শহরতলির ছোট্ট এক স্কুল, গুটিকয়েক শিক্ষক আর বেশকিছু ছাত্রছাত্রী নিয়ে মিশে আছে সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে। সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়টি শিক্ষার্থীর জীবনে কতো বড় ছাপ রেখে যায়, জীবনে চলার পথে কীভাবে শক্তির উৎস হয়ে ওঠে, টুকরো টুকরো ঘটনার মধ্য দিয়ে বড় সেই জীবনসত্যের কথা বলেছেন সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। ছোট্ট এই বই তাই বলছে অনেক বড় অভিজ্ঞতার কথা, স্কুলের যেসব অভিজ্ঞতায় পুষ্ট হতে হতে বড় হওয়ার পথে পা বাড়ায় ছাত্রছাত্রীরা।
Selina Hossain (Bangla: সেলিনা হোসেন) is a famous novelist in Bangladesh. She was honored with Bangla Academy Award in 1980. she was the director of Bangla Academy from 1997 to 2004.
সেলিনা হোসেন (জন্ম: ১৯৪৭) বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিকদের অন্যতম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি এ অনার্স পাশ করলেন ১৯৬৭ সালে। এম এ পাশ করেন ১৯৬৮ সালে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমীর গবেষণা সহকারী হিসেবে। তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমীর প্রথম মহিলা পরিচালক হন। ২০০৪ সালের ১৪ জুন চাকুরি থেকে অবসর নেন।
গল্প ও উপন্যাসে সিদ্ধহস্ত। এ পর্যন্ত ৭টি গল্প সংকলন, ২০টি উপন্যাস, ৫টি শিশুতোষ গল্প, ৫টি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু বই। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক (১৯৬৯); বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮০); আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১); কমর মুশতরী স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৭); ফিলিপস্ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮); অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪)। তাঁর গল্প উপন্যাস ইংরেজি, রুশ, মেলে এবং কানাড়ী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
কলম্বিয়ান খুকি স্কুলে যাচ্ছে। কৃতজ্ঞতা: Christoph Otto
আমার দাদু সেই সময় বেঁচে ছিলো কি না মনে নেই তবে আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়ে এসেছিলো গ্রামের অন্য এক দাদু, যে স্কুলে আমার আম্মু-আব্বুও পড়েছিল। সেই স্কুলের শুধু একটা ঘটনাই মনে আছে। একবার এক বাচ্চা খুব কাঁদছিল, তো মাস্টার মশাই রেগে-মেগে বলেছিলেন, হোনার তুন ব্যাঙ ওগ্গো ধরি গালা-ত ঢুঁগাই দেতো কেউ। :P তো সেই স্কুলে ফার্স্টও হয়ে গেলাম। তৎকালীন নিয়মানুসারে সবগুলো সরকারি বই নতুনও পেয়েছিলাম। সেই স্কুলে আর পড়া হয়নি এবং বইগুলো রেখে দিয়েছিলাম, স্মারক চিহ্ন হিসেবে। :D
আমার আম্মু অতি কাবিল শ্রেণির লোক। সম্ভবত তার ধারণা হয়েছিল, নিশ্চয় বাকিরা সব অতি গাধা, এ কারণে তুলনামূলক কম গাধাটা ফার্স্ট হয়ে গেছে। তো গাধাকে মানুষ করার জন্য এবার একটা কিন্ডার গার্টেন স্কুলে ভর্তি করানো হল। জ্বী না, টু তে না! কেজি তে! -_- এবার নিজে গিয়েই ভর্তি হয়ে আসলাম। (বড় হয়ে গিয়েছিলাম তো। :3) আমার আম্মু যে অন্য কাবিলদের চেয়ে কয়েক ডিগ্রি বেশি কাবিল তা তো আর জানতাম না। বই দেখে বললো, না! পেরে উঠবি না। অতএব এবার নার্সারিতে!! লোকে না ভালো ফলাফল করলে ডাবল প্রমোশন পেতো, আর আমি পেলাম ডাবল ডিমোশন। সেই থেকে বুঝে গেলাম এ পৃথিবী মুমিন বান্দাদের জন্য নয়। :'( [আম্মু এ কান্ড আমার আপুর সাথেও করেছিলো। শহরে যখন চলে আসলাম তখন তাকে এইটে ভর্তি না করিয়ে সেভেনে করালো। >:( ]
সেই স্কুলের কথাও আসলে কিছু মনে নেই। আমার ছোট ভাই স্কুলে যেতে চাইতো, কিন্তু ওর তো বয়সই হয়নি। কিন্তু সে আমার সাথে চলে আসতো। আমার পাশে থেকে ক্লাসও করেছিলো কয়েক দিন। এ নিয়ে যে বেশ অস্বস্তিতে ভুগতাম তা না বললেও চলে। বাবু এখন স্কুলে যাওয়ার জন্য কাঁদছো। এক সময় স্কুলে না যাওয়ার জন্য কাঁদবে। রবি ঠাকুরের কথাটা তার জন্য সত্যি হয়ে গিয়েছিল। নার্সারি আর কেজি পড়লাম এই স্কুলে।
এবার উচ্চ শিক্ষার্থে শহরে গমন। ক্লাস থ্রি। যাক ক্ষতি কিছুটা পূরণ করা গেলো। কিন্তু সেটা ছিলো আবাসিক স্কুল। :'( পিটির একটু আগে যেতাম বলে আগেই ক্লাসে যাওয়া হতো না, যার ফলে অধিকাংশ সময়ই পেছনের দিকেই বসতে হতো। ছেলে-মেয়েগুলো কিছুটা সহানুভূতির চোখেই দেখতো। আহারে মা-বাবা ছাড়া আছে!
এবার আম্মুরাও শহরে চলে আসলো। আর আমি ভর্তি হলাম বাসার কাছের এক স্কুলে। এটাই আমার একমাত্র স্কুল যেটায় কোন মাঠ ছিল না, বাসার মধ্যে স্কুল। কিন্তু এটা খুব চমৎকার স্কুল। প্রতি ক্লাসে বিশ জনের মত ছেলে-মেয়ে। আমি এই স্কুলের আগে যেসব স্কুলে পড়েছি সেসবের কারো নাম বলতে বললে বলতে পারবো না, কিন্তু এটার পারবো, বিশেষত ফাইভের। কাস্ট-ক্রিড-কালার, শব্দগুলো এটার জন্য প্রযোজ্য। তিন ধর্মের স্টুডেন্ট/টিচার, তার উপর আবার আমাদের ছিল বিশালের মত বন্ধু আর সুপ্রিয়া ম্যাম, যারা বাঙালি নন, চাকমা। [(অনেক) বাঙালির কাছে আদিবাসী মানেই চাকমা, আমি সেজন্য কিছু না জেনেই বলছিনা, নিশ্চিত তো।] ব্যাপারটা হয়তো হাস্যকর মনে হতে পারে কারো কারো কাছে কিন্তু পারিবারিক/স্কুলের পরিবেশ আসলে জীবনে অনেক প্রভাব পরে। তখন ওভাবে চিন্তা করতে পারতাম না, কিন্তু এখন চিন্তা করলে মনে হয়, বাহ! [তার উপর ছিলাম পাথরঘাটার মত একটা এলাকায়।] টিচারদের সাথে সম্পর্ক ছিল সবচেয়ে সহজ-সরল। আমরা তো পারলে তাদের সাথে ঝগড়াও করি! একবার গণিতের সি-টিতে প্রায় সবাই ১৮/১৯ পেলেও শুধু জেনি ২০ পেলো। সুব্রত স্যারকে ধরলাম। এটা কী করলেন। ও একটা ভুল করেছে, ২০ মোটেই পাবে না। :D 'এক্স' (নামটা ভুলে গেছি) একবার আমার সামনে দোকান থেকে ফুল কিনে ম্যামকে দিল, বললো আমার বাগানের ফুল। কি মিথ্যুক! আর ম্যামও কি খুশি: তোমরা তো কেউ দাওনা। -_-
তো সিক্সে ভর্তি হতে হবে। প্ল্যাসিডে ডাব্বা মারলাম। অতএব মুসলিম হাই স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিতেই হল। ঐ একবারই আম্মু 'পরীক্ষা কেমন হল' 'র বাইরেও কিছু জিজ্ঞেস করলো। এমনকি পরের দিন আমাকে দিয়ে সেই প্রশ্নের পরীক্ষাও নিলো। খাতা দেখলো আপু [উইথ রেড পেন :3]। দুইজনের সম্মিলিত রায় আসলো, না, লক্ষণ দেখি না! কিন্তু চান্স পেয়ে গেলাম। পুরো স্কুল লাইফে ঐ একবারই ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। আমার ছোট ভাইকে তো নার্সারিতেও ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। আহারে! এখনকার বাচ্চা-কাচ্চাদের কি কষ্ট! আবার নাকি একটা ভাইবাও হবে। তো গেলাম ভাইবা দিতে। 'তোমার চুল তো অনেক লম্বা, যাও কেটে আসো।' এই ছিল তাদের জবাব। কেটে আসার পর, আইডি জিজ্ঞেস করলেন, আর বললেন, এবার যাও। এরকম আজব ভাইবা আর দিইনি।
সিক্সের প্রথম ক্লাসেই স্যার বললেন, এতকাল ৯০/১০০ পেয়ে এসেছো, এখন নাইন্টি পাওয়া তো দূরের কথা, নাইন্টিন পেতেও কষ্ট হয়ে যাবে। কথাটার মর্যাদা রাখতে আরবী নামক এক আজগুবি বিষয়ে আমি ১৮ পেয়ে বসলাম। ইসলাম শিক্ষার সাথে গুলিয়ে ফেললে হবেনা, এটা আরবী। একটা গল্প ছাড়া বাকী সব লিখতে হত আরবীতে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় একজন পেল ৯২! কিভাবে সম্ভব? যাইহোক, (স্কুলে) সেই একবারই ফেইল করেছিলাম। কয়েক বছর পর সেই বিষয় বাদ দেয়া হয়েছিল। জুনিয়ররা ভাগ্যবান।
ড্রইং স্যার। ফাঁকিবাজ। মাঝে মাঝে আসতেন, এই তোরা খাতাগুলো নিয়ে আয়। আমরা নিয়ে যেতাম, আর বিভিন্ন ছবি দেখে মন্তব্য করতেন। অ্যালাইনমেন্ট ঠিক আছে, আরো সুন্দর করা চেষ্টা কর। ব্লা ব্লা। সুন্দর ছবি আঁকতেন, একবার একটা হুক্কার ছবি এঁকেছিলেন, যা সুন্দর। আর্ট নিয়ে মাঝে মাঝে গল্পও করতেন। তো সেই স্যার পরীক্ষার আগে প্রতি সেকশনে যেতেন আর পুরো ৫০ নাম্বারের প্রশ্নটাই বোর্ডে লিখে দিতেন। শূণ্যস্থান কোন প্যারা থেকে আসবে, কোন তিনটা প্রশ্ন, কোন তিনটা ড্রইং …
এই স্কুল নিয়ে লিখতে গেলে আসলে অনেক-অনেক কিছু লিখা যায়। শুধুমাত্র বিচিত্র স্যারগুলোকে নিয়ে একটা বইও লিখে ফেলা যায়! পুরো হাই স্কুলটাই যে ওখানে কাটিয়েছি। স্কুল জীবন আমি অনেক আরামে কাটিয়েছি। মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে পড়ি, স্কুলে অনেক প্রেশার, আবার বাসায় মা-বাবার প্রেশার। চিন্তা করতেও তো ভয় হয়।
যাইহোক, আমার ছোট ভাই পড়তো সেন্ট স্কলাস্টিকাস কনভেন্টে। রাজকীয় দালান, সুন্দর একটা বাগান, মানে খুব সুন্দর একটা স্কুল। ওদের ছোট্ট-ছোট্ট বেঞ্চিগুলোতে বসতে যা ইচ্ছে হতো আমার। :P
*
... মাঝে মাঝে আমরা ওইসব বাড়িতে ঢুকে পানি খেতে চাইতাম। আমাদের কারো কোন ফ্লাস্ক ছিল না। স্কুলের সামনে একটা টিউবওয়েল ছিল। কলের মুখে হাত লাগিয়ে পানি টেনে খেতে হতো। বেশির ভাগ সময় জামা ভিজে যেতো। মাঝে মাঝে বাড়ির মেয়েরা রেগে গিয়ে আমাদের বলতো, তোমরা এখানে কেন পানি খেতে আসো? তোমাদের স্কুলের কলে খেতে পারো না? আমি চটপট বলতাম, শুধু তো পানি চাই। আর তো কিছু চাই না। কলের পানি খেতে গেলে দুষ্টু ছেলেরা পানি ছিটোয়। জামা ভিজে যায়।
মেয়েটি মুখ ঝামটা দিয়ে বলতো, হয়েছে আর কৈফিয়ৎ দিতে হবে না। যত্তসব পাকামি। আমি রেগে বলতাম, একটু পানি খাওয়াবে তাতে এতো কথা। আমাদের বাড়িতে গেলে তোমাকে কলসি কলসি পানি খেতে দেবো।
মেয়েটি রেগে বলতো, কি, এতো বড় কথা! পানি আনতে আমার কষ্ট হয়না বুঝি। আমিও ছাড়তাম না। বলেই ফেলতাম, আমাদের স্কুলের টিউবওয়েল থেকেই তো আনো। তোমাদের বাড়িতে তো কল নেই।
মেয়েটি চিৎকার করে মাকে ডাকতো। আমরা ছুট লাগাতাম। ভাবতাম, ওর মা বেরিয়ে হয়তো আমাদের মারতে পারে। এরপর কয়েকদিন না গিয়ে,আবার যেতাম। তখন মেয়েটির সঙ্গে ভাব হয়ে যেতো।
বলতাম, তুমি স্কুলে আসো না কেন?
মেয়েটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বলতো, স্কুলে গিয়ে কী হবে?
আমাদের মধ্যে কেউ একজন বলতো, আমাদের সঙ্গে মজা করতে পারবে।
মেয়েটি গ্লাস নিয়ে চলে যেতো। ওর মধ্যে স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ দেখি নি। কেন? সেটা বোঝার বয়স আমার ছিল না।
সেলিনা হোসেনের এই বইটা সুন্দর। বগুড়ার ছোট্ট একটা স্কুলের গল্প। আলোর পাঠশালা থেকে নামিয়ে ৩২ পৃষ্ঠার এই বইটা পড়েও ফেলা যাবে ঝটপট।
হা আলস্য! বইটা পড়েছিলাম আজ থেকে ঠিক একমাস আগে। বইটি এন্ট্রি করা ছিল না বিধায় আর রিভিউ করা হয় নি। হা কপাল, এক মাসেও কেউ এন্ট্রি করলো না (যদিও করার কথাও ছিল না), আমারই করতে হলো।
এই শিরোনামে (বা এই সিরিজের) আরও একটি বই আগে পড়েছিলাম, রনবীর লেখা। তার প্রতিক্রিয়ায় কিছুটা আশাহত হবার সুর ছিল। কিন্তু আমি সব কিছুকেই দ্বিতীয়বার (কখনো তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম পর্যন্তও গড়ায়) সুযোগ দিতে ভালবাসি এবং তার সুফল ভোগ করি। রনবীর বইটি সম্পর্কে যে সব অভিযোগ ছিল তার সব কয়টি কেটে গেছে এই বইটিতে।
খুব ছোট্ট পরিসরের বই। সেলিনা হোসেনের বইয়ের পাতা বাড়ানোর একদম চেষ্টা করেননি। শুধুমাত্র প্রাথমিক স্কুলের কথা লিখেছেন। মাধ্যমিক স্কুলের অভিজ্ঞতাগুলো প্রাথমিক স্কুলের তুলনায় অধিক সচেতন এবং স্মৃতিগুলো বেশি পরিষ্কার হবার কথা থাকলেও সেদিকে পা না বাড়িয়ে শুধুমাত্র প্রাথমিক স্কুলের স্মৃতিচারণই করেছেন। হয়তো এই স্মৃতিগুলোর সাথে ওনার প্রিয়তা মাধ্যমিক স্কুলের স্মৃতির চেয়ে অনেক বেশি। শুধুমাত্র সেই স্কুল সম্পর্কিত স্মৃতির কথাই বলেছেন, শৈশবকালীন আরও অনেক অভিজ্ঞতা টেনে আনেননি। রনবী নিজের বইটির চেয়ে এই বইতে ছবিগুলো ঢের বেশি যত্ন করে এঁকেছেন। ছবি এবং কন্টেন্ট সমন্বয়ের যে অভাব সে বইটিতে ছিল এই বইটি তা থেকেও মুক্ত।
এছাড়াও পরপর দুটি বই পড়তে গিয়ে যা বুঝতে পারলাম, একটি ছেলে এবং একটি মেয়ের প্রাথমিক স্কুলের অভিজ্ঞতা পর্যন্ত আলাদা ধরণের হয়। সেলিনা হোসেনের স্মৃতি এবং দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আমি তুলনামূলক বেশি কানেক্ট করতে পেরেছি। যাই হোক, ক্যামন যেন ছক কেটে উদ্ভিদ এবং প্রাণীর পার্থক্য লেখা ধরণের আলোচনা হয়ে যাচ্ছে, এর থেকে কিছুটা বেরোবার চেষ্টা করা যাক।
বইটি আমার কাছে বিশেষ হবার অন্যতম কারণ লতিফপুর প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার। দুর্ঘটনায় তিনি তাঁর এক পা হারিয়ে ঢুকেছিলেন সেই স্কুলটিতে। দূর করতে চেয়েছিলেন ছোট ছোট বাচ্চাদের জীবনের অন্ধকার। প্রতিদিন স্কুলের সকল বাচ্চাদের একসাথে উচ্চারণ করাতেন "পাখিসব করে রব রাতি পোহাইলো, কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল"। আর বলতেন "তোরা হলি পাখি। তোদের জীবন থেকে অন্ধকার দূর হয়ে যাক, তোরা অন্ধকারের বিরুদ্ধে কলরব করবি"।
আহা...সোসাকু কোবায়েশি ইদানীং পিছু ছাড়ছেনই না, নানা রূপে চিন্তা জগতে হাজির হচ্ছেন! ভাল থাকুন, শান্তিতে থাকুন লতিফপুর প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার। ভাল থাকুন, শান্তিতে থাকুন সোসাকু কোবায়েশি। আমাকে কেন শুধু শুধু যন্ত্রণা দেয়া!
One of the luckiest things that can happen to you in life is to have a happy childhood.
অগাথা ক্রিস্টির এই কথাটা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। যার কোনো শৈশব স্মৃতি নেই সে নিঃসন্দেহে ভীষণ অসহায় একজন মানুষ। বুড়ো বয়সে মিষ্টি একটা শিশুকাল মনে করে দু-চোখের কোণ ভিজে না উঠলে একটা জীবন বৃথা হয়ে যায়।
মিষ্টি শৈশব স্মৃতির পরতে পরতে ইশকুল থাকবে না সেটা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। সেলিনা হোসেন এর স্মৃতির পাতা ঘেটে লেখা আমার স্কুল পড়তে গিয়ে আমি কল্পনায় ফ্রক পড়া ভীষণ কৌতূহলী আর সাহসী একজন বালিকাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম! অদ্ভুত সুন্দর মায়াময় একটা বই!
লেখিকার ইশকুল স্মৃতির সাথে নিজের স্মৃতির কিছুটা মিল খুঁজে পেয়ে রীতিমতো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছি! সরকারী স্কুলের প্লাস্টার খসে পড়া মলিন ক্লাসঘর আর লম্বা বারান্দার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে বারবার! কান পাতলেই যেন ঢংঢং করে স্কুল ঘন্টি পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি!
আহা নস্টালজিয়া!!
ক্লাস টু পর্যন্ত গ্রামের সরকারী স্কুলে পড়েছি। তাই স্কুল পালানোর অবাধ স্বাধীনতা ছিলো। কোনো কোনো দিন এমনও হয়েছে- ভাল লাগছে না, তাই স্কুলে না গিয়ে বনেবাদাড়ে ঘুরেফিরে ছুটির সময়ে বাড়ি ফিরেছি! বাবা-মা স্কুল ফাঁকি দেয়ার কথা জানতেও পারেনি! আবার এমনও হয়েছে, মামাতো ভাইবোনেরা বাড়ি এসেছে, তাই মিথ্যে জ্বরের অজুহাতে ছুটির ঘন্টা পড়ার আগেই চলে এসেছি বাড়িতে। বাড়ি ফিরলেই জ্বর পালাতো! তখন আমার মতো সৃষ্টিছাড়া মেয়ে কি আর ঘরে বসে থাকে?! ঠিকঠিক চলে যেতাম তেঁতুলতলায় না হয় শাপলাপুকুরে!
বড় মধুর ছিল সময়গুলো! ক্লাস থ্রিতে উঠে ট্রান্সফার হলাম লেকার্স পাবলিক স্কুলে। স্কুলের জন্য বরাদ্দ ভালোবাসার সিংহভাগ জমা আছে লেকার্সের জন্য। কিন্ডারগার্টেন স্কুল, ভীষণ কড়া নিয়মকানুন। স্কুল ফাঁকি দেবার জো নেই। নিয়মিত পড়া করতে না পারলে শাস্তিবিধানেরও ব্যবস্থা ছিল। তবু এই স্কুলের জন্য অদ্ভুত একটা মমত্ববোধ শিশুকাল থেকেই লালন করতাম! কাপ্তাই লেকের পাশে স্কুল। মাঠের অপর সীমানায় লেকের টলমলে জল আর লেকের উপর জেগে থাকা চর মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। স্কুলের টীচাররা ছিল বন্ধুর মতো। দু-একজন কড়া শিক্ষক যে ছিলনা, সেটা না। তারাও শিক্ষার্থীদের ভালবাসতো প্রাণ দিয়ে!
আহা.. রূপকথার সেইসব দিনগুলো! ফেলে আসা মিষ্টি স্কুলবেলা! নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায়, কোলাহলের ভীড়ে, বেলা অবেলায় একটা মিষ্টি শৈশব প্রায় সময় হাতছানি দিয়ে ডাকে। বিশ্রী রকমের এডাল্টিং বাদ দিয়ে মাঝেমাঝে দিন দুয়েকের জন্য শৈশবের নিষ্পাপ দিনে পালিয়ে যেতে পারলে মন্দ হতোনা।
মাগল ওয়ার্ল্ডে টাইম টার্নার থাকাটা খুব প্রয়োজন ছিল।
সেলিনা হোসেন বড্ড সেফ খেলেন। শহর-নগর-গ্রাম নির্বিশেষে সব ধরণের মানুষের কথাবার্তার ক্ষেত্রেই তিনি একই কলকাতার ভাষা ব্যবহার করেন। তাই সবকিছু কৃত্রিম মনে হয়। স্কুল নিয়ে লেখিকার স্মৃতিগুলো সুন্দর, বিমর্ষ। কিন্তু সার্বজনীন ভাষাপ্রয়োগ সেগুলোকে বিবর্ণ করেছে।
সেলিনা হোসেনের প্রাথমিক বিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিকথা। ১৯৫০ এর দশকের গল্প। মানে পিটিতে "আমার সোনার বাংলা" গাওয়ার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। শৈশব কেটেছিল বগুড়ায়। সেলিনা ছিলেন ভালো ছাত্রী। ক্লাসে প্রথম। আদব কায়দাতে ছিলেন ত্রুটিমুক্ত। শিক্ষকদের চোখে আদর্শ শিক্ষার্থী যাদের বলে, তিনি ছিলেন সেই দলের। ক্লাস ফাঁকি দেওয়া নেই, পড়া না পেরে মার খাওয়া নেই, মারামারি করার রেকর্ড নেই, বন জঙ্গলে ঘোরাঘুরি নেই। তাই তার গল্পটা তেমন ইন্টারেস্টিং না।
কিন্তু তাঁর স্মৃতিকথায় সহানুভূতির উপস্থিতি আছে, শিশুদের যেই ���ুণটা রপ্ত করানো খুব দরকারি। স্কুলের ঘণ্টা বাজাতেন যিনি, সেই অসহায় বৃদ্ধের প্রতি সেলিনার ছিল পরম মমতা। সেলিনা স্কুলে যাবার পথকে ভালোবাসতেন, স্কুল প্রাঙ্গণ ভালোবাসতেন, শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করতেন, দুঃখ পেতেন বন্ধুদের দুঃখে। স্কুলের ঘণ্টাধ্বনি এখনও তাঁকে আকুল করে। ঠিক আমাদের মত।
ছোট পরিসরের একটা বই। পড়তে ১ ঘন্টা ও লাগে নি। কিন্তু পড়ার সময় প্রতিটা মুহূর্তে নিজের স্কুল জীবন আর সেই ছোটবেলার কাহিনী গুলো প্রতিমুহূর্তে মনে এসেছে। কেমন যেন একটা খারাপ লাগা কাজ করতে শুরু করেছে। একমাত্র কৃত্রিমতা বিহীন জীবন ছিল মনে হয় সে সময়৷ তারপর তো এই যে কলেজ এবং এখন ইউনিভার্সিটি! কত কিছু ই তো এখানে পাচ্ছি কিন্তু সেই ন্যাচারাল বিষয়টা কেন যেন মিসিং। স্কুল জীবন (৬-১৫ বছর বয়স)এ সময়টা হয়তো অতশত কিছু বুজতাম না তবুও কৃত্রিমতা বিহীন একটা সময় ছিল। এখন হয়তো সব বাচ্চারাা তাও পায়না। এসব চিন্তা হলে খুব মন কেমন কেমন করে৷ তখন যাদের ছাড়া একটা দিন ও কল্পনা ও করা যেত না আজ তারা কোথায়? আমার কেবল কষ্ট হয়। খারাপ ভালো সবকিছুর জন্য ই!স্মৃতি রোমন্থন ছাড়া আর কি ই বা করার থাকতে পারে?
ভালো কাটুক সবার স্কুলজীবন। কৃত্তিমতাবিহীন, সুন্দর, সরল আর মনোরোম🌻এখনকার সময়কার বাচ্চাদের জন্য এটাই কামনা 💜💜
আমাদের প্রত্যেকের জীবনের যে অংশটা নিয়ে অবশ্যই অবশ্যই লেখা উচিত তা হলো ছোটবেলা...শৈশব। আর শৈশবের যে অংশটা নিয়ে সবথেকে জোর দিয়ে লেখা উচিত তা হলো আমাদের স্কুলের সময়টুকু। সে আমরা লেখক হই আর না হই, বিখ্যাত হই বা না হই। কারণ এই ছোট জীবনে ঐ ছোট্ট সময়টুকুন সম্ভবত সবচেয়ে সুন্দর যার জন্য বারবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে, অনেক অনেকদিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে।
এ পর্যন্ত সেলিনা হোসেনের যত লেখা পড়েছি, এই বইটা সবথেকে প্রিয়। কেন প্রিয়, তার ব্যাখা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখছিনা। কথায়, শব্দে, অল্পে - বিশদে দেওয়া সম্ভবও না !
মনে হয় বেশিদিন হয়নি স্কুল লাইফ পিছনে ফেলে এসেছি। কিন্তু হিসাব করলে দেখি আমার জীবনের প্রায় ১২/১৩টা বছর এখানেই কেটেছে। আমার স্কুল আর কলেজ একটাই ছিল। এখানে কে.জি. থেকে ইন্টার পর্যন্ত কাটালাম। কখনো আমার স্কুল চেঞ্জ হয়নি। স্কুল শেষ করে এখানেই কলেজে পড়লাম। একই বিল্ডিং, একই বন্ধুবান্ধব, একই স্যার-ম্যাডাম। এই ১৩টা বছরের যে কত স্মৃতি আছে!! কত হাসি-কান্না, রাগ-অভিমান, আনন্দ, ঝগড়ার এক একটা গল্প আছে তা ভাবতে বসলে কোনো কূল কিনারা পাই না!! আমার স্কুল-কলেজ নিয়ে আমার আলাদা একটা জগত ছিল। মায়া আর ভালোবাসায় ভরা একটা জগত। অন্যরকম একটা টান কাজ করত। কিন্তু এখন সেই জগতটা বিলীন হয়ে গেল। এখন যা আছে তা শুধু স্মৃতি। মনে পড়লে প্রচন্ড কষ্ট লাগে। এই বইটা পড়ে আরও খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছিল সবকিছু যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। এই ১৩টা বছরের স্মৃতি আরও অনেক দিন আমাকে ভোগাবে!!
আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে আমার এখন পর্যন্ত আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময় কোনটা ছিল, আমি চোখ বন্ধ করে বলবো আমার স্কুল জীবন। স্কুল জীবনের সেই সুন্দর দিনগুলোতে যদি আমি ফিরে যেতে পারতাম, তাহলে হয়তো জীবনে আর কোন আক্ষেপ থাকতো না। এই বড়বেলায় এসে সকালে ঘুম থেকে উঠতে ভীষণ কষ্ট হয়। কিন্তু স্কুলের দিনগুলোতে আনন্দের সাথে ঘুম থেকে উঠতাম শুধু এই কথা ভেবে যে স্কুলে যাব! স্কুল মিস দেওয়ার চিন্তা কোনদিন মাথায়ই আসে নি! আমার স্কুল ছিল ক্যান্টনমেন্টের ভেতর। রেসিডেন্সিয়াল এলাকা ছেড়ে সবুজ গাছগাছালির মধ্যে বিরাট সাদা এক বিল্ডিং! চারপাশে গলফ মাঠ, সবুজ আর সবুজ! স্কুলের সামনে বিরাট মাঠ, তিনতলা বিল্ডিং-এ বিরাট টানা বারান্দা! কত যে দৌড়েছি ঐ বারান্দায়, ঐ মাঠে! বৌছি খেলা, ফড়িং ধরা, ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা, কি হয় নি ঐ মাঠে! মাঠের সামনে ছিল বিরাট পেয়ারা বাগান। ওতে যাওয়া নিষেধ ছিল। তারপরও মাঝেমধ্যে চলে যেতাম আমরা! ক্যান্টনমেন্টের একদিকের বাউন্ডারির একদম শেষ দেয়ালের সাথে ছিল আমাদের স্কুল। দেয়ালের ওপাশে ছিল কয়েকটি হিন্দু পরিবারের বাস। তাদের অনেক করমচা গাছ ছিল। টিফিনের সময় আমরা সেই বাউন্ডারির কাছে গিয়ে তাদের কাছ থেকে করমচা কিনতাম। তারপর লবণ মেখে রোদে বসে করমচা খেতাম! প্রত্যেকদিন সকালে স্কুলে গিয়েই অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া কিংবা শপথ পাঠ করার ঐ মুহূর্তগুলো কি যে বিরক্তিকর সময় বলে মনে হতো! অনেক সময়ই দেরি করে নামতাম মাঠে। আর এজন্য শাস্তিও বরাদ্দ ছিল! আজ যখন এইসব কথা টাইপ করছি, তখন বুকের ভেতর থেকে বিরাট এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসছে। আহারে, দিনগুলি সোনার খাঁচায় রইলো না... সেলিনা হোসেনের লেখা অল্প পাতার এই বইটি পড়ে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়ে গিয়েছে। কি দরকার ছিল বড় হওয়ার? কি দরকার ছিল?
লেখিকার স্কুল জীবনের বর্ননা পড়তে পড়তে বারবার নিজের স্কুলের দিনগুলোতে ফিরে যাচ্ছিলাম। জীবনে কাটানো সবচেয়ে সহজ, সুন্দর আর সুখময় দিনগুলো যা আমি গোটা দুনিয়ার বিনিময়ে হলেও বারবার ফিরে পেতে চাই! মা এর সাথে স্কুলে যাওয়া, ক্লাসের আগে বন্ধুদের সাথে হট্টগোল করে খেলা করা এরপর ক্লাস,ছুটির আনন্দ, ছুটির পরে আবার খেলা আর সবশেষে একবুক শান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরা! আহা কি দিন ছিলো সেগুলো :')
সৈয়দ শামসুল হক এর আমার স্কুল খুঁজতে গিয়ে এইটা পেলাম।ইদানিং কেমন স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছি এই বইটা পড়ে আমার শহীদ স্মৃতি স্কুলের কথা মনে পড়ছে আমারও লিখে রাখা উচিত আসলে এত ব্যস্ততা আর শরীর ক্লান্ত হয়ে যায় আর শরীর অসুস্থতা লেগেই থাকে তাই লিখা হচ্ছে না আর এই বইটা পড়তে গিয়ে পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা বই এ থাকা অপেক্ষা গল্পের কথা মনে পড়তেছিল।
সুন্দর, সাবলীল ভাবে লেখিকা তার স্কুল জীবনের দিনগুলো আমাদের সাথে শেয়ার করেছেন। তখন জীবন অনেক সাধারণ ছিল, জেতা এই যুগের মানুষ হিসেবে আমাদের কাছে অসাধারণ লাগে। সাথে ছবিগুলো আরও ভালো লেগেছে।
ইপাব ফরম্যাটে বই পড়েছি দেখে অনেক আনন্দ পেয়েছি, তবে কিছু বানান ভুল ছিল এবং ফরম্যাটিং এ অসুবিধা ছিল।