মানুষ শব্দের তৈরী। একটি শিশু যখন প্রথমবারের মতো চিৎকার করে, কাঁদে- ঠিক তখন থেকেই তার জীবন হাঁটতে শুরু করে। সময়ের সাথে তার চারপাশে যোগ হয় আরো নানান শব্দ। এবং এটা চলতে থাকে গলায় আধখানা কথা বা ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে একাকী মারা যাবার আগপর্যন্ত।
অথচ মানুষ পৃথিবীতে শুধু শূন্যতা নিয়ে আসে। আর কোনো পরিচয় থাকে না তার। ধীরে ধীরে তার ওপর আরোপ হতে থাকে নিত্যনতুন পরিচয়- নাম, লিঙ্গ, পরিবার, সমাজ, ধর্ম, দেশ। আর সে গড়ে উঠতে থাকে একেবারে ভিন্ন এক মানুষ হিসেবে- যা সে নয়, ছিলো না কখনো। এবং ভাগ্য খারাপ হলে, আর কখনোই খুঁজে পায় না নিজেকে। হারিয়ে যায় মানুষের ভীড়ে।
নিজেকে ভুলে গেলেও ভেতরের শূন্যতাটুকু আমরা কখনোই ভুলতে পারি না। এটাই আমাদের মাঝরাতে জাগিয়ে তোলে কিংবা আয়নার দিকে তাকিয়ে চট করে দেখে নিতে সাহায্য করে যে সবকিছু ঠিকঠাক আছে। এবং এই শূন্যতাই আমাদের জীবনের ভিন্ন ভিন্ন শব্দগুলোকে কাছাকাছি ছাঁচে ফেলে আবারো একসাথে জড়ো করে। তাই প্রতিটি মানুষের জীবনে আনন্দ-দুঃখ আলাদা। কিন্তু শূন্যতা এক; গল্পগুলো এক।
বইটা পড়া শুরু করার আগে দীর্ঘক্ষণ কাভার ছুঁয়ে বসে ছিলাম। রাফাত নূর খুব চমৎকার একটি প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিনে ইঙ্গিত বইটির জন্য। কাভার, ফ্ল্যাপে লেখা কথা আর উৎসর্গপত্রে জন্য আমার আলাদা একটা দুর্বলতা আছে। ইমরান নিলয় সেদিক দিয়ে ফুল মার্কস পেয়ে গেলেন।
তুমি একমুঠো শব্দ, যেখানে একপুকুর দুঃখ থাকে।
কি চমৎকার একটা কথা! শব্দের সাথে মানুষকে তুলনা করার আইডিয়াটা বেশ ইনোভেটিভ বলা যায়।
পনেরোটি গল্পগুচ্ছ নিয়ে সাজানো ইঙ্গিত বইটি। প্রত্যেকটা গল্পের পরিসর ভিন্ন। তবু কোথায় যেন একটা মিল আছে। মধ্যবিত্ত বৃত্তে বন্দি জীবন, হিপোক্রেসী আর আত্মোপলব্ধিকে বিষয়বস্তু করে অক্ষর বুনে জন্ম হয়েছে কিছু গল্পের।
মধ্যবিত্ত জীবনধারাকে নিয়ে সাহিত্য রচনা করার বোল্ড পদক্ষেপ সবার আগে হুমায়ূন আহমেদ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে অনেক নব্য লেখক সেই পথ মাড়িয়েছে। অনুসরণ করেছে হুমায়ূনীয় লেখার ধারা। অথচ ইমরান নিলয় সেই লেখনীর ধারেকাছেও যাননি। সম্পূর্ণ নিজস্ব ধারায় লেখালেখিটা শুরু করেছিলেন অনেক আগেই। আঠারো এর ফেব্রুয়ারিতে সেই নিরলস অধ্যবসায়ের ফল হাতে মিললো।
মধ্যবিত্ত আসলে এমন একটা বৃত্ত, যেখানে প্রচণ্ড ভালোবাসা যায়, কিন্তু প্রকাশের অধিকার সীমিত।
কি নিদারুণ সত্যি একটা কথা। 'বৃত্তবন্দি', 'ব্যর্থতা' আর 'দূরে থাকা নিকটবর্তী' গল্পের মিল এটুকুই। অপ্রকাশিত ভালোবাসার বোঝা আর বিচ্ছিরি সব অলিখিত নিয়ম মেনে বোকাবোকা দিন কাটে মধ্যবিত্ত সমাজের সদস্যদের।
'অ', 'পাপতান্ত্রিক' আর 'মৎস্যবৃদ্ধ ও মুখোশ' গল্প তিনটা সমাজের মুখে চপেটাঘাত করে অবলীলায়। তবু যদি ঘুণে ধরা সমাজের বোধোদয় ঘটে!
'এক থালা ফুলভাত' গল্পটি খুবই চমৎকার। ছোট্ট একটা থিমকে নিয়ে এত বিষদ পরিসরে লিখতে সাহস আর প্রতিভা দুইটারই প্রয়োজন। ইমরান নিলয় দুই ফিল্ডেই সফল হয়েছেন।
পরিশেষে ছোট্ট একটা দাবী। আমরা কি গল্পকার ইমরান নিলয়ের কাছে পরের কিংবা তারও পরের বছর আস্ত একটা উপন্যাস পেতে পারি?!
ছোট গল্প আসলে কী? ছোট ছোট গল্প, নাকি বড় বড় গল্প কে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করা? নাকি ছোট গল্প বিন্দুর মাঝে বিশাল সিন্ধুর গভীরতা? নাকি এর মানে একটা জীবন, কিছু স্বপ্ন, আবেগ, উপলব্ধি আর আক্ষেপ?
যাই হোক, আমার কাছে ছোট গল্প এক বিশাল ক্যানভাসের অজস্র গল্প। সেই গল্প একেক সময় একেক দিকে টেনে নিয়ে যায়। ইমরান নিলয়ের 'ইঙ্গিত' বইটির প্রতি আকৃষ্ট হবার কারণও মূলত তাই। আমি তার ক্যানভাসের ছবি বুঝতে চেয়েছিলাম। বইটির উৎসর্গপত্রের প্রথম লাইন ছিল ' শৈশবে একবার মা হারিয়ে গেলো। সাথে আমাদের খয়েরি লাগেজটা।' আমার পড়ে মনে হল, বাহ! এটাই একটা গল্প হবার মত লাইন!
আমি মনে মনে ভাবলাম, ব্যক্তি ইমরানের সাথে আমার পরিচয় আছে বেশ ক'বছর ধরে। অথচ আমি কখনো তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কোন আগ্রহ প্রকাশ করি নি। বই, ব্লগ, গল্প, বইমেলা এসব নিয়েই কথা হয়েছে। একবার অবশ্য আমরা ফুল নিয়ে বেশ দীর্ঘ আলাপ করেছিলাম। নানা রকম ফুল। নানা দেশের ফুল। ইমরানের তীব্র আপত্তি ছিল 'কাঠগোলাপ' এর মত অপূর্ব একটা ফুলের নাম কেন এমন? অন্য ফুলের ছায়া হয়ে কেন এই ফুলের নাম দিতে হবে? পৃথিবীতে কি শব্দের অভাব? আমি তখন তাকে জানিয়েছিলাম নিকারাগুয়ার জাতীয় ফুল 'কাঠগোলাপ'। ফুল, গাছ, লতা-পাতার কথা থাকুক। গল্পের কথায় ফিরে আসি। উৎসর্গপত্রের প্রথম লাইন আমাকে আবেগতাড়িত করেছিল। এই লাইনের খয়েরি লাগেজের কথাটা কি আসলেই আমাদের সবার অতীতের কথা মনে করায় না? আমার যেমন মনে পরে, আব্বার খয়েরি রঙের একটা চাদর ছিল। আব্বা মারা যাওয়ার পর শীতকাল আসলেই আম্মা সেই চাদর খুব যত্ন করে পরে থাকতেন। সেই খয়েরি রঙ আজও আমাকে খুব স্মৃতিকাতর করে।
এরপর পাতা উলটে দুটা ভূমিকা পেরিয়ে গল্পের প্রবেশ করে সবার আগে পড়ে ফেলি 'বৃত্তবন্দি' নামের গল্প। না এই গল্প আমাকে আঁচড় কাটতে পারে নি। যদিও গল্পের শেষে মধ্যবিত্তদের নিয়ে বলা কথাগুলো ছিল অসম্ভব সুন্দর এবং একইসাথে সত্য। চলে গেলাম পরের গল্পে ' মনোটোনাস মনোলগ', ব্যক্তিগতভাবে মনোলগ আমার খুব পছন্দের বিষয়। তবুও সেই গল্পে আমি আহামরি কিছুই পেলাম না। এভাবে বেশ কিছু গল্প শেষ হয়ে গেলো। মনে মনে ভাবলাম, ইমরান, আমি গল্প খুঁজতে এসেছি। তুমি শব্দ, বর্ণনা আর আবেগ পড়িয়ে যাচ্ছ? তবে গল্প অবশ্য খুঁজে পেলাম 'প্রতিনায়ক' এ এসে। গল্পের শেষটুকু বদলে গেলো নিমিষেই। ভালো লাগলো। এরপরের গল্প 'অন্তঃপুর' নিয়ে চাইলে আরেকটু কাজ করা যেতো। নাসরিন চমৎকার চ্যালেঞ্জিং চরিত্র হতে পারত। হতে হতেও হয়ে ওঠে নি। তবে চমক শুরু হল এরপর থেকে, 'অ', 'পাপতান্ত্রিক' পরপর দুটা দুর্দান্ত গল্প। 'বিস্মরণ' মোটামুটি লেগেছে। তবে ' আমার বুকটা হু হু করুক। কোথাও ডাহুক ডাকুক। শ্রাবণের বৃষ্টির মতো ফেনিয়ে উঠুক জল' এই কথাটা মন ছুঁয়ে গিয়েছে। আমার একান্ত বিষাদবেলায় এমন কথা তো আমারও মনে হয়। গল্পকার কি তাহলে পাঠকের মনের কথা লিখে দিল? ' মৎসবৃদ্ধ ও মুখোস' বহু আগে পড়া প্রিয় গল্প। এবং আমার প্রিয় গল্পের তালিকায় থাকবে আজীবন। 'চারটি দীর্ঘশ্বাস বা একটি রাতের গল্প' কোমল একটা গল্প। এমন গল্প পড়তে ভালো লাগে। 'সুবোধ তুই পালিয়ে যা' ভেতরটাকে নাড়া দিয়ে গিয়েছে। সুবোধ কে এতই জীবন্ত মনে হয়েছে যেন গল্পকারের সাথে সাথে আমিও একের পর এক দৃশ্যপটে চলে যাচ্ছি। 'অপেক্ষা' আরেকটি মধ্যবিত্ত বিষণ্ণ গল্প। আর 'বায়োস্কোপ' মনোস্তাতিক এক টানাপড়েনের নাটুকে গল্প। এমন অতিবাস্তব গল্পগুলো আমার খুব পছন্দ। এই গল্পের সমাপ্তিটা দুর্দান্ত। খুব ভালো লেগেছে।
তবে, ইমরান নিলয় কেন প্রথম পুরুষে লেখা গল্পগুলো টানা একসাথে রেখেছে আমি তা নিয়ে ভেবেছি। কেনই বা তার দুর্দান্ত গল্পগুলো রেখেছে পরের দিকে? তার কি মনে হয়েছে পাঠক সাধারণ গল্প, আবেগের গল্প পড়তে পড়তে সামনে এগিয়ে জটিলতা স্পর্শ করবে? নাকি এতকিছু সে ভাবেই নি? তার লেখার ভাষা প্রাঞ্জল, ঝরঝরে। নদীর মতো। পড়তে একঘেয়ে লাগে না একদমই। আর শব্দগুলো আঘাত করবে বুকের মধ্যে। যেন পাশে ডেকে কেউ তার বিষন্নতার কথা শোনাচ্ছে। যারা মনোলগ না গল্প খুঁজবে, দ্বন্দ্ব, টানাপড়েন, তীব্র প্রেম, প্রতিশোধ আর মানবিক আবেগ ও ঘটনার বৈচিত্র খুঁজবে তাদের গল্পে প্রবেশ করতে সময় লাগবে বেশ। তবে প্রথম বই হিসেবে 'ইঙ্গিত' খুব চমৎকার একটা বই। উপভোগ্য এবং আবেগীয়। তার আরও লেখা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
আর পরের বার কথা হলে, তাকে বলতে চাই, 'ডেনমার্কের জাতীয় ফুলের ইংরেজি নামটা কি তোমার ভালো লেগেছে? আমার কিন্তু খুব কবিতা কবিতা মনে হয়েছে নামটিকে...'
'তুমি এক মুঠো শব্দ, যেখানে এক পুকুর দুঃখ থাকে।' রাফাত নূরের করা চমৎকার প্রচ্ছদ পেরিয়ে বইয়ের ফ্ল্যাপ পর্যন্ত যেতে পারলাম না, তার আগেই এক রাশ মুগ্ধতা ঘিরে ধরলো, কি ভীষণ সুন্দর উপমা! ইমরান নিলয়ের লেখার সাথে পরিচয় বেশ আগ থেকে। এই মানুষটির শব্দ চয়ন সবসময়ই আমাকে বেশ ��ুগ্ধ করে। তার থেকেও বেশি মুগ্ধ করে তার লেখার আলাদা ভঙ্গী। যেন একজন শিল্পী রঙ তুলি আর ক্যানভাস নিয়ে বসে একটার পর একটা স্ট্রোক দিয়ে যাচ্ছে���, আর চমৎকার একটা দৃষ্কল্প চোখের সামনে উঠছে ভেসে। 'ইঙ্গিত' লেখকের প্রকাশিত প্রথম গল্প সংকলন। মোট ১৫টি ছোট গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে বইটি। সূচীপত্রে গল্প গুলোর নাম দেখেই বইটি একটানে পড়ে ফেলার ইচ্ছে জাগে মনে। বেশ কিছু গল্পই প্রথম পুরুষে লেখা। যার কারণে গল্প পড়তে পড়তে কখন যেন সেই গল্পেরই সঙ্গী হয়ে যাচ্ছিলাম নিজেও জানিনা। এমনিতেই ছোট গল্পের প্রতি আমার আলাদা একটা ভালো লাগা কাজ করে। আর এই বই এর প্রতিটি গল্প সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী। 'বৃত্তবন্দী' পড়ার পর নিজের মায়ের মুখটা চোখে ভেসে উঠবে সব পাঠকের, এই কথাটা একদম গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি! 'ব্যর্থতা' গল্পটি মনে করিয়ে দিবে মধ্যবিত্ত আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কথা। এই সংকলনে আমার সবথেকে প্রিয় গল্পটির নাম 'মৎস্যবৃদ্ধ ও মুখোশ' , কি সাবলীল অথচ কি ভীষণ দৃঢ় প্রতিটি লাইন! নতুন করে ভাবতে শেখায় সাজানো শব্দ গুলো!
খুব ছোট্ট একটা কথা দিয়ে শেষ করি, ২০১৮ এর বইমেলায় বাংলা সাহিত্যের জগত খুব অসাধারণ একজন লেখক কে পেলো। তার নিয়মিত লেখার প্রতীক্ষায় এবং শুভকামনায়!
সত্যি বলতে আমি সব কিছুকে রঙের সাথে তুলনা করতে খুব ভালোবাসি। আর যেগুলো খুবই সাদামাটা ধরনের হয় সেগুলো কিভাবে কিভাবে যেনো আমার খুব পছন্দের হয়ে যায়। তার পিছনে একটি কারন হলো সাদা কালো রঙ আমার ভীষণ প্রিয়। আর এ সাদামাটা জিনিস গুলোকে আমার সাদা কালো ধাচের মনে হয়। "ইমরান নিলয়" ভাইয়ার "ইঙ্গিত" বইটাকেও যদি আমি কোনো রঙের সাথে তুলনা করি তা হবে সাদা এবং কালো। সাদা রঙ্গে যেমন এক নতুন আনন্দ ফুটে উঠে, কালোটি ঠিক তার উলটো, যাকে বলি বেদনা।
ভাইয়ার গল্পে বৃত্তবন্দি হয়ে যখন টলতে টলতে কিছু চোখের জল চোখেই শুকানোর বন্দবস্ত করছি, ঠিক তখনই আমার মনোটোনাস মনোলগ থেকে বেরিয়ে এসে উপল্বধি করলাম "হারিয়েছে বলে কেউ কাঁদে না, পেয়েছিল বলেই কাঁদে।" এতো ব্যর্থতার মাঝেও যখন দূরে থাকা নিকটবর্তী মানুষটাকে দেখলাম কেমন যেনো একটা কষ্ট, সাপের মতো ফোনা তুলে এসে চোখে টোকা দিলো। ফলস্বরূপ বর্ষাকাল না হলেও বর্ষার বৃষ্টির মতোই কিছু জল এক থালা ফুলভাতের উপর পরতে থাকলো।জলগুলো মুছে নিজেকে খুব শক্ত একজন প্রতিনায়ক প্রতিষ্ঠা করার উদ্দ্যেশে অন্তঃপুরে গেলাম। কিন্তু 'অ' বলাও যেখানে পাপ এমন পাপতান্ত্রিক যায়গায় যেয়ে আমার বিস্মরন দূর হলো।যেখানে মৎস্যবৃদ্ধ ও মুখোশকে পেয়ে আমি চারটি দীর্ঘশ্বাস ফেল্লুম। তবে আপনারা একে এক রাতের গল্পও বলতে পারেন। হঠাত লক্ষ্য করলাম আমার সুবোধ পালিয়ে গেছে। তার অপেক্ষা করতে করতে এক চুড়ান্ত স্থানে এসে দাড়ালাম। তবে আমাকে এবং আমার পাগলামিকেও কি কেউ বায়োস্কোপ দিয়ে দেখছে?
আমার কাছে মনে হয় জীবনে অনেক কিছু ছক রয়েছে। সেই ছকগুলোর কিছু রঙ্গিন, কিছু রঙ্গহীন আবার কিছু সাদা কালো। "ইঙ্গিত" গল্পে এতো সুন্দরভাবে এই সাদা কালো ছকের মাঝে নকশা তৈরী করা হয়েছে যে আমার আর অন্য কোনো ছকে যেতে মন চাইছে না। <3
মানুষ পৃথিবীতে শুধু শূন্যতা নিয়ে আসে। আর কোনো পরিচয় থাকে না তার। ধীরে ধীরে তার ওপর আরোপ হতে থাকে নিত্যনতুন পরিচয়- নাম, লিঙ্গ, পরিবার, সমাজ, ধর্ম, দেশ। আর সে গড়ে উঠতে থাকে একেবারে ভিন্ন এক মানুষ হিসেবে- যা সে নয়, ছিলো না কখনো। এবং ভাগ্য খারাপ হলে, আর কখনোই খুঁজে পায় না নিজেকে। হারিয়ে যায় মানুষের ভীড়ে।
এবং এই শূন্যতাই আমাদের জীবনের ভিন্ন ভিন্ন শব্দগুলোকে কাছাকাছি ছাঁচে ফেলে আবারো একসাথে জড়ো করে। তাই প্রতিটি মানুষের জীবনে আনন্দ-দুঃখ আলাদা। কিন্তু শূন্যতা এক; গল্পগুলো এক।
বই এর মলাট উল্টিয়ে বোল্ড অক্ষরে লেখা প্রথম বাক্যটি একবার পড়লাম, আবার পড়লাম, তারপর আবার! "তুমি একমুঠো শব্দ, যেখানে এক পুকুর দুঃখ থাকে।" ব্যাস, এটুকু পড়েই পাঠক আমি একটুখানি অবসর নেওয়ার মতো থেমে যাই। ধারনা করার চেস্টা করি, ঠিক কতো উষ্ণ দুপুর শব্দ সাজালে হঠাৎ একপশলা বৃষ্টির মতো সুন্দর এমন কিছু লেখা যায়! একটা সাধারণ বাক্য, কিন্তু এক জীবন সমান গল্প হয়তো ইঙ্গিত দিচ্ছে এর ভিতর! এরপর ফ্ল্যাপের পুরো অংশটুকু গোগ্রাসে গিলতে খুব বেশি সময় নিতে হয়নি। এমন চমৎকার সুচনার পরে বই এর ভিতরের গল্পগুলো নিয়ে আমার মতোই যেকোন পাঠক মনে মনে একটা উচ্চ আশা ধারন করবে বলে আমার বিশ্বাস। মোট ১৫টি গল্পে সাজানো লেখক ইমরান নিলয় এর প্রথম বই এটি। তবে উপমা এবং শব্দগাঁথুনীর মুন্সিয়ানায় পাঠকের সেটি বুঝার উপায় থাকবে না, যদি না আগে থেকে লেখকের লেখার সাথে পরিচিতি থাকে। মানদন্ডের বিচারে সব লেখার মান কখনো এক হবে না এটাই স্বাভাবিক। একজন শিল্পী শিল্প তৈরীর সময় কখনো কৌশলী হন না, বরং অল্প একটু খেয়ালি হন। তবে যখন শিল্প উপস্থাপনের বিষয় সামনে চলে আসে, তখন শিল্পীর একটু কৌশলী হওয়া উচিৎ বৈকি। এই ব্যাপারে আমার মতামত, গল্পগুলো সাজানোর ব্যাপারে লেখকের একটু কৌশলী হওয়া প্রয়োজন ছিল, কেননা প্রথম দিককার গল্প গুলোর তুলনায় শেষের গল্পগুলো একটু ফ্যাকাশে। যেহেতু কথায় আছে, "শেষ ভাল যার, সব ভাল তার" তাই গল্পগুলোর ক্রমবিন্যাস নিয়ে হয়তো আরেকটু ভাবা যেতো। "বৃত্তবন্দী" নামক অসাধারণ এক গল্প দিয়ে বইটির শুরু। থিম, আমাদের জীবনের প্রতিশব্দ 'মা'কে নিয়ে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া খুব পরিচিত কিছু দৃশ্য ছোট ছোট বাক্যে খুব আয়েশি ভংগিতে এই গল্পে তুলে ধরেছেন লেখক। মাঝে এসে মনে হতে পারে, আহা! শেষটা মনে হয় গতানুগতিক হতে যাচ্ছে। কিন্তু শেষটা ছোট্ট একটা স্বস্তির টুইস্ট দিয়ে জীবনের আরেকটি খুব পরিচিত অনুভুতির বর্ননা নিয়ে আমার ছোট্ট দীর্ঘশ্বাসে মিলিয়ে যায়। "মনোটোনাস মনোলগ" গল্পের শেষ বাক্যটি আমার আজীবন মনে থাকবে। ''হারিয়েছে বলে কেউ কাঁদে না, পেয়েছিল বলেই কাঁদে''। আমার মতো অনেক পাঠকের, একে পৃথিবীর এক বিচ্ছিরি সত্য বলে মনে হলেও হতে পারে। "ব্যার্থতা" গল্পের খুব সুন্দর, সুক্ষ্ম বর্ননায় আমার মনে হয়েছে আমি গল্প পড়ছি না, বরং কোন একটা বিরতিহীন নাটক দেখছি। যার প্রধান চরিত্র খুব দাপটের সাথে অভিনয় করে যাচ্ছে! "দূরে থাকা নিকটবর্তী" আর "মৎস্যবৃদ্ধ ও মুখোশ" গল্প দুইটি আগেই পড়া। এখনো পর্যন্ত লেখকের যতো গল্প পড়া হয়েছে, তার মধ্যে এই গল্প দুইটি লেখকের মাস্টারপিস বলে আমার মনে হয়েছে। "এক থালা ফুলভাত" গল্পটি পড়ে আনমনেই বাহ! শব্দটি তৃপ্তি সহকারে বেড়িয়ে আসবে। ঠিক তমিজদ্দীর স্বপ্নে দেখা ধোঁয়া উঠা গরম ভাত খেতে পারার মতো তৃপ্তি! "প্রতিনায়ক" গল্পের প্লট আমার কাছে মোটামুটি মনে হয়েছে। মাঝে এসে আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছিল। আবার শেষের টুইস্ট এর ব্যাপারটা খুব সহজে হয়ে না গেলে মনে হয় আরও জমতো! "প্রতিনায়ক" আর "অন্তপুর" গল্পের পরে "অ" এবং "পাপতান্ত্রিক" গল্প দুটি আবারও পাঠকের আকর্ষনকে কেন্দ্রীভুত করে তুলবে। খুব শক্তিশালী থিম নিয়ে এই দুই গল্পের শেষ। শিল্প মানেই শুধু বিনোদন নয়। কখনো কখনো শিল্প একটা বার্তা, একটা দৃষ্টিভংগীর সাথে অন্যকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, নিজের বিবেক কিংবা হৃদয়ের ক্ষোভগুলো সবার সামনে ত��লে ধরা ও প্রতিবাদ করা। এইদিক থেকে বিবেচনা করলে "অ" এবং "পাপতান্ত্রিক" গল্প দুটি সফল। "চারটি দীর্ঘশ্বাস বা এক রাতের গল্প" এবং "অপেক্ষা" এই গল্পদুটো বিষণ্ণ সুন্দর! এই দুটি গল্প সম্বন্ধে বলতে গেলে ইংরেজি কবি শেইলি এর মতো বলতে হয় "Our sweetest songs are those that tell of saddest thoughts" "সুবোধ তুই পালিয়ে যা" আর "বায়োস্কোপ" গল্প দুটি থিম এর বিবেচনায় বেশ ভাল। তবে গল্প দুটি পড়ে আমার মনে হয়েছে লেখকের যথেস্ট পরিমাণ সময় এবং যত্ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে এরা। সার্বিকভাবে 'প্রথম বই' তকমা দিয়ে বিচার করলে আমি পাঠক হিসেবে ইঙ্গিত কে ১০ এ ৯ দিবো আর শুধু গল্পগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করলে ১০ এ ৮। অমর একুশে বইমেলা-২০১৮ এবং জাগৃতি প্রকাশনী, জড়তা কাটিয়ে যে সাহস যোগালো সেটা কাজে লাগিয়ে লেখক ইমরান নিলয় আরও ভাল অনেক লেখা উপহার দিবেন বলে আমার বিশ্বাস।