহু কাজ করেছে যা পাল্টে দিয়েছে বা তছনছ করে দিয়েছে পুরো জাতির ইতিহাস। আর কে না জানে জিউসের অ্যাড্রেনালিনের আলোড়ন কেমন! এজন্যেই তো দেবী থেকে মর্ত্যের মানবী এমনকি সুদর্শন মানবের দিলেও লোলুপ দৃষ্টি পড়ে তার। প্রমিথিউসের ভবিষ্যদ্বাণী থেকে শুরু করে কী করে জিউস এক বিশাল যু দ্ধের সূচনা করে তার অসামান্য পরিকল্পনায় এসব কিছুই কুয়েটজালকোয়াটল দেখেছেন। নানা অভিজ্ঞতার পর সবশেষ তাদের দেখা হয় চার মাথা ওয়ালা এক সৌম্যদর্শন বৃদ্ধের সাথে। তার থেকে জানতে পারে ভারতের কথা। সেখানের ইতিহাসের কথা। রাম-সীতার কথা জেনে তারা অবাক হয়ে যায়, কোথাকার সুদূরের এক পৃথিবী (তাদের ভাষ্যমতে) সেখানেও হেলাসের মতো কিংবা ট্রয় নগরীর দীর্ঘায়িত এক যু দ্ধের ঘটনার এত সাদৃশ্য! তবে কি তারা অদৃশ্য কারো হাতের নিশানায় চলছে। নিজেদের নিয়ে গর্ব, অহমিকা কিংবা দেবতা ভেবে শ্রেষ্ঠত্ব জাহিরের এই খেলায় তারাও হয়তো কোনো গুটি। এই অভিজ্ঞতা নিয়েই তবে সে যাত্রা করবে তার নিজস্ব সময়ে। জানাবে এতদিন যা দেখে এসেছে। এভাবেই যুগ থেকে যুগে, সীমানা থেকে অন্য সীমানায় ইতিহাস পৌঁছে যাবে। কিন্তু পরিকল্পনা মাফিক কি সব হয়? কুয়েটজাল কি পারবে ঘূর্ণিতে গিয়ে নির্দিষ্ট সভ্যতা সময়ে পৌঁছতে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
একটা জোক চালু আছে, ❛গ্রীক পুরাণের ইতিহাসে এতকিছু ঘটতোই না, যদি জিউস কা মু ক না হতো!❜
❝পুরাণের সমান্তরালে- কোডেক্স কুয়েটজালকোয়াটল, ব্রহ্মা এবং ট্রয়ের যু দ্ধ❞ মিথলজি অবলম্বনে রচিত উপন্যাস। বইয়ের নাম থেকেই বুঝা যায় বিভিন্ন পুরাণের মিশেলে সমান্তরালে এই কাহিনি আবর্তিত হবে। এবং অবশ্যই তাই হয়েছে। এখানে গ্রীক, অ্যাজটেক এবং ভারতীয় পুরাণ মিশেছে এবং নানা সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের মাধ্যমে ঘটনা এগিয়েছে। এখানে মূল চরিত্র অ্যাজটেক দেবতা কুয়েটজালকোয়াটলকে ধরা যায়। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে তার মাধ্যমেই। এরপর ঘটনা ক্রমেই রূপ নিয়েছে গ্রীক সভ্যতার ইতিহাসে। পুরো বইতেই ভিন্ন এক পুরাণের দেবতার চোখে অতীতের সমৃদ্ধ এক সভ্যতার ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। গ্রীক পুরাণ সম্পর্কে স্বল্প সময়ে বিস্তর ইতিহাস জানতে চাইলে আমি মনে করি এই বইটি থেকে জানা যাবে। লেখক শুরুতেই বলেছেন মিথলজি ফিকশন কী প্রকারে লেখা যায় এবং লেখায় তিনি কোন প্রকার ব্যাবহার করেছেন। সিউডো মিথ থেকে শুরু করে পুরাণের নানা ঘটনার ব্লেন্ড ছিল দারুণ। গ্রীক পুরাণের প্রায় আদ্যোপান্ত জানা গেছে এটা বলতেই পারি। জিউসের থেকে শুরু করে ট্রয়ের যু দ্ধ, নানা ঘটনা, ষড়যন্ত্র সব মিলিয়ে অ্যাজটেক দেবতা কুয়েটজালের নিজের লেখা এই কোডেক্স নিয়ে ঘটনা পড়তে গিয়ে অনেক উপভোগ করেছি। লেখককে মূলত আমরা চিনি ❛মিথলজি আদি থেকে অন্ত❜ সিরিজের লেখক হিসেবে। বাংলাদেশে পুরাণকে অনন্য এক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে আমরা মিথলজি সম্রাট নামেও অভিহিত করে থাকি। লেখকের একটি গল্পগ্রন্থ পড়া হয়েছে। নন-ফিকশন লেখক থেকে সাবলীল এবং সহজ ভাষায় এক উপন্যাস লেখার নতুন পরিচয়ে লেখকের প্রবেশ দারুণ হয়েছে। ক্রাউন সাইজের ২৭২ পৃষ্ঠার বইটি মূলত তিন পর্বে (প্রমিথিউসের ভবিষ্যদ্বাণী, ষড়যন্ত্র পর্ব এবং যু দ্ধ পর্ব) বিভক্ত। প্রতিটি অধ্যায়ই ছিল সুন্দর সাবলীল ভাষায় লেখা। লেখকের লেখার গতি দারুণ। এক নিমেষে গল্পে আটকে যাওয়ার মতো উপাদান এবং বর্ণনায় পরিপূর্ণ বই। তিনটি পুরাণের এই মিশেলে বলাই বাহুল্য গ্রীক ছিল চালকের আসনে। যেহেতু বইতে ব্রহ্মার কথা আছে আমার আশা ছিল এখানে হিন্দু তথা ভারতীয় পুরাণের বেশ বর্ণনাও থাকবে। যদিও খুব অল্প সময়ই সে বর্ণনা ছিল। তিন পুরাণের দেবতার টানটান কিছু মুহূর্ত আশা করেছিলাম। তবে এই অনুপস্থিতি গল্পের উপভোগে তেমন একটা প্রভাব ফেলেনি। প্রারম্ভিক কথোপকথন এবং শেষের দিকের ঘটনা পড়ে আমিও দোলাচলে আছি। ঠিক মিথ নিয়ে আমরা যেমন সত্য মিথ্যা আর কল্পনার সূক্ষ এক স্থানে ঘুরপাক খাই তেমন হ্যাঁ কি না এমন এক চিন্তায় বইটা শেষ হয়েছে। শেষে কী হলো সেটা জানতে বই তো অবশ্যই পড়তে হবে এবং এরপর অনেকগুলো ভাবনার মেঘে নিজেকে ভাসিয়ে নিবেন না এখানেই দাড়ি টানবেন সেটা তো পাঠকের ব্যাপার!
❛যু দ্ধ-বিগ্রহ, হিংসা, র ক্ত, অত্যাচার এই বিষয়গুলো সৃষ্টির শুরু থেকে আমাদের নিত্যসঙ্গী। দেশ, কাল, স্থান নির্বিশেষে এই ইতিহাস আমাদের কাছে বিভিন্ন রূপে ধরা দেয়। হাজার কিলোমিটার দূরের গ্রীক সভ্যতার সাথে তাই এপারের কোনো ইতিহাসে সাদৃশ্য থাকে। আবার সকল ইতিহাসের মধ্যেই একটা নির্দিষ্ট ঘটনা থাকে। কী করে যোগাযোগহীন প্রাচীন ভুখন্ডগুলোর ঘটনায় এত মিল? ক্যায়স, খেমেট, রু, ওমেটেওটল কিংবা ব্রহ্মা এদের মাঝের গোপন কম্মটি কি তবে অদৃশ্য আড়ালের কেউ জানেন?❜
অ্যাজটেক প্রধান দেবতাদের একজন কুয়েটজালকোয়াটল সময়ের ঘূর্ণিতে পড়ে গিয়ে হাজির হন জিউসের রাজত্বে। তাঁর মুখেই আমরা জানতে পারবো সৃষ্টির শুরুর গল্পটা মোটামুটি সব পুরাণেই একই। গ্রীক সভ্যতার উত্থান পতন। ট্রয়ের সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের পর্দার আড়ালের কাহিনী।
আমি ভেবেছিলাম এতে অ্যাজটেক মিথলজি সংক্রান্ত গল্প বেশি থাকবে। আশা করেছিলাম ব্রহ্মার উপস্থিতিতে ভারতীয় পুরাণের কাহিনীও আরও একটু বেশি থাকবে। কিন্তু আসলে তা নয়। এটাকে বরং বলা যায় অন্য পুরাণের দেবতার ভাষ্যে গ্রীক পুরাণের কাহিনী। সেই হিসাবে আমি কিছুটা হতাশ আরকি।
বই: পুরাণের সমান্তরালে- কোডেক্স কুয়েটজালকোয়াটল, ব্রহ্মা এবং ট্রয়ের যু/দ্ধ লেখক: এস এম নিয়াজ মাওলা প্রচ্ছদ: রিয়াজুল ইসলাম জুলিয়ান বানান সমন্বয়: ওয়াহিদ মিশা প্রকাশক: আজব মূদ্রিত মূল্য: ৬০০ পৃষ্ঠা: ২৭২
পুরাণের সমান্তরালে- কোডেক্স কুয়েটজালকোয়াটল, ব্রহ্মা এবং ট্রয়ের যু/দ্ধ - "এ ফ্রেম অফ রেফারেন্স"
[১]
এস এম নিয়াজ মাওলা ভাইয়ের "পুরাণের সমান্তরালে- কোডেক্স কুয়েটজালকোয়াটল, ব্রহ্মা এবং ট্রয়ের যু/দ্ধ" পড়তে পড়তে মনে পড়তেছিল "বুফ্যে লাউঞ্জের" কথা। একসাথে এতো খাবার, কোনটা রেখে কোনটা খাব অথবা একটা প্লেটেই খাদ্য উপাদানের আধিক্য যেমন অধিক নিউট্রিশনের প্রমিজ, তেমনি বদহজমেরও একটা ক্ষীন সম্ভাবনা থেকে যায়। এক্ষেত্রে যেকোন ভোজনরসিকই তার প্রিয় খাদ্যগুলোর স্বাদ নিবে জিবহা দিয়ে। বাকিগুলো চোখের চেতনায়। "পুরাণের সমান্তরালে"ও হয়তো পাঠক তার প্রিয় অংশটুকু, নামটুকু এবং ঘটনাটুকু মেমরীতে রেখে বাকি সব পড়ে যাবে। আলোচনার এবং লেখার সুবিধার্থে বইয়ের সম্পূর্ন নাম উল্লেখ না করে শুধু "পুরাণের সমান্তরালে" বলে লিখবো। তবে যেটা বললাম, এতো বেশি বিস্তৃত এবং জটিল সব নাম ও ঘটনা যে, সূচারুভাবে আলোচনায় হয়তো বইটা পড়ার সময় মাকিং করে রাখার দরকার ছিল। তার উপর মিথ বিষয়ে আমি একদমই অর্বাচিন একজন পাঠক। তাই গুরুত্বপূর্ন বা আমার মেমরী থেকে যতটুকু পারা যায় - শুধু সেটুকুই আলোচনায় রাখবো।
[২]
অ্যাজটেক দেবতা কুয়েটজালকোয়াটলকে দিয়ে শুরু এর কাহিনি। কুয়েটজালকোয়াটল প্রণীত একটা কোডেক্স ঘটনাক্রমে চলে আসে পরিভদ্রের (পরিচিত ভদ্রলোকে) কাছে। পরিভদ্র সেই কোডেক্স অনুবাদ করে পাঠান লেখক এস এম নিয়াজ মাওলার কাছে। এবং এস এম নিয়াজ মাওলা সেটাই তুলে দেন বাংলায় পাঠকের কাছে। "পুরাণের সমান্তরালে" বইয়ের কাঠামোই গড়ে উঠেছে এই আঙ্গিকে।
কোডেক্স একধরনের ডায়েরির এন্ট্রি, যেটা কোয়াটজালকোয়াটল লিখে গেছেন তার পৃথিবীর মানুষদের জন্যে। ঘটনার পরিক্রমে কোয়াটজালকোয়াটল পৌছে যান হেলাস নামক জায়গায়। সেখান থাকাকালীল সেই সব বর্ননা এবং নানা কাহিনির সমষ্টি এই কোডেক্স। মূলত"পুরাণের সমান্তরালে" সেই ডায়েরির এন্ট্রির বয়ানে বলা হয়েছে "গ্রীক মিথলজির" বৈচিত্রের কাহিনি।
এবং সেই সকল বর্ননায় উঠে এসেছে গ্রীক মিথলজির অজস্র দেব-দেবী, ডেমিগড, মহাকাব্যিক গুরুত্বপূর্ন চরিত্র, মানব সৃষ্টি ও তাদের ক্রমবিকাশ অনেক কিছুই। কাহিনি চলতে চলতে চলে এসেছে ট্রয়ের পরিণতির দিকে। বোধহয় পুরো কাহিনিতে জিউসের কথায় প্রমিথিউসের মানব সৃষ্টি, তাদের উন্নতির জন্যে প্রমিথিউসের অবদান সাথে কুয়েটজালকোয়াটলের বন্ধুর মতো পাশে থেকে সাহায্য এবং ট্রয়ের যে পরিনতি - এই দুটোই সবচেয়ে বোল্ডভাবে এসেছে। বা কাহিনির বিস্তৃতির জন্যে পাঠকের আলাদাভাবে চোখে পড়বে বা মনে থাকবে। রূপের প্রতিযোগিতার থেকে যুদ্ধের সূচনা এবং এর পিছনের যড়যন্ত্র - সেটা অনেকটাই ফোকাস পেয়েছে "পুরাণের সমান্তরালে" বইয়ে।
[৩]
মানুষের চেতনা এবং নীতিবোধের মধ্যে যে ফাটল, সেটা শুধু এই সময়ের না বরং যে কোন সময়ের জন্যেই ধ্রুব। আর ধ্রুব বলেই হয়তো শুধু মানুষ না বরং "পুরাণের সমান্তরালে" বইয়ের সকল দেব-দেবী বা অজস্র মহাকাব্যিক চরিত্রের মধ্যে দিয়েও পাঠক এই ফাটলের চিহ্ন অনায়াসে দেখতে পাবেন। একথা তো অনস্বীকার্য যে, পৌরাণিক কাহিনির যে কোন চরিত্রই "এক্স-ফ্যাকটর" নিয়ে বিকশিত। এই "এক্স-ফ্যাকটর" এবং বর্ণিল ঘটনার যোগসূত্র আমাদের আকর্ষিত করে সেটা সম্পর্কে আগ্রহের চোখ মেলে ধরতে।
"পুরাণের সমান্তরালে" পড়লে বোঝা যাবে কত পূর্বের কাহিনি (এমনকি মানুষ সৃষ্টির আগের -প্রামিথিউসের মানব সৃষ্টির কথা যেটা বলা হয়েছে); অথচ পাঠকের বর্তমান সময়ের সাথেও অনেকটা মিল। মিলটা অবশ্যই "এক্স-ফ্যাকটর" কেন্দ্রিক না বরং যে কোন সৃষ্টির "কর্ম এবং কর্মফলের গভীর যোগসূত্রের" বেসিসে। সেটা হোক মানুষ অথবা দেব-দেবী। দেব-দেবীরাও তো "কেউ একজনের" সৃষ্টি। সেই "কেউ একজনের" প্রকৃতি নির্মনের প্রয়াসই কুয়েটজালকোয়াটলের "কোডেক্স"।
যে কথায় ছিলাম, কর্ম এবং কর্মফলের গভীর যোগসূত্রের চলে আসে সচেতনতা। তবে তা সব সময়ের সত্যি না। অসচেতনও থাকে কেউ কেউ। এই যুগেও যেমন, তেমনি জিউসের দেব-দেবীর ঘরনায়ও। দেব-দেবীরাও আত্মপ্রসাদের ভার বাড়ায় নিজের সুবিধা নিশ্চিত করে অন্যের পাকা ধানে মই দিয়ে। সচেতনতা আসলে তো সুফল, অন্যথায় "অনর্থের উপস্থিত" নিশ্চিত। "পুরাণের সমান্তরালে" আমরা তা দেখতে পাই প্রতিটি পদে পদে। তবে মিল বা অমিল যাই থাক - পুরাণকে আপনি শুধু গল্প হিসেবে নিতে পারেন। অথবা সময়ের বিভিন্ন স্তরে সেটার সাথে যোগাযোগরে জন্যে একটা "রূপক" হিসেবেও গন্য করা যেতে পারে। সেটার নিক্তি মাপার বিষয় পাঠকের।
[৪]
পাঠকের নিক্তি মাপার বিষয় নিয়ে বলছিলাম। পৌরিণিক কাহিনি কারও কারও কাছে একদম বাতিলের জায়গায়, কেউ কেউ হয়তো মাঝামাঝি অবস্থায়, এবং অনেকেই হয়তো একটা ব্যবহারিক জ্ঞান হিসেবেও নিতে পারেন। পাঠক ভেদে পাঠ ভিন্ন। হোক এই ধরনের লেখা অতিপ্রকৃতিক, আধিভৌতিক অথবা ম্যাজিকাল- এর থেকে ব্যবহারিক ধারণাগুলো চাইলেই যোগাযোগের জন্যে"একটা রূপক" হিসেবে নেবায় জায়গা থাকে। আপনি কোনটা নিবেন সেটার উপর নির্ভর করবে। জিউসের "এক্স-ফ্যাকটর" নিলে সেটা হয়তো পাবেন না খুঁজে বর্তমানে, কিন্তু "সে/ক্স-ফ্যাকটর" নিলে এই ধরনের চরিত্র অহরহই আছে। "দেবত্বের" মুখোশ পড়া না হয়তো "মনুষত্ব"র মুখোশ পড়ে। কিন্তু "রীতি এবং প্রথার নৈতিক নিয়মাবলি" গুলো কিন্তু সহজেই রিলেটেবল।
পাঠকের নিক্তি মাপার বিষয় অবতারনায় চলে আসে এস এম নিয়াজ মাওলার "পুরাণের সমান্তরালে" কতটা বৈচিত্রময় বা পাঠকের প্রত্যাশাকে কতটা অতিক্রম করতে পারে- সেই প্রশ্ন। প্রথমেই লেখা প্রসঙ্গে আসি। এস এম নিয়াজ মাওলা ভাইয়ের লেখার সাথে আমি বেশি দীর্ঘ পরিচিত অন্যসূত্রে। তাই আমি নির্ধিদায় বলতে পারি (ব্যক্তিগত অভিমতের বেসিসে) যে, I have seen better from him. "পুরাণের সমান্তরালে" লেখায় আমি একধরনের জড়তা ফিল করি। একটা প্লেটে এত উপাদান ঠিক কিভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করবেন সেই জড়তা নাকি বহুদিন ধরে তিনি রিসার্চ-বেজড কাজ করায় গল্প-না-লেখার জড়তা ঠিক শিওর না।
অথবা এটাও হতে পারে যে ভাবে গল্পটা বলা হয়েছে - ডায়েরির এন্ট্রির আদলে - সেভাবে হয়তো লেখায় একধরনের স্থিরতা এসেছে। যেন এক জায়গায় বসে একটা দীর্ঘ কাহিনি শোনা বা একি আঙ্গিকে শুরু থেকে শেষে। আকৃষ্ট করছে, স্বতস্ফূর্ততাও বিদ্যমান, তবে ইন্টেলেকচুয়ালের স্বরের কারনে কোথাও যেন একটা "কিন্তু" রয়ে গেছে। যেহেতু ডায়েরি এন্ট্রি সম্পূর্নটা সুতরাং সেম টোন বজায় থাকাও স্বাভাবিক। সেটাও যৌক্তিক। তবে সেটা "কুয়েটজালকোয়াটলের এন্ট্রির" জন্যে; পাঠকের জন্যে কি?
কুয়েটজালকোয়াটল তার পৃথিবীর সৃষ্টিদের জন্যে লিখে গিয়েছেন এইসব এন্ট্রি। যার ফলে শুরু থেকেই তিনি বারবার বলে গেছেন "তোমাদের", "তোমরা কি জানো", "তোমরা নিশ্চই বুঝতে পেরেছো"- এমন ভাবে। পুনঃপুন"তোমাদের" বলাটা একটা সময় কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক করে। তবে এর একটা বিপরীত দিকও আছে। কুয়েটজালকোয়াটল "তোমরা" বলতে যেমন তার পৃথিবীর সৃষ্টির উদ্দ্যেশ্যে মীন করেছেন, একি সাথে মনে হচ্ছিল লেখক নিয়াজ মাওলা ভাই একি সাথে তার পাঠকদের মীন করছেন। এবং সেভাবে নেওয়াও যায়। এক ধরনের"ডুয়ালিটি" পারসপেক্টিভের বহিঃপ্রকাশ এবং ইন্টারেস্টিং। তবে টু বি অনেস্ট - একি সাথে অন্তর্জালে বহুল প্রচারিত মুহম্মদ জাফর ইকবালের মীম "তোমরা হয়তো শুনে অবাক হবে" ভাবনায় মাথায় এসে কয়েকবার তাহার মুখটাও ভাসছিল।
পাঠক হিসেবে আমার মনে হয় উপস্থাপনের ভঙ্গিটায় হয়তো আরও একটু ভাবনার জায়গা ছিল। এই "তোমারা" এর কারনে এবং উপস্থাপনের ওয়েতে আমার কাছে লেখায় জড়তা এবং একি সাথে এক ধরনের অপরিপক্ক লেগেছে শুরুতে। যদিও একটা সময় পড়তে পড়তে পাঠক সেটাই এডপ্ট করে নিবে হয়তো। "দেখতে দেখতে সয়ে যাবার" মতো ব্যাপার। "পুরাণের সমান্তরালে" ফাস্ট-পেসড। সেটা গল্পের কাহিনিতেও এবং এগিয়ে যাওয়া টাইমলাইনেও। এই গল্পে স্পেসিফিকভাবে টাইমলাইন মেইনটেইন অবশ্যই ঝামেলাপূর্ন এবং যৌক্তিক হতো না। লেখক সে পথে হাঁটেনওনি। তবে এতে একটা প্যাঁচও লাগে। যেমন, যেখানে প্রমিথিউস মানব সৃষ্টি করে কোয়াটজালকোয়াটরৈ বর্ননা মতে (যেহেতু তারা আগে মানুষ দেখেনি), সেখানে পূর্নবয়স্ক "ডেমিগড" কিভাবে আসে। এখানে পাঠককে তার সেন্স তৈরী করেই ধরে নিয়ে এগুতে হবে যে, একটার পর একটা কাহিনি বলে যাওয়া হলেও মাঝে আছে সময়ের বিস্তর ফাঁরাক। যেমন, "গাইনেমেড" ডেমিগড হলে কোনসময়ে জিউসের কাছে এলোবা তিনি অনলেন মানুষের বসতি থেকে? এগুলো পাঠকের "টাইম স্পেকুলেশন" এর হাত ধরে একটা যৌক্তিক গঠন পাবে।"পুরাণের সমান্তরালে" এক্ষেত্রে ততটা সহায্য করবে না, করবে পাঠকের নিজস্ব সেন্স। অন্য অর্থে এটা পাঠকের প্রতি লেখকের একধরনের সুবচিারও। লেখক পাঠকের ইন্টেলিজেন্সের উপর ভরসা রেখেছেন।
[৫]
"পুরাণের সমান্তরালে" উপজীব্য কাহিনিগুলো "জানা গল্পগুলো" সাজিয়েই পাঠকের প্লেটে হাজির করা হয়েছে। এই ব্যাপারটা পাঠক বইটা পড়ে যেমন বুঝবেন, একি সাথে বইয়ের ব্লার্বেও সেটা লিখে দেয়া আছে। তবে কিছু কিছু কাহিনি আমরা জানি গ্রীক মিথলজি না বরং অন্যভাবে। যেমন "হজরত নুহ(আ.) এবং তার তাঁর জাহাজের" কাহিনি আমরা দেখি গ্রিক-মিথলজির এসেন্সে এবং চরিত্রে। এমন আরও অনেক কিছুই আছে। ব্যাপারটা এমন, আমরা কখনো মৌখিক ভাবে, কখনো অন্তর্জালে সার্ফ করতে করতে বিচ্ছিন্নভাবে বা কখনো কোন বইয়ে টুকরো টুকরো ভাবে গল্পগুলো পড়েছি বিভিন্ন সময়ে। এখানে আমরা এক-প্লেটে পাচ্ছি সব এবং পরপর পড়ে যাওয়া যাচ্ছে। অনেকটা সেই ব্যুফে টেবিলের মতো। চেনা-জানা কাহিনিগুলো পড়তে পড়তে পাঠকের মনে সেই সুর বেজে উঠতেই পারে, "দূর দ্বীপবাসিনি, চিনি তোমারে চিনি"।
"পুরাণের সমান্তরালে" তিনটি পুরাণের ব্লেন্ডিং বলা হয়েছে। অ্যাজটেক, গ্রীক এবং ভারতীয় পুরাণ। এখানে কোয়াটজালকোয়াটল থেকে শুরু এবং তার লিখিত কোডেক্স ও ভূমিকায় অ্যাজটেক মিথলজির পার্টটা সাপোর্ট পায়। পুরো বইয়ে গ্রিক মিথের বিস্তার তো নিঃসন্দেহে সেটার উপস্থিতি জানান দেয়। প্রশ্ন জাগে তৃতীয় পুরাণের উপস্থিতির ব্যাপারে। কাহিনির শেষদিকে "ব্রক্ষ্মার" আবির্ভাব অবশ্যই সে অর্থে ভারতীয় পুরাণ এর উপস্থাপন এই বৈচিত্রে ভরা কাহিনিতে। তবে তার ব্যপ্তি যেটুকু বা মোটাদাগে বলতে গেলে একটা "প্রশ্নের" অবতারনা করতে - তাতে পুরাণের এই অংশটুকু আদৌ ব্লেন্ড কিনা সেটা পাঠক হিসেবে আমার কাছে একটা "প্রশ্নবোধক" চিহ্ন রেখে যায়। বইয়ের ফিনিশিং এর জন্যে ব্রক্ষ্মার আগমন এবং প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়া- সেটা বেশ সুন্দর ভাবে ফিট খেলেও, এটা ছাড়াও কিন্তু একি পদ্ধতিতে ফিনিশিং আসতে পারতো। যেমন, জিউস নিজেই সেই কথাগুলো বলতে পারতো কে জিতবে বা প্রমিথিউস। ব্রক্ষ্মার উপস্থিতি হয়তো একধরনের চমক বা স্টান্ট তবে আমার কাছে কিছুটা গিমিকও লেগেছে। বা আরোপিত।
"পুরাণের সমান্তরালে" বইয়ে কাহিনির পাশাপাশি লেখক অনেক "পাদটীকা"দিয়েছেন। এতো এতো জটিল নাম এবং সম্পর্কের প্যাঁচের কারনে নিঃসন্দেহে উক্ত "টীকা"গুলো পাঠকের জন্যে ব্রিদিং-স্পেস।এগুলোর সংযোজন দরকারও ছিল। একি সাথে এটাও সত্যি যে - একটু পর পর এগুলো সমানে আসা পড়ার ফ্লো-কে কিছুটা ধীর করেছে। অনেকটা স্পীড-ব্রেকারের মতো কাজ করেছে। প্রয়োজন ছিল বলেই হয়তো এতো টীকা থেকেও কাহিনি টীকার ভারে নুয়ে পড়েনি। তবে "গল্পকার" এস এম নিয়াজ মাওলার মাঝে যেন "রিসার্চার" এস এম নিয়াজ মাওলার সত্তা উঁকি দিচ্ছিল। কয়েকবারই মনে হয়েছে - "ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে"।
[৬]
উপরের আলোচনা যদি কেউ পুরোটা পড়ে থাকেন (যারা পড়বেন না তাদের বেলা তো কোন কথাই নেই), তাহলে হয়তো এই আলোচনা থেকে একটা দ্বীধা জন্মাতে পারে - "পুরাণের সমান্তরালে" কি পড়বো নাকি পড়বো না? অথবা উপভোগ্য কিনা?
আমাদের দেখা, শোনা এবং জানার মধ্যে দিয়ে যা সঞ্চারিত হয় সেটাকে প্রসঙ্গ অনুসারে পাল্টে নেবার একটা অপশন থাকে যে কোন ব্যক্তিরই। বিভিন্ন পুরাণে আমরা যতসব মণি-মুক্তা, লোভনীয় খাবার বা মোহনীয় বাহন দেখতে পাই - তা হয়তো সাবকনসাসলি আমাদের সকলেরই আরাধ্য। তবে পুরাণকে যৌক্তিক ব্যাখ্যায় দাঁড় করিয়ে বিচার করা প্রহসন মাত্র। প্রকৃত লোভনীয় জিনিষ কিন্তু কাহিনির প্রছন্নে থাকা আশ্চর্য সব সংকেত। এই সব সংকেত বা নিয়ম-ও-প্রথাকে অনড়, অপরিবর্তনশীল ভাবা হলে সেটা হয়তো অবাস্তব ভাবনা হবে না।
তবে তাতে লাভ কিছুই নেই। নিয়ম বা প্রথাকে প্রসঙ্গ অনুসারে পাল্টে নেয়ার সক্ষমতাই আত্মজ্ঞান বা আত্মোপলব্ধি হয়ে ধরা দেবে। সেটা পুরাণের ক্ষেত্রেও। "পুরাণের সমান্তরালে" এখানে একটা "ফ্রেম অফ রেফারেন্স" হিসেবেই কাজ করবে। একি সাথে, আমরা যারা হয়তো "গ্রিক মিথলজি- আদি থেকে অন্ত" সিরিজ তার অত্যাধিক মূল্যের জন্যে কিনতে বা পড়তে পারবো না- তাদের জন্যেও "পুরাণের সমান্তরালে" নিঃসন্দেহে "ফ্রেম অফ রেফারেন্স" হয়ে থাকবে।
মিথলজির কাহিনি বৈচিত্রময়। এখানে যেমন আছে ভালো ও মন্দ, তেমনি আছে নৈতিকতা এবং অনৈতিকতারও ভিন্ন ভিন্ন রঙ। "ভালো" এবং "মন্দ" - এই দুয়ের বাটখারায় নিক্তি মাপার বিষয় না। কারন অন্তর্নিহিত সংকেত থেকে যদি নৈতিক নিয়মাবলি পাঠকের প্রসারিত চেতনার দুনিয়ায় কড়া নাড়ে - তাহলে সফল। রূপকার্থে নিয়ে সংকেতটুকু প্রসঙ্গ অনুসারে পাল্টে নিবেন, তখন সেটা হয়ে উঠবে সম্পদ। আর সঠিক সম্পদ দেব-দেবীদের পুনরুজ্জীবনের মতোই বাড়তে থাকে। সেটা নিতে না পারলে- নির্জীব বলে মনে হবে।
এস এম নিয়াজ মাওলা ভাইয়ের "পুরাণের সমান্তরালে" তাই মিথ-পাঠকদের"ফ্রেম অফ রেফারেন্স" হতে পারে। অথবা পারে কিনা, সেটা নির্ণয় করতেও "পুরাণের সমান্তরালে" পড়ে সেই নিক্তি মাপার বিষয় হবে।
[৭]
আজব! প্রকাশনীর প্রোডাকশন নিয়ে না বললে অন্যায় হবে। বইটার ক্রাউন সাইজ এবং পেজ কোয়ালিটি দুটোর সমষ্টিতে অনন্য মাত্রা পেয়েছে। সেটা আরও বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে জুলিয়ান ভাইয়ের এস্থেটিক প্রচ্ছদে। বাইন্ডিং, পেজ কোয়ালিটি, প্রচ্ছদ, সম্পাদনা কোনটা নিয়েই বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই। এক কথায় বলা যায় - "ইটস কিউট!"
"পুরাণের সমান্তরালে" উপভোগ্য এবং ফাস্ট-পেসে কাহিনি অগ্রসর হওয়ায় মনোটোনাস ফিল আনবে না। ভালো লাগবে, তবে পাঠকের সাথে আত্নীয়তার সূত্রে অবদ্ধ হতে পারবে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকে যায়। পাঠকে ভেদে সেটা ভিন্ন হবেই।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিলো এক বছর পূর্বে, যখন লেখক অ্যাজটেকদের পুরাণ নিয়ে লেখা শুরু করেছিলেন। লেখকের একজন বন্ধু, যিনি মেক্সিকোতে আছেন, তাঁকে অনুরোধ করলেন অ্যাজটেকের পুরাণ নিয়ে জাতীয় গ্রন্থাগারে বা বিব্লিওটেকা নাসিওনাল ডে মেশিহকাতে ঘাটাঘাটি করে তথ্য জোগাড় করে দেওয়ার জন্য। তারই প্রেক্ষিতে লাইব্রেরিতে বন্ধু পরিভদ্রের সাথে পরিচয় হয় এক অ্যাজটেক বংশধর চিমাহলির, যিনি এমন এক কোডেক্সের সন্ধান দিলেন যা লিখেছেন স্বয়ং অ্যাজটেক দেবতা কুয়েটজালকোয়াটল, হাজার বছর পুরোনো নাহুয়াটল ভাষায় পশুর চামড়ায় লেখা সেই কোডেক্স তিনি পরিভদ্রের হাতে তুলে দেন, সাথে ব্যবস্থা করে দিলেন নাহুয়াটল ভাষা শিখার, যা শিখে পরিভদ্র কোডেক্স ইংরেজিতে অনুবাদ করে পাঠালেন লেখকের কাছে। আর লেখক সেটাই বাংলায় গ্রন্থ আকারে তুলে দিলেন পাঠকদের।
কোডেক্সটি একটা ডায়রি বলতে পারেন, যেখানে অ্যাজটেক দেবতা তার নিজের একটা পরিভ্রমণের গল্প বর্ণনা করেছেন। টোলান নামক এক পৃথিবীর এক জাতি মেশিহকার দেবতা হলো কোয়াটজালকোয়াটল, যিনি টোলানকে সমৃদ্ধিশালী, মানবমুক্তির উপায়, ন্যায়নিষ্টাবান বানাতে গিয়ে বড়ো ভাই তেজালিকাটলিপোকার প্রতিহিংসার বলি হয়ে ছুটতে হয়েছিলো অজানার উদ্দেশ্যে, সাপ দিয়ে তৈরি ভেলা ভাসাতে হয়েছিলো সমুদ্রে অস্তগামী সূর্যের দিকে। যা তাকে সময়ের ঘূর্ণিপাকে ফেলে পৌঁছে দিয়েছিলো হেলাস নামক পৃথিবীতে, যেখানে রাজ করছে দেবতা জিউস, সমুদ্রের রাজা পেসাইডন, পাতালের রাজা হেডিস সহ নানান দেব-দেবী।
এবার লেখক অ্যাজটেক দেবতা কোয়াটজালের দৃষ্টিতে এবং জবানে তুলে এনেছেন গ্রিক মিথলজিকে যেখানে গ্রিক মিথলজি অনুসারে টাইটান প্রমিথিউসের মানুষ সৃষ্টি ও মানুষের আদিম গুহা থেকে বের হয়ে সভ্যতার শিখরে আহরণের গল্প যেমন আছে, আছে গ্রিক মিথলজিতে বর্ণিত দেব-দেবীদের নানান ঘটনাগুলো। এখানে মূলত লেখক সৃষ্টিতত্ব হয়ে ট্রয়ের পরিণতির পর্যন্ত গ্রিক মিথলজিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ফাস্ট ট্র্যাকে তুলে এনেছেন।
যেখানে প্রমিথিউসের মানব সৃষ্টি ও উন্নতি পর্যন্ত কোয়াটজালকে দেখা গেলেও এরপর পরই এই দেবতার আর কোনো ভূমিকা ছিলো না, এরপরের সব কাহিনিই বলতে গেলে গ্রিক মিথলজির। এক্ষেত্রে গ্রিক মিথলজি যারা পড়েছেন, ট্রয়ের পরিণতির গল্প জানেন তাদের কাছে মাঝখানের এই গ্রিক গল্প, বিশেষ করে প্রমিথিউসের মানুষ সৃষ্টি, শাস্তি ও ভবিষ্যৎবাণী, জিউসের কাহিনি ও ট্রয় নিয়ে তার তৈরি করা ষড়যন্ত্র, প্যারিস আর হেলেনের গল্পগুলো নতুন লাগবে না। কিন্তু যারা গ্রিক মিথলজি পড়েননি, তাদের জন্য গ্রিক মিথলজি নিয়ে সামগ্রিকভাবে জানতে পুরাণের সমান্তরালে বইটি চমৎকার চয়েস হবে।
লেখকের এর আগে 'গ্রিক মিথলজি আদি থেকে অন্ত' পড়েছি এবং ট্রয়ের কাহিনি নিয়ে জানা থাকাই আমি বইটার মাঝের গ্রিক পুরাণের কাহিনির বলতে গেলে সবই আগে থেকে জানতাম। এক্ষেত্রে লেখকের গ্রিক মিথলজি পড়া থাকার ফলে একটা বিষয় খেয়াল করেছি যে গ্রিক মিথলজি আদি থেকে অন্ত বইটির বর্ণনা উপস্থাপন পদ্ধতি আর এই বইয়ের মিথলজি অংশের বর্ণনার ধরন প্রায় একই। যার ফলে যারা লেখকের গ্রিক মিথলজি পড়েছেন তাদের কাছে বর্ণনা অনেকেরই একই মনে হবে মানে অনেকটা নন-ফিকশনের মতো লাগবে। আর বইটির প্রথমদিকের কোডেক্সের লেখাগুলোর বর্ণনা আমার কাছে কিছুটা অপরিপক্ক লেখার মতো মনে হয়েছে, লেখকের গল্পসংকলন পড়া থাকলে এই পার্থক্যটা ধরতে পারবেন। যদিও শেষদিকে এসে অবশ্য সেটা আর মনে হয়নি। বরং লেখক মিথলজির গল্পকে বেশ গতিশীলভাবেই বর্ণনা করেছেন। যার ফলে গল্প খুব দ্রুতই পড়ে গেছি, সাথে বইয়ের গল্প শুরুর প্রারম্ভিক উপস্থাপনাটা আমার কাছে চমৎকার লেগেছে। যদিও এই পদ্ধতিটা ঐতিহাসিক উপন্যাস, মিথলজিক্যাল ফিকশনে আগেও দেখেছি।
অবশ্য মাঝে হেলেনের বিয়ের সময়ের গল্প পড়ার সময় অল্প সময়ের জন্য আমি কিছুটা গল্পের প্রবাহের সাথে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিলাম অনেকগুলো সম্পর্কিত সাবপ্লটের কারণে। এরপরের কাহিনি সাবলীল ভাবেই পড়ে গেছি। শেষদিকে এসে লেখক অ্যাজটেক মিথলজি, গ্রিক মিথলজি আর হিন্দু পুরাণের রামায়ণ কাহিনিকে একই সমান্তরালে দাঁড় করিয়ে বর্ণনা করেছেন যা নতুন এবং একই সাথে উপভোগ্য ছিলো। এক্ষেত্রেও রাম সীতার গল্পটা আগে থেকেই জানতাম। শেষদিকে এসে কোডেক্সের সমাপ্তি এবং একটা চিঠি এই দুটো বিষয় গল্পের রেশ ভালোভাবেই রেখে গেছে। তবে এই গল্পে গ্রিক মিথলজির কথা যতটা এসেছে, অ্যাজটেক আর হিন্দু পুরাণ তার অর্ধেকেরও কম এসেছে। তবে লেখক যেখানে শেষ করেছেন তাতে পরের বইটিতে আশাকরি দারুণ কিছু ঘটতে চলেছে।
বইটির প্রোডাকশনটা আমার সবথেকে বেশি ভালো লেগেছে। ক্রাউন সাইজের বইটির বাইন্ডিং একেবারে পাঠ উপযোগী। সেই সাথে প্রচ্ছদটাও প্রাসঙ্গিক, আর পৃষ্টা কোয়ালিটিও চমৎকার।
“পুরাণের সমান্তরালে- কোডেক্স কুয়েটজালকোয়াটল, ব্রহ্মা এবং ট্রয়ের যুদ্ধ” মিথলজি নিয়ে লেখা একটি চমৎকার ফিকশন। তিনটি পুরাণের কাহিনীর মিশ্রন বলা হলেও কাহিনী মূলত আবর্তিত হয়েছে গ্রীক পুরাণ নিয়েই। কিন্তু দারুন ব্যাপার হলো এই কাহিনীটাই আবার আমরা জানতে পারছি অ্যাজটেক মিথলজির প্রধান দেবতা, অ্যাজটেকদের সৃষ্টিকর্তা ওমেটেওটলের পুত্র কুয়েটজালকোয়াটলের জবানীতে। দেবতারা মানবজাতি তৈরি করে ছিলেন তাঁদের উপাসনা করার জন্য। তারপর একসময় গিয়ে মানুষ বলির প্রচলন হয় এবং এই মানুষ বলির বিরুদ্ধে নিজের ভাইয়ের বিপক্ষেই দাঁড়িয়েছিলেন কুয়েটজাল। ফলে ভাইয়ের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিজের ভুখন্ড, নিজের মানুষদের ছেড়ে ভেলা বানিয়ে অজানার উদ্দ্যেশে বেড়িয়ে পড়েন। ভাসতে ভাসতে একসময় গল্পের মূল চরিত্র কুয়েটজাল সময় ঘূর্ণির মধ্যে পরে চলে আসেন গ্রীক সভ্যতায়। সেখানে কুয়েটজালের সাথে দেখা হয় পার্সের আর প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে যান। এরপর বন্ধুত্ব হয় যাকে গ্রীক পুরাণে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী বলা হয় সেই প্রমিথিউসের সাথে। কুয়েটজালের পরামর্শেই প্রমিথিউস মানুষ সৃষ্টি করেন, তাদেরকে আগুন এনে দেন, শেখান কৃষিকাজ। পৃথিবীতে নানান পুরাণ, নানান গল্প আর সেইসব গল্পগুলোর মাঝে কী অদ্ভুত মিল!! যেমন প্রতিটি পুরাণের কাহিনীতেই আছে মহাপ্লাবনের গল্প। হেলেনের জন্য ট্রয়ের যুদ্ধ আর সীতা হরণ করার কাহিনীতে যে যুদ্ধ দুটোর সাথে যে অদ্ভুত সাদৃশ্য , কী করে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিহীন পুরনো ভুখন্ডগুলোর কাহিনীতে এতো মিল হওয়া সম্ভব!!! ওমেটেওটল, রু, ক্যায়স, খেমেট অথবা ব্রহ্মা এদের একইরকম পৃথিবীর কলকাঁঠি কি তবে অন্য কোন অদৃশ্যশক্তির হাতে?!!! জিউস থেকে শুরু হয়ে ট্রয়ের যুদ্ধ, দেবতাদের ষড়যন্ত্র আরও নানা ঘটনা এবং গল্পের একদম শেষ পর্যায়ে পুস্পকরথে করে ব্রহ্মার আবির্ভাব সব মিলিয়ে অ্যাজটেক দেবতা কুয়েটজালের জবানীতে লেখা এই কোডেক্স আমার কাছে খুবই চমৎকার লেগেছে। এই বইয়ের লেখক এস এম নিয়াজ মওলা কে চিনেছি তার নন ফিকশন “গ্রীক মিথলজি-আদি থেকে অন্ত” থেকে। তবে উনার কোন ফিকশন পড়ার সুযোগ হয়েছে এই প্রথম এবং এটাই সম্ভবত উনার সবথেকে পাতলা বই। চমৎকার লেখনীর অসম্ভব সুখপাঠ্য একটি বই, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রমুগ্ধের মতো আটকে যেতে হয়। আর তার সাথে বোনাস হিসেবে আছে চমৎকার প্রচ্ছদ। তবে ১১৮ নম্বর পৃষ্ঠার ‘পিচ্চিকাল’ 'শৈশব' হতেই পারতো আর তারই কয়েকপাতা পরে ‘ভেজাল’-কে ‘সমস্যা’ লেখাই যেত। এটা লেখকের ইচ্ছে কিন্তু এতো চমৎকার একটা লেখার এই দু’টো শব্দ পাঠক হিসেবে আমাকে খুব দুঃখ দিয়েছে। দেবতাদের মুখ থেকে এই দু'টো শব্দ মেনে নিতেই খুব কষ্ট হয়েছে। যে কারণে পিরিয়ড মুভিগুলোতে সবসময় বৃটিশ এক্সেন্ট ব্যবহার করা হয় সম্ভবত সেই কারণেই। মিথলজি আমার বরাবর খুব পছন্দের বিষয় কিন্তু মিথলজি নিয়ে বাংলায় সুখপাঠ্য বইয়ের খুবই অভাব। আশা রাখলাম লেখক নানা দেশের মিথলজি নিয়ে আরও দারুণ দারুণ সব ফিকশন, নন-ফিকশন বই আমাদের উপহার দেবেন৷ ❤️
মিথলজি সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা আমার নেই। তবে পরিচিত কিছু নাম পেয়েছি যেমন প্রমিথিউস, জিউস, কুয়েটজালকোয়াটাল, আফ্রোদিতি, এথেনা, একিলিস, ট্রয়, হেলাস.... এদের সাথে, কুয়েটজালকোয়াটালের সাথে যাত্রা দারুণ কেটেছে। দেবী দেবতাদের জগৎ তার সাথে তাদের সৃষ্টি করা মানব মানবীর জগৎ এর গল্প সমান্তরালে চলেছে এখানে। কেমন করে মানুষ শিখলো আগুনের ব্যবহার, কৃষিকাজ, কেমন করে মানুষে দেবতায় হতো যুদ্ধ কিংবা মিলন সবকিছু মিলে অনেক কিছু জানা হয়েছে এই বইয়ের মাধ্যমে। কুয়েটজালকোয়াটালের লেখা এক অভিশপ্ত কোডেক্স কেমন করে বাংলাদেশে বসা নিয়াজের হাতে এলো সে গল্পও ছিলো দারুণ। তবে যে প্রশ্নটা মনের মধ্যে প্রথম থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছিলো তা অজানাই রয়ে গেলো। কে আছে এই সব সৃষ্টিবিনাশ রহস্যের পেছনে? সেই কেউ একজন কে?
সর্বোপরি মিথলজি সম্পর্কে কিছু না জানলেও নিয়াজ মাওলার লেখা এই ফিকশনাল উপন্যাস ভালো লাগবে সবারই। আগ্রহ জাগাবে মিথলজি সম্পর্কে জানার।
এস এম নিয়াজ মাওলার লেখা এই প্রথম পড়লাম। উনার 'মিথলজির আদি থেকে অন্ত' সিরিজের বেশ প্রশংসা শুনেছিলাম, কিন্তু পড়ার আগ্রহ হয়নি কারণ সেই সিরিজে বর্ণিত মিথলজিগুলো নিয়ে মোটামুটি পড়াশোনা আমার আগেই করা ছিল। পরবর্তীতে শুনলাম তিনি পুরাণকে অবলম্বন করে মৌলিক উপন্যাস লিখছেন। প্রকাশের প্রায় সাথে সাথেই কৌতূহল বশত হয়ে 'পুরাণের সমান্তরালে' কেনা হলেও এতদিনে পড়িনি কারণ আমার আগ্রহে ভাটা পড়েছিল। ভেবেছিলাম, পুরাণের মধ্যে নতুন আবার কী থাকবে! ভুল ভেবেছিলাম। বইটা পড়ে ভালো লেগেছে। পৌরাণিক কিছু ঘটনাবলী ও চরিত্রকে উপজীব্য করে লেখক খুবই ইন্টারেস্টিং একটি গল্প লিখেছেন। পড়ার পুরোটা সময়ই উপভোগ্য ছিল। নিয়াজ মাওলার বাংলা ভাষাজ্ঞানে (শব্দ চয়ন ও বাক্য গঠন) মুগ্ধ হয়েছি।
মিথলজির প্রতি আমার টান কাজ করে, যদিও এবিষয়ে স্পেশালাইজড কোনো বই আমি ঐভাবে পড়িনি (নিজের ধর্মের বাদে)। কিন্তু লেখকের টীকা এবং সরল লেখনীতে পুরো দস্তুর বইটি এক দিন আর এক রাতের মধ্যেই শেষ করে ফেললাম।
এন্ডিং দেখে কিছুটা সন্দিহান যে এর কি কোনো সিক্যুয়েল আসবে। যদিও আসার চান্স উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে আশায় রইলাম।