বাবর আলী একজন ভ্রমণ পিপাসু মানুষ এবং বাংলাদেশের একজন সুপরিচিত ট্রেকার। পায়ে হেঁটে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ করেছেন ২০১৯ সালে। পথ জুড়ে নিজের পদচিহ্ন এঁকে দেয়ার সাথে সাথে তিনি তুলে এনেছেন প্রতিটি অঞ্চলের গল্প, সবুজ বাংলার সুন্দরম চিত্র আর মানুষের মুখ। শব্দে শব্দে এঁকেছেন পায়ে হেঁটে ৬৪ জেলা ভ্রমণের রোজনামচা।
ভ্রমণ ডায়েরি হিসেবে এই বইটা বেশ ভালো। বিশেষ করে পায়ে হেঁটে ৬৪ জেলা চাট্টিখানি কথা না, তার উপর ৬৪ দিনে। এর মাঝেই প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা, পথের মাঝে তৈরী হওয়া গল্প, ভালোলাগা, ক্লান্তি সব নিয়ম করে নোট বইয়ে টুকে রাখাও অনেক ধৈর্যের ব্যাপার। ভ্রমণে লেখক তা করেছেন সুনিপুনভাবে।
আজকাল ভ্রমণ নিয়ে দেশে বই প্রকাশের আধিক্য বাড়ছে। এটা ভালো। যদিও আমার বেশি পড়া হয়নি। যতটুকু পড়েছি, মনে হয়েছে তরুণ ট্রাভেলারদের মধ্যে লেখার চেয়ে বই প্রকাশের তাড়াটাই বেশি।
লিখুক সবাই। তবে তাড়াহুড়ো করে বই বের করার জন্য না লিখে, ধীরে ধীরে গল্পগুলো লিখুক। মনে রাখতে হবে এই ভাষায় ভ্রমণ সাহিত্য লিখে গেছেন মুজতবা আলি, বিমল দে' রা।
How many miles would you walk to preach a message?
"একক ব্যবহার্য প্লাস্টিক পরিহার করি"—এই প্রতিপাদ্য হাতে করে টানা দুই মাস হেঁটেছেন তিনি, উপস্থিত হয়েছেন ৬৪ জেলায়। বাজারের পলিথিন, ওয়ান টাইম কাপ-প্লেট-চামচ, সোডার বোতল, প্লাস্টিকের এমন কত কত প্রডাক্ট আমাদের দৈনন্দিনে জড়িয়ে আছে, ভেবেছেন? ভয়ের ব্যাপার হলো, এগুলো একবার ব্যবহারের জন্যই ডিজাইন করা, চাইলেও কোকের বোতল দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে পারবেন না স্বাস্থ্যঝুঁকি ছাড়া, অন্যগুলোও ফেলে দিতে হয় শীঘ্রই। সুপারশপের কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে ফাস্টফুড, সবখানেই একক ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহৃত হয়, কারণ তার বিকল্পগুলো অতো সস্তা নয়। অথবা, খুব সস্তা! যদি আমরা অভ্যাস বদলাই। ব্যাগ নিয়ে বাজারে গেলেই ১০টা পলিব্যাগ বেঁচে যায়, খাবারের দোকানে স্ট্র/চামচ পরিহার করা যায় চাইলেই। এই যে ভাবনা-টা, যেটা আমাদের রোজকার দিনযাপনে আরো যত্নবান হতে আমাদের বাধ্য করে, তার বীজ বুনতেই ২০২১ সালে পায়ে পায়ে ডা. বাবর আলী ঘুরে বেড়িয়েছিলেন দেশজুড়ে।
ভ্রমণের বই পড়েন? অচেনা, না-দেখা জায়গাগুলো লেখার ভাষায় দেখে আসা, এজন্যই তো? আর বইটা যদি আপনার খুব চেনা দুনিয়াকেই নতুন চোখে দেখায়, তাহলে? "পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা" এইদিক থেকেই চমৎকার কাজ করেছে। 'Slow living'-এর শ্লোগান যখন ট্রেন্ডি হয়ে উঠছে, কিন্তু বুঝতে পারছেন না ধীরে বাঁচতে হয় ঠিক কেমন করে, তখন একপাক হেঁটে আসুন বাবর আলী'র সাথে। যান কিংবা সাইকেল ছেড়ে, হেঁটে হেঁটে পথচলা'র একটা পে-অফ আছে। সেটা হলো, যে পথ দিয়ে যাচ্ছেন, তার বর্ণ-গন্ধ-স্বাদ-ছন্দ গায়ে মাখতে মাখতে যাওয়া। সেটা কোথাও ভালো, কোথাও মন্দ—সব অভিজ্ঞতায়ই ডুবে দেখা হবে। তারজন্য সারাদেশ ঘোরা লাগবে না, ঘরের বাইরে যে-কোথাও কেবল হাত-পা নিয়ে সারাদিন কাটালেই দেখতে পাবেন, যে মুহূর্তটায় বাঁচছেন, সেটা আপনার জীবনে একদম নতুন!
এদিক থেকে পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা'র দারুণ ব্যাপারটা হলো, হয়তো আপনারই চেনাজানা অনেক স্থান বইটার সাথে একপ্লোর করবেন আপনি, অথবা বইটা পড়ে ইচ্ছে করবে, হাতের কাছের জায়গাগুলো দেখেই আসি না! এবং লেখকের একটা বিশেষত্ব এখানে টানতেই হয়, তাঁর লেখা পড়ে একদম মনে হয় না, বিশেষ কারো লেখা পড়ছি, কিংবা আমার চেয়ে খুব ভিন্ন কোনো মানুষ এই অভিজ্ঞতাগুলো নিয়েছেন। ভ্রমণগদ্য পড়ে সাধারণত বেড়াবার আগ্রহ জাগে। উইশলিস্টে কিছু নাম যোগ হয়... অথচ 'পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা' পড়ে মনে হয়েছে, "দূর ছাই, চাইলেই তো ঘুরে আসতে পারি, কেন বেরোচ্ছি না!"
একেকটা দিন একেকটা অধ্যায়, ৬৪ দিনে ৬৪টা নতুন জায়গা। কোথা থেকে কোথায় কোন পথে হাঁটা হয়েছে, কত দূরত্ব, অধ্যায়ের শুরুতেই সেসব উল্লেখ করা হয়েছে, সাথে যোগ হয়েছে সেদিনের উল্লেখযোগ্য একটা করে ছবি। শুধু ছবি ঘাঁটলেও মনে একটা কোলাজ তৈরী হয়ে যায় বাংলাদেশের! প্রায়-বিলুপ্ত হওয়া লাঙলের হালচাষ, পানের বরজ, " সাবধান! হাতি চলার পথ" সাইনবোর্ড, অথবা রাবার বাগানে বধ্যভূমি। মাটির হাঁড়ি, মাটির দোতলা বাড়ি, নদীপথে বাঁশের ভেলা—এসব নিশ্চয় রোজ দেখি না! দেশের উত্তরে নদীতে চর পড়ে,আর দক্ষিণে গেলে খাল-ই নদীর সমান! আমাদের ছোট দেশটায় কত বৈচিত্র আছে, ধীরে এগোলেই কেবল তা দেখা সম্ভব।
চন্দ্রবিন্দু'র প্রডাকশনে বইটার সাইজ বয়ে বেড়ানোর উপযোগী। শুরুতেই বাবর আলী'র র্যুটটা দেওয়া আছে দেশের মানচিত্রে, যেটা সবচে কম সময়ে/দূরত্বে ৬৪ জেলা ভ্রমণের যাত্রাপথ দেখাবে আপনাকে।
তো, সাথে করে বেরিয়ে পড়তে আর অপেক্ষা কীসের?
পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা লেখক : বাবর আলী জনরা : ভ্রমণকাহিনী প্রকাশক : চন্দ্রবিন্দু পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৩২৮ মুদ্রিত মূল্য : ৫২০ টাকা
এ বছরে হয়তো আমি আরো অনেক বই পড়বো, এর মধ্যে অনেক ভালো লেখকের অনেক মাস্টারপিস বইও থাকবে, তবে বাবর আলীর "পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা"র মত বই মনে হয় না আর পাবো। বাবর আলী কোন পেশাদার লেখক নন। তিনি মূলত চিকিৎসক এবং একজন অভিযানপিয়াসী মানুষ। তিনি ঘুরে বেড়ান পাহাড়ে পাহাড়ে, কায়াকিং করেন, সাইকেলে করে দেশ ভ্রমণ করেন। তবে তার সবচেয়ে কঠিন মিশন ছিলো নিঃসন্দেহে ৬৪ দিনে পায়ে হেঁটে ৬৪ জেলা ভ্রমণ করা। প্রতিদিন তাকে হাঁটতে হয়েছে ৪০ থেকে ৫৫ কিলোমিটার। একটা দিন একটু অসুস্থ হলে বা কোন দুর্ঘটনা অথবা ঝামেলায় জড়িয়ে গেলেই তার এই মিশন সম্পন্ন হতো না। তিনি এটি সম্পন্ন করেছেন সাফল্যের সাথেই।
পায়ে পায়ে দেশ ভ্রমণের সুবিধা হলো দেশটাকে খুব ভালোমত দেখা যায়। কথা বলা যায় ভ্যানচালক, স্কুলের শিক্ষার্থী, তালা সারাইকারী অথবা জাদুটোনার সাথে। বিচিত্র এই দেশের বিচিত্ররকম পেশাজীবীদের সাথে পরিচিত হওয়াটা একটা অভিজ্ঞতা বটে। এই যেমন আপনি কি জানেন বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে রাস্তায় প্রচুর 'ডুবুরী'র বিজ্ঞাপন দেখা যায়? আচ্ছা বলেন তো, ধামাঘষা পেশাটা কোন অঞ্চলে প্রচলিত?
উত্তরবঙ্গের "বাড়ি কোঠে" থেকে শুরু হয়ে পশ্চিমাঞ্চলে এসে তা হয়ে যায় "বাড়ি কনে" আর দক্ষিণের শেষ প্রান্তে যেন কী বলে, এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না, তবে ভাষার এই ভেসে যাওয়া দেখাটা খুবই উপভোগ্য। বিশেষ করে যখন নিজের পরিচিত এলাকাগুলির সাথে মিলে যায়।
এই দেশের মানুষ সাধারণত পরিব্রাজক দেখে অভ্যস্ত না। তাই বাবর আলীকে তারা কৌতূহলী চোখে দেখেছে। অনেকের কাছেই তাকে মনে হয়েছে সে পাগল। কেউ কেউ আবার তার সাথে হেঁটেছে কিছু পথ। গুগল ম্যাপকে টেক্কা দিয়ে কখনও তারা তাকে চিনিয়ে দিয়েছে গোপণ পথ।
পথ চলতে গিয়ে ছটফটে পাখি, কৌতূহলী মানুষ, ভুল বানানের পোস্টার, দানবাকৃতির ট্রাক অথবা টং দোকানের আড্ডা এই অতি পরিচিত দৃশ্যগুলিই ঐকান্তিক নিবিড়তা দিয়ে বারবার আবির্ভূত হবে আপনার কাছে।
পথ থেকে ফিরতে হয় ঘরে। ৬৪ দিনের মধ্যে দুইদিন তিনি থেকেছেন হোটেলে, বাকি ৬২ দিন কারো না কারো বাসায়। বাঙালির আন্তরিকতা আর অতিথিপরায়নতার কথা তো বলাই বাহুল্য! প্রতিটি বাড়িতে এই সমাদর দেখে মনে হয়েছে আমরা আসলে মানুষ হিসেবে সূর্যালোকের মতই উজ্জ্বল আর উষ্ণ। একটা ফিল গুড আর ইতিবাচক অনুভূতি সবসময় ঘিরে থেকেছে।
লেখকের রসবোধ বেশ ভালো। উদাহরণ দেই। তিনি নোয়াখালিতে এসে কোথাও নোয়াখালি বিভাগ চাওয়ার আন্দোলন দেখেন নি, কিন্তু সিলেটের বা অন্য কোন এক জেলার যেন জারুয়া বাজার উপজেলা চেয়ে পোস্টারে পোস্টারে সয়লাব দেখেছেন রাস্তাঘাট। নোয়াখালিতে এসে আন্দোলনের দূরাবস্থা না কি তাকে হতাশ করেছে। এদিকে পথ চলতে কোন এক জায়গায় দুজনের মধ্যে বচসা আগ্রহ নিয়ে শুনতে গিয়ে সেটা হঠাৎ থেমে যাওয়ায় তার হতাশা প্রকাশও মিটিমিটি হাসি এনে দেবে আপনার মুখে।
তার এই অভিযানের সময়ে তিনি প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা চালিয়ে গেছেন। বিভিন্ন প্রসঙ্গে নানা বই, নানা চরিত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। তার পড়ার পরিধি বেশ ভালো। আর এই পাঠাভ্যাস তাকে দিয়েছে প্রাঞ্জলভাবে লেখার সক্ষমতা।
তাই বিষয়বস্তু এবং লেখার মান দুই মিলিয়ে এটি একটি অবশ্যপাঠ্য বই। অর্ডার করুন চন্দ্রবিন্দু থেকে।
বাবর আলী,পেশায় ডাক্তার এবং নেশায় পাহাড়ি।সিদ্ধান্ত নিলেন পায়ে হেঁটে ৬৪ জেলা দেখার, একইসাথে সিংগেল ইউজ প্লাস্টিকের ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করার। সেই লক্ষ্যে পঞ্চগড় থেকে যাত্রা শুরু করে শেষ হয় কক্সবাজারে। এই পুরো ভ্রমণের দৈনিক রোজনামচা লাগাতার ফেসবুকে পোষ্ট করেছিলেন৷ পরে সেসব একত্রিত,পরিবর্ধিত এবং পরিমার্জিত হয়ে ‘পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা’ বইয়ে রুপ নেয়।
তিনি পেশাদার কোনো লেখক নন। ফলে লেখায় তুমুল সাহিত্যরস খুঁজতে যাওয়া অন্যায় হবে৷ তবুও তিনি যে সহজ, সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন তাতে মুগ্ধ হতে হয়। ছোট্ট করে বলার চেষ্টা করেছেন ভ্রমণস্থানের ইতিহাস। লেখকের রসবোধ ও দেখার মতো। অনেক জায়গা পড়তে গিয়ে হো হো করে হেসেছি। আবার অনেক জায়গায় মনটা ভালো লাগায় ছেয়ে গিয়েছে, মানুষের হরেকরকম গল্প শুনে। কয়েক জায়গায় খাবারের বর্ণনায় জিভে জল এসেছে। ইচ্ছে জেগেছে সেসব চেখে দেখার।
যারা ভ্রমণ পছন্দ করেন,তারা নির্দ্বিধায় পড়ে ফেলতে পারেন এই বইটি। সময়ের অপচয় তো হবেইনা,বরং ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে বের হওয়ার তোরজোর শুরু করে দিতে পারেন। ৬৪ জেলায় যাত্রা শুভ হোক।
এই আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগেও পায়ে হেটে ৬৪ জেলা ঘুরা কে আপনি নিছক পাগলামি ছাড়া আর কি বা বলবেন?
লেখক বাবর আলী এই কষ্টসাধ্য পাগলামীর গল্প আছে এই বইতে। উনি ৬৪ দিনে বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলা পায়ে হেটে ঘুরেছেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ কিলোর মতোন। এই হাটাহাটি করতে গিয়ে কৌতুহলী মানুষের প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হয়েছেন। বহু মানুষ তাকে পাগল বলেছে, আড়চোখে তাকিয়েছে কিন্তু তিনি তার পথচলা চালিয়েছেন শেষ অব্দি।
এই পুরো ভ্রমণে তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো পুরো দেশের মানুষের জীবনের খুব কাছে যেতে পেরেছেন। একই মানচিত্রের বিভিন্ন অঞ্চলে যে কতো কতো বৈচিত্র্য ছড়িয়ে আছে তা সচক্ষে অবলোকন করেছেন। পুরোটা সময়ে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের অপকারীতা নিয়ে সচেতন করেছেন সবাইকে। পেয়েছেন বহু মানুষের ভালোবাসা।
আমরা প্রায় সবাই-ই ভ্রমণ প্রিয়।ছোটবেলায় সমাজ বইয়ে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মানচিত্র যখন দেখতাম তখন ভাবতাম ইশ! ৬৪ জেলা ভ্রমণ করতে যদি পারতাম।এরপর ধীরে ধীরে বড় হচ্ছি সেই আকাঙ্ক্ষাকে সঙ্গে নিয়ে এবং তা পূরণ করার চেষ্টাও করে চলেছি।এখন পর্যন্ত কয়েকটি জেলা ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছে। ৩২০ পৃষ্ঠার পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা বইটা পড়ার পর সেই ইচ্ছেটা আবার মনে জোরালো ভাবে উঁকি দিচ্ছে।আমারও প্রচন্ড ইচ্ছে হচ্ছে মানুষগুলোর সঙ্গে মিশতে, তাদের গল্পগুলো শুনতে।ইনশাআল্লাহ হয়তো কোনো একদিন তা পূরণ হবে।আপাততো ঝুম্পা লাহেরির নিচের কোট থেকেই মনের সান্ত্বনা নিলাম।
That's The Thing about books. They let you Travel without moving your feet.
তেমন আহামরি কোন লেখা নয় হয়তো, তবু পুরোটা সময় কী এক মন্ত্রে আচ্ছন্ন করে রাখলো। অনেক সময় ও ভালো লাগা নিয়ে এই বইটা পড়লাম আমি। পড়ার মাঝেই শুনি এই বইয়ের লেখক নাকি পঞ্চম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করে বসে আছেন। ভালোই কাকতালীয় ও মজার ব্যাপার, আমার তাঁর ব্যাপারে আগে কোন ধারণাই ছিলো না। অনেক টুকটাক মজার জিনিস জানলাম পড়তে পড়তে। সবচেয়ে ভালো লাগছিলো বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিনের হাঁটাশেষে তিনি পরিচিত কারো বাড়িতে যখন এক রাতের অতিথি হয়ে যেতেন তার বিবরণগুলো। ভ্রমণ আমার খুব একটা ভালো লাগার জিনিস এমন বলবো না, কিন্তু অন্তত নিজের দেশের বিভিন্ন কোণা খুঁজে দেখতে যাবার একটা ইচ্ছা বইটা জাগিয়ে দিয়ে গেলো আমার মাঝে।
একজন ডাক্তারের প্রচুর পড়াশোনা, প্র্যাক্টিস করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে টাইটেল " ডাক্তার" অর্জন করতে হয়, এটা পাবার পর অধিকাংশ মানুষই আরও ডিগ্রি আরও খ্যাতির পেছনে ছোটে। বাবার ভাই, সবকিছুর ব্যাতিক্রম উনি তার স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলেছেন। পাহাড় বড্ড ভালবাসেন তাই সুযোগ পেলেই ছুটে যান সেই ডাকে সাড়া দিতে, এ ছাড়াও ক্রস কান্ট্রি সাইক্লিং, দূর পাল্লার দৌড় খুবই উপভোগ করেন। হারুকি মুরাকামির মত আমাদের বাবার ভাইও দৌড়বিদ লেখক।
পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা আসলে একটা ভ্রমণ ডায়েরি এবং বাবর আলীর প্রথম বই। লেখক হেটে হেটে দেখেছেন তার নিজের মাতৃভূমিকে অবশ্যই ভিন্ন চোখে, সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে সচেতনতা তৈরির জন্য কাজ করেছেন সিংগেল ইউজ পলিব্যাগ ব্যাবহার কমানোর এই টোটাল হাটাহাটির সময়ে। প্রতিদিন এর দূরত্ব এবং কোন এলাকা থেকে কোন এলাকায় যাচ্ছেন তা প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতেই দেয়া থাকছে যা পাঠকের জন্য খুবই উপভোগ্য।
আমাদের কারাগার আমরা নিজেরাই বানাই বা অনেক ক্ষেত্রে সময় বানিয়ে দেয় আমরা মানিয়ে চলি, ��াই ঘুরে দেখা হয়না আমাদের চারিপাশের ছোট, বড়- মনমুগ্ধকর স্থানগুলো, পরিচিত হয়ে ওঠা হয়না অপরিচিত মানুষ গুলোর সাথে। আমার মত কারাগারে বন্দী মানুষের জন্য পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা বইটি খোলা জানালার মত, একটু বেশিই প্রশস্ততর জানালা যা দিয়ে আপনি আমাদের বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকা ঘুরে আসতে পারবেন নিজের আরামকেদারায় বসে।
যেহেতু আমাদের এই পাহাড়ি, দৌড়বিদ একজন খাদ্যরসিক মানুষ ফ্রি ফ্রি জেনে যাবেন কোন এলাকার কোন চিপায় কি বিখ্যাত খাবার আছে। শুধুমাত্র খাবারের মত স্থুল না আরও অনেক সুক্ষ্ম পোট্রের্ট আছে এই বই নামক হিডেন চেম্বারে।
আমি মুগ্ধ, লেখকের জন্য শুভকামনা, আগামীতে পাহাড় নিয়ে এইধরনের বইয়ের অপেক্ষায় থাকলাম।
বইটা কিছুক্ষণ আগে শেষ করে ভাল লাগছে খুব। মনে হচ্ছে লেখকের সাথে সাথে আমারও সারা বাংলাদেশ হেঁটে বেড়ানোর জার্নি শেষ হলো। এই বই আমি গতবছর থেকে একটু একটু করে পড়ে শেষ করেছি৷ টানা পড়ে বোর লাগে। তাই। ভ্রমণপিয়াসু হিসেবে এই বইটা আমার খুবই ভাল লেগেছে। কত কত অভিজ্ঞতা ৬৪ জেলা জুড়ে। এভাবে হেঁটে বেড়ানোর এক অভিযানে বের হতে পারলে অস্থির ব্যাপার হতো। একটা ডিটেইলড রিভিউ আজই লিখবো। এটা ফেলে রাখা যাবেনা।
অসাধারণ একটা বই শেষ করলাম। এক কথায় অনবদ্য। আরো আগে লেখকের মাউন্ট এভারেস্ট ও লোৎসে শিখরে বইটা পড়ে হয়েছিলো, এই বইটা পড়ে ভালোলাগার মাত্রা আরো বেড়ে গেল।
বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে বিচিত্র রকমের মানুষ, পথঘাট, নদ-নদী দেখে বেড়ানোর এক অভিনব পদ্ধতি হলো পায়ে হাঁটা। সেই কাজটিই এভারেস্ট বিজয়ী বাবর আলী করেছেন ২০১৯ সালে ।
তার পদব্রজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছেন ‘পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা’ বইয়ে। দেশ দেখার পাশাপাশি সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্দেশ্য। পুরো যাত্রায় তিনি থেকেছেন আত্মীয়-বন্ধুদের বাসায়। তাদের সবার সম্পর্কেই কয়েক লাইন করে লিখেছেন বইটিতে।
প্রতিটা জেলা সম্পর্কে কিছু তথ্য, গল্প বা দৃশ্যের বিবরণ দিয়েছেন — এটাই আমার সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং লেগেছে পড়ার সময়ে। এই ডেসক্রিপশনগুলোর পরিমাণ আরো বেশিও হতে পারত! বাংলাদেশের মাঠঘাট, জলনদীর বর্ণনার প্রতি আমার বিশেষ আগ্রহ আছে।
তবে এই বইটা একান্তই একটা ডায়েরি, ভ্রমণ বিষয়ক সাহিত্য নয়। খুবই conversational টোনে লেখা, লেখনী আড্ডার ভাষার মতো। এখন থেকে নতুন কোনো জেলায় যাওয়ার আগে এই বই থেকে টুক করে পড়ে নেওয়া যাবে জায়গাটা সম্পর্কে, মানুষজন সম্পর্কে।
অবশেষে বই এর পাতায় আমার দেশভ্রমণ শেষ হলো। আমি খুব ভ্রমণপ্রিয় মানুষ নই,আবার পাঠক হিসেবেও ভ্রমণ কাহিনী যে আমার খুব প্রিয় তা নয়।কিন্তু এই বইটি পড়ে মনে হচ্ছে আর কিছু না হোক যদি নিজের দেশ টা একবার ঘোরা না হয় তাহলে জীবন টাই বৃথা। বাবর আলীর ছিমছাম লেখনী খুবই মনে ধরেছে,ঠিক বই পড়ছি মনে হয় নিই,মনে হচ্ছিল লেখকের সাথে বসে তার ভ্রমণ কাহিনী শুনছি। মজার বিচিত্র অভিজ্ঞতার পাশপাশি বইট বেশ ইনফরমেটিভও বটে।
A quote that I obsessively remembered while reading this book! Jhumpa Lahiri's “The namesake”. Also adapted into a movie by the leading character ‘asoka’ played by Irrfan Khan.
“You are still young, free.. Do yourself a favor. Before it's too late, without thinking too much about it first, pack a pillow and a blanket and see as much of the world as you can. You will not regret it. One day it will be too late.”
"My grandfather always says that's what books are for, To travel without moving an inch."
This is exactly the book for travel without moving an inch!
“গত ৬৪ দিনে সর্বমোট হেঁটেছি ২৭০১ কিলোমিটার পথ। গড় করলে দৈনিক হাঁটা হয়েছে ৪২.২ কিলোমিটার। দিনপ্রতি একটা ফুল ম্যারাথনের সমান দূরত্ব পাড়ি দিয়েছি আমি। পঞ্চগড় থেকে যেদিন হাঁটা শুরু করেছিলাম সেদিন আমি ছিলাম একা। আর যাত্রার শেষদিনে আমি দাঁড়িয়ে আছি এতগুলো মানুষের ভিড়ে। যদিও মনের মধ্যে কাজ করছে বিশাল এক শূন্যতা। কাল থেকে নতুন কোনো অ্যাডভেঞ্চার নেই, এই ভাবনাই খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে ভেতরটা।
এত দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পরে সবকিছুই খানিকটা শূন্য শূন্য বলেই মনে হচ্ছে। কাল থেকে অপেক্ষা করে নেই নতুন কোনো পথ, নেই নতুন কোনো অভিজ্ঞতা, নতুন কোনো মুখের সাথেও হাসি বিনিময় করা হবে না চলতি পথে। গন্তব্যে পৌঁছে একটা কথাই মনে হচ্ছে, Everywhere is walking distance, if you have the time.”
That enthusiastic ambition toward new adventures is insane! That type of story really inspires us to go one step ahead towards our goals, although author Babar Ali reaches Mount Everest, Lhotse etc.
আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না; আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে, পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে। জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা অন্য সবাই বহন করে করুক; আমি প্রয়োজন বোধ করি না: আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে নক্ষত্রের নিচে।
পুরো দেশ সম্পর্কে যদি একটা ধারনা নিতে চান তবে এই বইটি পড়ার সাজেশন আমি ব্যক্তিগতভাবে করবো। এভাবে পুরো দেশটা হাঁটা গেলে বেশ হয়।লেখকের ভাষা ভীষন ঝরঝরে। পড়তে পড়তে মনে হবে যেন লেখক আপনার সাথেই কথোপকথন করছেন। লেখক ঘুরতে ভালবাসেন। কেবল ভালবাসেন বললে ভুল হবে - পেশা ও নেশাও হয়ে দাঁড়িয়েছে ভ্রমন। বইয়ের ছাপা, বাঁধাই উন্নতমানের।
ইন্সপায়ারিং৷ পায়ে হেঁটে এখন আমারও দেশ ঘুরতে ইচ্ছে করছে। বাংলাদেশের নানান জায়গার মানুষের আচরণ সম্পর্কেও একটা ধারণা হল।আমার পেডি সার্জারীর বড় ভাই এবং পরবর্তীতে কলিগ তৌকির যে লেখকের বন্ধু তাতো আর জানতাম না। লেখার মাঝে আবিষ্কার করে বিমলানন্দ পেয়েছি। চেনা মানুষের কথা বইতে পড়তে দারুণ লাগে!
ত্রিভুবনে কত মানুষের বিচিত্র সকল ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা জন্মে তবে তার কতটুকুই বা পূরণ হয় বা সে লক্ষ্য পূরণে আমরা কতই বা অটল থাকতে পারি। এই যেমন বইটির লেখক অর্থাৎ বাবর আলী তার অদম্য ইচ্ছা ও দু'পায়ের সাহায্যে টানা ৬৪ দিন ৬৪টি জেলায় বিচরণ করেছেন যার প্রত্যেকদিনের রোজনামচা নিয়েই বইটি। দীর্ঘ এই যাত্রায় শুভাকাঙ্ক্ষীদের থেকে যেমন মূল্যাতীত সহায়তা, আত্মীয়তা, অভ্যর্থনা পেয়েছেন তেমনি উদ্ভট সব বিবৃতির মধ্য দিয়ে যাওয়া বা জিজ্ঞাসার সম্মুখীন নিজের ভ্রমণগাঁথায় যুক্ত করেছেন।
লেখা যতটা সাবলীল ছিল ততটা আমি আশা করিনি। আরেকটি ভালো দিক হলো যে প্রত্যেক জেলা বা ভ্রমণ করা জায়গা সম্বন্ধে অল্প বিস্তর তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য পাঠকদের জানানো। আবার লেখকের সততার নমুনাও পাওয়া যায় কিন্তু বইয়ে, ঠিক যেমন উনি যতটুকু লক্ষ্য করে প্রতিদিন হাঁটতেন পরবর্তী দিনে ঠিক একই জায়গা থেকে শুরু করতেন। পাশাপাশি লেখক প্লাস্টিক ব্যবহারেও সকলকে সচেতন করতে চেয়েছেন পুরোটা যাত্রা জুড়ে।
পরিশেষে বলতে চাই যে আমি যখন দূরে কোথাও ভ্রমণ করার প্রস্তুতি নেই তখন প্রস্থানের আগেই আধা ক্লান্ত হয়ে পড়ি এই ভেবে যে , হায়! কতখানি না হাঁটা লাগে আর এই মানুষটা নাকি পায়ে হেঁটে ৬৪ জেলা দাপিয়ে বেড়িয়েছে।
'গত ৬৪দিনে সর্বমোট হেঁটেছি ২৭০১কিলোমিটার পথ ।গড় করলে দৈনিক হাটা হয়েছে ৪২.২ কিলোমিটার ।দিনপ্রতি একটা ফুল ম্যারাথনের সমান দূরত্ব পাড়ি দিয়েছি আমি ।পঞ্চগড় থেকে যেদিন হাটা শুরু করেছিলাম সেদিন আমি ছিলাম একা ।আর যাত্রার শেষদিনে আমি দাঁড়িয়ে আছি এতগুলো মানুষের ভিড়ে ।যদিও মনের মধ্যে কাজ করছে বিশাল এক শূন্যতা ।কাল থেকে নতুন কোন এডভেঞ্চার নেই,এই ভাবনাই খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে ভেতরটা ।'
'এত দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পরে সবকিছু খানিকটা শূন্য শূন্য বলেই মনে হচ্ছে ।কাল থেকে অপেক্ষা করে নেই নতুন কোনো পথ ,নেই নতুন কোনো অভিগ্গতা, নতুন মুখের সাথেও হাসি বিনিময় করা হবে না চলতি পথে ।গন্তব্যে পৌঁছে একটা কথাই মনে হচ্ছে,Everywhere is walking distance ,if you have much time.'
বই পড়া শেষ করে আমারও প্রায় একই রকম অনুভূতি হচ্ছিলো । বাবার আলী ভাই তার যাত্রাটা এতো দারুণভাবে বর্ণনা করেছেন ,মনে হচ্ছিলো আমিও উনার সাথে চলছি । সবচেয়ে অবাক করা বিষয় মনে হয়েছে ,এতো পথ কলার পরেও সেগুলো আবার ডায়েরি নোট করা আর নগন্য টাইপিং মিস্টেক ।অন্যান্য বই এ যেখানে টাইপিং মিস্টেক এ ভরপুর ,সেখানে এটাতে টাইপিং মিস্টেক পাওয়ার পর মনে হচ্ছিলো ,''টাইপিং মিস্টিকমুক্ত বইও হয়!" পরিশেষে,Full of adventure,lots of information,little bit of information.